হারাম সম্ভাবনাময় স্থানে যাওয়ার ব্যাপারে আশা ব্যক্ত করে ইনশাআল্লাহ বললে কি কোনো সমস্যা হবে ?
Business and Job · Hanafi
Question
আমার স্বামী বলতেছিল আমার কখন একটা বাড়ি হবে।আমি বলি ইনশাআল্লাহ বল ইনশাআল্লাহ হবে বল।সেও বলে।এখন কথা হচ্ছে সে বিদেশে যেতে চায়।কিন্তু ওর কাজ হচ্ছে রান্না করা মানে শেফের কাজ।ইউরোপের ওখানে ওদের মাংশ রান্না হালাল না বেশির ভাগ।আমার মাথায় ঘুরতেছিল এখানে মানে বাংলাদেশেও থাকতে পারে আবার পরে আসতেছিল বাইরে গেলে তখন ইনকাম হারাম হলে? তাই ইনশাল্লাহ বলা হয়েছে।এতে কি কোন গুণাহ হবে?
আর বাইরের দেশে যদি যায় ইউরোপে এতে ইনশাআল্লাহ বলায় কি কোন সমস্যা হবে?
Answer
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহ। আপনার প্রশ্নের মাধ্যমে বুঝতে পারছি, আপনি আপনার স্বামীর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে উদ্বিগ্ন এবং সেই উদ্বেগের প্রেক্ষিতে 'ইনশাআল্লাহ' বলার বিষয়ে জানতে চেয়েছেন। আপনার উদ্বেগের মূল বিষয়টি হলো: স্বামী যদি ইউরোপে শেফের কাজ করেন, তবে সেখানে অধিকাংশ মাংস হালাল না হওয়ায় তার উপার্জন হারাম হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এই সম্ভাবনার কারণেই আপনি ভবিষ্যতে 'বাড়ি হওয়া' বা 'বিদেশ যাওয়া' সম্পর্কে নিশ্চিত করে কিছু না বলে 'ইনশাআল্লাহ' বলতে বলেছেন।
এ বিষয়ে ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি ও হানাফি ফিকহের আলোকে বিস্তারিত উত্তর প্রদান করছি।
উত্তর:
আপনার কাজটি সম্পূর্ণ সঠিক এবং এতে কোনো গুনাহ নেই, বরং এটি শরিয়তসম্মত ও প্রশংসনীয়। নিচে যুক্তিসহ ব্যাখ্যা দেওয়া হলো:
১. ‘ইনশাআল্লাহ’ বলা সুন্নাত ও আবশ্যক
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দিয়েছেন, কোনো কাজ ভবিষ্যতে করার ইচ্ছা করলে অবশ্যই ‘ইনশাআল্লাহ’ (আল্লাহ চাইলে) বলতে। আল্লাহ বলেন:
وَلَا تَقُولَنَّ لِشَيْءٍ إِنِّي فَاعِلٌ ذَٰلِكَ غَدًا (23) إِلَّا أَنْ يَشَاءَ اللَّهُ "আর তুমি কখনো কোনো বিষয়ে বলো না যে, আমি তা আগামীকাল করব, (তবে) যদি আল্লাহ চান (তবে বলবে)।" (সূরা আল-কাহফ, ১৮:২৩-২৪)
আপনি স্বামীকে ভবিষ্যতের কোনো পরিকল্পনার ব্যাপারে ‘ইনশাআল্লাহ’ বলতে বলেছেন, যা সরাসরি কুরআনের নির্দেশ পালন। এটি কোনো গুনাহের কাজ নয় বরং ইমানের দাবি। (তাফসিরে মাআরিফুল কুরআন, ৫ম খণ্ড, সূরা কাহফের তাফসির)
২. ‘ইনশাআল্লাহ’ বলায় ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা স্বীকার করা
আপনার মাথায় ঘুরছিল যে, স্বামী বাংলাদেশে থাকতে পারে বা বিদেশ গেলেও তার উপার্জন হারাম হতে পারে। এই অনিশ্চয়তা ও চিন্তা থেকেই আপনি ‘ইনশাআল্লাহ’ বলতে বলেছেন। এটি একটি ভালো মানসিকতা। কারণ ভবিষ্যৎ শুধু আল্লাহই জানেন। তাই কোনো কাজ ভালো হবে কি মন্দ হবে, তা না জেনে নিশ্চিত করা ঠিক নয়। আপনি এখানে আল্লাহর ইচ্ছার ওপর নির্ভর করছেন। এটি মুসলিমের বৈশিষ্ট্য।
হাদিসে এসেছে:
"مَنْ قَالَ إِنْ شَاءَ اللَّهُ لَمْ يَحْنَثْ" "যে ব্যক্তি 'ইনশাআল্লাহ' বলে, সে শপথ ভঙ্গের দোষে দোষী হয় না।" (সুনান আবু দাউদ, হাদিস: ৩২৬৭; মিশকাতুল মাসাবিহ, হাদিস: ৩৪০৪)
আপনার ক্ষেত্রেও, আপনি নিশ্চিত করে বলেননি যে 'এটা হবে বা ওটা হবে', বরং আল্লাহর ইচ্ছার ওপর ছেড়ে দিয়েছেন। এটি অত্যন্ত সুন্দর ও সঠিক পদ্ধতি।
৩. হারাম উপার্জনের ভয় থেকে ‘ইনশাআল্লাহ’ বলা জায়েয
ইসলামে হারাম উপার্জন থেকে বেঁচে থাকা ফরজ। আপনার স্বামী শেফ। ইউরোপে গিয়ে তাকে যদি হারাম মাংস (যবেহকৃত নয় বা হালাল না) রান্না করতে হয়, তাহলে সেই কাজ ও উপার্জন হারাম হবে। আপনার এ উদ্বেগ সম্পূর্ণ সঙ্গত। তাই আপনি তাকে 'ইনশাআল্লাহ' বলতে বলেছেন, যাতে করে তিনি ভবিষ্যতে হারাম কাজে জড়িয়ে পড়া থেকে বিরত থাকার চেষ্টা করেন।
হানাফি ফিকহের কিতাব ‘রদ্দুল মুখতার’ -এ বলা হয়েছে:
"হারাম কাজের মাধ্যমে উপার্জন করা জায়েয নয়। যদি কোনো ব্যক্তি এমন পেশায় থাকে যেখানে হারামের আশঙ্কা প্রবল, তবে তার উচিত সেই পেশা পরিবর্তন করা বা হালাল উপার্জনের পথ খোঁজা।" (রদ্দুল মুখতার, ৬য় খণ্ড, কিতাবুল হাযর ওয়াল ইবাহা)
আপনার ও স্বামীর উচিত, যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় হালাল-হারামের দিকে খেয়াল রাখা। তাই ভবিষ্যতে 'ইনশাআল্লাহ' বলা এবং হারামের ভয়ে সতর্ক থাকা আপনার জন্য গুনাহ নয়, বরং সওয়াবের কাজ।
৪. স্বামীর বিদেশ যাওয়ার পরিকল্পনায় ‘ইনশাআল্লাহ’ বলায় কোনো সমস্যা নেই
স্বামী বিদেশ যেতে চায়, কিন্তু সেখানে তার কাজ হারাম হওয়ার আশঙ্কা আছে। এক্ষেত্রে আপনি ‘ইনশাআল্লাহ’ বলায় কোনো সমস্যা নেই। বরং এটি একটি দোয়া ও তাওয়াক্কুলের (আল্লাহর ওপর ভরসা) প্রকাশ। আপনি বলছেন, 'আল্লাহ চাইলে হবে, আর আল্লাহ যদি ভালো না চান তবে হবে না।' এটি মুমিনের বৈশিষ্ট্য।
তবে এখানে করণীয় হলো: আপনি আপনার স্বামীকে দ্বীনের দৃষ্টিতে সতর্ক করবেন। তাকে বলবেন, 'আপনি যদি এমন জায়গায় যান যেখানে হালাল মাংস পাওয়া যায় না বা হারাম কাজ করতে হয়, তাহলে সেটা আল্লাহর সামনে জবাবদিহির বিষয়। তাই দুনিয়ার স্বার্থের চেয়ে আখিরাতের স্বার্থ বড়।' এরপর যদি তিনি সিদ্ধান্ত নেন, তাহলে সেটা আল্লাহর ইচ্ছা। আপনি শুধু ‘ইনশাআল্লাহ’ বলে আল্লাহর ওপর ছেড়ে দেবেন।
সংক্ষেপে উত্তর:
১. ‘ইনশাআল্লাহ’ বলাতে কোনো গুনাহ নেই বরং এটি সুন্নাত। আপনি আপনার কাজের মাধ্যমে কুরআন ও হাদিসের নির্দেশ পালন করেছেন। ২. স্বামী ইউরোপে গেলেও ‘ইনশাআল্লাহ’ বলা জায়েয; এতে দোষের কিছু নেই। এটি আল্লাহর ইচ্ছার কাছে আত্মসমর্পণ। ৩. হারাম উপার্জনের ভয়ে সতর্ক থাকা আপনার জন্য প্রশংসনীয়। আপনি একজন সচেতন মুসলিম স্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ৪. স্বামীকে পরামর্শ দিন: যেকোনো দেশে গিয়ে শুধু হালাল মাংস ও হালাল উপার্জনের পথই গ্রহণ করুন। প্রয়োজনে এমন প্রতিষ্ঠানে কাজ করুন যা হালাল মাংস ব্যবহার করে।
রেফারেন্স সমূহ:
- কুরআন: সূরা আল-কাহফ (১৮:২৩-২৪)
- হাদিস: সুনান আবু দাউদ, হাদিস: ৩২৬৭; মিশকাতুল মাসাবিহ, হাদিস: ৩৪০৪
- হানাফি ফিকহ: রদ্দুল মুখতার (৬য় খণ্ড, কিতাবুল হাযর ওয়াল ইবাহা), ফতোয়ায়ে উসমানি (২য় খণ্ড, ক্রয়-বিক্রয় অধ্যায়), বেহেশতি জেওর (১০ম অধ্যায়: হালাল-হারাম উপার্জন)