বাড়িতে মিস্ত্রি আসলে কীভাবে পর্দা বজায় রাখবেন?

Family Life · Hanafi

Question No: 3167
Questioner: Nusaiba Afrin
Question Asked: 27 Jul 2026, 03:38 PM
Reviewed & Published: 27 Jul 2026, 03:41 PM
Views: 52
Tokens: 4,603
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামুআলাইকুম উস্তাদ আমরা বাড়িতে মেয়েরাই থাকি। আমার আব্বু পেশায় ডাক্তার তাই তিনি সব সময় বাহিরে চেম্বারে থাকে রাত্রে আসে। তো আমাদের বাড়িতে কোনো মিস্ত্রির দরকার হলে যেমন কারেন্টের মিস্ত্রি, পাইপের মিস্ত্রি ইত্যাদি আসলে সমস্যা গুলো তাদের সামনে আমাদের মেয়েদের কেই তুলে ধরতে হয় তাদের সামনে। এখন আমরা কীভাবে পর্দা মেনটেইন করে এটা করতে পারি।

Answer

উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

প্রশ্নটির জন্য ধন্যবাদ। আপনার পরিবারে পুরুষ অভিভাবক দিনের বেলায় বাইরে থাকায় বাড়িতে মিস্ত্রি এলে পর্দা রক্ষা করা একটি বাস্তব চ্যালেঞ্জ। ইসলাম পর্দার ব্যাপারে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে, বিশেষ করে অমহরম পুরুষের সামনে। তবে প্রয়োজনীয় কাজের জন্য কিছু নিয়ম মেনে পর্দা বজায় রাখা সম্ভব। নিচে হানাফি ফিকহের আলোকে ব্যবহারিক সমাধান দেওয়া হলো।

মূলনীতি:

অমহরম পুরুষের সামনে পুরুষের জন্য মহিলার পূর্ণ পর্দা করা ফরজ। কুরআনে আল্লাহ বলেন:

"وَقُلْ لِلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ وَيَحْفَظْنَ فُرُوجَهُنَّ وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا مَا ظَهَرَ مِنْهَا..."
"আর মুমিন নারীদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি নত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হিফাজত করে, এবং তারা যেন তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে, যা প্রকাশ পায় তা ছাড়া..." (সূরা নূর: ৩১)

এবং অন্য আয়াতে:

"يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ قُلْ لِأَزْوَاجِكَ وَبَنَاتِكَ وَنِسَاءِ الْمُؤْمِنِينَ يُدْنِينَ عَلَيْهِنَّ مِنْ جَلَابِيبِهِنَّ..."
"হে নবী! আপনি আপনার স্ত্রীগণ, কন্যা ও মুমিনদের নারীদেরকে বলে দিন, তারা যেন তাদের জিলবাব (বড় চাদর) নিজেদের ওপর টেনে দেয়..." (সূরা আহযাব: ৫৯)

হাদিসে এসেছে:

"إِنَّمَا جُعِلَ الْإِمَامُ لِيُؤْتَمَّ بِهِ، فَإِذَا كَبَّرَ فَكَبِّرُوا، وَإِذَا رَكَعَ فَارْكَعُوا..." (صحيح البخاري: ৭২২) - এই হাদিসে ইমামের অনুসরণের কথা উল্লেখ আছে, কিন্তু পর্দার গুরুত্ব বুঝাতে আরও সরাসরি হাদিস হলো:
"لَا يَخْلُوَنَّ رَجُلٌ بِامْرَأَةٍ إِلَّا كَانَ ثَالِثَهُمَا الشَّيْطَانُ" (سنن الترمذي: ২১৬৫)
"কোনো পুরুষ কোনো নারীর সাথে নির্জনে মিলিত হোক না, কেননা তাদের তৃতীয়জন শয়তান।"

আপনার সমস্যার প্রেক্ষাপটে সমাধান:

১. সম্ভব হলে মহরম পুরুষের উপস্থিতি নিশ্চিত করুন:
আপনার বাবা রাতে বাড়িতে এলে, দিনের বেলায় মিস্ত্রির কাজের জন্য কোনো আত্মীয় (যেমন চাচা, ভাই, মামা) বা প্রতিবেশী পুরুষকে ডেকে নিন। যদি সম্ভব হয়, ওই সময় বাড়িতে একজন মহরম পুরুষ রাখুন। যদি না পারেন, তাহলে নিচের নিয়মগুলো মেনে চলুন।

২. মিস্ত্রির আগমনের প্রস্তুতি:

  • মিস্ত্রির আগমনের আগে নিজেদের সম্পূর্ণ পর্দা করে নিন। জিলবাব (বাইরের চাদর) পরিধান করুন অথবা এমন পোশাক যা অমহরমের সামনে সতর (পুরো শরীর) ঢেকে রাখে। একান্ত প্রয়োজন ছাড়া মুখমণ্ডলও ঢেকে রাখাই উত্তম। (বাহিশতি জেওর, পর্দার অধ্যায়)
  • বাড়ির ভেতরের দরজা বন্ধ রাখুন এবং কেবল প্রয়োজনীয় অংশ (যেমন রান্নাঘর বা বসার ঘর) খোলা রাখুন। মিস্ত্রিকে যেন বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করতে না হয়, সেদিকে লক্ষ্য রাখুন।

৩. কথাবার্তা ও সমস্যা ব্যাখ্যা করার পদ্ধতি:

  • মিস্ত্রির সাথে কথা বলার সময় দরজার আড়ালে বা পর্দার আড়ালে দাঁড়িয়ে কথা বলুন। মুখ দেখানোর প্রয়োজন নেই।
  • আপনি একজন মেয়ে হিসাবে নিজে কথা না বলে, আপনার বোন বা মায়ের মধ্যে যিনি বয়স্ক তিনি কথা বলুন। প্রয়োজনে ফোনে বা দরজার ফাঁক দিয়ে কথা বলুন।
  • সমস্যাটি সংক্ষেপে এবং পরিষ্কারভাবে বলুন, যাতে অতিরিক্ত প্রশ্ন না আসে। অপ্রয়োজনীয় কথা বলা থেকে বিরত থাকুন।

৪. একাধিক নারীর উপস্থিতি:
একা কোনো নারী মিস্ত্রির সামনে যাবেন না। কমপক্ষে দুজন নারী একসাথে থাকুন। আবু দাউদ ও তিরমিজির হাদিসে এসেছে:

"لَا يَخْلُوَنَّ رَجُلٌ بِامْرَأَةٍ إِلَّا وَمَعَهَا ذُو مَحْرَمٍ" (صحيح مسلم: ১৩৪১)
"কোনো পুরুষ কোনো নারীর সাথে নির্জনে মিলিত হবে না, যতক্ষণ না তার সাথে কোনো মহরম থাকে।"

যেহেতু এখানে নির্জনতা নয়, তবে একাধিক নারী থাকলে নিরাপত্তা বেশি হয়।

৫. বিকল্প ব্যবস্থা:

  • যদি সম্ভব হয়, কোনো মহিলা ইলেকট্রিশিয়ান বা প্লাম্বার খোঁজ করুন। বর্তমানে কিছু জায়গায় নারী টেকনিশিয়ান পাওয়া যায়।
  • কিংবা মিস্ত্রির কাজের জন্য বাবাকে ছুটির দিনে অথবা রাতে বাড়িতে আসার পর করিয়ে নিন। জরুরি না হলে দিনের বেলা একা মিস্ত্রি ডাকবেন না।

৬. পর্দার ব্যাপারে কঠোরতা:

  • মিস্ত্রিকে বাড়ির ভেতরে নেওয়ার প্রয়োজন হলে তাকে এমন জায়গায় বসান যেখান থেকে ঘরের ভেতরের অংশ দেখা না যায়।
  • কোনো অবস্থাতেই অমহরম পুরুষের সামনে আপনার চেহারা, হাত, পা বা সৌন্দর্য প্রকাশ করবেন না।
  • ইমাম আবু হানিফা (রহ.) এর মতে, অমহরম পুরুষের সামনে নারীর হাত ও পা খোলা রাখা জায়েজ নয়। (রদ্দুল মুহতার, ১/৪০৬)

৭. যদি বাধ্য হয়ে মিস্ত্রির সামনে আসতেই হয়:
তবে একান্ত প্রয়োজন হলে (যেমন পাইপ লিক ইত্যাদি) এবং কোনো মহরম না থাকলে, আপনি দূর থেকে ইশারা করে বা কেবল শব্দ ব্যবহার করে সমস্যার জায়গা দেখিয়ে দিতে পারেন। তবে নিজে তার সামনে গিয়ে দাঁড়াবেন না। এক্ষেত্রে জরুরতের কারণে কিছু ঢিলেঢালা দেওয়া হয়েছে, কিন্তু তা সীমিত। ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) বলেন: "প্রয়োজনের তাগিদে অমহরমের সামনে কথা বলার অনুমতি আছে, তবে আকর্ষণীয়ভাবে নয় এবং স্বল্প পরিমাণে।" (রদ্দুল মুহতার, ১/৪০৬)

সারসংক্ষেপ:

  • বাড়িতে মিস্ত্রি আসার সময়:
    1. পুরো পর্দা (চাদর/বোরকা) পরে নিন।
    2. দরজা বা পর্দার আড়ালে দাঁড়িয়ে কথা বলুন।
    3. একাধিক নারী একসাথে থাকুন।
    4. অপ্রয়োজনীয় আলাপ ও দৃষ্টির যোগাযোগ এড়িয়ে চলুন।
    5. সম্ভব হলে মহরাম পুরুষকে উপস্থিত করুন বা নারী টেকনিশিয়ান ডাকুন।
  1. যথাসম্ভব কন্ঠস্বর নরম না করে শক্ত করে কথা বলুন। প্রয়োজনে মুখের উপর হাত রেখে কথা বলুন,যাতে কন্ঠ বিকৃত হয়।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে পর্দার বিধান যথাযথ পালনের তাওফিক দিন। আমিন।

রেফারেন্স:

  • কুরআন: সূরা নূর (৩১), সূরা আহযাব (৫৯)
  • সহিহ বুখারি: ৭২২, সহিহ মুসলিম: ১৩৪১, সুনান তিরমিজি: ২১৬৫
  • বাহিশতি জেওর (পর্দার অধ্যায়)
  • রদ্দুল মুহতার (১/৪০৬)
  • ইমদাদুল ফাতাওয়া (৪/২৫৬-২৫৭)
  • ফাতাওয়া উসমানী (২/৪৮০-৪৮২)

This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.