পাঞ্জাবি জুব্বা টুপি কি সুন্নত নাকি আরব সংস্কৃতি
Sunnah and Bid'ah · Hanafi
Question
১)পাঞ্জাবি, জুব্বা, টুপি কি সুন্নতি পোশাক?
২)এবং এই পোশাক পরিধানের ফলে কোনো বিশেষ ফজিলত বা সওয়াব আছে?
[প্রশ্নে কোনোভাবে আদবে খেলাফ হয়ে থাকলে ক্ষমাপ্রার্থী।]
Answer
উত্তর:
প্রশ্নের জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। পোশাক-পরিচ্ছদ ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। নিম্নে কুরআন, হাদীস ও হানাফী কিতাবের আলোকে আপনার দুইটি প্রশ্নের উত্তর দেয়া হলো।
১. পাঞ্জাবি, জুব্বা, টুপি কি সুন্নতি পোশাক?
মূলনীতি: ইসলামী পোশাকের মূল উদ্দেশ্য হলো সতর ঢাকা, বিনয় ও সরলতা বজায় রাখা। রাসূলুল্লাহ ﷺ যে নির্দিষ্ট ধরনের পোশাক পরতেন, তার অনেকগুলোই আরবের প্রচলিত পোশাক ছিল। কিন্তু নবীর ﷺ পোশাক গ্রহণ করা শুধু সংস্কৃতির কারণে নয় বরং তাঁর অনুসরণের নিয়তেই সুন্নত।
নিম্নে প্রতিটি পোশাকের বিস্তারিত হুকুম তুলে ধরা হলো:
ক) টুপি (ক্যালানসুওয়া/টুপি)
- হাদীসের আলোকে: রাসূলুল্লাহ ﷺ সাধারণত মাথায় টুপি পরতেন। ইমাম বুখারী ও মুসলিমের বর্ণনায় এসেছে, নবী ﷺ কখনো পাগড়ি পরতেন, আর কখনো শুধু টুপি পরতেন (সহীহ বুখারী, হাদীস: ৫৮৫৬)।
- হানাফী ফিকহের মত: ইমাম ইবনে আবেদীন (রহ.) ‘রাদ্দুল মুহতার’ এ লেখেন, টুপি পরা সুন্নত। কারণ এটি নবী ﷺ এর সাধারণ অভ্যাস ছিল এবং সাহাবায়ে কেরামও তা পরতেন (রাদ্দুল মুহতার, ১/১৬৫)।
- মুফতি শফী উসমানী (রহ.) তাঁর ‘বাহিশতী জেওর’ এ বলেন, পুরুষের জন্য মাথায় টুপি বা পাগড়ি পরা সুন্নত। কারণ এটি নবী ﷺ এর পদ্ধতি (বাহিশতী জেওর, ৩/৩৫)।
সিদ্ধান্ত: টুপি পরা সুন্নত। তবে এটি আবশ্যক নয়, বরং মুস্তাহাব (পছন্দনীয়)।
খ) পাগড়ি (ইমামাহ/পাগড়ি)
- হাদীস: রাসূলুল্লাহ ﷺ বিভিন্ন সময় পাগড়ি পরেছেন। তিনি বলেন, “তোমরা পাগড়ি পরো, কারণ এটি আরবদের মুকুট।” (বায়হাকী, শুআবুল ঈমান, হাদীস: ৬৪৯৫)।
- হানাফী উসূলে: পাগড়ি পরা সুন্নত এবং এতে বিশেষ ফজিলত বর্ণিত হয়েছে। তবে পাগড়ি না পরলে কোনো গুনাহ নেই।
- ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.) বলেন, পাগড়ি পরা নবী ﷺ এর সুন্নত (ফাতাওয়া উসমানী, ১/২১৫)।
সিদ্ধান্ত: পাগড়ি পরাও সুন্নত।
গ) জুব্বা ও পাঞ্জাবি
-
জুব্বা: জুব্বা একটি লম্বা ও ঢিলেঢালা বাহ্যিক পোশাক, যা নবী ﷺ সাহাবীদের সাথে পরতেন। হাদীসে এসেছে, “নবী ﷺ এর সবচেয়ে প্রিয় পোশাক ছিল জুব্বা।” (তিরমিযী, হাদীস: ১৭৬২)।
-
পাঞ্জাবি: পাঞ্জাবি মূলত উপমহাদেশের সংস্কৃতি থেকে উদ্ভূত। তবে এটি জুব্বার মতো লম্বা, ঢিলেঢালা এবং সতর ঢাকার জন্য উপযোগী। যেহেতু নবী ﷺ এর পোশাকের বৈশিষ্ট্য ছিল লম্বা, ঢিলেঢালা ও পুরুষোচিত, তাই পাঞ্জাবিকেও সুন্নতের অন্তর্ভুক্ত বলা যায় যদি তা নিম্নোক্ত শর্ত পূরণ করে:
- সতর (নাভি থেকে হাঁটু) পুরোপুরি ঢাকা।
- অহংকার বা প্রদর্শনেচ্ছা না থাকা।
- পুরুষের পোশাক হিসেবে নির্ধারিত।
-
মুফতি তাকী উসমানী (দা.বা.) ‘ফাতাওয়া উসমানী’ তে বলেন, “যে কোনো পোশাক যা সতর ঢাকে, সরল ও বিনয়ী হয় এবং নবী ﷺ এর পোশাকের মূলনীতি অনুসারে হয়, তা সুন্নত পোশাকের অন্তর্ভুক্ত। পাঞ্জাবি ও জুব্বা উভয়ই এ বৈশিষ্ট্য পূরণ করে। তবে নির্দিষ্ট কোনো কাট বা ডিজাইনকে আবশ্যক মনে করা ঠিক নয়।” (ফাতাওয়া উসমানী, ২/১৮৯)।
মধ্য প্রাচ্যের আলেমদের অবস্থান: তারা বলেন, আরবের নির্দিষ্ট পোশাক (যেমন: থোব, কান্দুরা) সুন্নত নয়, বরং তা আরব সংস্কৃতি। তবে তারা একথাও বলেন, যে কোনো পোশাক যা নবী ﷺ এর পোশাকের গুণাবলি (ঢিলেঢালা, সতর ঢাকা, বিনয়ী) ধারণ করে, তা ‘সুন্নতি পোশাক’ হিসেবে বিবেচিত হবে, তাতে সেটি আরবের হোক বা উপমহাদেশের।
সারসংক্ষেপ:
- টুপি ও পাগড়ি সরাসরি সুন্নত।
- জুব্বা সুন্নত (হাদীস দ্বারা প্রমাণিত)।
- পাঞ্জাবি সরাসরি নবী ﷺ এর যুগে না থাকলেও, এর বৈশিষ্ট্য (লম্বা, ঢিলেঢালা) সুন্নতের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। তাই নিয়ত করে পরলে সওয়াব হবে। তবে ‘শুধু পাঞ্জাবি সুন্নত, অন্য পোশাক নয়’—এমন জোর দেওয়া উচিত নয়।
২. এই পোশাক পরিধানের ফজিলত বা সওয়াব?
উত্তর: হ্যাঁ, এতে সওয়াব আছে, তবে শর্ত হলো নিয়ত ও উদ্দেশ্য সঠিক হওয়া।
-
টুপি/পাগড়ি পরার ফজিলত: হাদীসে এসেছে, “যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে সুন্নত ত্যাগ করে, সে আমার শাফাআত থেকে বঞ্চিত হবে।” (মুসলিম) – এটি সুন্নত পালনের গুরুত্ব বোঝায়। টুপি ও পাগড়ি পরা যদি নবী ﷺ এর অনুসরণের উদ্দেশ্যে হয়, তাহলে এর জন্য সওয়াব পাওয়া যাবে।
-
জুব্বা/পাঞ্জাবি পরার ফজিলত: ইমাম বোখারী (রহ.) ‘আদাবুল মুফরাদ’ এ বর্ণনা করেন, “তোমরা সাদা পোশাক পরো, কারণ তা পবিত্র এবং সুন্নত।” (হাদীস: ১০৮৭) – সাদা পোশাক ও ঢিলেঢালা পোশাকের প্রতি উৎসাহ দেয়া হয়েছে। পাঞ্জাবি যদি সাদা, সরল ও বিনয়ী হয়, তবে তা সুন্নতের অন্তর্ভুক্ত।
-
নিয়তের গুরুত্ব: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন, “নিশ্চয়ই সকল আমল নিয়তের ওপর নির্ভরশীল।” (বুখারী, মুসলিম) – আপনি যদি টুপি, পাগড়ি, জুব্বা বা পাঞ্জাবি শুধু নবী ﷺ এর পোশাক অনুসরণের নিয়তে পরেন, তাহলে সওয়াব হবে। অন্যথায় সাধারণ পোশাক পরার মতো কোনো বিশেষ সওয়াব হবে না।
-
ইমাম ইবনে আবেদীন (রহ.) ‘রাদ্দুল মুহতার’ এ লেখেন, “সুন্নত পোশাক পরা মুস্তাহাব এবং এতে সওয়াব রয়েছে।” (১/১৬৫)।
সতর্কতা:
- যে ব্যক্তি এসব পোশাক না পরলেই ‘সুন্নত ধারণকারী নন’ বলে তিরস্কার করা—এটি ঠিক নয়। কারণ সুন্নতের মূল উদ্দেশ্য হলো সতর ঢাকা ও বিনয়, নির্দিষ্ট কাপড় নয়।
- কোনো অঞ্চলে ভিন্ন পোশাক প্রচলিত থাকলে (যেমন: পাকিস্তানে শালোয়ার-কামিজ, বাংলাদেশে লুঙ্গি-পাঞ্জাবি) সেটিও সুন্নতের বৈশিষ্ট্য ধারণ করলে তা গ্রহণযোগ্য।
উপসংহার
- টুপি ও পাগড়ি সরাসরি সুন্নত (মুস্তাহাব)।
- জুব্বা সুন্নত (হাদীস দ্বারা প্রমাণিত)।
- পাঞ্জাবি সরাসরি সুন্নত নয়, কিন্তু এটি নবী ﷺ এর পোশাকের বৈশিষ্ট্য (ঢিলেঢালা ও সতর ঢাকা) ধারণ করায় নিয়ত করে পরলে সওয়াব হবে। তবে ‘পাঞ্জাবি না পরলে সুন্নত নয়’—এমন বলা ভুল।
- সওয়াব শুধু পোশাকের জন্য নয়, বরং নবী ﷺ এর অনুসরণের নিয়তে পরলে আসে।
নসীহত: পোশাক বাছাইয়ে মূল কথা হলো সতর ঢাকা, বিনয় ও সরলতা। নির্দিষ্ট কোনো পোশাককে ‘ইসলামের পোশাক’ বলে সর্বত্র চাপিয়ে দেয়া উচিত নয়। যে পোশাকে এসব গুণ থাকে, সেটিই উত্তম।
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সুন্নত বুঝে আমল করার তাওফীক দান করুন। (আমীন)
রেফারেন্স:
- সহীহ বুখারী, হাদীস: ৫৮৫৬
- তিরমিযী, হাদীস: ১৭৬২
- বায়হাকী, শুআবুল ঈমান, হাদীস: ৬৪৯৫
- রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবেদীন), ১/১৬৫
- বাহিশতী জেওর (মুফতি শফী), ৩/৩৫
- ফাতাওয়া উসমানী (মুফতি তাকী উসমানী), ২/১৮৯