বিয়ে ভেঙে দেওয়ার পর অভিশাপ লাগবে কি
Faith and Belief · Hanafi
Question
Answer
উত্তর
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রথমেই জেনে রাখা জরুরি যে, ইসলামে বিয়ের প্রস্তাব ও বাগদান (এংগেজমেন্ট) কোনো চূড়ান্ত অঙ্গীকার নয়; বরং এটি একটি ওয়াদা মাত্র। তাই কোনো জোরালো শর‘ঈ কারণ ছাড়া বাগদান ভাঙা মাকরূহ হলেও তা হারাম নয়। আপনার ক্ষেত্রে আপনি নিয়মিত ইস্তিখারা করছিলেন, বারবার বাধা পাচ্ছিলেন, আত্মীয়দের অমত এবং নিজের মনের প্রশান্তি না পাওয়ায় বিয়ে ভেঙে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এটি আপনার জন্য জায়েযই হয়েছে, কারণ ইস্তিখারার উদ্দেশ্যই হলো আল্লাহর নিকট থেকে কল্যাণের দিশা পাওয়া। যখন আপনার মন সায় দেয়নি এবং বাধা এসেছে, তা ইস্তিখারার ফলেই হতে পারে। তাই আপনি কোনো অপরাধ করেননি।
অভিশাপের ব্যাপারে ইসলাম কী বলে?
১. অভিশাপ (লা‘নত) শুধু সেটাই কার্যকর হয় যা ন্যায়সংগত। অত্যাচারীর অভিশাপ তার ওপরেই ফিরে আসে। হাদীসে এসেছে:
إِنَّ الْعَبْدَ إِذَا لَعَنَ شَيْئًا صَعِدَتِ اللَّعْنَةُ إِلَى السَّمَاءِ فَتُغْلَقُ أَبْوَابُ السَّمَاءِ دُونَهَا، ثُمَّ تَهْبِطُ إِلَى الْأَرْضِ فَتُغْلَقُ أَبْوَابُهَا دُونَهَا، ثُمَّ تَأْخُذُ يَمِينًا وَشِمَالًا، فَإِذَا لَمْ تَجِدْ مَسَاغًا رَجَعَتْ إِلَى الَّذِي لُعِنَ، فَإِنْ كَانَ لِذَلِكَ أَهْلًا وَإِلَّا رَجَعَتْ إِلَى قَائِلِهَا
“বান্দা যখন কোনো কিছুকে অভিশাপ দেয়, তখন সেই অভিশাপ আকাশে উঠে, কিন্তু আকাশের দরজাগুলো তার জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয়। তারপর তা জমিনে নেমে আসে, কিন্তু জমিনের দরজাগুলোও বন্ধ করে দেওয়া হয়। তারপর সে ডানে-বামে ঘুরতে থাকে। যখন কোনো গন্তব্য পায় না, তখন ফিরে এসে সেই ব্যক্তির ওপর পড়ে যাকে অভিশাপ দেওয়া হয়েছিল—যদি সে তার উপযুক্ত হয়; অন্যথায় তা অভিশাপদাতার ওপরেই ফিরে আসে।” (সুনান আবু দাউদ, হাদীস ৪৯০৫)
২. পিতামাতার অভিশাপ সাধারণত তাদের সন্তানের ওপর কার্যকর হয় যখন সন্তান তাদের নাফরমানি করে। কিন্তু এখানে আপনিতো তাদের সন্তান নন, বরং তাদের পুত্রের সম্ভাব্য বধূ ছিলেন। তাই তাদের অভিশাপ আপনার ওপর কার্যকর হওয়ার কোনো শারঈ ভিত্তি নেই, বিশেষ করে যখন আপনি সঠিক কারণেই সম্পর্ক ছিন্ন করেছেন। যদি তাদের মধ্যে কোনো জুলম বা অন্যায় হয়ে থাকে, তবে সেই অভিশাপ তাদেরই ক্ষতি করবে, ইনশাআল্লাহ।
তবে করণীয় কী?
১. তওবা ও ইস্তিগফার করুন। যদিও আপনি কোনো গুনাহ করেননি, তথাপি তওবা সাধারণত মুমিনের জন্য সর্বদা কল্যাণকর। আল্লাহর কাছে ক্ষমা চান এবং তাঁর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করুন।
২. পাত্রপক্ষের জন্য দোয়া করুন। তাদের প্রতি কোনো রাগ বা বিদ্বেষ পোষণ না করে বরং আল্লাহর কাছে তাদের জন্য হিদায়াত ও উত্তম প্রতিদান কামনা করুন। দোয়া করলে আপনার অন্তরও শান্ত হবে এবং তাদের ক্রোধ কমার সম্ভাবনা থাকে।
৩. দান-সাদাকা করুন। সাদাকা বিপদ ও বালা দূর করে। অভিশাপ থেকে বাঁচতে নিয়মিত দান করুন—যতটুকু সম্ভব, বিশেষ করে শুক্রবারে বা রাতে।
৪. পবিত্র কুরআনের আয়াত ও দুআ পড়ুন। সকাল-সন্ধ্যার যিকির, আয়াতুল কুরসি, সূরা ফালাক, সূরা নাস নিয়মিত পড়ুন। নিচের দোয়াটিও পড়তে পারেন:
- بِسْمِ اللَّهِ الَّذِي لَا يَضُرُّ مَعَ اسْمِهِ شَيْءٌ فِي الْأَرْضِ وَلَا فِي السَّمَاءِ وَهُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ (তিনবার পড়লে কোনো ক্ষতি হয় না—সুনান আবু দাউদ, তিরমিযি)
৫. সালাতুল হাজাত আদায় করুন। আল্লাহর কাছে অভিশাপের প্রভাব থেকে বাঁচতে ও মানসিক শান্তির জন্য দুই রাকাত নফল সালাত পড়ে বিশেষ দোয়া করুন।
৬. ক্ষমা প্রার্থনার চেষ্টা চালিয়ে যান। যদি পাত্রপক্ষের সাথে সম্পর্ক আরও দৃঢ় করার সুযোগ থাকে, তবে তাদের সন্তুষ্ট করতে পারেন। কিন্তু তারা যদি ক্ষমা না-ও করে, তবে আপনার কোনো ক্ষতি নেই, কারণ আপনি আপনার পক্ষ থেকে যথাসাধ্য চেষ্টা করেছেন।
শেষকথা
আপনি যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তা ইস্তিখারার আলোকে এবং বাস্তব বাধার কারণে হয়েছে—ইনশাআল্লাহ তাতে কোনো দোষ নেই। পাত্রপক্ষের অভিশাপ আপনার কোনো ক্ষতি করবে না, যদি আপনি নির্দোষ হন। তবে নিজেকে আরও সুরক্ষিত রাখতে উপরোক্ত আমলগুলো করুন। আল্লাহ তাআলা আপনার মনের উদ্বেগ দূর করুন এবং উত্তম পাত্রের সাথে কল্যাণময় বিয়ের ব্যবস্থা করুন।
সূত্র:
- ফাতাওয়া উসমানী (১/৪৫০-৪৫২)
- রদ্দুল মুহতার (৫/২৮২)
- বেহিশ্তি জেওর (অভিশাপ ও তাবীজ-দোজা সংক্রান্ত অধ্যায়)
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (৪/২৮৪)
- সুনান আবু দাউদ, হাদীস ৪৯০৫
আল্লাহই সর্বাধিক জ্ঞানী।