দ্বীনি কাজে একাগ্রতা সৃষ্টির লক্ষে বিয়ে না করা কতটুকু গ্রহণযোগ্য ?
Sunnah and Bid'ah · Hanafi
Question
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
আমি দ্বীনি কাজ করার সিদ্বান্ত নিয়েছি।জীবনের সবটুকু দিয়ে ইসলামকে প্রতিষ্ঠা করতে চাই, শহীদ হতে চাই। কিন্তু বিবাহ করলে আমি মনে করি ওইদিকে পিছিয়ে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অনেকের কথা শুনেছি যারা এরকম করা আশা করত কিন্তু বিবাহের পর তাদের অজান্তে বা পরিস্থিতির কারণে তারা পথ থেকে সরে গেছেন। তাই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমি বিবাহ্ দেরি করে করবো। কারণ বিবাহ্ করলে আমার মিসন ভিশন থেকে ঝড়ে পড়তে পারি। আর আমাদের ঈমান দুর্বল আমাদের ঈমান সাহাবাদের মত না যে আমরা বিবাহ করব কিন্তু স্ত্রী সন্তান জিহাদে যাবার বাধা হবে না । আমার বয়স 20 আমি আরও ৬/৭ বছর পরে বিবাহ্ করব এই সময়টা দ্বীনি কাজে মশগুল থাকবো ঈমানকে আরো শক্ত করব। আমার এই সিদ্ধান্ত ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে কতটুকু ঠিক আছে। কারণ একজন ভাই আমাকে বলেছে যে আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম; তারাতারি বিবাহ করার জন্য উৎসাহিত দিয়েছেন। আমার সেই ভাইয়ের মতে আমার আপাতত দৃষ্টিতে মনে হতে পারে আমি পিছিয়ে পড়বো কিন্তু হতে পারে সত্যিকারে তা হবে না । কিন্তু আমি মনে করি আমাদের মতই দুর্বল ঈমানের মানুষদের জন্য তা শহীদ হওয়ার ক্ষেত্রে বাদার কারণ হতে পারে। বিবাহ না করলে আমি স্বাধীন আমি যেদিকে মন চায় চলে যেতে পারবো পিছুটান থাকবে না। কোন কথাটি সঠিক ইসলাম কি বলে এটা নিয়ে . কোরআন হাদিসের আলোকে জানাবেন দয়া করে ।
2. আমার বয়স এখন 20 বছর যদি বিয়ে করতেই হয় তাহলে কখন করা উচিত কতক্ষণ দেরি করা উচিত ।
Answer
بسم الله الرحمن الرحيم
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রথমেই আপনার দ্বীনী উদ্দেশ্য ও শহীদ হওয়ার আগ্রহের জন্য আপনাকে সালাম ও দো‘আ। আপনার নিয়ত অত্যন্ত উচ্চ ও প্রশংসনীয়। তবে ইসলামে বিবাহ ও দ্বীনী কাজকে পরস্পরবিরোধী মনে করা ঠিক নয়। বরং বিবাহ একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত ও সুন্নাহ, যা দ্বীনী কাজে সহায়ক হতে পারে। নিচে কুরআন-হাদীস ও হানাফী ফিকহের আলোকে আপনার প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হলো।
১. বিবাহ বনাম দ্বীনী কাজ: ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি
আপনার সিদ্ধান্ত (৬/৭ বছর বিবাহ না করে শুধু দ্বীনী কাজে মশগুল থাকা) ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে সম্পূর্ণ সঠিক নয়। কারণ:
ক. বিবাহ সুন্নাতে মুআক্কাদা (জোরালো সুন্নাহ):
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"يا معشر الشباب! من استطاع منكم الباءة فليتزوج، فإنه أغض للبصر وأحصن للفرج"
"হে যুবক সম্প্রদায়! তোমাদের মধ্যে যার বিবাহের সামর্থ্য আছে, সে যেন বিবাহ করে। কারণ তা দৃষ্টি অবনতকারী ও লজ্জাস্থানের পবিত্রতা রক্ষাকারী।"
(সহীহ বুখারী: ৫০৬৬, সহীহ মুসলিম: ১৪০০)
খ. বিবাহ ইবাদত ও দ্বীনী কাজের অংশ:
ইমাম ইবনে আবেদীন শামী (রহ.) বলেন:
"النكاح من سنن المرسلين، وهو عبادة بها حفظ الدين والنسب"
"বিবাহ নবীগণের সুন্নাহ, এবং এটি একটি ইবাদত যার দ্বারা দ্বীন ও বংশ সংরক্ষিত হয়।"
(রদ্দুল মুহতার: ৩/৪)
গ. সাহাবায়ে কেরামের উদাহরণ:
সাহাবীগণ বিবাহিত অবস্থায় জিহাদ, দাওয়াহ ও দ্বীন প্রতিষ্ঠার কাজ করেছেন। যেমন হযরত উমর (রা.), হযরত আলী (রা.), হযরত খালিদ বিন ওয়ালীদ (রা.) প্রমুখ। তাদের ঈমান দৃঢ় ছিল, কিন্তু তারা বিবাহকে বাধা মনে করেননি। বরং বিবাহ তাদের দ্বীনী কাজে শক্তি ও স্থিতিশীলতা দিয়েছে।
ঘ. বিবাহ না করার ক্ষতি:
দীর্ঘদিন বিবাহ না করলে নফসের চাহিদা দমিয়ে রাখা কঠিন হয়। এতে অনৈতিক কাজ বা পাপে জড়ানোর আশঙ্কা থাকে, যা আপনার দ্বীনী লক্ষ্যের জন্যই ক্ষতিকর। রাসূল ﷺ বলেছেন:
"من لم يتزوج فليس مني"
"যে বিবাহ করে না, সে আমার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত নয়।"
(সুনানে ইবনে মাজাহ: ১৮৪৬) [যদিও হাদীসটি শায (দুর্বল) হিসেবে গণ্য, তবে এর অর্থ দাঁড়ায় যে বিবাহ ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ রীতি]
ঙ. আপনার যুক্তির সমাধান:
আপনি বলছেন, “আমাদের ঈমান দুর্বল, তাই বিবাহ আমাদের জন্য বাধা হবে।” এটি শয়তানের ধোঁকা হতে পারে। আপনার ঈমানকে শক্তিশালী করতে হলে বিবাহই সহায়ক হতে পারে, কারণ এটি আপনাকে পাপ থেকে বাঁচাবে এবং দায়িত্বশীল করবে। দ্বীনী কাজের জন্য নিজেকে সম্পূর্ণ উৎসর্গ করতে গিয়ে আপনি যদি বিবাহের সুন্নাহ পরিত্যাগ করেন, তাহলে তা দ্বীন থেকে বিচ্যুতির কারণ হবে।
২. বিবাহের সঠিক সময় কখন?
আপনার বয়স ২০ বছর। এটি বিবাহের জন্য আদর্শ বয়স। হানাফী ফিকহের বড় আলেমগণ বলেন:
- ইমাম আবু হানীফা (রহ.) এর মতে, সামর্থ্য থাকলে বিবাহ ওয়াজিব না হলেও মুস্তাহাব (অত্যন্ত পছন্দনীয়)।
- ফতোয়া আলমগীরী তে লেখা আছে:
"إذا خاف على نفسه الزنا وجب عليه النكاح"
"যদি নিজের যিনা হওয়ার ভয় থাকে, তাহলে বিবাহ করা ওয়াজিব।"
(ফতোয়া আলমগীরী: ১/২৭২)
আপনি দুই-তিন বছর অপেক্ষা করতে পারেন, তবে ৬-৭ বছর দেরি করার কোনো ইসলামী সমর্থন নেই। বরং এর মধ্যে আপনার বয়স ২৬-২৭ হয়ে যাবে, যা অনেক বিলম্বিত হবে।
প্রস্তাবনা:
- এখনই একজন দ্বীনদার ও সহযোগী স্ত্রী খোঁজার চেষ্টা করুন। এমন স্ত্রী বেছে নিন যিনি আপনার দ্বীনী কাজে উৎসাহ দেবেন ও সহায়তা করবেন।
- বিবাহ না করা পর্যন্ত নিজেকে পাপ থেকে বাঁচাতে রোযা রাখার অভ্যাস করুন (হাদীসের নির্দেশ অনুযায়ী)।
- দাওয়াহ ও দ্বীনী কাজ চালিয়ে যান, কিন্তু বিবাহকে বাধা নয় বরং উৎসাহ হিসেবে নিন।
সারসংক্ষেপ:
১. আপনার সিদ্ধান্ত (বিবাহ দেরি করা) ইসলামের পরিপন্থী। কারণ বিবাহ একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত ও সুন্নাহ, যা দ্বীনী কাজের পথে বাধা নয় বরং সহায়ক।
২. আপনার বয়স ২০ হওয়ায় এখনই বিবাহের চেষ্টা করা উচিত। দেরি করলে পাপের আশঙ্কা বাড়বে। ৬-৭ বছর দেরি করা ঠিক নয়।
৩. শহীদ হওয়ার ইচ্ছা রাখলে সাহাবাদের পথ অনুসরণ করুন—বিবাহ করে দ্বীন প্রতিষ্ঠায় কাজ করুন।
আল্লাহ আপনাকে দ্বীনের পথে দৃঢ় রাখুন ও শহীদের মর্যাদা দান করুন। (آمين)