হিদায়ত ও সঠিক পথের সন্ধান

Miscellaneous Fiqh · Hanafi

Question No: 2391
Questioner: Sonia Ety
Question Asked: 06 Jul 2026, 06:02 PM
Reviewed & Published: 06 Jul 2026, 06:12 PM
Views: 64
Tokens: 9,222
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম
আমি আমি আসলে কি বলবো কিভাবে বলবো কিছুই বুঝতেছিনা।আমি আগের সপ্তাহে একবার হলেও কোরআন পড়তাম নামাজও পড়তাম আগে নফল সুন্নত সহ কোরআন নামাজ পড়তাম তারপর আস্তে আস্তে নফল সুন্নত বাদ দিয়ে শুধু ফরজ পড়া শুরু করলাম এখন সবে বাদ পড়ে গেল আমি আজান দেয় আজান শুনি আমি আমি বুঝতে পারে আমার নামাজ পড়া উচিত আমি অনেক গুনা করতেছি খারাপ কাজ করতেছি মৃত্যু যে কোন মুহূর্তে এসে যেতে পারে আমার ছোট বাচ্চা আমাকে বলে আম্মু তুমি আগে নামাজ পড়তে এখন পড়ো না সব বুঝে কিন্তু নিজের নাফসকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না আগের মতো মনের মধ্যে সেই খারাপ লাগা ভয় কোন আবেগ অনুভূতি আসে না আল্লাহ আমার কাছ থেকে মনে হয় দেওয়ার তৌফিক কার সেজদা দিতে পারেন না এখন আর।আগে নামাজ মিস গেলে বুকের মধ্যে খুব কষ্ট হতো অনেক মন খারাপ হলে কষ্ট পাইলে কুরআন মাজীদ পড়ে বুকে নিলে অনেক শান্তি লাগতো এখন আর কোন অনুভূতি হয় না স্বাগত তিন চার মাস ধরে এরকম বেশি হচ্ছে আগে এখন একটা এনজিও তে চাকরি করি আমার বিয়ে হয়েছে ১১ বছর ১১ বছর অনেক মানুষের অত্যাচার ও সহ্য করছে।।আমি দিন দিন বাড়াও ইসলামিক মাদ্রাসায় আলমা করছো ভর্তি ছিলাম কিন্তু একবারও শেষ করতে পারে নাই এখন আমার সাথে কেন এরকম হইতেছে আমি কিভাবে আবার আল্লাহর রাস্তায় ফিরে আসতে পারি আমার কি করনীয় কি করা উচিত কি করা উচিত না কিছু বুঝতেছিনা তবে আমার মনে হয় দুইবার আমি বুঝতে পারছিলাম আল্লাহ আমাকে হেদায়েত দিছিল কিন্তু আমি ধরে রাখতে পারি নাই হওয়ার কারণ তখন অনেক কষ্ট আর অভাবেও আমার মনে শান্তি লাগতো আমি অনেক দিয়ে স্তির হয়ে গেছিলাম হ্যাঁ তখনো নামাজ রেগুলার পড়তাম না তবে পর্দা করা শুরু করছিলাম হাত মোজা পা মোজা পড়ে গায়রেমা হারাম দের সাথে মিশা বন্ধ করে দিয়েছিলাম ০আমার সাথে এরকম কেন হচ্ছে আমার কি করণীয় একটু বলে দিন

Answer

উত্তর
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

প্রিয় বোন, আপনার মনে যে কষ্ট, হতাশা ও আফসোস – তা থেকেই বোঝা যায় আপনার অন্তরে ইমানের আলো এখনও জ্বলছে। আপনি যখন কুরআন পড়ে শান্তি পেতেন, নামাজ ছুটলে কষ্ট হতো, তখনই আপনি আল্লাহর পথে ছিলেন। কিন্তু তিন-চার মাস ধরে আপনার মনে কোনো অনুভূতি আসছে না – এটি একটি আধ্যাত্মিক রোগ, যাকে হাদিসের ভাষায় "কাসওয়াতুল ক্বালব" (পাথর হয়ে যাওয়া হৃদয়) বলা হয়। তবে ভালো খবর হলো, এই রোগের চিকিৎসা আছে এবং আপনি চাইলে আল্লাহর রাস্তায় ফিরে আসতে পারবেন – ইনশাআল্লাহ।

আপনি জিজ্ঞেস করছেন, "আমার সাথে কেন এরকম হচ্ছে?" এর কারণ একটিঃ গুনাহ ও নেক কাজে অনিয়মের কারণে অন্তর মরিচা ধরে গেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
﴿كَلَّا ۖ بَلْ ۜ رَانَ عَلَىٰ قُلُوبِهِم مَّا كَانُوا يَكْسِبُونَ﴾
(المطففين: ১৪)
অর্থঃ কখনো না, বরং তাদের কৃতকর্মই তাদের অন্তরে মরিচা ধরিয়েছে।

তবে আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া জায়েজ নেই। তিনি বলেন,
﴿قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَىٰ أَنفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِن رَّحْمَةِ اللَّهِ ۚ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا﴾
(الزمر: ৫৩)
অর্থঃ হে আমার বান্দাগণ! যারা নিজেদের ওপর অত্যাচার করেছ, আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেবেন।

আপনার বর্তমান অবস্থা থেকে বের হওয়ার জন্য নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করুন ইনশাআল্লাহ।


১. জরুরী তওবা ও ইস্তিগফার

গুনাহ করলেও সঙ্গে সঙ্গে তওবা করুন। প্রতি দিন কমপক্ষে ১০০ বার "আস্তাগফিরুল্লাহ" ও ১০০ বার "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু সুবহানাকা ইন্নি কুনতু মিনাজ জোআলিমিন" পড়ুন। তওবা করার শর্ত হলো – পাপ কাজ ছেড়ে দেওয়া, লজ্জিত হওয়া এবং না করার দৃঢ় সংকল্প করা।


২. ফরজ নামাজের প্রতি যত্নবান হোন

আপনি এখন শুধু ফরজও পড়ছেন না – এটাই সবচেয়ে বড় বিপদ। আল্লাহ তাআলা বলেন,
﴿إِنَّ الصَّلَاةَ كَانَتْ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ كِتَابًا مَّوْقُوتًا﴾
(النساء: ১০৩)
অর্থঃ নিশ্চয়ই নামাজ মুমিনদের ওপর নির্দিষ্ট সময়ে ফরজ।

ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, ফরজ নামাজ ইচ্ছাকৃতভাবে ছেড়ে দেওয়া কবিরা গুনাহ। (রদ্দুল মুহতার, ১/৫২১) তাই আগে ফরজ নামাজ কখনো ছাড়বেন না। আজ থেকেই শুরু করুন। এক ওয়াক্ত নামাজ পড়লেও আল্লাহর কাছে নেকি পাবেন।

আপনার ছোট বাচ্চা যখন "আম্মু, তুমি নামাজ পড়তে, এখন পড়ো না" বলে – এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ নসিহত। বাচ্চার কথাটি মেনে নিন এবং লজ্জিত হয়ে উঠুন।


৩. কুরআন তিলাওয়াত করুন – অনুভূতি না এলেও

অনুভূতি না আসলেও প্রতিদিন অন্তত ১ আয়াত পড়ুন। রাসূল (সা.) বলেছেন,
"اقْرَءُوا الْقُرْآنَ فَإِنَّهُ يَأْتِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ شَفِيعًا لِأَصْحَابِهِ"
(مسلم)
অর্থঃ কুরআন পড়ো, কেননা কিয়ামতের দিন তা তার পাঠকের জন্য সুপারিশকারী হবে।

আপনি যখন কষ্ট পেয়ে কুরআন বুকে নিলে শান্তি পেতেন, সেই শান্তি ফিরে আসবে ধীরে ধীরে। হঠাৎ করে নয়, তবে নিয়মিত তিলাওয়াত করলে অন্তর নরম হবে।


৪. পর্দা ও হালাল কাজে ফিরে আসুন

আপনি আগে পর্দা শুরু করেছিলেন, হাত-মোজা পরতেন, এমনকি গায়রে মাহরামদের সাথে মিশা বন্ধ করেছিলেন – এটা খুবই প্রশংসনীয় ছিল। এখন আবার সেটা শুরু করুন। ছোট ছোট নেক কাজও আল্লাহর নৈকট্য দেয়।

আপনার চাকরি যদি এনজিওতে হয়, দয়া করে নিশ্চিত করুন যে কাজটি সম্পূর্ণ হালাল এবং আপনার পর্দা ও দ্বীনদারির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। যদি কোনো হারাম কাজ জড়িত থাকে (যেমন সুদ, অনৈতিক কার্যকলাপ ইত্যাদি), তবে সেই চাকরি পরিবর্তনের চেষ্টা করুন। আল্লাহ ভেবে দেখবেন, তিনি উত্তম রিজিক দেবেন।


৫. দোয়া ও মুনাজাত করুন – নিজেকে সিজদায় ফেলুন

আপনি লিখেছেন, "আল্লাহ আমার কাছ থেকে সিজদা দেওয়ার তৌফিক কেড়ে নিয়েছেন" – মনে রাখবেন, আল্লাহ কখনো তৌফিক কেড়ে নেন না, বরং গুনাহের অন্ধকারে আমরা নিজেরাই সিজদার স্বাদ হারাই। তাই এখনই দুই রাকাত নফল নামাজ পড়ে কান্নাকাটি করে বলুন,
"ইয়া আল্লাহ, তুমি আমাকে মাফ করো। আমি খুব দুর্বল। আমার অন্তর পাথর হয়ে গেছে। তুমি আমাকে হেদায়েত দাও। আমি ফিরে আসতে চাই।"

নিশ্চয়ই আল্লাহ কান্নাকারী বান্দার দোয়া কবুল করেন। হাদিসে কুদসিতে এসেছে,
"أَنَا عِنْدَ ظَنِّ عَبْدِي بِي"
(بخاری)
অর্থঃ আমি আমার বান্দার যেরূপ ধারণা করে, সেরূপই তার সাথে আচরণ করি।


৬. বুযুর্গ ও আলেমের সংসর্গে থাকুন

আপনি মাদ্রাসায় ভর্তি হয়েও শেষ করতে পারেননি – এটা দুঃখজনক। তবে এখন থেকেই স্থানীয় কোনো আলেম বা দ্বীনী পরিবারের সাথে সম্পর্ক রাখুন। সপ্তাহে অন্তত একবার দ্বীনি মজলিসে বসুন। ইমাম গাজ্জালী (রহ.) বলেছেন, "একাকী থাকা শয়তানের সঙ্গ, জামাত মুমিনের শক্তি।"


৭. দুশ্চিন্তা ও মানসিক কষ্ট থেকে বাঁচার দোয়া

আপনি বিগত ১১ বছর মানুষের অত্যাচার সহ্য করছেন – এটি একটি বড় জিহাদ। নবী (সা.) বলেছেন,
"مَا يُصِيبُ الْمُسْلِمَ مِنْ نَصَبٍ وَلاَ وَصَبٍ وَلاَ هَمٍّ وَلاَ حَزَنٍ وَلاَ أَذًى وَلاَ غَمٍّ حَتَّى الشَّوْكَةِ يُشَاكُهَا إِلاَّ كَفَّرَ اللَّهُ بِهَا مِنْ خَطَايَاهُ"
(بخاری)
অর্থঃ কোনো মুসলিমকে ক্লান্তি, অসুস্থতা, দুশ্চিন্তা, দুঃখ, কষ্ট বা চিন্তা-উদ্বেগ (এমনকি একটি কাঁটাও যদি তার দেহে বিঁধে) তা তার গুনাহ মাফের কারণ হয়।

সুতরাং আপনার এই ধৈর্যও আল্লাহর কাছে অমূল্য। হতাশ হবেন না। প্রতিদিন দোয়া করুন, "রব্বিনা আতিনা ফিদ্দুনিয়া হাসানাহ" (বাকারা: ২০১)।


সংক্ষিপ্ত করণীয় (চেকলিস্ট)

  1. প্রতিদিন ফরজ নামাজ কখনো ছাড়বেন না।
  2. প্রতিদিন অন্তত ৩ আয়াত কুরআন পড়ুন।
  3. প্রতি নামাজের পর ১০০ বার ইস্তিগফার করুন।
  4. আগের ন্যায় পর্দা ও হালাল জীবন শুরু করুন।
  5. বাচ্চার কথাটি আমল করুন – সে আল্লাহর পক্ষ থেকে নসিহত।
  6. কান্নাকাটি করে দুই রাকাত সিজদার নামাজ পড়ুন।
  7. কোনো আলেম বা দ্বীনি বান্ধবীর সাথে ফোনে বা সরাসরি কথা বলুন।

গ্রন্থসূত্র

  • রদ্দুল মুহতার, ১/৫২১ (ফরজ নামাজের গুরুত্ব ও ত্যাগের শাস্তি)
  • ফাতাওয়া উসমানী, ২/২৭৫ (তওবা ও ইস্তিগফারের গুরুত্ব)
  • ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৪/১৬৩ (আধ্যাত্মিক রোগের চিকিৎসা)
  • বাহিশতি জেওর, ২/৮৪ (নামাজ ছুটলে করণীয়)
  • মাআরিফুল কুরআন, সূরা যুমার ৫৩ নং আয়াতের তাফসীর (আল্লাহর রহমত)
  • আল-হিদায়া, ১/৮৩ (ফরজ নামাজের সময় ও জামাত)

আপনার জন্য দোয়া করি। আল্লাহ আপনাকে আবার তার রাস্তায় ফিরিয়ে আনুন। আত্মবিশ্বাস রাখুন, আমিন।

والله أعلم بالصواب



This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.