গাছের শিকড় গাছের শিকড় কোমরে বেঁধে চিকিৎসা করা কি জায়েয বেঁধে চিকিৎসা করা কি জায়েয?
Sunnah and Bid'ah · Hanafi
Question
Rectal prolapse/পাইলস রোগের জন্য আমাদের এদিকে একজন স্বনামধন্য চিকিৎসক আছেন, গাছের শিকড় কোমরে বাঁধতে দেন, এটাতে না কমলে শিকড় খেতে দেন, এইরকম টাইপ। নামাজ পড়েন দাড়ি রাখেন এরকম উনি।
কাছের কয়েকজনকে দেখলাম শিকড়টা সুতা দিয়ে কোমরে বাঁধাতেই সুস্থ হয়ে গিয়েছে কয়েক সপ্তাহে, এটা দেখে আম্মু জোর করে আমার জন্য ও আনালেন আমারও সমস্যা কমে আসছে।
কিন্তু আমার আসলে এই চিকিৎসা পদ্ধতি টা সন্দেহ লাগছে! এভাবে চিকিৎসা নেয়া কি জায়েজ আছে, বা করণীয় কি জানাবেন অনুগ্রহ করে ।
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
সংক্ষিপ্ত উত্তর:
গাছের শিকড় (বা তাবিজ-কবজ জাতীয় বস্তু) কোমরে বেঁধে চিকিৎসা করা—যদি তাতে কোনো কুরআন-দুআ বা আল্লাহর নাম না থাকে, বরং শুধু শিকড়/গাছ/বস্তুকে রোগ নিরাময়ের মাধ্যম মনে করে বাঁধা হয়—তাহলে এটি শরীয়তসম্মত নয়; বরং শিরক ও হারামের সীমান্তে পৌঁছে যায়। কারণ রোগ নিরাময় আল্লাহ তাআলার হাতে; কোনো বস্তুকে স্বতন্ত্রভাবে নিরাময়ের কারণ বা প্রভাবশালী মনে করা জায়েয নয়। তবে চিকিৎসার বৈধ উপায় (ডাক্তারি চিকিৎসা, ওষুধ, বৈধ দুআ) গ্রহণ করা সুন্নত ও জায়েয।
বিস্তারিত আলোচনা
১. মূল নীতি: রোগ নিরাময় আল্লাহরই কাজ
কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَإِذَا مَرِضْتُ فَهُوَ يَشْفِينِ
“আর যখন আমি অসুস্থ হই, তখন তিনিই আমাকে সুস্থ করেন।”
— (সূরা আশ-শুআরা: ৮০)
وَإِن يَمْسَسْكَ اللَّهُ بِضُرٍّ فَلَا كَاشِفَ لَهُ إِلَّا هُوَ
“আর আল্লাহ যদি তোমাকে কোনো কষ্টে ফেলেন, তবে তিনি ছাড়া তা দূর করার কেউ নেই।”
— (সূরা আল-আনআম: ১৭)
হাদিসে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
لَا بَأْسَ بِالرُّقَى مَا لَمْ يَكُنْ فِيهِ شِرْكٌ
“যে রুকইয়াতে শিরক নেই, তাতে কোনো অসুবিধা নেই।”
— (সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ২২০০; মুসনাদে আহমাদ)
অর্থাৎ চিকিৎসা বা দুআ বৈধ, কিন্তু তাতে শিরকের গন্ধ থাকলে তা নাজায়েয।
২. শিকড় বেঁধে চিকিৎসা: ফকিহদের মত
হানাফি ফিকহের মূল কিতাবগুলোতে স্পষ্ট বলা হয়েছে—তাবিজ-কবজ, শিকড়, পাথর, সুতা ইত্যাদি এমনভাবে বাঁধা, যাতে বিশ্বাস করা হয় এগুলো নিজেই রোগ দূর করে বা উপকার-ক্ষতির মালিক—এটি শিরক। আর যদি কুরআনের আয়াত বা আল্লাহর নাম লেখা থাকে এবং বিশ্বাস থাকে যে আল্লাহই শিফা দেন, এগুলো শুধু মাধ্যম—তাহলে আলেমদের একটি দল তা অনুমোদন করেছেন; তবে সালাফদের অনেকেই কুরআন বহন বা ঝুলানো থেকে নিষেধ করেছেন।
ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ তাবিজ প্রসঙ্গে বলেন:
“যদি তাবিজে কুরআন বা আল্লাহর নাম থাকে এবং বিশ্বাস থাকে যে আল্লাহই শিফা দেন, তবে তা জায়েয; আর যদি কুরআন ছাড়া অন্য কিছু থাকে বা স্বয়ং বস্তুকে প্রভাবশালী মনে করা হয়, তবে তা নাজায়েয ও শিরক।”
— (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৬, ‘কিতাবুল হাজার’ অধ্যায়; ফাতাওয়া আলমগিরি, খণ্ড ৫)
ফাতাওয়া উসমানি ও ইমদাদুল ফাতাওয়া-তেও এ ধরনের শিকড়-তাবিজ ব্যবহারে শিরকি বিশ্বাস থেকে বিরত থাকার কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) স্পষ্ট বলেছেন—যে তাবিজে কুরআন-দুআ নেই বা যার দ্বারা স্বতন্ত্র প্রভাবের বিশ্বাস জন্মে, তা ব্যবহার করা জায়েয নয়।
আশরাফ আলী থানভী (রহ.) «বেহেশতী জেওর»-এ লিখেছেন:
“তাবিজ-কবজ এমন হওয়া চাই যাতে কুরআনের আয়াত বা আল্লাহর নাম থাকে, এবং বিশ্বাস এই থাকবে যে আল্লাহ তাআলাই শিফা দেন; তাবিজ নিজে কিছু করে না। আর যেসব তাবিজে অশুদ্ধ কালাম, অজানা শব্দ বা শিকড়-গাছ থাকে, তা ব্যবহার করা জায়েয নয়।”
— (বেহেশতী জেওর, তাবিজ-কবজ অধ্যায়)
৩. আপনার প্রশ্নের নির্দিষ্ট বিষয়
আপনি বলেছেন—ডাক্তার সাহেব গাছের শিকড় কোমরে বাঁধতে দেন, না কমলে শিকড় খেতে দেন। এখানে দুটি দিক লক্ষণীয়:
- শিকড় বেঁধে রাখা: যদি শিকড়ে কোনো কুরআন-দুআ না থাকে এবং রোগী বা ডাক্তার বিশ্বাস করেন শিকড় নিজেই রোগ সারাবে—তাহলে এটি শিরকি বিশ্বাস; নাজায়েয।
- শিকড় খাওয়া: যদি শিকড়টি এমন ভেষজ হয় যা চিকিৎসাবিজ্ঞানে রোগ নিরাময়ের উপকারী বলে প্রমাণিত এবং তা হারাম বা নাজিস নয়—তাহলে খাওয়া জায়েয; এটি সাধারণ ওষুধের মতো। কিন্তু যদি শিকড় খাওয়াকে ধর্মীয় আচার বা অলৌকিক শিফার মাধ্যম মনে করা হয়, তবে তা নাজায়েয।
ডাক্তার সাহেব নামাজ পড়েন, দাড়ি রাখেন—এটি তাঁর দ্বীনদারির পরিচয়; কিন্তু দ্বীনদারি কোনো আমলকে শরীয়তবিরোধী হলে বৈধ করে দেয় না। ফিকহের মূলনীতি হলো: ব্যক্তির দ্বীনদারি নয়, আমলের শরীয়তসম্মতি বিবেচ্য।
৪. করণীয়
- শিকড় বাঁধা বন্ধ করুন—বিশেষত যদি তাতে কুরআন-দুআ না থাকে বা শিকড়কে স্বতন্ত্র শিফার কারণ মনে করা হয়।
- বৈধ চিকিৎসা নিন: অভিজ্ঞ ডাক্তার/সার্জন দেখান; পাইলস/রেক্টাল প্রোল্যাপসের চিকিৎসা চিকিৎসাবিজ্ঞানে সুপ্রতিষ্ঠিত।
- বৈধ দুআ ও রুকইয়া করুন: যেমন—«أَسْأَلُ اللَّهَ الْعَظِيمَ رَبَّ الْعَرْشِ الْعَظِيمِ أَنْ يَشْفِيَكَ» (সাতবার), সূরা ফাতিহা, মুআওবিযাতাইন পড়ে ফুঁ দেওয়া; এগুলো সুন্নত।
- আম্মুকে বুঝিয়ে বলুন: তিনি ভালো নিয়তে করেছেন, কিন্তু শরীয়তের সীমা রক্ষা করা জরুরি।
- সন্দেহ হলে স্থানীয় নির্ভরযোগ্য মুফতি/দারুল ইফতাকে সরাসরি দেখান—বিশেষত শিকড়টি কী এবং কীভাবে ব্যবহার হচ্ছে তা জানিয়ে।
সারসংক্ষেপ
- শিকড়/তাবিজ বেঁধে চিকিৎসা—যদি কুরআন-দুআবিহীন এবং বস্তুকে স্বতন্ত্র শিফার কারণ মনে করা হয়—নাজায়েয ও শিরকের সীমান্তে।
- বৈধ ভেষজ ওষুধ খাওয়া বা ডাক্তারি চিকিৎসা নেওয়া জায়েয ও সুন্নত।
- রোগ নিরাময়ের একমাত্র প্রকৃত মালিক আল্লাহ; মাধ্যম গ্রহণ করা বৈধ, কিন্তু মাধ্যমকে প্রভাবশালী মনে করা শিরক।
- দ্বীনদার ডাক্তার হলেও তাঁর পদ্ধতি শরীয়তের মানদণ্ডে যাচাই করা আবশ্যক।
আল্লাহ তাআলা আপনাকে শিফায়ে কামিলা দান করুন এবং শরীয়তের উপর অটল থাকার তাওফিক দিন। আমিন।
আল্লাহ সর্বজ্ঞ।