মোবাইলে রাগের মাথায় তিন তালাক দিলে এবং মানসিক রোগীর অজ্ঞান অবস্থায় তালাক দিলে কী হয়?

Marriage and Divorce · Hanafi

Question No: 2409
Questioner: Bin Siraj
Question Asked: 07 Jul 2026, 03:28 PM
Reviewed & Published: 07 Jul 2026, 03:37 PM
Views: 63
Tokens: 7,014
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ।
একজনের পক্ষ থেকে প্রশ্ন।
তিনি বলেন -
আমি দীর্ঘদিন যাবত মানুষিক রোগে ভুগছি। যার ফলে পরিবার, আত্মীয়-স্বজনদের সাথে বিভিন্ন রকম খারাপ ব্যবহার ও মারধরের মত আচরণ করে আসছি। গত দেড় মাস পূর্বে আমার স্ত্রীর সাথে মোবাইলে কথা বলার মাঝে ঝগড়ার এক পর্যায়ে আমি রাগান্নিত হয়ে আমার স্ত্রীকে মোবাইলে পরপর তিনবার তালাক শব্দ বলে ফেলি। উল্লেখ্য, আমার রাগ আসলে আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। ঘটনার দিনও তালাক বলার আগে-পরে আমার মানুষিক ভারসাম্য ঠিক ছিলনা। যার কারণে আমি তখন পাশের একটি দোকানে ৩০ মিনিটের মত অজ্ঞান অবস্থায় শুয়ে থাকি, যখন আমার কোন জ্ঞান ছিলনা।

অতএব আমার জানার বিষয় হলো, উল্লেখিত সুরতে আমার স্ত্রীর উপর তালাক পতিত হয়েছে কিনা? আমি আমার স্ত্রীকে ফিরিয়ে নিতে পারবো কিনা? কুরআন হাদিসের আলোকে জানিয়ে বাধিত করবেন।

Answer

উত্তর: ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।

আপনার বিবরণ অনুযায়ী, আপনি দীর্ঘদিন ধরে মানসিক রোগে ভুগছেন এবং রাগ এলে আপনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। তালাক উচ্চারণের সময়ও আপনার মানসিক ভারসাম্য ঠিক ছিল না বলে উল্লেখ করেছেন এবং পরে ৩০ মিনিট অজ্ঞান ছিলেন। উক্ত অবস্থায় কোনো মানুষ যদি জ্ঞানহীন অবস্থায় তালাক দেয়, তবে তা সহীহ হয় না। কিন্তু আপনি যে মুহূর্তে স্ত্রীকে তিনবার তালাক শব্দ বলেছেন, সেই মুহূর্তে আপনি পুরোপুরি অজ্ঞান ছিলেন কিনা—এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।


হানাফি ফিকহের বিধান

১. রাগ ও জ্ঞানহীন অবস্থায় তালাক:
হানাফি মতে, তালাকের জন্য পরিপূর্ণ জ্ঞান ও ইচ্ছা (وعي واختيار) আবশ্যক। যদি কোনো ব্যক্তি এমন রাগের কারণে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে যে সে কী বলছে তা বুঝতে পারে না, বা উন্মাদ (مجنون) অবস্থায় থাকে, তাহলে তার তালাক পতিত হয় না।

  • ইমাম আবু হানিফা (রহ.) বলেন: “যে ব্যক্তি এমন ক্রোধে তালাক দেয় যা তাকে জ্ঞানহীন করে দেয়, তার তালাক বাস্তবায়িত হবে না।” (আল-বিনায়া, ৪/৪০)
  • ইবনে আবেদীন (রহ.) ‘রদ্দুল মুহতার’-এ লেখেন: “যদি ক্রোধ এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে ব্যক্তি নিজের কথা ও কাজ সম্পর্কে সচেতন না থাকে, তবে তার তালাক দুর্বল বলে গণ্য হবে এবং পণ্ডিতদের একাংশ মতে তা বাস্তবায়িত হবে না।” (রদ্দুল মুহতার, ৩/২২৯)
  • ফতোয়া-ই আলমগিরীতে বলা হয়েছে: “যে ব্যক্তি উন্মাদ অবস্থায় তালাক দিলে তা পতিত হয় না। আর উন্মাদনার চিহ্ন হলো—এমন কথা বলা যা স্বাভাবিক মানুষ বলে না।” (ফতোয়া আলমগিরী, ১/৩৫৩)

২. তিন তালাক একসাথে:
যদি কোনো সচেতন ব্যক্তি একই মজলিসে (একসাথে) তিন তালাক দেয়, তবে হানাফি মতে তা তিনটি পৃথক তালাক গণ্য হবে এবং স্ত্রী তার জন্য চিরতরে হারাম হয়ে যায় (তালাকে মুগাল্লাযা)। তাকে পুনরায় গ্রহণ করতে হলে তাকে অপর স্বামীর সাথে বিয়ে ও তালাকের পর (হালালা) নিতে হবে। কিন্তু এটি তখনই প্রযোজ্য যখন তালাকটি শুদ্ধভাবে পতিত হয়।

৩. মোবাইলে তালাক:
আজকাল মোবাইলে তালাক দিলে তা তালাক বলে গণ্য হয়, যদি উভয়পক্ষ পরিষ্কারভাবে শুনে এবং ইচ্ছা থাকে। এক্ষেত্রে কোনো সমস্যা নেই।


আপনার অবস্থার পর্যালোচনা

আপনি বলেছেন:

  • “আমার রাগ আসলে আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি।”
  • “ঘটনার দিনও তালাক বলার আগে-পরে আমার মানুষের ভারসাম্য ঠিক ছিল না।”
  • “তখন পাশের একটি দোকানে ৩০ মিনিটের মত অজ্ঞান অবস্থায় শুয়ে থাকি, যখন আমার কোন জ্ঞান ছিল না।”

এ থেকে বোঝা যায় যে, তালাক উচ্চারণের সময় আপনি সম্পূর্ণ জ্ঞান ও বিবেকের অধিকারী ছিলেন না। বরং আপনার মানসিক রোগের কারণে আপনি এমন এক ক্রোধজনিত অবস্থায় ছিলেন যা জ্ঞানশূন্যতার পর্যায়ে পৌঁছেছিল। আপনার অজ্ঞান হওয়া নিয়েও দ্ব্যর্থতা নেই। যদি প্রমাণিত হয় যে আপনি তালাক বলার সময় অজ্ঞান/অচেতন ছিলেন, তাহলে আপনার তালাক মোটেই পতিত হয়নি। কিন্তু যদি অজ্ঞান হওয়া তালাক বলার পরে হয়, তবে তালাক পতিত হয়েছে কিনা তা নির্ভর করছে সেই মুহুর্তে আপনার জ্ঞান ও ইচ্ছাশক্তি কতটুকু সক্রিয় ছিল তার ওপর।

ইসলামি ফিকহের মূলনীতি হলো: স্বাভাবিক অবস্থায় কেউ তালাক দিলে তা কার্যকর হয়। কিন্তু মানসিক রোগী বা অতি ক্রোধান্ধ ব্যক্তির ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম প্রযোজ্য। সুতরাং একজন নির্ভরযোগ্য মুফতি বা ইসলামি পণ্ডিতের কাছে সরাসরি গিয়ে আপনার পুরো ঘটনা, মানসিক রোগের ধরন ও চিকিৎসকের প্রতিবেদন উপস্থাপন করে ফতোয়া নেওয়া কর্তব্য। এখানে সাধারণ অনুমানের চেয়ে বাস্তব অবস্থা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।


সারসংক্ষেপ ও নির্দেশনা

১. যদি আপনি তালাক বলার সময় সম্পূর্ণ অজ্ঞান বা অচেতন ছিলেন: তাহলে কোনো তালাক পতিত হয়নি। আপনার স্ত্রী আপনার ঘরে ফিরে আসবেন এবং আপনাদের দাম্পত্য জীবন পূর্বের ন্যায় অব্যাহত থাকবে।

২. যদি আপনি অর্ধ-সচেতন অবস্থায় বা রাগের ঘোরে হলেও নিজের কথার অর্থ বুঝে তালাক দিয়ে থাকেন: তাহলে একসাথে তিন তালাক হওয়ায় স্ত্রী আপনার জন্য চিরতরে হারাম হয়ে গেছেন। তালাক পতিত হওয়ার পর আপনি তাকে ফিরিয়ে নিতে পারবেন না যতক্ষণ না তিনি অন্য কাউকে বিয়ে করে সেই স্বামী তাকে তালাক না দেয় (হালালা)। তবে আপনার মানসিক রোগের কারণে এটি খুবই সন্দেহজনক, তাই উল্লিখিত হিসাবে একজন বিশেষজ্ঞ আলেমের শরণাপন্ন হওয়া জরুরি।

সুপারিশ:

  • মানসিক রোগ নিরাময়ের জন্য একজন ভালো ডাক্তারের পরামর্শ নিন।
  • তালাকের ব্যাপারে নিশ্চিত ফতোয়া পেতে আপনার নিকটবর্তী কোনো বড় মাদরাসা বা আলেমের কাছে লিখিত অভিযোগ (মানসিক রোগের ডাক্তারি রিপোর্টসহ) দিন।
  • ততক্ষণ পর্যন্ত স্ত্রীর সাথে বেঁচে থাকার ইচ্ছা থাকলে বিচ্ছেদের কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন না।

উল্লেখযোগ্য কিতাব ও ফতোয়া:

  • রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবেদীন) – তালাক ও উন্মাদনা অধ্যায়
  • ফতোয়া আলমগিরী (১/৩৫৩) – ক্রোধ ও অজ্ঞানতা
  • ফতোয়া উসমানী (মুফতি তকি উসমানি) – তালাক সংক্রান্ত আধুনিক মাসায়েল
  • ইমদাদুল ফতোয়া (আশরাফ আলি থানবী) – রোগী ও রাগী ব্যক্তির তালাক

আল্লাহ তায়ালা আপনার রোগ নিরাময় করুন, আপনার পরিবারে শান্তি ও বরকত দান করুন। আমিন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.