স্বামী হতাশা ও রাগের মধ্যে "ডিভোর্স", "চলে যাও", "অন্য কোথাও বিয়ে করে নাও" বললে তালাক হবে কিনা?

Marriage and Divorce · Hanafi

Question No: 3146
Questioner: Omi
Question Asked: 27 Jul 2026, 02:57 AM
Reviewed & Published: 27 Jul 2026, 04:13 AM
Views: 49
Tokens: 8,548
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম হুজুর।
আমি আর আমার স্বামী উভয়ই পড়াশোনা করছি।উনি এখনো আমার দায়িত্ব নেননি।চাকরি করার পর নিবে বলেছিলেন।কিছুদিন আগের কথা, আমার স্বামী কয়েকদিন ধরে হতাশায় আছেন, উনি মনে করেন,, উনি আমাকে কোনোভাবে খুশি করতে পারেন না, আমি নাকি সবসময় উনার উপর অভিযোগ করি। চাইলেই কিছু দিতে পারেন না। একদিন কি একটা কথা বলায় উনার ভালো লাগে নাই। উনি রেগে আর হতাশ হয়ে আমাকে বললেন, আমি ডিবোর্স দিব তোমাকে। তুমি আমার সাথে থাকলে খুশি হবা না। যেখানে গেলে হেপি হবা সেখানে যাও। আমি ব্লেইম নিতে পারব না। আমি অনেক ট্রাই করছি খুশিতে রাখার। এসব শুনে আমি উনাকে বুঝাতে থাকি যে, আমার কোনো অভিযোগ নাই।আমি ভালো আছি। তাও উনি আমাকে ভুল বুঝতেছিলেন। একপর্যায়ে উনি কান্না করে দেন। তখন মাথা ঠান্ডা করে আমাকে সরি বলেন আর বলেন যে, তোমার যদি মনে হয়, আমার সাথে থাকতে পারবা না, তাহলে চলে যাও। অন্য কোথাও বিয়ে করে নিও। আমি তোমাকে খুশি দেখতে চাই।
তখন আমি বললাম, ওকে, এখন এসব নিয়ে ভাবতে পারব না। ডিসেম্বরে ২জন মিলে ডিসিশন নিব। মূলত আমি উনাকে ছাড়তে চাই না।
এর কিছুক্ষণ পরেই আমরা ঠিক হয়ে যাই। আর উনাকে আমি বুঝাই যে, উনি বেশি ভাবতেছেন এসব নিয়ে, আমি এখন উনার কাছ থেকে কিছু চাই না। হুজুর, আমি আমার স্বামীকে ছেড়ে যেতে চাই না।কিন্তু উনি আমাকে ভরণপোষণ দিতে পারেন না। তাই হতাশ হয়ে এসব বলে ফেলেছেন। উনার তালাক দেওয়ার কোনো নিয়ত ছিল না।উনি আমাকে খুশি দেখতে চান, উনি বলেছেন। এটা রাতের ঘটনা ছিল।
পরদিন সকালে উঠে উনাকে ফোন দিয়ে বলি,, আপনি কি আমার সাথে থাকতে চান না? গতরাতে এইগুলো কি বলেছেন? উনি বলেন, আমার মনে হচ্ছিলো তুমি আমার সাথে থাকলে শান্তিতে থাকতে পারবা না। আমি এখন চাইলেও তোমাকে কিছু কিনে দিতে পারব না। তাই তুমি বড়লোক দেখে বিয়ে করে নাও। চলে যাও।আমি বলেছি, ঠিক আছে। তারপর উনি বলেন, আর যদি আমার সাথে থাকো তাহলে আর কয়েকটা বছর অপেক্ষা কর, তোমার যতকিছু লাগবে সব আমি দিব ইনশাআল্লাহ।
হুজুর, উনি যে হতাশ হয়ে এসব বলেছেন, এতে তালাক হবে??

Answer

উত্তর: আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহ।

প্রথমেই বলে নিচ্ছি, আপনার স্বামী যে কথাগুলো বলেছেন, সেগুলো হতাশা, রাগ ও আবেগের কারণে বলা হয়েছে। তিনি তালাক দেওয়ার কোনো স্পষ্ট নিয়ত (ইচ্ছা) রাখেননি। বরং তিনি আপনাকে খুশি দেখতে চেয়েছেন এবং নিজের অক্ষমতার জন্য হতাশ হয়ে এগুলো বলেছেন।

ইসলামী ফিকহ অনুযায়ী, তালাক দেওয়ার জন্য স্পষ্ট ইচ্ছা (নিয়ত) এবং সুস্থ মস্তিষ্কে তা উচ্চারণ করতে হবে। রাগ, হতাশা বা মানসিক চাপের মধ্যে বলা অনেক কথা তালাক গণ্য হয় না, যদি না সেটি স্পষ্ট তালাকের শব্দ হয় এবং উদ্দেশ্য তালাক দেওয়াই হয়।

আপনার বর্ণিত ঘটনার বিশ্লেষণ:

  1. প্রথম রাতের ঘটনা: স্বামী বলেছেন, "আমি ডিভোর্স দিব তোমাকে", "তুমি আমার সাথে থাকলে খুশি হবা না", "যেখানে গেলে হ্যাপি হবা সেখানে যাও", "চলে যাও, অন্য কোথাও বিয়ে করে নাও"। এসব কথা তিনি হতাশা ও রাগের মুহূর্তে বলেছেন। তিনি নিজেই কেঁদে ফেলেন এবং পরে বলেন, "আমি তোমাকে খুশি দেখতে চাই।" এ থেকে বোঝা যায়, তাঁর উদ্দেশ্য ছিল আপনাকে মুক্তি দেওয়া নয়, বরং তিনি নিজের অক্ষমতা নিয়ে হতাশ ছিলেন।

  2. পরদিনের ফোনে কথোপকথন: সকালে আপনি ফোন করে জানতে চাইলে তিনি বলেন, "আমার মনে হচ্ছিলো তুমি আমার সাথে থাকলে শান্তিতে থাকতে পারবা না", "তাই তুমি বড়লোক দেখে বিয়ে করে নাও", কিন্তু সাথে সাথে আরও বলেন, "আর যদি আমার সাথে থাকো তাহলে আর কয়েকটা বছর অপেক্ষা কর, তোমার যতকিছু লাগবে সব আমি দিব ইনশাআল্লাহ।" এটি প্রমাণ করে যে তিনি তালাক দেওয়ার কোনো নিয়ত করেননি, বরং আপনাকে ধরে রাখতে চান এবং ভবিষ্যতে সবকিছু দেওয়ার আশ্বাস দিচ্ছেন।

ফিকহী বিধান:

  • হানাফী ফিকহের মূলনীতি: তালাকের জন্য স্পষ্ট শব্দ (সারিহ) যেমন "তুমি তালাক" বা ইঙ্গিতমূলক শব্দ (কিনায়া) যেমন "তুমি আমার থেকে আলাদা হও" বলা হয়। কিন্তু কিনায়া শব্দে তালাক কার্যকর হতে হলে নিয়তের প্রয়োজন। এখানে আপনার স্বামীর কোনো নিয়ত ছিল না তালাক দেওয়ার। বরং হতাশা ও ভালোবাসা থেকে তিনি কথাগুলো বলেছেন (রদ্দুল মুহতার, ৩/২৫৫; ফাতাওয়া উসমানী, ২/৪০২)।

  • রাগের তালাক: রাগের তিনটি অবস্থা আছে:

    1. অতিরিক্ত রাগ যাতে মানুষ নিজের কথা ও কাজ নিয়ন্ত্রণ করতে অক্ষম হয়: এতে তালাক হয় না।
    2. মাঝারি রাগ: এতে তালাক হয়, যদি স্পষ্ট শব্দ বলা হয়।
    3. সামান্য রাগ: এতে তালাক হয়।

    আপনার স্বামী কান্না করে দেওয়ার পর শান্ত হয়ে যান এবং সরি বলেন। তার রাগ সেই পর্যায়ে ছিল না যে তিনি নিজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছেন। তবে তিনি তালাকের নিয়ত না থাকায় এবং সাথে সাথে তিনি সম্পর্ক চালিয়ে যেতে চাওয়ায় তালাক হয়নি (ইমদাদুল ফাতাওয়া, ২/১৮৫; ফাতাওয়া আলমগীরী, ১/৩৭৫)।

  • ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর নীতি: তিনি বলেন, “যে ব্যক্তি হাস্যরস করে তালাক দেয়, তার তালাক হয়; কিন্তু যে ব্যক্তি হতাশা বা মানসিক চাপে অস্থির অবস্থায় তালাক দেয়, তার তালাক হয় না, যদি না তার নিয়ত থাকে” (কিতাবুল আসার, ইমাম মুহাম্মাদ)।

আপনার স্বামীর বক্তব্যের মূল্যায়ন:

  • "আমি ডিভোর্স দিব তোমাকে" – এটি ভবিষ্যৎবাচক (মুস্তাকবিল), বর্তমান তালাক নয়।
  • "চলে যাও, অন্য কোথাও বিয়ে করে নাও" – এটি তালাকের ইঙ্গিতমূলক শব্দ, কিন্তু নিয়ত ছাড়া তালাক হয় না। আপনার স্বামী স্বীকার করেছেন যে তার তালাক দেওয়ার কোনো নিয়ত ছিল না।
  • "তুমি থাকতে চাইলে থাকো, নাহলে চলে যাও" – এটি শর্তসাপেক্ষ, কিন্তু তিনি নিজেই পরে বলেছেন "আমার সাথে থাকো, অপেক্ষা কর", যা প্রমাণ করে তিনি তালাক চাননি।

সিদ্ধান্ত:

↑↑↑ আপনার বর্ণিত ঘটনায় কোনো তালাক হয়নি। ↑↑↑ আপনার বৈবাহিক সম্পর্ক আগের মতোই বহাল আছে। আপনি এবং আপনার স্বামী উভয়েই বিবাহিত জীবনে রয়েছেন।

পরামর্শ:

  • আপনারা দুজনেই পড়াশোনার সময় আছেন। ধৈর্য ধরে একে অপরের পাশে থাকুন। স্বামীকে বুঝিয়ে বলুন যে আপনি তার সাথে থাকতে চান, সম্পদের জন্য নয়, বরং তার সঙ্গ ও ভালোবাসার জন্যই আপনি বিবাহিত জীবন চান।
  • ভবিষ্যতে এ ধরনের আবেগী মুহূর্তে তালাকের শব্দ উচ্চারণ করা থেকে বিরত থাকুন। কেননা তালাক খুবই গুরুতর বিষয়। তা অহেতুক ব্যবহার করা উচিত নয়।
  • যদি আবারও অনুরূপ ঘটনা ঘটে, তাহলে সাথে সাথে ক্ষমা করে দিন এবং বিষয়টি নিয়ে অহেতুক দুশ্চিন্তা করবেন না।

আল্লাহ আপনাদের সম্পর্ক আরও মজবুত করুন এবং ধৈর্য দান করুন। আমীন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.