চরমোনাইয়ের সাথে বিয়ে দেওয়া জায়েজ কি?
Sunnah and Bid'ah · Hanafi
Question
আমার ননদের জন্য একটি পাত্রের সম্বন্ধ এসেছে। ছেলে Charmonai Darul Ulum Madrasah-এ পড়াশোনা করেছে এবং বর্তমানে একটি মসজিদে ইমামতি করেন। আমার ননদও কওমি মাদরাসায় পড়াশোনা করেছে।
ছেলের পরিবার থেকে বলা হচ্ছে যে, জিলহজ মাসে (বর্তমান চাঁদে) নাকি বিয়ে দেওয়া যাবে না। ইসলামে কি এমন কোনো নিষেধাজ্ঞা আছে? এটি কি সহিহ কথা?
আর আমার কিছু প্রশ্ন আছে—
১. চরমোনাইয়ের আকীদাগত কোনো সমস্যা আছে কি?
২. তারা কি অন্যান্য আহলুস সুন্নাহর আলেমদের থেকে ভিন্ন কোনো আকীদা পোষণ করেন?
৩. তারা কি Tablighi Jamaat পছন্দ করেন না বা তাদের সঙ্গে মতপার্থক্য আছে?
৪. তাদের পরিবারের সঙ্গে বিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে শরীয়তের দৃষ্টিতে কোনো সমস্যা আছে কি?
৫. বিয়ের ক্ষেত্রে কি করা যায়,,, কিভাবে খোঁজ নেব তাদের সম্পর্কে ... একটু পরামর্শ দিয়ে সাহায্য করেন
তাদের যদি সত্যিই আকিদাগত সমস্যা থাকে তাহলে তো ভবিষ্যতে মেয়েরও আকিদাগত সমস্যা হতে পারে আল্লাহ মাফ করুক ... এছাড়া তারা নাকি বিদদাতে জড়িত ... দয়া করে সমস্ত প্রশ্নের একটু খোলাখুলি উত্তর দিবেন সাহায্য করবেন
Answer
উত্তর:
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
আপনার প্রশ্নগুলোর উত্তর নিম্নরূপ দেওয়া হলো—
১. জিলহজ মাসে বিয়ে দেওয়া কি নিষিদ্ধ?
উত্তর: জিলহজ মাসে (হজের মাস) বিয়ে দেওয়া ইসলামি শরিয়তে কোনোভাবেই নিষিদ্ধ নয়। এটি একটি ভিত্তিহীন কুসংস্কার। প্রমাণ:
- রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর বিবাহসমূহ বিভিন্ন মাসে হয়েছে, যার মধ্যে জিলহজ মাসও অন্তর্ভুক্ত (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৪২২)।
- ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, কোনো নির্দিষ্ট মাসে বিবাহ নিষিদ্ধ নয় (আল-হিদায়া, ২/২৯৩)।
- বর্তমান সমাজে প্রচলিত "জিলহজ মাসে বিয়ে শুভ নয়" ধারণাটি সম্পূর্ণ ভুল এবং বিদআত। সুতরাং, ছেলের পরিবারের এই কথা সঠিক নয়।
২. চরমোনাই মাদরাসার আকীদা সম্পর্কে জানতে চান
উত্তর: চরমোনাই দারুল উলুম মাদরাসা বাংলাদেশের একটি প্রসিদ্ধ দেওবন্দি মাদরাসা। এটি আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআত-এর অনুসারী এবং হানাফি মাজহাবের ওপর প্রতিষ্ঠিত।
- আকীদাগত অবস্থান: তারা আশআরি ও মাতুরিদি আকীদার অনুসারী (যা আহলুস সুন্নাহর মূল ধারা)।
- অন্যান্য আলেমদের সঙ্গে পার্থক্য: সাধারণত দেওবন্দি আলেমগণ অন্যান্য আহলুস সুন্নাহর আলেমদের (যেমন বেরেলভী, সালাফি) থেকে কিছু ফিকহি বা তরিকতগত বিষয়ে ভিন্ন মত পোষণ করতে পারেন, কিন্তু আকীদার মূল ভিত্তি একই (ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর পথ)।
- তাবলিগি জামাতের সঙ্গে সম্পর্ক: চরমোনাই মাদরাসা মূলত তাবলিগি জামাতের সাথে সম্পৃক্ত নয়, তবে তাদের সঙ্গে মৌলিক আকীদাগত বিরোধ নেই। অনেক দেওবন্দি আলেমই তাবলিগি জামাতকে সমর্থন করেন। তবে কারো কারো মধ্যে কিছু ফিকহি বা তরবিয়তি পদ্ধতি নিয়ে মতভেদ থাকতে পারে—এটি স্বাভাবিক।
- বিদআত প্রসঙ্গ: চরমোনাই মাদরাসা সাধারণত বিদআত (যেমন—মীলাদ, কিয়াম, উরস ইত্যাদি) থেকে দূরে থাকার পক্ষপাতী। তবে কিছু নির্দিষ্ট আচার সম্পর্কে সমালোচনা থাকলেও সেগুলো সাধারণত ফুরূঈ (গৌণ) বিষয়।
সারমর্ম: চরমোনাইয়ের অনুসারীরা আহলুস সুন্নাহর অন্তর্ভুক্ত। তারা আকীদাগতভাবে বিভ্রান্ত নয়। তবে ফিকহি বা তরিকতগত কিছু ভিন্ন মত থাকতে পারে, যা স্বাভাবিক।
৩. তাদের সঙ্গে বিয়ে দেওয়া শরিয়তসম্মত কি?
উত্তর: হ্যাঁ, শরিয়তের দৃষ্টিতে কোনো সমস্যা নেই। কারণ:
- মুসলিম পুরুষের সাথে মুসলিম নারীর বিবাহ বৈধ (সূরা আল-মায়েদা: ৫)
- ছেলে ও মেয়ে উভয়ই কওমি মাদরাসায় পড়েছে—ধর্মীয় শিক্ষিত ও আমলি—এটি একটি ভালো দিক।
- তবে দাম্পত্য জীবন সুন্দর করতে নিম্নলিখিত বিষয়গুলো বিবেচনা করুন:
- ছেলেটির চরিত্র, দ্বীনদারি, ইলম ও আমল সম্পর্কে ভালোভাবে খোঁজ নিন।
- তার আকীদা সম্পর্কে সরাসরি জিজ্ঞাসা করুন (যেমন—কুরআন-সুন্নাহর প্রতি তার ভালোবাসা, সাহাবায়ে কেরামের প্রতি শ্রদ্ধা, বিদআত সম্পর্কে ধারণা ইত্যাদি)।
- পরিবারের ধর্মীয় পরিবেশ ও আচার-আচরণ সম্পর্কে জানুন।
৪. বিয়ের ক্ষেত্রে করণীয় ও খোঁজ নেওয়ার উপায়
পরামর্শ:
- সরাসরি ছেলেটির সাথে বা তার পরিবারের সাথে দ্বীনি বিষয়ে আলোচনা করুন।
- তার এলাকার বিশিষ্ট আলেম বা মুফতির কাছে তার সম্পর্কে জানতে পারেন।
- তার মসজিদের মুসল্লি বা স্থানীয় দ্বীনি ভাইদের মাধ্যমে খোঁজ নিন।
- শরিয়তের নীতিমালা: বিয়ের ক্ষেত্রে যোগ্যতা হলো—দ্বীনদারি ও চরিত্র (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫০৯০)।
- যদি ছেলেটি দীনের উপর প্রতিষ্ঠিত, আমানতদার ও নিষ্ঠাবান হয়, তাহলে চরমোনাইয়ের ব্যাপারে অহেতুক সন্দেহ না করে বিয়ে দিতে পারেন।
৫. ভবিষ্যতে মেয়ের আকীদার সমস্যা হবে কি?
উত্তর: যদি ছেলেটি নিজে দীনের ওপর প্রতিষ্ঠিত হয় এবং তার পরিবার দ্বীনের পথে থাকে, তাহলে মেয়ের আকীদার সমস্যা হওয়ার আশঙ্কা নেই। বরং উভয়ের দ্বীনি শিক্ষা ও আমল একসঙ্গে ভালো থাকলে সংসার সুন্দর হবে। তবে আপনাকে সতর্ক থাকতে হবে:
- শুরু থেকেই মেয়েকে কুরআন-সুন্নাহভিত্তিক শিক্ষা দিন, যাতে সে যে কোনো বিভ্রান্তি চিনতে পারে।
- বিয়ের পরে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে দ্বীনি বিষয়ে খোলামেলা আলোচনা চলুক।
উপসংহার
- জিলহজ মাসে বিয়ে দেওয়ার কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। এটি ভুল ধারণা।
- চরমোনাই মাদরাসা ও তার অনুসারীরা আহলুস সুন্নাহর অন্তর্ভুক্ত, তবে কিছু ফিকহি বা তরিকতগত ভিন্ন মত থাকতে পারে যা সাধারণত গ্রহণযোগ্য।
- তাদের সঙ্গে বিয়ে দেওয়া শরিয়তসম্মত, তবে ভালোভাবে খোঁজ নেওয়া জরুরি।
- দ্বীনদারি ও চরিত্রই বিবাহের মূল মাপকাঠি।
আল্লাহ তাআলা আপনাদের কল্যাণ করুন।