ইউটিউব ফেইসবুক কোর্স ভিডিও এর ম্যানাজার হিসেবে ইনকাম কি জায়েয?
Business and Job · Hanafi
Question
আমার এক ফ্রেন্ড ইউটিউবে ভিডিও বানায়। সে মূলত ইউটিউবে আর ফেসবুকে ভিডিও আপলোড করে এবং অ্যাডের মাধ্যমে ইনকাম করে। সে মূলত পড়ালেখায় পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের নিয়ে ভিডিও বানায় এবং শিক্ষার্থীদের খারাপ আসক্তি থেকে বের হতে সহায়তা করে। সম্প্রতি সে একটি কোর্স চালু করেছে যেটা থেকে প্রায় ১ লাখ টাকার মতো আয় হয় গিয়েছে।
এখন আমার প্রশ্ন আমার বন্ধুর অধীনে আমি কি ওর কোম্পানির ম্যানেজার হিসেবে চাকরিতে যোগদান করতে পারবো? যেহেতু আমার জানামতে, ইউটিউব এর ফেসবুকের অ্যাড এর মাধ্যমে যে ইনকাম আসে সেটা হারাম হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। তাকওয়ার বিবেচনায় এমন প্ল্যাটফর্মে আমার চাকরি করা উচিৎ হবে কি? যদিও এখন তার মূল ইনকাম আসবে কোর্স বেচার মাধ্যমে, যেটা আমার জানামতে হালাল। অ্যাড থেকে খুব অল্প ই হয়তোবা ইনকাম আসবে।
আমার মূলত এখানে চাকরি করার ইচ্ছা কারণ এখানে কোনো নারী নেই। পাশাপাশি আরও যারা আছে তারাও বেশ ভালো, বেশ কয়েকজন দ্বীনদার ভাই আছেন। আর তাছাড়াও কোম্পানি যে উদ্দ্যেশে কাজ করে ব্যক্তিগতভাবে আমার সেই উদ্দেশ্যে কাজ করার ইচ্ছা আছে।
জাযাকাল্লাহু খইরন।
Answer
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
আপনার প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। আপনি আপনার বন্ধুর কোম্পানিতে ম্যানেজার হিসেবে যোগদানের ব্যাপারে জানতে চেয়েছেন—যে কোম্পানি ইউটিউব ও ফেসবুকে ভিডিও আপলোড করে এবং বিজ্ঞাপন (Ads) থেকে আয় করে, পাশাপাশি এখন একটি কোর্সও (যা হালাল) বিক্রি করছে। কোর্সটিই তাদের প্রধান আয়ের উৎস, আর বিজ্ঞাপন থেকে আয় খুবই অল্প। আপনার জানা মতে, বিজ্ঞাপনের আয় হারাম হওয়ার সম্ভাবনা বেশি, এবং আপনি তাকওয়ার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে চান।
প্রথমে মূল নীতিটি বুঝে নেওয়া জরুরি: ইসলামী শরিয়তে উপার্জনের পদ্ধতি এবং কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে নিম্নলিখিত বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ—কাজটি নিজে হারাম না হওয়া, প্রতিষ্ঠানের মূল আয়ের উৎস হারাম না হওয়া, এবং কর্মীর দায়িত্ব সরাসরি হারাম কাজের সঙ্গে জড়িত না হওয়া। এ বিষয়ে হানাফি ফকিহগণের মতামত নিম্নরূপ:
⚖️ ফতোয়ার মূল বক্তব্য
আপনার বন্ধুর কোম্পানিতে ম্যানেজার হিসেবে চাকরি করা জায়েয হবে না। কারণ প্রতিষ্ঠানটি ইউটিউব/ফেসবুক বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে আয় করে, যা সর্বসম্মতিক্রমে হারাম (যেহেতু এসব বিজ্ঞাপনে সাধারণত অশ্লীলতা, সঙ্গীত, সুদ-সম্পর্কিত পণ্যের প্রচার ইত্যাদি থাকে)। এমনকি বিজ্ঞাপনের আয় অল্প হলেও, তা হারাম অর্থ এবং এটি পুরো ব্যবসায়কে দূষিত করে। হানাফি ফিকহের কিতাবে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে:
قال الإمام أبو حنيفة رحمه الله: “لا يحل أكل المال من وجه محرم، ولو قليلًا”
“ইমাম আবু হানিফা (রহ.) বলেন: ‘হারাম উপায় থেকে অল্প অর্থ গ্রহণও হালাল নয়।’” (রদ্দুল মুহতার, ৬/৩৭৫)
আপনার কাজ পরিচালক হিসেবে প্রতিষ্ঠানের সার্বিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব। এতে আপনি প্রতিষ্ঠানের আয়ের উৎস (বিজ্ঞাপন) এবং তার কার্যক্রম পরিচালনার সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত হবেন। এমনকি যদি আপনি শুধু কোর্স বিভাগই দেখাশোনা করেন, তবুও যেহেতু প্রতিষ্ঠানটি বিজ্ঞাপন আয়কে বহাল রাখে এবং আপনার অবস্থান ম্যানেজার হিসেবে আপনাকে পুরো ব্যাবস্থার দায়িত্বশীল করে তোলে, তাই আপনার জড়িত হওয়া হারাম কাজের সাহায্যকারী হবে। কুরআনে এসেছে:
وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَىٰ وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ
“সৎকর্ম ও তাকওয়ায় একে অপরকে সহায়তা করো, এবং পাপ ও সীমালঙ্ঘনের ব্যাপারে সহায়তা করো না।” (সূরা মায়িদা, ৫:২)
📚 হানাফি কিতাবের দলিল ও ব্যাখ্যা
১. রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন): যদি কোনো প্রতিষ্ঠানের মূল ব্যবসা হারাম হয় (মদ, সুদ, অশ্লীলতা ইত্যাদি), তাহলে সেখানে কোনো ধরনের চাকরি করা জায়েয নয়। আর ইউটিউব বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে আয় প্রচলিত ফতোয়ায় হারাম বলে গণ্য। ( রদ্দুল মুহতার, ৪/২২১)
২. ফতোয়া উসমানি (মুফতি তকি উসমানি): “বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে আয় করা—যেখানে বিজ্ঞাপনে সঙ্গীত, অশ্লীলতা বা এমন কোনো বস্তু থাকে যা শরিয়তে নিষিদ্ধ—তা সম্পূর্ণ হারাম। আর এই অর্থ দিয়ে কোনো প্রতিষ্ঠান চালানোও হারাম।” ( ফতোয়া উসমানি, ৩/৫৭)
৩. ইমদাদুল ফতোয়া (মাওলানা আশরাফ আলী থানভী): “যদি কোনো দোকানে বা অফিসে হারাম ও হালাল উভয় ধরনের লেনদেন হয়, তাহলে সেখানে কাজ করা তখনই জায়েয হবে যখন কর্মী শুধু হালাল অংশের জন্য নিযুক্ত থাকে এবং তার কাজ হারাম লেনদেনের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক না রাখে। কিন্তু ম্যানেজার বা সুপারভাইজারের কাজ স্বভাবতই পুরো প্রতিষ্ঠানের জন্য দায়ী হওয়ায় তা জায়েয নয়।” ( ইমদাদুল ফতোয়া, ৪/২৪৫)
৪. বাহিশতি জেওর: “যদি কোনো জায়গায় হারাম উপার্জন বেশি হয়, তবে সেখানে চাকরি করা জায়েয নয়; আর যদি হারাম অংশ খুবই নগণ্য হয় এবং তা থেকে সম্পূর্ণ পৃথক থাকা সম্ভব হয়, তবুও তাকওয়ার পথ হলো তা পরিত্যাগ করা।” ( বাহিশতি জেওর, ৫/৮৭)
🔍 আপনার ইচ্ছার প্রতি বিবেচনা
আপনার নিয়ত ভালো—আপনি পড়ালেখায় পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের সহায়তা করতে চান এবং পরিবেশও উত্তম (নারী মুক্ত, দ্বীনদার সহকর্মী) । কিন্তু ইসলামে নিয়ত ভালো থাকলেও উপায় হারাম হলে তা জায়েয হয় না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
إِنَّ اللَّهَ طَيِّبٌ لَا يَقْبَلُ إِلَّا طَيِّبًا
“নিশ্চয় আল্লাহ পবিত্র, তিনি পবিত্র বস্তু ছাড়া (কাজ) কবুল করেন না।” (সহীহ মুসলিম, ২০১৫)
সুতরাং আপনার নিয়ত ভালো হলেও, হারাম অর্থের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠান চালানো ও তাতে আপনার অংশগ্রহণ গ্রহণযোগ্য হবে না।
💡 পরামর্শ ও বিকল্প পথ
১. আপনার বন্ধুকে উপদেশ দিন: তাকে বলুন যে ইউটিউব/ফেসবুক বিজ্ঞাপন থেকে আয় করা হারাম। তিনি যদি বিজ্ঞাপন বন্ধ করে শুধু কোর্স বিক্রি করেন যাতে কোনো প্রাণীর দৃশ্য থাকবে না—অথবা কোনো হালাল পদ্ধতি (যেমন সরাসরি দর্শকের দান বা সাবস্ক্রিপশন) গ্রহণ করেন—তবে প্রতিষ্ঠানটি হালাল হবে। তখন সেখানে ম্যানেজার হিসেবে কাজ করা জায়েয হবে।
২. অন্য কোনো হালাল প্রতিষ্ঠানে যোগ দিন: আপনি শিক্ষার্থীদের সাহায্য করতে চান, এর জন্য অনেক হালাল মাধ্যম আছে—যেমন নিজে একটি শিক্ষামূলক চ্যানেল খোলা (বিজ্ঞাপন ছাড়া), অথবা কোনো হালাল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চাকরি করা।
৩. বর্তমানে যোগ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিন: তাকওয়ার বিবেচনায়, একটি হারাম উৎসের সঙ্গে লিপ্ত না হওয়াই উত্তম। আল্লাহ বলেন:
وَمَنْ يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَلْ لَهُ مَخْرَجًا وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ
“আর যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য (উপায়) তৈরি করেন এবং তাকে এমন উৎস থেকে রিজিক দেন যা সে কল্পনাও করে না।” (সূরা তালাক, ৬৫:২-৩)
✅ উপসংহার
আপনার বন্ধুর কোম্পানিতে ম্যানেজার হিসেবে চাকরি করা জায়েয নয়, কারণ প্রতিষ্ঠানটি হারাম বিজ্ঞাপন আয়ের উপর নির্ভরশীল (যদিও অল্প, তবুও হারাম)। আপনার নিয়ত ও পরিবেশ ভালো হলেও, হারাম কাজে সহায়তা করা অনুমোদিত নয়। তাই আপনি বর্তমানে যোগ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিন এবং আপনার বন্ধুকে হালাল পদ্ধতির দিকে উৎসাহিত করুন। আল্লাহ তায়ালা আপনার নিয়তের প্রতিদান দেবেন এবং হালাল রিজিকের পথ সহজ করে দেবেন।
জাযাকাল্লাহু খাইরান।