মেয়েদের মাথার চুল মাটিতে পুঁতে ফেলার অপশন নাই, তাই এখন কি আগুনে পুড়ানো যাবে?
Halal and Haram · Hanafi
Question
Answer
উত্তর:
আলহামদুলিল্লাহ, ওয়া সালাতু ওয়া সালামু ‘আলা রাসূলিল্লাহ।
আপনার প্রশ্নের জবাবে প্রথমে একটি মূলনীতি স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি—ইসলামি শরিয়তে মানুষের শরীরের কোনো অংশ (চুল, নখ ইত্যাদি) আগুনে পোড়ানো নিষিদ্ধ। এটি অসম্মানজনক ও অপমানজনক কাজ। তবে মাটিতে পুঁতে ফেলা সম্ভব না হলে বা কোনো কারণে পুঁতে ফেলা কষ্টকর হলে, চুলকে কোনো পরিষ্কার কাপড়ে মুড়ে বা কাগজে পেঁচিয়ে নিরাপদ স্থানে ফেলে দেওয়া বা পানিতে ভাসিয়ে দেওয়া জায়েয আছে।
হানাফি ফিকহের নির্ভরযোগ্য কিতাবের আলোকে বিস্তারিত দলিল:
১. আগুনে পোড়ানো নিষিদ্ধ হওয়ার প্রমাণ:
- রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
"নিশ্চয়ই আগুন দিয়ে শাস্তি দেওয়ার অধিকার একমাত্র আল্লাহ তাআলারই।"
(সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ২৬৭৩; সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩০১৬) - এই হাদিসের ভিত্তিতে ফুকাহায়ে কেরাম বলেছেন, মানুষের শরীরের কোনো অংশ বা এমন বস্তু যা সম্মানিত, তা আগুনে পোড়ানো মাকরূহে তাহরিমি (নিষিদ্ধের কাছাকাছি) বা হারাম।
- ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ রদ্দুল মুহতার (২/২৪৩) এ লিখেছেন:
"চুল বা নখ কাটার পর মাটিতে পুঁতে দেওয়া মুস্তাহাব। তবে যদি মাটিতে পুঁতে ফেলা সম্ভব না হয়, তাহলে সেগুলোকে কাগজে বা কাপড়ে মুড়ে এমন স্থানে ফেলে দেওয়া জায়েয, যেখানে মানুষের পদতলে দলিত না হয়। আগুনে পোড়ানো জায়েয নয়, কারণ এটি অপমানজনক।"
২. মাটিতে পুঁতে ফেলার বিধান:
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া (আলমগিরি) (৫/৩৫৮) তে উল্লেখ আছে:
"চুল ও নখ কাটার পর সেগুলো মাটিতে পুঁতে দেওয়া সুন্নত। কারণ, হাশরের দিন মানুষের শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সাক্ষ্য দেবে, এবং চুলও শরীরের অংশ হিসেবে পুনরুত্থিত হবে। তাই এগুলোকে সম্মানের সাথে লুকিয়ে রাখা উচিত।"
- ইমাম কাসানি (রহ.) বাদায়িউস সানায়ি (১/৪০) তে বলেন:
"চুল বা নখ মাটিতে পুঁতে দেওয়া মুস্তাহাব, কারণ এটি শরীরের অংশ এবং তা অপমানিত হওয়া থেকে রক্ষা করা কর্তব্য।"
৩. যদি মাটিতে পুঁতে ফেলা সম্ভব না হয়:
- ফাতাওয়া উসমানি (২/২৩৪) তে মুফতি মুহাম্মদ তাকি উসমানি (দামাত বারাকাতুহুম) কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল:
"আধুনিক শহরে মাটিতে পুঁতে ফেলার সুযোগ নেই, চুল কী করা উচিত?"
উত্তরে তিনি বলেন:
"চুল বা নখ মাটিতে পুঁতে ফেলা সম্ভব না হলে, সেগুলোকে টিস্যু বা কাগজে মুড়ে ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়া যেতে পারে। তবে আগুনে পোড়ানো উচিত নয়, কারণ এটি শরীরের অংশের প্রতি অসম্মান।" - ইমদাদুল ফাতাওয়া (১/১৮৫) তে মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ.) কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন:
"মাটিতে পুঁতে ফেলা সম্ভব না হলে, চুলকে কাপড়ে জড়িয়ে কোনো নদী বা পানিতে ভাসিয়ে দেওয়া ভালো। অথবা এমন জায়গায় ফেলে দেওয়া যেখানে মানুষ পায়ে দলিত না করে।"
৪. আগুনে পোড়ানোর ব্যাপারে সতর্কতা:
- শরহে মা'আনিল আসার (ইমাম তাহাবী) এবং আল-হিদায়া তে উল্লেখ আছে, মানুষের শরীরের কোনো অংশ পোড়ানো বা ধ্বংস করা ইসলামে নিষিদ্ধ। এমনকি মৃত ব্যক্তির শরীরও আগুনে পোড়ানো হারাম।
- তাই প্রশ্নে উল্লেখিত "আগুনে পুড়ানো" পদ্ধতি সম্পূর্ণ অনুচিত ও গুনাহের কাজ।
সারসংক্ষেপ উত্তর:
মেয়েদের মাথার চুল মাটিতে পুঁতে ফেলা সম্ভব না হলে আগুনে পোড়ানো যাবে না। বরং নিম্নোক্ত পদ্ধতিগুলোর যেকোনো একটি অবলম্বন করুন:
১. চুলগুলোকে পরিষ্কার কাপড় বা কাগজে মুড়ে একটি নিরাপদ স্থানে (যেমন: ফুলের টবের মাটি, বাগানের কোনো কোণ, বা নির্জন স্থান) পুঁতে দিন।
২. সম্ভব না হলে, কাপড়ে মুড়ে প্রবাহিত পানিতে (নদী/নালা) ভাসিয়ে দিন।
৩. অথবা কাগজে মুড়ে ডাস্টবিনে এমনভাবে ফেলুন যেন তা মানুষের পদতলে দলিত না হয়।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সঠিক আমল করার তাওফিক দান করুন। (আমিন)