মহররম মাসে দাওয়াতের আয়োজন কি বিদআত?
Sunnah and Bid'ah · Hanafi
Question
Answer
উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
মহররম মাস উপলক্ষে প্রতি বছর যে দাওয়াত (আমন্ত্রণ/ভোজ) অনুষ্ঠিত হয়, তা নির্ণয় করতে হবে—এটি কী নিয়তে এবং কীভাবে পালিত হয়।
মূলনীতি
ইসলামে এমন কোনো নির্দিষ্ট দিন বা মাসকে ধর্মীয় উৎসব বানিয়ে প্রতি বছর আয়োজন করা, যার প্রমাণ কুরআন-হাদীসে নেই, তা বিদ‘আত বলে গণ্য হবে। হাদীসে এসেছে:
«من أحدث في أمرنا هذا ما ليس منه فهو رد»
“যে ব্যক্তি আমাদের এই দ্বীনে এমন নতুন কিছু সৃষ্টি করবে যা এর অন্তর্ভুক্ত নয়, তা প্রত্যাখ্যাত।” (বুখারী, মুসলিম)
মহররমের দাওয়াতের বিধান
- যদি দাওয়াতটিকে ধর্মীয় একটি আয়োজন মনে করা হয় (যেমন, মনে করা হয় এটি মহররমের সুন্নত বা ইবাদত), এবং প্রতি বছর একই তারিখে সেটা অনুষ্ঠিত হয়, তাহলে সেটা বিদ‘আতে রদিয়্যাহ (গর্হিত নবচর্চা) হবে। কেননা সাহাবা ও তাবেঈন থেকে মহররম উপলক্ষে বিশেষ দাওয়াত বা ভোজের কোনো প্রমাণ নেই।
- যদি এটি কেবল একটি সামাজিক মিলনমেলা হয় (যেমন আত্মীয়-স্বজনদের একত্র হওয়া, খাবার বিলি করা) এবং একে ধর্মীয় কোনো ফজিলতের সাথে সম্পৃক্ত না করা হয়, তাহলে তা বিদ‘আত নয়; বরং এটি একটি সাধারণ বৈধ কাজ। তবে এটাকে শুধু মহররমের জন্য নির্ধারিত করে না নেওয়াই উত্তম, যাতে ধর্মীয় আচার বলে কেউ ভুল না করে।
হানাফী কিতাবের আলোচনা
- ইমাম ইবনে আবেদীন (রহ.) বলেন: “কোনো নির্দিষ্ট দিনকে ইবাদতের জন্য বরাদ্দ করা বা উৎসব বানানো, যদি শরী‘আত থেকে তার প্রমাণ না থাকে, তবে তা বিদ‘আত।” (রদ্দুল মুহতার, ১/৫৪০)
- ফাতাওয়া উসমানী এবং ইমদাদুল ফাতাওয়া-তে এসেছে: “মাহে রমযান, মহররম ইত্যাদি উপলক্ষে বিশেষ দাওয়াত বা জমায়েতের কোনো ভিত্তি নেই। তবে যদি তা শুধু খাওয়া-দাওয়া ও আপ্যায়ন হয় এবং একে ধর্মীয় ফরজ বা ওয়াজিব মনে না করা হয়, তাহলে তা নাজায়েয নয়।”
- হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ.) বলেন: “প্রতি বছর নির্দিষ্ট দিনে ইবাদতের উদ্দেশ্যে জমায়েত করাকে যদি সুন্নাহ মনে করা হয়, তাহলে তা বিদ‘আত। আর যদি নিছক সাধারণ সভা হয়, তবে জায়েয।” (ইমদাদুল ফাতাওয়া ৫/৪৪৪)
সতর্কতা
- মহররম মাসের দশম তারিখ (আশুরা) রোজা রাখা সুন্নত, কিন্তু বিশেষ খাবার তৈরি বা দাওয়াত দেওয়া সুন্নত নয়।
- আমাদের সমাজে অনেক সময় “আশুরার হরির” বা “মহররমের খাবার” ইত্যাদি ধর্মীয় আচার হিসেবে পালিত হয়। সেটি বিদ‘আত। যদি আপনি কেবল সাধারণভাবে আত্মীয়দের দাওয়াত করেন (তাতে মাসের কোনো নাম না দিয়ে), তাহলে সমস্যা নেই।
আপনার সমাজের প্রসঙ্গ
আপনার প্রশ্নে “প্রতি বছরি দাওয়াত হয়”—সেটি যদি একটি নির্দিষ্ট নিয়মে এবং মহররমের জন্য বিশেষ আয়োজন হিসেবে হয় (যেমন কেউ মনে করে “এটা এই মাসের ইবাদত”), তাহলে তা বিদ‘আত হবে। আর যদি তা হয় সাধারণ একটি পারিবারিক বা সামাজিক দাওয়াত যা ঘটনাক্রমে মহররমে পড়ে গেছে, তাহলে সেটি জায়েয। তবে সর্বোত্তম পন্থা হলো: ধর্মীয় মাসুল বা নির্দিষ্টতার ভাবনা ছাড়াই, শুধু ভালো উদ্দেশ্যে যেকোনো বৈধ সময়ে দাওয়াত দেওয়া। বিশেষ করে মহররমে শোক বা হুসাইন (রা.)-এর শাহাদাতের মতো ঐতিহাসিক ঘটনা স্মরণে দাওয়াতকে উৎসবে পরিণত না করা।
উপসংহার
- যদি দাওয়াতটি আশুরা বা মহররমের একটি বিশেষ ইবাদত বা সুন্নত মনে করে প্রতি বছর একইভাবে করা হয়, তাহলে তা বিদ‘আত।
- যদি এটি কেবল সামাজিক আপ্যায়ন হয় এবং ধর্মীয় কোনো সাওয়াবের নিয়ত না থাকে, তাহলে তা বিদ‘আত নয়, তবে এটাকে মাসের সাথে জড়িয়ে না নেওয়াই উত্তম।
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে বিদ‘আত থেকে হেফাজত করুন এবং সুন্নাহর উপর প্রতিষ্ঠিত রাখুন।