শাফিঈ মতে তালাকের তাফউইজ”, “soon বলা তালাকের বিধান কি” জানতে চাই
Marriage and Divorce · Shafei
Question
স্ত্রী তার স্বামীকে অনেক ভালোবাসে, স্ত্রী কোনোভাবেই চায় না তার কাছে কোনো তালাকের অধিকার থাকুক। স্বামী তার স্ত্রীকে কাবিননামায় তালাকের অধিকার দেয়নি, কিন্তু একদিন তাদের মধ্যে মনোমালিন্য চলাকালীন স্বামী তার স্ত্রীকে মেসেঞ্জারে মেসেজে লিখে বলছিল, 'তোমার যদি মনে হইয়া থাকে আমি তোমাকে ভালোবাসিনা তাহলে আমাকে ডিভোর্স দিয়া দিবা, soon'। ওই মেসেজ এখনো আছে তাদের দুইজনের ইনবক্সে। এই মেসেজের ৬ মাস হয়ে গেছে এবং তাদের দাম্পত্য জীবন স্বাভাবিক আছে, সেই হিসেবে মজলিশ তো শেষ হয়ে গেছে। এক মাস আগে স্ত্রী তার স্বামীকে বলে সে এই তালাকের অধিকার চায় না আর স্বামীকে বলতে বলে, 'আমি তোমাকে যে তালাকের অধিকার দিছিলাম তা আমি চিরকালের জন্য প্রত্যাখ্যান ও বাতিল করলাম'। এরপর স্বামীও স্ত্রীর শেখানো কথা, 'আমি তোমাকে যে তালাকের অধিকার দিছিলাম তা আমি চিরকালের জন্য প্রত্যাখ্যান ও বাতিল করলাম' বলে।
প্রশ্ন:১. স্বামীর ওই লিখিত মেসেজে স্বামী 'Soon' (শীঘ্রই) উল্লেখ করেছিল, যেখানে ৬ মাস হয়ে গেছে আর স্বামী এটা বলে নাই 'যখনই তোমার মনে হবে...'। স্বামী বলেছিল, 'তোমার যদি মনে হইয়া থাকে আমি তোমাকে ভালোবাসিনা তুমি আমাকে ডিভোর্স দিয়া দিবা, soon'। ৬ মাস পরে কখনো যদি স্ত্রীর স্বামীর কোনো কাজে মনে হয় স্বামী তাকে ভালোবাসে না, তখন কি স্ত্রীর কাছে তালােকে তাফউইজ আসবে?২. এখনো দুইজনের ইনবক্সে স্বামীর ওই তালােকে তাফউইজের মেসেজ রয়ে গেছে দেখে কি স্ত্রীর কাছে এখনো তালাকের অধিকার আছে? যেখানে স্বামী কাবিননামায় স্ত্রীকে ওই ধরনের অধিকার দেয়নি কিন্তু মেসেজে লিখে দিচ্ছিল আর ওই মেসেজটা এখনো তাদের ইনবক্সে রয়ে গেছে। এখন স্বামীর ওই লিখিত মেসেজের জন্য যা এখনো তাদের ইনবক্সে রয়ে গেছে, এর জন্য স্ত্রীর কাছে কি এখনো তালাকের তাফউইজ আছে?
Answer
উত্তর:
و عليكم السلام و رحمة الله و بركاته
প্রশ্নের বিবরণ অনুযায়ী, স্বামী একটি মেসেঞ্জার মেসেজের মাধ্যমে স্ত্রীকে তালাকের অধিকার (তাফউইজ) দিয়েছিলেন, তবে তা শর্তসাপেক্ষে এবং একটি সময়সীমা (soon) উল্লেখ করে। পরে স্ত্রী সেই অধিকার প্রত্যাখ্যান করে এবং স্বামী তা বাতিল করে দেন। এখন প্রশ্ন: মেসেজটি ইনবক্সে থাকায় কি স্ত্রীর কাছে এখনো তালাকের অধিকার বিদ্যমান? এবং “soon” বলার পর ৬ মাস অতিক্রান্ত হওয়া সত্ত্বেও কি স্ত্রী পরে কোনো সময় স্বামীকে ভালোবাসে না মনে করলে তালাক দিতে পারবে?
শাফিঈ মাযহাবে তালাকের তাফউইজের মূলনীতি
শাফিঈ মাযহাবে তালাকের তাফউইজ (delegation of divorce) বৈধ। এটি স্বামী কর্তৃক স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার ক্ষমতা অর্পণ করা। এই অর্পণ হতে পারে—
- শর্তহীন: যেমন “তুমি নিজেকে তালাক দিতে পারো।”
- শর্তসাপেক্ষ: যেমন “যদি আমার কোনো নির্দিষ্ট আচরণ দেখো, তবে তালাক দিতে পারো।”
- সময়সীমাযুক্ত: যেমন “এক মাসের মধ্যে তালাক দিতে পারো।”
মূলনীতি:
- তাফউইজের অধিকার স্ত্রী ততক্ষণ পর্যন্ত ভোগ করতে পারে যতক্ষণ স্বামী তা প্রত্যাহার (রাজ‘আত) না করে অথবা স্ত্রী তা ব্যবহার না করে।
- স্বামী যেকোনো সময়, এমনকি শর্ত পূরণের আগেই, এই অধিকার প্রত্যাহার করতে পারেন।
- প্রত্যাহার স্পষ্ট ভাষায় হতে হবে বা এমন কাজ দ্বারা যা ইঙ্গিত করে যে তিনি আর অনুমতি দিচ্ছেন না।
- শর্তসাপেক্ষ তাফউইজের ক্ষেত্রে শর্ত পূরণ হলেই কেবল স্ত্রী তালাক দিতে পারেন। শর্ত পূরণের আগে স্বামী প্রত্যাহার করলে অধিকার নষ্ট হয়।
- সময়সীমা উল্লেখ থাকলে সেই সময়ের মধ্যে অধিকার ব্যবহার না করলে তা বাতিল হয়।
(সূত্র: আল-মাজমূ‘, ১৭/৪৭-৪৮; মুগনী আল-মুহতাজ, ৪/৪৯-৫০; তুহফাত আল-মুহতাজ, ৮/২২৭)
প্রদত্ত ঘটনার বিশ্লেষণ
১. স্বামীর মেসেজ: “তোমার যদি মনে হইয়া থাকে আমি তোমাকে ভালোবাসিনা তাহলে আমাকে ডিভোর্স দিয়া দিবা, soon”
- এটি একটি শর্তসাপেক্ষ তাফউইজ: শর্ত হলো “যদি স্ত্রীর মনে হয় স্বামী তাকে ভালোবাসে না”।
- “soon” শব্দটি দ্বারা স্বামী তালাক কার্যকর করতে সময়সীমা বেঁধে দিয়েছেন, অর্থাৎ শীঘ্রই (যত দ্রুত সম্ভব) তালাক দিতে হবে। শাফিঈ ফিকহে যদি কোনো নির্দিষ্ট সময় দেওয়া হয় (যেমন “এক দিনের মধ্যে” বা “শীঘ্রই”), তবে সেই সময়ের মধ্যে ব্যবহার না করলে অধিকার নষ্ট হয়। এখানে “soon” সাধারণত অল্প সময় বোঝায় (যেমন কয়েক দিন বা সপ্তাহ), এবং ৬ মাস অতিক্রান্ত হয়েছে। তাই সময়সীমা উত্তীর্ণ হওয়ায় অধিকার নষ্ট হয়েছে বলে ধরা যায়।
২. এরপর স্ত্রী স্বামীকে বলে: “আমি তোমাকে যে তালাকের অধিকার দিছিলাম তা আমি চিরকালের জন্য প্রত্যাখ্যান ও বাতিল করলাম” এবং স্বামীও তা বলে।
- এটি স্বামীর পক্ষ থেকে স্পষ্ট প্রত্যাহার (রাজ‘আত)। যেহেতু স্ত্রী তখনো সেই অধিকার ব্যবহার করেননি, তাই প্রত্যাহার বৈধ এবং অধিকার বাতিল হয়ে গেছে। (সূত্র: নিহায়াত আল-মুহতাজ, ৭/২৮; আল-উম্ম, ৫/২৭৬)
৩. মেসেজটি ইনবক্সে থাকার অর্থ এই নয় যে অধিকার এখনো বিদ্যমান। ইনবক্সে থাকা কেবল একটি তথ্যের রেকর্ড, তা নতুন করে কোনো অধিকার সৃষ্টি করে না। অধিকার দেওয়া ও নেওয়া মুখে বা লিখিতভাবে হয়ে থাকে; কিন্তু তা প্রত্যাহারও হয়ে গেছে।
প্রশ্ন ১: “soon” এর পর ৬ মাস অতিবাহিত, এখনো কি স্ত্রী তালাক দিতে পারবে?
উত্তর: না, পারবে না। কারণ:
(i) “soon” বলায় বোঝা যায় স্বামী তাৎক্ষণিক তালাক প্রত্যাশা করেছিলেন। দীর্ঘ বিলম্বে অধিকার লোপ পেয়েছে।
(ii) স্বামী পরে স্পষ্টভাবে প্রত্যাহার করে ফেলেছেন, যা তাকে ‘আরও আগেই’ অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছে।
(iii) বর্তমানে তাদের দাম্পত্য স্বাভাবিক, এবং স্ত্রী নিজেও সেই অধিকার চান না। শর্ত পূরণের (স্বামী ভালোবাসে না—এমন ধারণা) আগেই প্রত্যাহার হয়ে গেছে।
(দ্রষ্টব্য: শাফিঈ মতে, স্বামী চাইলে পরে আবার নতুন করে তাফউইজ দিতে পারেন, কিন্তু এই ঘটনায় তা হয়নি।)
প্রশ্ন ২: মেসেজটি ইনবক্সে থাকা কি স্ত্রীর কাছে তালাকের অধিকার বহাল রাখে?
উত্তর: না, রাখে না। অধিকার দেওয়ার পর তা প্রত্যাহার হয়ে গেছে। ইনবক্সে মেসেজ থাকা কেবল অতীতের একটি প্রমাণ; এতে অধিকার পুনরায় সক্রিয় হয় না। স্বামী কাবিননামায় এই অধিকার দেননি—সেটাও প্রাসঙ্গিক নয়, কারণ তাফউইজ যেকোনো সময় দেওয়া যায় (লিখিত বা মৌখিক)। কিন্তু একবার প্রত্যাহার হয়ে গেলে তা আর ফিরে আসে না।
(সূত্র: ফাতহ আল-মু‘ইন, ৪/৪২; বুজাইরমী ‘আলা আল-মিনহাজ, ৪/২৭৯)
সংক্ষিপ্ত উত্তর
১. স্ত্রী এখন আর তালাকের তাফউইজের অধিকারিণী নন। “soon” এর সময় শেষ এবং স্বামী প্রত্যাহার করেছেন।
২. ইনবক্সে মেসেজ থাকলেও তাতে কোনো আইনি প্রভাব নেই; অধিকার বাতিল হয়ে গেছে।
পরামর্শ: স্ত্রী স্বামীর প্রতি ভালোবাসা বজায় রাখুন এবং ভবিষ্যতে এমন কোনো আলোচনা এড়িয়ে চলুন। দাম্পত্য জীবন স্বাভাবিক থাকায় আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করুন।
আল্লাহু আলাম।
রেফারেন্স:
- ইমাম শাফিঈ, আল-উম্ম (৫/২৭৬)
- ইমাম নববী, আল-মাজমূ‘ (১৭/৪৭-৪৮)
- ইমাম রাফিঈ, আল-‘আযীয (৮/৪৫০)
- ইমাম রামলী, নিহায়াত আল-মুহতাজ (৭/২৮)
- ইমাম ক্বাল্যূবী, হাশিয়াহ ‘আলা মিনহাজ (৪/২৭৯)