হারানো জিনিস অন্যের কাছে দেখতে পেলে কী করবেন?

Miscellaneous Fiqh · Hanafi

Question No: 3191
Questioner: ayasa akter
Question Asked: 28 Jul 2026, 03:28 PM
Reviewed & Published: 28 Jul 2026, 03:33 PM
Views: 44
Tokens: 6,433
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

ধরো তুমি অনেকদিন যাবত তোমার দুইটা জিনিস পাচ্ছিলে না।মোটামুটি দামি জিনিস।একদিন অনিচ্ছাকৃতভাবে বা এক্সিডেন্টলি তুমি ওই জিনিসগুলো এমন একজন মানুষের কাছে দেখে ফেললে যেটা তুমি দুঃস্বপ্নেও চিন্তা করতে পারো নি।তোমার বিশ্বাস তো গুঁড়েবালি হয়ে যাবেই সাথে তুমি বলতেও পারবে না।এক্ষেত্রে তুমি কি করতে?অপশন দুটো-
১.তোমার ওই জিনিসগুলো তুমি ওই ব্যক্তির অবর্তমানে সরিয়ে নিতে।
২.আল্লাহর হাতে ওই ব্যক্তিকে তার কাজের দরুন সোর্পদ করে দিতে যেহেতু বলতে গেলে বেহুদা ঝামেলা সৃষ্টি হবে,সম্পর্ক খারাপ হবে।আল্লাহই তার ব্যবস্থা নিবে।

Answer

ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে উত্তর

আপনার বর্ণিত পরিস্থিতিতে ইসলামী শরীয়ত স্পষ্ট দিকনির্দেশনা দেয়। আপনি যে জিনিস দুটি হারিয়েছিলেন এবং তা অন্যের কাছে পেয়েছেন, সেই ব্যক্তি যদি আপনার বিশ্বাসের জায়গা থেকে পড়ে গিয়ে থাকেন, তাহলে আপনার করণীয় কী? নিচে কুরআন, হাদীস ও হানাফী ফিকহের কিতাবের আলোকে বিশ্লেষণ উপস্থাপন করা হলো।


মূলনীতি: নিজের সম্পদ ফিরিয়ে নেওয়ার অধিকার

ইসলামে নিজের সম্পদ ফিরিয়ে নেওয়া বৈধ, তবে তা হতে হবে ন্যায়সঙ্গত পদ্ধতিতে। কুরআনে আল্লাহ বলেন:

"তোমরা পরস্পরের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভোগ করো না।" (সূরা বাকারা, ২:১৮৮)

আরেক আয়াতে এসেছে:

"নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদেরকে আদেশ করেন যে, তোমরা আমানতসমূহ তার প্রাপককে প্রত্যার্পণ করবে।" (সূরা নিসা, ৪:৫৮)

হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

"কোনো মুসলিমের সম্পদ তার অনুমতি ছাড়া অপরের জন্য হালাল নয়।" (মুসনাদে আহমদ, সুনানে আবু দাউদ)

যদি আপনি নিশ্চিত হন যে সেই জিনিস দুটি আপনার, এবং আপনি তা কাউকে দেননি বা বিক্রি করেননি, তাহলে সেগুলো ফিরিয়ে নেওয়া আপনার অধিকার। কিন্তু কীভাবে নেবেন? এখানে দুটি অপশনের মধ্যে আপনি দ্বিধায় পড়েছেন।


অপশন ১: ব্যক্তির অভাবে চুরি করে নেওয়া

আপনার প্রথম অপশন: লোকটির অভাবে জিনিসগুলো সরিয়ে নেওয়া। এটি কি জায়েজ?

হানাফী ফিকহে বলা হয়েছে: যদি আপনি নিশ্চিত হন যে জিনিসটি আপনার এবং তা কোনো জালেম বা চোরের কাছে আছে, তাহলে আপনি তা সরিয়ে নিতে পারেন, তবে শর্ত হলো—এর ফলে কোনো ফিতনা বা বড় ক্ষতি সৃষ্টি না হয়। (রদ্দুল মুহতার, ৯/৫০; ফাতাওয়া আলমগীরী, ৩/৪৫০)

তবে, এই পদ্ধতি গ্রহণের আগে কয়েকটি বিষয় খেয়াল রাখা জরুরি:

  • বিশ্বাস: আপনি যদি একেবারে নিশ্চিত না হন যে জিনিসটি আপনার (যেমন, একই রকম অন্য কোনো জিনিস হতে পারে), তাহলে চুপিসারে নেওয়া জায়েজ নয়। এটা চুরির শামিল হবে।
  • উপকারিতা ও ক্ষতি: যদি নেওয়ার ফলে সম্পর্ক নষ্ট হয়, অশান্তি হয়, বা আপনার উপর সন্দেহ পড়ে, তাহলে শরীয়ত তা উৎসাহিত করে না। বরং আপনি যদি অন্যায়ের শিকার হন, তাহলে আল্লাহর উপর ভরসা করে ধৈর্য ধরা উত্তম।

বিখ্যাত হানাফী আলেম মুফতি মুহাম্মদ শফী (রহ.) লিখেছেন:

"নিজ জিনিস অপরের কাছে দেখতে পেলে, যদি সেটা দাবি করলে অসুবিধা হয়, তাহলে আল্লাহর কাছে দোয়া করুন এবং সুযোগ পেলে সরিয়ে নিন। তবে সরানোর সময় এমনভাবে করুন যাতে অপর ব্যক্তির প্রতি কোনো অপবাদ না লাগে।" (ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৪/২৩০)

অতএব, যদি আপনি নিশ্চিত এবং তা নেওয়ার ফলে কোনো ফিতনা না ঘটে, তবে প্রথম অপশনটি গ্রহণ করা জায়েজ। তবে সতর্ক থাকবেন—এটি যেন চুরি বা প্রতারণা না হয়।


অপশন ২: আল্লাহর ওপর ছেড়ে দেওয়া

দ্বিতীয় অপশন: বলতে না গিয়ে আল্লাহর ওপর ছেড়ে দেওয়া। ইসলামে এটি একটি প্রশংসনীয় পন্থা, বিশেষ করে যখন কথা বললে সম্পর্ক নষ্ট হয় এবং অনর্থক ঝামেলা সৃষ্টি হয়।

আল্লাহ বলেন:

"আল্লাহই তোমাদের সম্পদের ব্যবস্থা করেন, তিনি সর্বশক্তিমান।" (সূরা আত-তালাক, ২:২-৩)

এছাড়া হাদীসে এসেছে:

"যে ব্যক্তি কোনো মজলুমের দাবি ছেড়ে আল্লাহর কাছে প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য সোপর্দ করে, আল্লাহ তাকে তার চেয়ে উত্তম কিছু দান করেন।" (তিরমিযী, হাদীস: ২৫২৫)

তবে, এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি হলো: আল্লাহর ওপর ভরসা করার অর্থ এই নয় যে আপনি আপনার বৈধ অধিকার থেকে পুরোপুরি সরে যাবেন। বরং আপনি চেষ্টা করবেন, যদি সম্ভব হয় ন্যায়সংগত উপায়ে। আর যদি চেষ্টা করলে বড় ক্ষতি হয়, তাহলে সবর করুন এবং আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ জানান।

হানাফী ফিকহের ইমাম ইমাম আবু হানিফা (রহ.) থেকে বর্ণিত:

"যদি কেউ তার জিনিস অপরের কাছে স্পষ্ট দেখতে পায় কিন্তু সাক্ষী না থাকে, তাহলে সে চাইলে নিয়ে নিতে পারে, আবার চাইলে আল্লাহর ওপর ছেড়ে দিতে পারে। তবে নেওয়ার সময় ফিতনা না হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।" (শরহু মাআনিল আসার, ৪/১৪০)

সুতরাং দ্বিতীয় অপশনটিও বৈধ, তবে শর্ত হলো আপনি যথাসাধ্য চেষ্টা করার পর যদি তা অশান্তির কারণ হয়, তাহলে ছেড়ে দেওয়া উত্তম।


কোন অপশনটি উত্তম?

এক্ষেত্রে আপনার জন্য সবচেয়ে উত্তম পন্থা হলো:

  1. নিশ্চিত হোন জিনিস দুটি আপনার।
  2. পূর্বে কাউকে দিয়েছিলেন কিনা ভেবে দেখুন।
  3. যদি সম্ভব হয়, নরম ভাষায় কথা বলুন লোকটির সাথে। হয়তো তিনি ভুলে বা অজান্তে নিয়ে থাকতে পারেন। কথা বললে সম্পর্ক নষ্ট হলে পরে আফসোস করবেন না।
  4. যদি কথায় অসুবিধা হয় এবং আপনি নিশ্চিত, তাহলে এমনভাবে সরিয়ে নিন যাতে কেউ না জানে এবং আপনার ওপর কোনো সন্দেহ না আসে। তবে খেয়াল রাখবেন, যেন আপনি তার কোনো জিনিস না নেন।
  5. যদি সরানো সম্ভব না হয় বা তাতে ফিতনা হয়, তাহলে আল্লাহর ওপর ছেড়ে দিন। দোয়া করুন, তিনি আপনার হক ফিরিয়ে দেবেন বা এর চেয়ে উত্তম কিছু দেবেন।

ইমাম ইবনে আবেদীন (রহ.) তার বিখ্যাত গ্রন্থ রদ্দুল মুহতার-এ লিখেছেন:

"যে ব্যক্তি তার সম্পদ অপরের কাছে পায় এবং সে জানে তা তার, কিন্তু মালিক যদি তা দাবি করতে না চায় ফিতনার ভয়ে, তাহলে তার জন্য চুপ থাকা এবং আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করা উত্তম।" (রদ্দুল মুহতার, ৬/৫৪৫)

একই কথা মুফতি তাকী উসমানী-এর ফাতাওয়াতেও এসেছে (ফাতাওয়া উসমানী, ২/৪৫০)।


উপসংহার

  • প্রথম অপশন: জিনিস সরিয়ে নেওয়া জায়েজ যদি আপনি নিশ্চিত হন এবং তাতে ক্ষতি না হয়। তবে সতর্ক থাকুন, চুরির সন্দেহ না হয়।
  • দ্বিতীয় অপশন: আল্লাহর ওপর ছেড়ে দেওয়াও বৈধ এবং অনেক সময় উত্তম, বিশেষ করে যদি সম্পর্ক নষ্টের আশঙ্কা থাকে।
  • সর্বোত্তম পথ: সম্ভব হলে নরম ভাষায় কথা বলা। যদি না পারেন, তাহলে আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করুন এবং সময়মতো সুযোগ বুঝে নিন।

মনে রাখবেন: ইসলাম কখনো জুলুমকে সমর্থন করে না, কিন্তু জুলুমের প্রতিকারের পদ্ধতিতেও হিকমত (বুদ্ধিমত্তা) ও ইনসাফ বজায় রাখতে বলে। আপনার বিবেক ও পরিস্থিতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিন, তবে আল্লাহকে ভয় করুন এবং হারাম পন্থা অবলম্বন করবেন না।

আল্লাহু তায়ালা আপনাকে সঠিক পথ বুঝার তাওফিক দিন। আমীন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.