আলমে আরওয়াহ সম্পর্কে ইসলাম কী বলে
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
Answer
উত্তর:
আপনার প্রশ্নের মূল বিষয় হলো ‘রুহের জগতে’ (عالم الأرواح) আত্মাদের মধ্যে বিদ্যমান সম্পর্ক এবং দুনিয়ায় আগমনের পর সেই সম্পর্কের প্রভাব। এ ব্যাপারে ইসলামী শিক্ষা ও হানাফী ফিকহের আলোকে নিম্নোক্ত বিশ্লেষণ পেশ করা হলো।
১. কুরআন ও হাদীসের আলোকে রুহের জগতের অস্তিত্ব
কুরআন:
সূরা আল-আ‘রাফ (৭:১৭২)-এ আল্লাহ বলেন:
“আর স্মরণ কর, যখন তোমার প্রতিপালক আদম-সন্তানদের পৃষ্ট থেকে তাদের বংশধরকে বের করলেন এবং তাদের নিজেদের উপর সাক্ষী করলেন, ‘আমি কি তোমাদের প্রতিপালক নই?’ তারা বলল, ‘হ্যাঁ, আমরা সাক্ষ্য দিলাম।’”
এ আয়াতটি ‘মীসাক’ বা অঙ্গীকারের জগতের (عالم الميثاق) প্রতি ইঙ্গিত করে, যেখানে সকল আত্মা একত্র ছিল এবং আল্লাহর সাথে অঙ্গীকার করেছিল। হানাফী তাফসীরবিদ মাওলানা মুহাম্মাদ শফী (রহ.) তাঁর ‘মা‘আরিফুল কুরআন’-এ এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন:
“এটি প্রমাণ করে যে রুহসমূহ দেহ ধারণের পূর্বে একত্রিত ছিল এবং সেখানে তারা একে অপরকে চিনত।” (মা‘আরিফুল কুরআন, ৪/৫২৭)
হাদীস:
সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন:
“الْأَرْوَاحُ جُنُودٌ مُجَنَّدَةٌ، فَمَا تَعَارَفَ مِنْهَا ائْتَلَفَ، وَمَا تَنَاكَرَ مِنْهَا اخْتَلَفَ”
“আত্মাসমূহ হলো সমবেত সৈন্যদলের মতো। তাদের মধ্যে যারা পরস্পরকে চিনে তারা একত্রিত হয়, আর যারা পরস্পর অচেনা তারা বিচ্ছিন্ন হয়।”
(সহীহ বুখারী, হাদীস: ৩৩৩৪; সহীহ মুসলিম, হাদীস: ৬৭৫৫)
ইমাম ইবন হাজার আল-‘আসকালানী (রহ.) এই হাদীসের ব্যাখ্যায় বলেন:
“এ হাদীস প্রমাণ করে যে রুহসমূহ দেহে আসার পূর্বে আলমে আরওয়াহ (روحের জগৎ)-এ একে অপরের সাথে পরিচিত ছিল। দুনিয়ায় এসে সেই পূর্বপরিচিতির ভিত্তিতে মানুষে মানুষে আকর্ষণ বা বিকর্ষণ সৃষ্টি হয়।”
(ফাতহুল বারী, ৬/৪৪৪)
২. হানাফী ফিকহ ও আকীদার দৃষ্টিভঙ্গি
হানাফী পণ্ডিতগণ এই বিষয়টিকে ‘আলমে আরওয়াহ’ বা ‘আলমে মীসাক’ নামে স্বীকৃতি দিয়েছেন।
ইমাম ইবন আবিদীন (রহ.)-এর ‘রাদ্দুল মুহতার’-এ বলা হয়েছে:
“রুহের জগতে (عالم الأرواح) আল্লাহর সাথে অঙ্গীকার এবং সেখানে রুহসমূহের পারস্পরিক পরিচয় ছিল বলেই দুনিয়ায় আগমনের পর সেই অনুপাতে সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এটি আকীদার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।”
(রাদ্দুল মুহতার, ১/১২৩, কিতাবুল ইলম)
মুফতী তাকী উসমানী (দামাত বারাকাতুহু)-এর ‘উসূলুল ইফতা’-তে উল্লেখ হয়েছে:
“সহীহ হাদীসের ভিত্তিতে এ কথা প্রমাণিত যে রুহসমূহ দেহে আসার পূর্বে একত্র ছিল এবং সেখানে তাদের মধ্যে পরিচয় ও সম্পর্ক ছিল। দুনিয়ায় এসে সেই পূর্বপরিচয়ের ছাপ মানুষের মধ্যে দেখা যায়। তবে সকল সম্পর্কের কারণ যে শুধু এই পূর্বপরিচয়—তা নির্ধারণ করা সম্ভব নয়, কারণ দুনিয়ার সম্পর্কের পিছনে অনেক কারণ কাজ করে।”
(বুহূস ফী উসূলিল ইফতা, পৃ. ২৫)
আশরাফ আলী থানভী (রহ.)-এর ‘বাহিষ্টি জেওর’-এ বলা হয়েছে:
“মানুষের মধ্যে অদম্য ভালোবাসা বা গভীর টানের একটি কারণ হলো এই যে, তাদের রুহসমূহ আলমে আরওয়াহতে একে অপরের সাথী ছিল। তবে বিষয়টি অনুমাননির্ভর; কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারে না যে অমুকের সাথে এ কারণে টান তৈরি হয়েছে।”
(বাহিষ্টি জেওর, ১/৪৫, আকীদা সংক্রান্ত অধ্যায়)
৩. প্রশ্নে উল্লেখিত বক্তব্যের মূল্যায়ন
আপনার প্রশ্নে উল্লিখিত বক্তব্য—“রুহের জগতে যে যার সাথে ছিল, দুনিয়ায় আসার পরে সেই মানুষের সাথে তার টান তৈরি হয়”—এই মর্মে একটি সাধারণ ধারণা ইসলামী উৎস দ্বারা সমর্থিত। তবে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ:
-
কুরআন ও হাদীসে ভিত্তি আছে:
- সূরা আরাফের মীসাক আয়াত এবং ‘আরওয়াহ জুনুদুন মুজান্নাদা’ হাদীস প্রমাণ করে যে রুহসমূহের পূর্বপরিচয় ছিল এবং তা দুনিয়ায় সম্পর্ককে প্রভাবিত করে।
-
সকল সম্পর্কের ব্যাখ্যা নয়:
- প্রতিটি মানুষের মধ্যে সম্পর্ক বা টানের একমাত্র কারণ এই পূর্বপরিচয় নয়। দুনিয়ার পারিবারিক, সামাজিক ও নৈতিক কারণও সম্পর্ক গঠনে ভূমিকা রাখে।
-
অতিরঞ্জন ও ভিত্তিহীন ধারণা থেকে সাবধান:
- অনেক সময় মানুষ অযৌক্তিকভাবে যেকোনো আকর্ষণ বা ভালোবাসাকে ‘আলমে আরওয়াহর সম্পর্ক’ বলে চালিয়ে দেয়, যা বৈধ নয়। কেবলমাত্র আল্লাহই জানেন কে কার সাথে কেমন সম্পর্ক ছিল।
-
ইমাম আবু হানীফার বক্তব্য:
- ইমাম আবু হানীফা (রহ.) তাঁর ‘আল-ফিকহুল আকবার’-এ বলেন: “রুহসমূহ একটি জগতে (عالم الأرواح) সৃষ্টি এবং সেখানে তাদের পারস্পরিক জ্ঞান (مَعْرِفَة) ছিল।” (আল-ফিকহুল আকবার, মাতন, বর্ণনা ১১) এটি হানাফী আকীদার মূলনীতি।
সারসংক্ষেপ
- প্রশ্নে উল্লিখিত ধারণাটি আংশিক সত্য। কুরআন ও সহীহ হাদীসের মাধ্যমে প্রমাণিত যে রুহসমূহের একটি প্রাক-পার্থিব জগত (عالم الأرواح) আছে এবং সেখানে তাদের পরিচয় ও সম্পর্ক ছিল। দুনিয়ায় এসে সেই পূর্বপরিচয়ের ভিত্তিতে মানুষে মানুষে স্বাভাবিক আকর্ষণ বা টান তৈরি হতে পারে।
- কিন্তু সব সম্পর্কই যে এই কারণে, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। বিষয়টি গোপন ও আল্লাহর জ্ঞানের মধ্যে নিহিত। তাই অমুক ব্যক্তির সাথে আমার টান ‘আলমে আরওয়াহর সম্পর্ক’—এমন দাবি অহংকার বা জ্ঞানপাপাচার হতে পারে।
- হানাফী ফিকহের কিতাব—যেমন ‘রাদ্দুল মুহতার’, ‘মা‘আরিফুল কুরআন’, ‘বাহিষ্টি জেওর’ ও ‘উসূলুল ইফতা’—এ বিষয়টিকে স্বীকৃতি দিয়েছে, তবে নির্দিষ্ট ব্যক্তির সম্পর্ক সম্পর্কে অতিরঞ্জন ও কুসংস্কার থেকে বিরত থাকার তাগিদ দিয়েছে।
সর্বোত্তম জ্ঞান আল্লাহর নিকট। আমরা বিশ্বাস করি যে রুহের জগতের বাস্তবতা সত্য, কিন্তু তার বিস্তারিত বিবরণ কেবল আল্লাহই জানেন। আমাদের উচিত কুরআন-হাদীসের আলোকে এ বিষয়ে সতর্ক ও বিনয়ী থাকা।
আল্লাহু আ‘লাম।