নারীদের জন্য প্রয়োজনে চাকুরী করার বিধান কি?

Business and Job · Hanafi

Question No: 764
Questioner: Khadiza Akter Suvo
Question Asked: 25 May 2026, 11:22 PM
Reviewed & Published: 25 May 2026, 11:39 PM
Views: 76
Tokens: 3,174
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম,
আমি মাস্টার্স পাস করেছি কয়েকমাস ছাত্রী হিসেবে মোটামুটি ভালোই বলা চলে।। আমি পর্দা করি আলহামদুলিল্লাহ। আমরা চার বোন। আমি সেজ যেহেতু স্টুডেন্ট ভালো পড়ানোর জন্য ছোট বোনকেও বিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমি জব করতে ইচ্ছুক না, আমার বাবা একজন কৃষক। আমার বাবার ইচ্ছে, আমি একটি জব করি টিচিং করি। কিন্তু বর্তমান বাংলাদেশের যেই চাকরি ব্যবস্থা, তাতে আমার কি করা উচিত কিভাবে বোঝাব।।আমার যেহেতু ভাই নেই, আমার জব করলে কি গোনাহ হবে ,জানতে চাই বিস্তারিত

Answer

উত্তর

وَعَلَيْكُمُ السَّلَامُ وَرَحْمَةُ اللَّهِ وَبَرَكَاتُهُ

প্রশ্নের জন্য আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দিন। আপনি মাস্টার্স পাস করে পর্দা করছেন—এটি অত্যন্ত প্রশংসনীয়। আপনার বাবা কৃষক, চার বোন, আর আপনি সেজ মেয়ে। বাবার ইচ্ছা আপনি শিক্ষকতা করে পরিবারকে সহায়তা করুন, কিন্তু আপনি চাকরি করতে ইচ্ছুক নন। জানতে চেয়েছেন—চাকরি করলে গুনাহ হবে কি না এবং কীভাবে বাবাকে বোঝাবেন।

হানাফি ফিকহের আলোকে নারীর চাকরির মূলনীতি

ইসলামে নারীর জন্য ঘরে অবস্থান করা মূল বিধান। আল্লাহ বলেন:

وَقَرْنَ فِي بُيُوتِكُنَّ وَلَا تَبَرَّجْنَ تَبَرُّجَ الْجَاهِلِيَّةِ الْأُولَىٰ
“আর তোমরা নিজ ঘরে অবস্থান কর এবং প্রাচীন জাহেলিয়াতের মতো নিজেদের প্রদর্শন করো না।” (সূরা আহযাব: ৩৩) তবে প্রয়োজনে ঘরের বাইরে যাওয়া জায়েয, যদি নিম্নলিখিত শর্তগুলো পূর্ণ হয়:

  1. প্রয়োজন (যেমন পরিবারের আর্থিক সঙ্কট, অথবা সমাজে প্রয়োজনীয় নারী শিক্ষকের অভাব, ইত্যাদি)।
  2. পূর্ণ পর্দা (সার্বিক পোশাক, গায়রে মাহরাম থেকে সম্পূর্ণ আবৃত) এবং মেকআপ-সাজসজ্জা পরিহার
  3. একাকী বা অপরিচিত পুরুষের সাথে ফ্রি মিক্সিং না হওয়া (শুধু নারী বা মাহরাম পরিবেশে কাজ)।
  4. সুবিধাজনক সময় ও পরিস্থিতি যেখানে ফেতনা-ফাসাদের আশঙ্কা না থাকে।

ইবনে আবেদীন (রহ.) বলেন:

“নারীর জন্য নিজের বা পরিবারের প্রয়োজনে ঘর থেকে বের হওয়া জায়েয, তবে শর্ত হলো পর্দা ও শালীনতা রক্ষা এবং ফেতনা থেকে দূরে থাকা।” (রদ্দুল মুহতার, ১/৪০৬)

আপনার অবস্থার বিশ্লেষণ

  • আপনার ইচ্ছা: আপনি চাকরি করতে চান না। ইসলাম চাপিয়ে দেয় না। আপনি যদি নেক নিয়তে ঘরেই থাকেন এবং ইলম অর্জন ও পরিবারের সেবা করেন, তাহলে তা অধিক ফজিলতপূর্ণ। ইমাম বুখারী ও মুসলিমের হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

“স্ত্রীগণ তোমাদের (পুরুষদের) বন্দিনী, আর তোমরা তাদের ওপর দায়িত্বশীল।” কোনো নারীকে কাজে বাধ্য করা তার ওপর জুলুম।

  • বাবার ইচ্ছা: পিতা অভাবের কারণে চান আপনি উপার্জন করুন। কিন্তু পিতার ইচ্ছা মানা ফরজ নয়, যদি তা আপনার দ্বীনি ক্ষতির কারণ হয়। তবে পিতার সম্মান ও ভালোবাসা বজায় রেখে বোঝানো উচিত।

  • গুনাহ হবে কি না?
    কাজটি যদি উপরোক্ত শর্তাবলী (পর্দা, মিক্সিং না, ফেতনা থেকে নিরাপদ) পূর্ণ হয় এবং তা পরিবারের জন্য অপরিহার্য প্রয়োজন হয়, তাহলে জায়েয, গুনাহ নয়। কিন্তু বর্তমান বাংলাদেশের চাকরি ব্যবস্থায় পূর্ণ পর্দা ও লিঙ্গ বিচ্ছিন্নতা বজায় রাখা অত্যন্ত কঠিন। অধিকাংশ স্কুল-কলেজে নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা, সৌন্দর্য প্রদর্শন, বিনা মাহরামে ভ্রমণ ইত্যাদি ফেতনা বিদ্যমান। সেক্ষেত্রে যদি এসব গুনাহের কাজে লিপ্ত হতে হয়, তাহলে তা জায়েয হবে না, বরং গুনাহ হবে। আল্লামা আশরাফ আলী থানভী (রহ.) বলেন:

“যখন কোনো কাজ দ্বীনি বা দুনিয়াবি প্রয়োজনে হয় এবং তাতে ফেতনার আশঙ্কা না থাকে, তখন জায়েয। কিন্তু যদি ফেতনার আশঙ্কা প্রবল হয়, তাহলে সেই কাজ ত্যাগ করা ওয়াজিব।” (ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৪/৩৭)

আপনার পিতার আর্থিক অবস্থা কষ্টসাধ্য, কিন্তু আপনার ভাই না থাকলেও আপনি মেয়ে—ঘরের দায়িত্ব পিতার ওপর, আপনার ওপর নয়। ফিকহে স্পষ্ট: “পিতা সন্তানদের ভরণ-পোষণ দিতে বাধ্য, কিন্তু সন্তান পিতাকে (অবৈধ কাজ না করে) আর্থিক সাহায্য করতে বাধ্য নয়, যদিও তা উত্তম।” (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/৪৫২)

সুতরাং আপনি যদি শর্তযুক্ত চাকরি (যেমন: মাদরাসায় বালিকাদের শিক্ষকতা, পর্দা সহ, কোনো পর্দাহীন পরিবেশ না) করতে পারেন তাহলে জায়েয, তবে আপনি ইচ্ছুক না হওয়ায় তা আবশ্যক নয়। আর যদি এমন চাকরি হয় যেখানে পর্দা ভাঙতে হবে, তাহলে করা আপনার জন্য গুনাহ হবে।

বাবাকে বোঝানোর উপায়

  1. স্নেহ ও সম্মানের সাথে বুঝান: বলুন, “আব্বু, আমি আপনার ইচ্ছাকে শ্রদ্ধা করি, কিন্তু ইসলাম বলে নারীদের জন্য পর্দা করা ফরজ। বর্তমান চাকরি পরিবেশে পর্দা বজায় রাখা খুব কঠিন। আমি চাই না আল্লাহর নাফরমানি করে আপনার সন্তুষ্টি অর্জন করতে।”

  2. আপনার শিক্ষাকে ঘরে কাজে লাগান: পরিবারের ছোট বোনদের বা প্রতিবেশী শিশুদের বিনামূল্যে বা স্বল্পমূল্যে পড়াতে পারেন—এতে পর্দাও থাকবে, উপার্জনও কম-বেশি হতে পারে।

  3. অন্য কোনো বৈধ উপায় দেখান: যেমন সুইং মেশিনে কাজ, ঘরে বসে অনলাইনে টিউশনি (শুধু নারী শিক্ষার্থী), অথবা হালাল ব্যবসায় অংশ নেওয়া।

  4. দু’আ করুন: আল্লাহ আপনার পিতাকে সঠিক বুঝ দিন এবং আপনার পরিবারের অভাব দূর করুন।

সংক্ষিপ্ত ফতোয়া

  • আপনার চাকরি না করা ইচ্ছা পোষণ করা জায়েয এবং উত্তম, কারণ নারীর জন্য ঘরে থাকাই মূল বিধান।
  • যদি চাকরি করতে বাধ্য হন এবং পর্দা ও লিঙ্গ বিচ্ছিন্নতার শর্ত পূরণ হয়, তাহলে জায়েয; অন্যথায় গুনাহ হবে।
  • পিতার ইচ্ছা পালন করা আবশ্যক নয়, যদি তা দ্বীনি ক্ষতির কারণ হয়। তবে পিতার সাথে নম্রভাবে আলোচনা করুন এবং তার দরদ বোঝার চেষ্টা করুন।

আল্লাহ তাআলা আপনাকে সহজ পথ দেখান এবং আপনার পরিবারকে অভাবমুক্ত করুন। আমীন।

সহায়ক গ্রন্থাবলী:

  • ফাতাওয়া উসমানী (১/৪৫০-৪৬০)
  • ইমদাদুল ফাতাওয়া (৪/৩৫-৪০)
  • রদ্দুল মুহতার (১/৪০৬, ৬/৪০১)
  • বেহেশতী জেওর (১/২৫-২৮)
  • ফাতাওয়া হিন্দিয়া (১/৪৫২)
  • আল-হিদায়া (২/২৫৮)
  • মাআরিফুল কুরআন (সূরা আহযাবের তাফসির)

والله أعلم بالصواب


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.