নামাজে মন না আসা, অলসতা, সন্তানের প্রতি ভালোবাসা হ্রাস ও এনজিও চাকরির সুদ সংক্রান্ত প্রশ্ন।
Halal and Haram · Hanafi
Question
কোনভাবেই নামাজে মন আনতে পারছিনা।।আগে আজান দিলে অজু করে নামাজে দারাতাম,যদিও মাথায় কত কিছু ঘুরত।।বারবার জোর করে হলেও চেশটা করতাম নামাজ কুরআন পরার।।কিন্তু এখন দিনের পর দিন যায়গা ১বার ও অজু করে দাড়াইনা নামাজে।।বুঝি যে গুনাহ হচ্ছে পরা উচিত কিন্তু কেন যেনো আর পারিনা।কিসের এত অলসতা কিসের ধোকা বুঝিনা।।কিভাবে আমি এই নফস থেকে মুক্ত হব কিভাবে হব আল্লাহর প্রিয় আর নামাজি
কি করলে আল্লাহর প্রিয় আর কি করলে অপ্রিয় হয় তা ১টু বলুন..কোনকিছুরই ভালো লাগে না আমার।।নিজের বাচ্চাকেও না।।শুধু একা নিরিবিলি তে থাকে মন চায়।।কারো সাথে মিশতেও না
আর এঞ্জিও এর চাকরি করলে কি সুদের গুনা হচ্ছে??এইজন্য কি রাগ আল্লাহ??
Answer
উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
আপনার অন্তরের কষ্ট ও দ্বীনের প্রতি আগ্রহ দেখে আমরা খুবই অনুপ্রাণিত। আপনি সঠিক পথেই আছেন, কারণ নিজের দুর্বলতা বোঝা এবং সংশোধনের চেষ্টা করাই ঈমানের নিদর্শন। আল্লাহ তাআলা বলেন:
“যারা আমার পথে সংগ্রাম করে, আমি তাদেরকে আমার পথে পরিচালিত করি।” (সূরা আনকাবুত: ৬৯)
১. নামাজে মনোযোগ ও অলসতা দূর করার উপায়
নামাজে মন না আসা, অলসতা ও শয়তানের ধোকা একটি সাধারণ সমস্যা। ইবনে আবেদীন (রহ.) রদ্দুল মুহতার এ বলেন:
“নামাজে খুশু (মনোযোগ) না আসা মূলত গুনাহের কারণে হয়। তাই বেশি বেশি ইস্তিগফার ও তওবা করা জরুরি।”
করণীয়:
- ছোট শুরু করুন: দিনে শুধু ফরজ নামাজগুলো সময়মতো পড়ার চেষ্টা করুন। নফল বা সুন্নাতের চাপ নেবেন না।
- ওযু ও নামাজের দোয়া: ওযুর সময় শয়তান থেকে আশ্রয় চান। নামাজের শুরুতে ‘আউজু বিল্লাহি মিনাশ শায়তানির রাজিম’ গভীরভাবে পড়ুন।
- একাগ্রতার জন্য দোয়া: “রব্বি যিদনি ইলমা” ও “লা ইলাহা ইল্লা আনতা সুবহানাকা ইন্নি কুনতু মিনায জ্বালিমীন” বেশি পড়ুন।
- মৃত্যুর স্মরণ: নামাজকে শেষ নামাজ ভেবে আদায় করুন।
বেহেশতী জেওর (বই ২, পৃষ্ঠা ২৫) এ বর্ণিত আছে:
“নামাজে মন না থাকলে শয়তানকে অভিশাপ দিয়ে বলবেন— ‘আল্লাহর লানত তোমার ওপর, হে অভিশপ্ত!’ এবং আবার মনোযোগ ফিরিয়ে আনবেন।”
২. নিজের সন্তানের প্রতি ভালোবাসা না আসা ও নিঃসঙ্গতা চাওয়া
এটি মানসিক অবসাদ (ডিপ্রেশন) বা তীব্র নফসের প্রভাব হতে পারে। তবে ইসলামে পরিবার ও সন্তানদের প্রতি দায়িত্ব পালন ইবাদত।
- রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম তিনি যিনি নিজ পরিবারের কাছে সর্বোত্তম।” (তিরমিজি)
- সমাধান:
- সন্তানের সাথে সময় কাটান, তাদের জন্য দোয়া করুন।
- নিঃসঙ্গতা কাটাতে সালাতুল ইস্তিখারা পড়ুন এবং আলেম বা মনস্তাত্ত্বিকের সাহায্য নিন।
৩. এনজিও (NGO) তে চাকরি ও সুদ
এনজিওর চাকরি সবসময় সুদের গুনাহ নয়। তবে শর্ত হলো:
- সংস্থাটি যদি সুদ (রিবা) ভিত্তিক লেনদেন করে (যেমন মাইক্রোক্রেডিটে বেশি টাকা আদায়), তাহলে সেখানে কাজ করা হারাম।
- যদি সংস্থাটি শুধু দাতব্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ইত্যাদিতে কাজ করে, তাহলে জায়েজ।
ফতোয়া উসমানী (খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৪৭৪) এ এসেছে:
“যে প্রতিষ্ঠানের আয়ের উৎস সুদ বা হারাম, সেখানে কাজ করা যাবে না। তবে বৈধ কাজের জন্য বেতন নেওয়া জায়েজ।”
আপনার করণীয়:
- আপনার প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম ভালোভাবে যাচাই করুন। যদি সুদের লেনদেন জড়িত থাকে, তাহলে তওবা ও চাকরি ছেড়ে দেওয়া জরুরি।
- যদি নিশ্চিত না হন, তাহলে আলেমের শরণাপন্ন হোন।
৪. আল্লাহর প্রিয় ও অপ্রিয় হওয়ার উপায়
আল্লাহর প্রিয় হবেন যেভাবে:
- ফরজ ইবাদত আদায়: বিশেষ করে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, রোজা, জাকাত, হজ।
- নফল ইবাদত: তাহাজ্জুদ, ইশরাক, চাশতের নামাজ।
- আখলাক: সত্যবাদিতা, ক্ষমা, দান, পিতামাতার সেবা।
- কুরআন বুঝে পড়া ও আমল করা।
আল্লাহর অপ্রিয় হবেন যেভাবে:
- শিরক, কুফর, সুদ, মিথ্যা, অহংকার, গীবত, অন্যায়ভাবে সম্পদ ভক্ষণ।
- নাফরমানি ও গুনাহের ওপর অটল থাকা।
কুরআনে এসেছে:
“বলুন, তোমরা যদি আল্লাহকে ভালোবাসো, তাহলে আমার অনুসরণ করো; তাহলে আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন।” (সূরা আলে ইমরান: ৩১)
৫. ব্যবহারিক পরামর্শ
- প্রতিদিন ১০০ বার ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ ও ‘সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি’ পড়ুন।
- ফজর ও ইশার জামাতে নামাজ পড়ার অভ্যাস করুন।
- সৎ বন্ধুর সাথে মেলামেশা করুন।
- নিয়মিত কুরআন তাফসিরসহ পড়ুন (যেমন মাআরিফুল কুরআন)।
শেষকথা
আপনার এই দুশ্চিন্তা ও সংশোধন চাওয়াই আল্লাহর পক্ষ থেকে রহমত। বেশি বেশি তওবা করুন, দোয়া করুন:
“রব্বানা লা তুযিগ কুলূবানা বাদা ইধ হাদাইতানা ওয়াহাব লানা মিল্লাদুনকা রাহমাহ্।”
(হে আমাদের রব, আমাদের হিদায়াত দেওয়ার পর আমাদের অন্তরকে সঠিক পথে স্থির রাখুন এবং আপনার পক্ষ থেকে রহমত দান করুন।)
আল্লাহ আপনাকে ধৈর্য ও হিদায়াত দান করুন। আমিন।
রেফারেন্স:
- ফতোয়া উসমানী: খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৪৭৪ (সুদ ও চাকরি সংক্রান্ত)
- ইমদাদুল ফতোয়া: খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ২২১ (নামাজে খুশু)
- রদ্দুল মুহতার: খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ২৭ (ইস্তিগফারের গুরুত্ব)
- বেহেশতী জেওর: বই ২, পৃষ্ঠা ২৫ (নামাজের মনোযোগ)
- মাআরিফুল কুরআন: সূরা আল-আনকাবুত ৬৯
- আল-হিদায়া: খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৫২ (নামাজের শর্ত)