সহীহ ইস্তেগফার সমূহ
Sunnah and Bid'ah · Hanafi
Question
Answer
সমস্ত সহীহ ইস্তেগফার সমূহ (বাংলা উচ্চারণ ও অর্থসহ)
১. সর্বাধিক প্রচলিত ইস্তেগফার (ছোট)
আরবি:
أَسْتَغْفِرُ اللَّهَ
বাংলা উচ্চারণ:
“আসতাগফিরুল্লাহ”
অর্থ:
আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই।
দলীল:
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) প্রতিদিন সত্তরবারের বেশি এই ইস্তেগফার পড়তেন। (সহীহ বুখারী, হাদীস: ৬৩০৭; সহীহ মুসলিম, হাদীস: ২৭০২)
হানাফী রেফারেন্স:
বেহেশতী জেওর (১ম খণ্ড, ইস্তেগফার অধ্যায়) – মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ.)
২. সাইয়্যিদুল ইস্তিগফার (বড়)
আরবি:
اللَّهُمَّ أَنْتَ رَبِّي لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ، خَلَقْتَنِي وَأَنَا عَبْدُكَ، وَأَنَا عَلَى عَهْدِكَ وَوَعْدِكَ مَا اسْتَطَعْتُ، أَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّ مَا صَنَعْتُ، أَبُوءُ لَكَ بِنِعْمَتِكَ عَلَيَّ، وَأَبُوءُ بِذَنْبِي فَاغْفِرْ لِي فَإِنَّهُ لَا يَغْفِرُ الذُّنُوبَ إِلَّا أَنْتَ
বাংলা উচ্চারণ:
“আল্লাহুম্মা আনতা রাব্বী লা ইলাহা ইল্লা আনতা, খালাক্বতানী ওয়া আনা আবদুকা, ওয়া আনা আ’লা আহ্দিকা ওয়া ওয়া’দিকা মাসতাতা’তু, আ’ঊযু বিকা মিন শাররি মা সানা’তু, আবূউ লাকা বিনি’মাতিকা আলাইয়্যা, ওয়া আবূউ বিযাম্বী ফাগফির লী ফাইন্নাহু লা ইয়াগফিরুয যুনূবা ইল্লা আনতা।”
অর্থ:
হে আল্লাহ! তুমিই আমার প্রভু, তুমি ছাড়া কোন উপাস্য নেই। তুমি আমাকে সৃষ্টি করেছ এবং আমি তোমার দাস। আমি যথাসাধ্য তোমার অঙ্গীকার ও প্রতিজ্ঞার উপর আছি। আমি আমার কৃতকর্মের অনিষ্ট থেকে তোমার আশ্রয় চাই। তুমি আমার প্রতি তোমার অনুগ্রহ স্বীকার করছি এবং আমি আমার গুনাহ স্বীকার করছি। সুতরাং আমাকে ক্ষমা কর। কেননা তুমি ছাড়া আর কেউ গুনাহ ক্ষমা করতে পারে না।
দলীল:
সহীহ বুখারী, হাদীস: ৬৩০৬; নাসাঈ, হাদীস: ১০৪৪৪; আবু দাউদ, হাদীস: ৫০৭৪
সাওয়াব:
যে ব্যক্তি সন্ধ্যায় ইস্তেগফারটি পড়ে এবং সন্ধ্যায় মৃত্যুবরণ করে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। (বুখারী)
হানাফী রেফারেন্স:
ফাতাওয়া উসমানী (১/২১৪) – মুফতী মুহাম্মাদ শফী (রহ.)
৩. কুরআন মজীদ থেকে ইস্তেগফার
(ক) সূরা বাকারা: ২০১
আরবি:
رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ
বাংলা উচ্চারণ:
“রাব্বানা আতিনা ফিদ্দুনইয়া হাসানাতাওঁ ওয়া ফিল আখিরাতি হাসানাতাওঁ ওয়া ক্বিনা আযাবান নার।”
অর্থ:
হে আমাদের প্রভু! দুনিয়াতে আমাদের কল্যাণ দাও এবং আখিরাতেও কল্যাণ দাও, আর আমাদেরকে জাহান্নামের শাস্তি থেকে রক্ষা করো।
নোট: যদিও এটি সরাসরি ইস্তেগফার শব্দ নয়, তবে তওবা ও ক্ষমা প্রার্থনার অন্তর্ভুক্ত।
(খ) সূরা আল ইমরান: ১৪৭
আরবি:
رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا ذُنُوبَنَا وَإِسْرَافَنَا فِي أَمْرِنَا وَثَبِّتْ أَقْدَامَنَا وَانصُرْنَا عَلَى الْقَوْمِ الْكَافِرِينَ
বাংলা উচ্চারণ:
“রাব্বানাগফির লানা যুনূবানা ওয়া ইসরাফানা ফী আমরিনা ওয়া সাব্বিত আক্বদামানা ওয়ানসুরনা আলাল ক্বাওমিল কাফিরীন।”
অর্থ:
হে আমাদের প্রভু! আমাদের গুনাহসমূহ এবং আমাদের কাজের বাড়াবাড়ি ক্ষমা করো, আমাদের পদস্থির করো এবং কাফির সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে আমাদের সাহায্য করো।
(গ) সূরা ত্বহা: ২৫-২৮
আরবি:
قَالَ رَبِّ اغْفِرْ لِي وَلِأَخِي وَأَدْخِلْنَا فِي رَحْمَتِكَ ۖ وَأَنْتَ أَرْحَمُ الرَّاحِمِينَ
বাংলা উচ্চারণ:
“ক্বালা রব্বিগফির লী ওয়া লি-আখী ওয়া আদখিলনা ফী রাহমাতিকা ওয়া আনতা আরহামুর রাহিমীন।”
অর্থ:
মূসা (আ.) বললেন: হে আমার প্রভু! আমাকে ও আমার ভাইকে (হারূনকে) ক্ষমা করুন এবং আমাদেরকে আপনার রহমতে দাখিল করুন। আপনি সর্বাধিক দয়ালু।
(ঘ) সূরা নূহ: ২৮
আরবি:
رَبِّ اغْفِرْ لِي وَلِوَالِدَيَّ وَلِمَنْ دَخَلَ بَيْتِيَ مُؤْمِنًا وَلِلْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ
বাংলা উচ্চারণ:
“রব্বিগফির লী ওয়া লিওয়ালিদাইয়্যা ওয়া লিমান দাখালা বাইতিয়া মু’মিনাওঁ ওয়া লিল মু’মিনীনা ওয়াল মু’মিনাত।”
অর্থ:
হে আমার প্রভু! আমাকে, আমার পিতামাতাকে, আমার গৃহে মুমিনরূপে আগমনকারীকে এবং সকল মুমিন পুরুষ ও নারীকে ক্ষমা করুন।
৪. হাদীসের অন্যান্য ইস্তেগফার
(ক) “রব্বিগফির লী” (ছোট)
আরবি:
رَبِّ اغْفِرْ لِي
বাংলা উচ্চারণ:
“রব্বিগফির লী।”
অর্থ:
হে আমার প্রভু! আমাকে ক্ষমা করো।
দলীল:
সহীহ মুসলিম, হাদীস: ২৭০২ (সিজদায় এই দু‘আ পড়তেন)
(খ) সালাতের শেষে ইস্তেগফার
আরবি:
اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي مَا قَدَّمْتُ وَمَا أَخَّرْتُ وَمَا أَسْرَرْتُ وَمَا أَعْلَنْتُ وَمَا أَنْتَ أَعْلَمُ بِهِ مِنِّي، أَنْتَ الْمُقَدِّمُ وَأَنْتَ الْمُؤَخِّرُ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ
বাংলা উচ্চারণ:
“আল্লাহুম্মাগফির লী মা কাদ্দামতু ওয়া মা আখখারতু ওয়া মা আসরারতু ওয়া মা আ’লান্তু ওয়া মা আনতা আ’লামু বিহী মিন্নী, আনতাল মুক্বাদ্দিমু ওয়া আনতাল মুআখখিরু লা ইলাহা ইল্লা আনতা।”
অর্থ:
হে আল্লাহ! আমার পূর্বাপর এবং প্রকাশ্য-গোপনীয় সকল গুনাহ ক্ষমা করে দিন। আপনি সম্মুখে আনার এবং পশ্চাতে সরানোর অধিকারী। আপনি ছাড়া কোন উপাস্য নেই।
দলীল:
সহীহ মুসলিম, হাদীস: ৭৭১; তিরমিযী, হাদীস: ৩২৫০
(গ) সকাল-সন্ধ্যার ইস্তেগফার
আরবি:
أَسْتَغْفِرُ اللَّهَ الَّذِي لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ الْحَيَّ الْقَيُّومَ وَأَتُوبُ إِلَيْهِ
বাংলা উচ্চারণ:
“আসতাগফিরুল্লাহাল্লাযী লা ইলাহা ইল্লা হুওয়াল হাইয়্যুল ক্বাইয়ূমু ওয়া আতূবু ইলাইহি।”
অর্থ:
আমি সেই আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই যিনি ছাড়া কোন উপাস্য নেই, যিনি চিরঞ্জীব ও চিরস্থায়ী, এবং আমি তাঁর দিকে ফিরে যাই (তওবা করি)।
দলীল:
আবু দাউদ, হাদীস: ১৫১৭; তিরমিযী, হাদীস: ৩৫৭৭ (হাসান)
(ঘ) ইস্তেগফারের মাধ্যমে মাগফিরাতের সর্বোত্তম দু‘আ
আরবি:
اللَّهُمَّ إِنِّي ظَلَمْتُ نَفْسِي ظُلْمًا كَثِيرًا وَلَا يَغْفِرُ الذُّنُوبَ إِلَّا أَنْتَ، فَاغْفِرْ لِي مَغْفِرَةً مِنْ عِنْدِكَ، وَارْحَمْنِي إِنَّكَ أَنْتَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ
বাংলা উচ্চারণ:
“আল্লাহুম্মা ইন্নী জ্বালামতু নাফসী যুলমান কাসীরাওঁ ওয়া লা ইয়াগফিরুয যুনূবা ইল্লা আনতা, ফাগফির লী মাগফিরাতাম মিন ইনদিকা ওয়ারহামনী ইন্নাকা আনতাল গাফুরুর রাহীম।”
অর্থ:
হে আল্লাহ! আমি নিজের ওপর অনেক জুলম করেছি। তুমি ছাড়া আর কেউ গুনাহ মাফ করতে পারে না। সুতরাং তোমার পক্ষ থেকে আমাকে ক্ষমা করো এবং আমার ওপর রহম করো। নিশ্চয়ই তুমি ক্ষমাশীল ও দয়ালু।
দলীল:
সহীহ বুখারী, হাদীস: ৬৩২৬; সহীহ মুসলিম, হাদীস: ২৭০৫
৫. সংক্ষিপ্ত ইস্তেগফারের তালিকা (কোনো বাদ না দিতে)
| ক্রমিক | ইস্তেগফার (আরবি) | বাংলা উচ্চারণ | অর্থ | দলীল | |--------|------------------|--------------|------|------| | ১ | أَسْتَغْفِرُ اللَّهَ | আসতাগফিরুল্লাহ | আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই | বুখারী, মুসলিম | | ২ | أَسْتَغْفِرُ اللَّهَ رَبِّي وَأَتُوبُ إِلَيْهِ | আসতাগফিরুল্লাহা রাব্বী ওয়া আতূবু ইলাইহি | আমি আমার প্রভু আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই এবং তাঁর কাছে তওবা করি | আবু দাউদ | | ৩ | رَبِّ اغْفِرْ لِي | রব্বিগফির লী | হে আমার প্রভু! আমাকে ক্ষমা করো | মুসলিম | | ৪ | اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي | আল্লাহুম্মাগফির লী | হে আল্লাহ! আমাকে ক্ষমা করো | বুখারী | | ৫ | اللَّهُمَّ إِنَّكَ عَفُوٌّ تُحِبُّ الْعَفْوَ فَاعْفُ عَنِّي | আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুওউন তুহিব্বুল আফওয়া ফা’ফু আন্নী | হে আল্লাহ! আপনি ক্ষমাশীল, ক্ষমা পছন্দ করেন, অতএব আমাকে ক্ষমা করুন | তিরমিযী (শবে কদরের দু‘আ) | | ৬ | سُبْحَانَكَ اللَّهُمَّ وَبِحَمْدِكَ اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي | সুবহানাকা আল্লাহুম্মা ওয়া বিহামদিকা আল্লাহুম্মাগফির লী | পবিত্র আপনি হে আল্লাহ, আপনার প্রশংসার সাথে, হে আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করো | মুসলিম (রুকু থেকে উঠে) |
৬. হানাফী ফিকহের নির্দেশিত ইস্তেগফার
ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.) ও ইমাম মুহাম্মাদ (রহ.)-এর নির্দেশনা:
- ফরয সালাতের পর তিনবার “আসতাগফিরুল্লাহ্” বলা সুন্নাত। (ফাতাওয়া আলমগীরী, ১/৫২; রদ্দুল মুহতার, ১/২২৬)
- ইস্তেগফারের সময় হাত না তোলাই উত্তম, কারণ এটি নফল দু‘আ নয়, বরং নির্দিষ্ট জিকর। (ইমদাদুল ফাতাওয়া, ১/৩০৮)
ইমাম তাহাবী (রহ.)-এর কিতাব “শারহু মাআনিল আসার”-এ এসেছে:
যে কেউ প্রতিদিন “আসতাগফিরুল্লাহ” ১০০ বার পড়ে, তার গুনাহ মাফ হয় যদিও তা সমুদ্রের ফেনা পরিমাণ হয়। (শারহু মাআনিল আসার, ৪/২৯০)
৭. মুফতী তকী উসমানী (দা.ব.)-এর নির্দেশিত ইস্তেগফার
মুফতী সাব “ইসলাহী খুতুবাত” ও “বেহেশতী জেওর” ব্যাখ্যায় বলেন:
“সাইয়্যিদুল ইস্তিগফার” সর্বোত্তম ইস্তেগফার। প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যা এটি পড়া চাই। এছাড়া “আসতাগফিরুল্লাহ” মুখে সবসময় রাখা ছোট গুনাহ মাফের মাধ্যম।
৮. গুরুত্বপূর্ণ টিকা
-
হানাফী মতে ইস্তেগফারের শর্ত:
- গুনাহ ছেড়ে দেওয়া
- অনুতপ্ত হওয়া
- পুনরায় না করার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা
- যদি হকুল ইবাদ হয়, তাহলে ক্ষমা প্রার্থনা ও ফেরত দেওয়া। (রদ্দুল মুহতার, ১/২২৭)
-
ছোট ইস্তেগফারের ফযীলত:
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন: “যে ব্যক্তি ‘আসতাগফিরুল্লাহাল্লাযী লা ইলাহা ইল্লা হুওয়াল হাইয়্যুল কাইয়ূম’ পড়ে, তার গুনাহ মাফ হয় যদিও সে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পলায়ন করে থাকে।” (তিরমিযী, হাদীস: ৩৫৭৭) -
উত্তম আমল:
- প্রত্যেক ফরয সালাতের পর “আসতাগফিরুল্লাহ” (তিনবার)
- প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যা সাইয়্যিদুল ইস্তিগফার (একবার)
- দিন-রাতে ১০০ বার “আসতাগফিরুল্লাহ”
- বড় গুনাহের জন্য “আল্লাহুম্মাগফির লী যাম্বী কুল্লাহু দিক্কাহু ওয়াজিল্লাহু”
৯. উপসংহার
উপরোক্ত সকল ইস্তেগফার হানাফী ফিকহের নির্ভরযোগ্য সূত্র (কুরআন, সহীহ হাদীস, ফাতাওয়া উসমানী, ইমদাদুল ফাতাওয়া, রদ্দুল মুহতার, বেহেশতী জেওর) থেকে সংগৃহীত। কোনো ইস্তেগফার বাদ না দেওয়ার জন্য পূর্ণ তালিকা দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি ইস্তেগফার সহীহ সনদে প্রমাণিত।
মুদ্রিত গ্রন্থের রেফারেন্স:
- ফাতাওয়া উসমানী (২/২১৫-২৩০)
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (১/২৯৮-৩১২)
- রদ্দুল মুহতার (১/২২৫-২২৭)
- বেহেশতী জেওর (১ম খণ্ড, ইস্তেগফার অধ্যায়)
- মাআরিফুল কুরআন (মুফতী শফীর তাফসীর, সংশ্লিষ্ট আয়াতের ব্যাখ্যা)
- শারহু মাআনিল আসার (ইমাম তাহাবী, ৪/২৮৮-২৯২)
আল্লাহ আমাদের সকলকে ইস্তেগফারের মাধ্যমে নিজের গুনাহ মাফ করিয়ে জান্নাতুল ফিরদাউস নসীব করুন। আমীন।