'আলহামদুলিল্লাহ' এর মত ব্যবহৃত অন্যান্য বাক্যবলি সম্পর্কে জানতে চাই?
Sunnah and Bid'ah · Hanafi
Question
Answer
بسم الله الرحمن الرحيم
الحمد لله رب العالمين والصلاة والسلام على سيد المرسلين وعلى آله وأصحابه أجمعين
নিচে দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত আল্লাহর নাম ও গুণের সাথে সম্পৃক্ত কিছু গুরুত্বপূর্ণ ইসলামী শব্দ ও বাক্য অর্থ, ব্যবহারের স্থান এবং কোরআন-হাদীস ও হানাফী ফিকহের কিতাবের রেফারেন্সসহ উপস্থাপন করা হলো। উল্লেখিত সকল শব্দ ও বাক্য সহীহ এবং দ্বীনের মূলনীতি অনুযায়ী প্রমাণিত।
১. مَا شَاءَ اللَّهُ (ماشاء اللہ)
- অর্থ: "আল্লাহ যা চান তা-ই হয়।"
- ব্যবহার: কোনো ভালো বা সুন্দর জিনিস দেখলে (যেমন সন্তান, সম্পদ, প্রকৃতি) বলতে হয়। এটি হিংসা বা অহংকার থেকে বাঁচার জন্য এবং আল্লাহর ইচ্ছার প্রতি সম্মান জানানোর জন্য।
- দলিল: সূরা আল-কাহফ (১৮:৩৯) – "وَلَوْلَا إِذْ دَخَلْتَ جَنَّتَكَ قُلْتَ مَا شَاءَ اللَّهُ"
- হাদীস: আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (সা.) বলেন: "যখন তোমাদের কেউ কোনো ভাইয়ের মধ্যে সন্তান বা সম্পদে এমন কিছু দেখে যা পছন্দ করে, তবে সে যেন তার জন্য বরকতের দুআ করে।" (ইবনে মাজাহ: ৩৫০৯)
২. الْحَمْدُ لِلَّهِ (আলহামদুলিল্লাহ)
- অর্থ: "সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য।"
- ব্যবহার:
- কোনো নেয়ামত পেলে বা সুসংবাদ শুনলে।
- খাওয়া-দাওয়ার পর (বুখারী: ৫৪৫৮)।
- হাঁচি দেওয়ার পর (বুখারী: ৬২২৪)।
- দুঃখ-কষ্ট দূর হলে।
- দলিল: সূরা আল-ফাতিহা (১:২) – "الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ"
- হাদীস: নবী (সা.) বলেন: "আলহামদুলিল্লাহ বললে পাল্লা পূর্ণ হয়।" (মুসলিম: ২২৩)
৩. بَارَكَ اللَّهُ (বারাকাল্লাহ)
- অর্থ: "আল্লাহ বরকত দান করুন।"
- ব্যবহার:
- কাউকে ভালো কিছু করতে দেখলে বা তার কোনো জিনিস দেখলে (যেমন নতুন জামা, নতুন গাড়ি) বলতে হয়।
- বিয়ে বা কোনো শুভ অনুষ্ঠানে দম্পতিকে আশীর্বাদ করতে।
- দলিল: হাদীস: "بَارَكَ اللَّهُ لَكَ وَبَارَكَ عَلَيْكَ" (আবু দাউদ: ২১৩০)
- হানাফী ফিকহ: ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.) বলেন: "যখন কোনো নেয়ামত দেখে, তখন বলবে: 'بارك الله لك فيه'।" (আল-ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়্যাহ, ৫/৩৫৪)
৪. جَزَاكَ اللَّهُ خَيْرًا (জাযাকাল্লাহু খাইরান)
- অর্থ: "আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দিন।"
- ব্যবহার: কেউ ভালো কাজ করলে বা উপকার করলে কৃতজ্ঞতা প্রকাশে বলতে হয়।
- দলিল: হাদীস: "যদি কেউ তোমাকে বলে 'جَزَاكَ اللَّهُ خَيْرًا', তবে তুমি বলবে: 'وَإِيَّاكَ' (তোমাকেও)।" (তিরমিযী: ২০৩৫)
- হানাফী গ্রন্থ: ইমাম শাফি'র উক্তি উদ্ধৃত করেছেন ইবনে আবেদীন (রহ.) 'রাদ্দুল মুহতার' (২/৫২২)-এ।
৫. بِسْمِ اللَّهِ (বিসমিল্লাহ)
- অর্থ: "আল্লাহর নামে শুরু করছি।"
- ব্যবহার:
- খাওয়া-দাওয়ার শুরুতে (বুখারী: ৫৩৭৬)।
- ঘর থেকে বের হওয়ার সময় (তিরমিযী: ৩৪২৬)।
- যে কোনো বৈধ কাজের শুরুতে (যেমন পড়া, লেখা, গাড়ি চালানো)।
- দলিল: সূরা হুদ (১১:৪১) – "بِسْمِ اللَّهِ مَجْرَاهَا وَمُرْسَاهَا"
৬. إِنْ شَاءَ اللَّهُ (ইনশাআল্লাহ)
- অর্থ: "যদি আল্লাহ চান।"
- ব্যবহার: ভবিষ্যতে কোনো কাজ করার ইচ্ছা প্রকাশে।
- দলিল: সূরা আল-কাহফ (১৮:২৩-২৪) – "وَلَا تَقُولَنَّ لِشَيْءٍ إِنِّي فَاعِلٌ ذَلِكَ غَدًا إِلَّا أَنْ يَشَاءَ اللَّهُ"
৭. سُبْحَانَ اللَّهِ (সুবহানাল্লাহ)
- অর্থ: "আল্লাহ পবিত্র।"
- ব্যবহার:
- কোনো আশ্চর্যজনক বা মহান জিনিস দেখলে।
- নামাজে রুকু ও সিজদায় (বুখারী: ৭৬১)।
- দলিল: সূরা আল-ইসরা (১৭:১) – "سُبْحَانَ الَّذِي أَسْرَى بِعَبْدِهِ"
৮. اللَّهُ أَكْبَرُ (আল্লাহু আকবার)
- অর্থ: "আল্লাহ মহান।"
- ব্যবহার:
- নামাজের তাকবির।
- কোনো বিপদ বা আনন্দের সময়।
- কোরবানির পশু জবাইয়ের সময়।
- দলিল: সূরা আল-ইসরা (১৭:১১১) – "وَقُلِ الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي لَمْ يَتَّخِذْ وَلَدًا"
৯. أَسْتَغْفِرُ اللَّهَ (আস্তাগফিরুল্লাহ)
- অর্থ: "আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই।"
- ব্যবহার:
- গুনাহের পর বা ভুল-ত্রুটির জন্য তওবা করতে।
- নামাজের পর (বুখারী: ৬৩২৯)।
- দলিল: সূরা নূহ (৭১:১০) – "فَقُلْتُ اسْتَغْفِرُوا رَبَّكُمْ إِنَّهُ كَانَ غَفَّارًا"
১০. لاَ حَوْلَ وَلاَ قُوَّةَ إِلاَّ بِاللَّهِ (লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ)
- অর্থ: "আল্লাহ ছাড়া কোনো পরিবর্তন ও শক্তি নেই।"
- ব্যবহার:
- বিপদ বা কষ্টের সময়।
- কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা দেখলে।
- হাদীস: নবী (সা.) বলেন: "এটি জান্নাতের ধন।" (বুখারী: ৬৪০৫)
১১. تَوَكَّلْتُ عَلَى اللَّهِ (তাওয়াক্কালতু আলাল্লাহ)
- অর্থ: "আমি আল্লাহর উপর ভরসা করলাম।"
- ব্যবহার: কাজ শুরু করার সময় বা কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর।
- দলিল: সূরা আত-তালাক (৬৫:৩) – "وَمَنْ يَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ فَهُوَ حَسْبُهُ"
১২. رَضِيتُ بِاللَّهِ رَبًّا (রাদ্বীতু বিল্লাহি রাব্বা)
- অর্থ: "আমি আল্লাহকে রব হিসেবে সন্তুষ্টচিত্তে মেনে নিলাম।"
- ব্যবহার: ইসলামের মৌলিক বিশ্বাস জাহিরে বা সকাল-সন্ধ্যার দুআয়।
- হাদীস: নবী (সা.) বলেন: "যে ব্যক্তি সকালে ও সন্ধ্যায় তিনবার বলে 'رَضِيتُ بِاللَّهِ رَبًّا...', তার জন্য জান্নাত ওয়াজিব হবে।" (আবু দাউদ: ৫০৭২)
১৩. يَا اللَّهُ (ইয়া আল্লাহ)
- অর্থ: "হে আল্লাহ!"
- ব্যবহার: সরাসরি দুআ বা সাহায্য চাওয়ার জন্য।
- দলিল: সূরা আল-আরাফ (৭:১৮০) – "وَلِلَّهِ الْأَسْمَاءُ الْحُسْنَى فَادْعُوهُ بِهَا"
১৪. اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ (আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদ)
- অর্থ: "হে আল্লাহ! মুহাম্মাদ (সা.)-এর উপর দরুদ বর্ষণ করুন।"
- ব্যবহার: নবী (সা.)-এর নাম শুনলে বা নামাজের শেষ বৈঠকে।
- হাদীস: নবী (সা.) বলেন: "যে ব্যক্তি আমার উপর একবার দরুদ পাঠায়, আল্লাহ তার উপর দশবার রহমত নাযিল করেন।" (মুসলিম: ৪০৮)
১৫. إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)
- অর্থ: "নিশ্চয় আমরা আল্লাহর জন্য এবং আমরা তাঁরই কাছে ফিরে যাব।"
- ব্যবহার: কারো মৃত্যু বা বিপদ সংবাদ শুনলে।
- দলিল: সূরা আল-বাকারাহ (২:১৫৬) – "الَّذِينَ إِذَا أَصَابَتْهُمْ مُصِيبَةٌ قَالُوا إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ"
১৬. مَا شَاءَ اللَّهُ لَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللَّهِ (মা শা আল্লাহ লা হাওলা ওয়ালা কুওওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ)
- অর্থ: "আল্লাহ যা চান, আর আল্লাহ ছাড়া কোনো শক্তি ও ক্ষমতা নেই।"
- ব্যবহার: কোনো বস্তুর ভালো অবস্থা দেখে বা সম্পদের প্রশংসা করতে।
- হাদীস: নবী (সা.) বলেন: "তোমাদের কেউ যখন তার সঙ্গীর সম্পদ ও সন্তান দেখে মুগ্ধ হয়, তখন যেন এই বাক্যটি বলে।" (তাবরানি, সিলসিলা সাহিহা: ১৩৪)
১৭. فِي سَبِيلِ اللَّهِ (ফি সাবিলিল্লাহ)
- অর্থ: "আল্লাহর পথে।"
- ব্যবহার:
- কোনো কাজ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করলে (যেমন সাদাকা, জিহাদ, ইলম শিক্ষা) বলতে হয়।
- দলিল: সূরা আত-তাওবাহ (৯:৬০) – "وَفِي سَبِيلِ اللَّهِ"
১৮. لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ (লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ)
- অর্থ: "আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য মা'বুদ নেই।"
- ব্যবহার:
- তওবা ও জিকিরের জন্য।
- মৃত্যুশয্যায় (বুখারী: ১২৩৭)।
- হাদীস: নবী (সা.) বলেন: "যার শেষ কথা 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' হবে, সে জান্নাতে যাবে।" (আবু দাউদ: ৩১১৬)
১৯. قَدَّسَ اللَّهُ سِرَّهُ (কাদ্দাসাল্লাহু সিররাহু)
- অর্থ: "আল্লাহ তার গোপন বিষয় পবিত্র করুন।"
- ব্যবহার: আওলিয়া বা বুজুর্গদের নামের পর সম্মানসূচক বাক্য হিসাবে।
- উৎস: এটি কোনো সহীহ হাদীস বা কোরআনে নেই, তবে সালাফ ও খলফদের আমল থেকে প্রসিদ্ধ। ইমাম শা'রানী (রহ.) 'আত-তাবাকাত' গ্রন্থে ব্যবহার করেছেন।
২০. رَحِمَهُ اللَّهُ (রাহিমাহুল্লাহ)
- অর্থ: "আল্লাহ তার উপর রহম করুন।"
- ব্যবহার: কোনো মৃত মুসলমানের বা ফকীহ-আলেমের উল্লেখ করলে।
- দলিল: সূরা আল-আহযাব (৩৩:৫৬) – "إِنَّ اللَّهَ وَمَلَائِكَتَهُ يُصَلُّونَ عَلَى النَّبِيِّ" থেকে গৃহীত। সাহাবীগণ পরস্পরের জন্য এই দুআ করতেন।
২১. نَوَّرَ اللَّهُ قَبْرَهُ (নাওওয়ারাল্লাহু কাবরাহু)
- অর্থ: "আল্লাহ তার কবর আলোকিত করুন।"
- ব্যবহার: মৃত বুজুর্গের জন্য দুআ করতে বলতে হয়।
- উৎস: এটি 'রাদ্দুল মুহতার' (১/১৮৪) ইত্যাদি হানাফী গ্রন্থে উল্লিখিত।
২২. شَكَرَ اللَّهُ سَعْيَكَ (শাকারাল্লাহু সা'ইয়াকা)
- অর্থ: "আল্লাহ আপনার প্রচেষ্টাকে স্বীকৃতি দিন (ধন্যবাদ)।"
- ব্যবহার: কেউ কোনো পরিশ্রম করলে বা সাহায্য করলে বলতে হয়।
- হাদীস: নবী (সা.) বলেন: "যে ব্যক্তি মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না, সে আল্লাহর প্রতিও কৃতজ্ঞ নয়।" (তিরমিযী: ১৯৫৪)
২৩. جَمَعَ اللَّهُ بَيْنَكُمَا فِي خَيْرٍ (জামা'আল্লাহু বাইনাকুমা ফি খাইর)
- অর্থ: "আল্লাহ তোমাদের উভয়কে কল্যাণে একত্রিত করুন।"
- ব্যবহার: বিয়ের সময় বা কোনো দু'জনের মিলন অনুষ্ঠানে।
- হাদীস: নবী (সা.) বর-কনেকে এই দুআ দিতেন (তিরমিযী: ১০৯১)।
২৪. أَحْسَنَ اللَّهُ عَاقِبَتَكَ (আহসানাল্লাহু আক্বিবাতাকা)
- অর্থ: "আল্লাহ তোমার শেষ পরিণতি সুন্দর করুন।"
- ব্যবহার: কারো বিদায়কালে বা কোনো বিপদাপন্ন ব্যক্তির জন্য দুআ করতে।
- হানাফী ফিকহ: ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.) এ দুআ ব্যবহার করতেন (আল-আসার: ১২৩)।
২৫. سَلَامُ اللَّهِ عَلَيْكُمْ (সালামুল্লাহি আলাইকুম)
- অর্থ: "আল্লাহর শান্তি তোমাদের উপর বর্ষিত হোক।"
- ব্যবহার:
- সালাম দেওয়ার সময় সাধারণত "السلام عليكم" বলা উত্তম, তবে "سلام الله عليكم" বলা দ্বারাও সুন্নত আদায় হবে।।
- দলিল: সূরা ইউনুস (১০:২৫) – "وَاللَّهُ يَدْعُو إِلَى دَارِ السَّلَامِ"
হানাফী ফিকহের বিশেষ নির্দেশনা:
ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, সাধারণ নিয়মে জিকির ও দুআ-সমূহ কোরআন ও হাদীস থেকে প্রমাণিত হওয়া জরুরি। তবে সাহাবা ও তাবেয়ীগণের আমলও গ্রহণযোগ্য যতক্ষণ না তা কোরআন-হাদীসের বিরোধী হয়। ইমাম মুহাম্মাদ (রহ.) 'কিতাবুল আসার'-এ সাহাবীদের দ্বারা বলা বহু শব্দ (যেমন "بارك الله لك") উল্লেখ করেছেন। ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.) 'আল-খারাজ'-এ "جزاك الله خيرا" ব্যবহারকে মুস্তাহাব বলেছেন।
বিঃদ্রঃ বর্তমান সমাজে ব্যবহৃত কিছু বাক্য যেমন "গুড লাক", "থ্যাংক্স" ইত্যাদির পরিবর্তে উপরে বর্ণিত ইসলামী শব্দগুলো ব্যবহার করাই উত্তম। والله أعلم بالصواب