বিড়াল কি নাপাক পশু
Taharah Purity · Hanafi
Question
২.এছাড়াও কম্বলে বিড়াল অনেকবার পায়খানা করেছে।ধোয়া হয় নি।শুধু শুকিয়ে পায়খানা ফেলে দেওয়া হতো।তারপরেও সামান্য আটকেই থাকতো।কুকুর, বিড়ালের পায়খানা সব মিলিয়ে কি নাপাক হয়ে গেছে?
৩.শিয়ালের লালা কি নাপাক? শিয়াল মুরগি কামড়ে নিয়ে যাওয়ার সময় ফেলে দিয়ে গিয়েছে। পরে আমার আম্মু হাত দিয়ে চেক করেছে।পরে মুরগির ঘরের হাতল ধরেছে,গেট আটকেছে। সব কি নাপাক হয়েছে ও সাতবার ধুতে হবে?
সরাসরি আলেমদের কাছে জানতে চাইছি।Ai এর নয়।
Answer
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
নিচে আপনার তিনটি প্রশ্নের উত্তর হানাফি ফিকহের মূলনীতি অনুযায়ী দেওয়া হলো। প্রথমে একটি গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি মনে রাখবেন: শরীয়তে সন্দেহের কারণে কোনো বস্তু নাপাক হয় না; নাপাক হওয়ার বিষয়ে নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া গেলে তবেই নাপাক সাব্যস্ত হয়। (রাদ্দুল মুহতার, ১/৩১৭; ফাতাওয়া উসমানি, ১/২৩০)
১ম প্রশ্ন: কুকুর কম্বলে শুয়ে থাকলে কম্বল, ঝুড়ি ও বিছানা কি নাপাক হবে?
উত্তর: শুধু কুকুর শুয়ে থাকার কারণে কম্বল বা ঝুড়ি নাপাক হয় না। কুকুরের শরীরের কোনো অংশ (লালা, মুখ, পেশাব-পায়খানা) যদি কম্বলে লেগে থাকে এবং তা ভিজা অবস্থায় লেগে থাকে, তবেই সেই নির্দিষ্ট স্থান নাপাক হবে। আর যদি শুকনো কুকুর শুকনো কম্বলে শুয়ে থাকে, তাহলে কম্বল নাপাক হয় না।
হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "কুকুর যদি তোমাদের কারো পাত্রে মুখ ঢুকিয়ে দেয়, তবে সে যেন তা সাতবার ধোয়, তন্মধ্যে একবার মাটি দিয়ে।" (সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৭৯; সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ৭১)
এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, কুকুরের মুখ বা লালা পাত্রে লাগলে পাত্র নাপাক হয়। কিন্তু শুধু শুয়ে থাকলে নয়। ইমাম ইবনে আবিদিন রহ. বলেন, কুকুরের শরীরের শুকনো অংশ কোনো বস্তুতে লাগলে তা নাপাক করে না, যতক্ষণ না লালা বা ভেজা অংশ লাগে। (রাদ্দুল মুহতার, ১/৩১৭)
আপনার ক্ষেত্রে: আপনি নিশ্চিত নন কুকুরের লালা বা ভেজা অংশ কম্বলে লেগেছিল কি না। শুধু "মনে হচ্ছে" দ্বারা নাপাক সাব্যস্ত হয় না। তাই কম্বল, ঝুড়ি ও বিছানা নাপাক ধরার প্রয়োজন নেই। তবে সতর্কতামূলকভাবে কম্বলটি তিনবার ধুয়ে নিলে ভালো।
বিড়ালের বিছানায় ওঠা: বিড়ালের শরীর শরীয়তের দৃষ্টিতে পাক (তাহির)। হাদিসে এসেছে, বিড়াল নাপাক নয়; সে তোমাদের ঘরে ঘুরে বেড়ায়। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ৭৫; সুনানে তিরমিজি, হাদিস ৯২) তাই বিড়াল বিছানায় উঠলে বিছানা নাপাক হয় না।
২য় প্রশ্ন: কম্বলে বিড়ালের পায়খানা শুকিয়ে ফেলে দেওয়ার পর সামান্য লেগে থাকলে কম্বল নাপাক হবে?
উত্তর: হ্যাঁ, বিড়ালের পায়খানা (বিষ্ঠা) নাপাক (নাজাসাতে গালিজা)। কম্বলে পায়খানা লেগে থাকলে এবং শুধু শুকিয়ে ফেলে দেওয়া হলে, যতটুকু অংশ লেগে আছে তা নাপাক। শুকিয়ে গেলেও নাপাকত্ব দূর হয় না; পানি দিয়ে ধুয়ে নাপাকত্ব দূর করতে হয়।
নাপাক দূর করার নিয়ম: নাজাসাতে গালিজা (যেমন পায়খানা, পেশাব, রক্ত) যদি বস্তুতে দৃশ্যমান থাকে, তবে তা দূর করে ধুয়ে ফেলতে হবে। যদি দৃশ্যমান না থাকে কিন্তু দাগ বা গন্ধ থাকে, তবে তিনবার ধোয়া উত্তম। (রাদ্দুল মুহতার, ১/৩১৭; আল-হিদায়া, ১/৩৫)
আপনার ক্ষেত্রে: কম্বলে বিড়ালের পায়খানার সামান্য অংশ লেগে থাকলে সেই নির্দিষ্ট স্থান নাপাক। কম্বলটি সম্পূর্ণ নাপাক নয়, শুধু লেগে থাকা স্থানটি ধুয়ে নিলেই পাক হয়ে যাবে। আর কুকুরের পায়খানা বা পেশাব যদি কম্বলে লেগে থাকে, তাও নাপাক; তবে কুকুরের পেশাব-পায়খানার ক্ষেত্রে সাতবার ধোয়া ওয়াজিব নয়—এটি কুকুরের মুখ/লালার ক্ষেত্রে (পাত্রে) প্রযোজ্য। (ফাতাওয়া উসমানি, ১/২৩০)
সতর্কতা: কম্বলটি যদি ধোয়া সম্ভব না হয়, তবে যতটুকু নাপাক লেগেছে তা পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন।
৩য় প্রশ্ন: শিয়ালের লালা কি নাপাক? শিয়ালের কামড়ে মুরগি ফেলে যাওয়া, আম্মুর হাত দিয়ে চেক করা, হাতল ও গেট ধরা—সব কি নাপাক? সাতবার ধুতে হবে?
উত্তর:
শিয়ালের লালা নাপাক। হানাফি মাজহাবে শিয়াল (ثعلب) হিংস্র পশু (سبع) হিসেবে গণ্য, এবং তার লালা নাপাক। (রাদ্দুল মুহতার, ১/৩১৭; ফাতাওয়া আলমগিরি, ১/৪৬) তবে শিয়ালের শরীরের শুকনো অংশ নাপাক নয়; লালা, মুখ, পেশাব-পায়খানা নাপাক।
আপনার ঘটনার বিশ্লেষণ:
১. শিয়াল মুরগি কামড়ে নিয়ে ফেলে দিয়েছে: মুরগির যে অংশে শিয়ালের মুখ বা লালা লেগেছে, সেই অংশ নাপাক। মুরগির বাকি অংশ পাক। তবে শিয়াল যদি মুরগি কামড়ে ধরে নিয়ে যায় এবং ফেলে দেয়, তাহলে মুরগির সেই অংশটি ধুয়ে ফেললে পাক হয়ে যাবে। মুরগির গোশত খাওয়া যাবে, তবে শিয়ালের মুখ লাগা অংশ ধুয়ে নিতে হবে।
২. আম্মু হাত দিয়ে চেক করেছেন: যদি আম্মুর হাতে শিয়ালের লালা বা নাপাক কিছু লেগে থাকে, তবে হাত নাপাক হবে। কিন্তু যদি শুধু মুরগির পাক অংশে হাত দেন, তাহলে হাত নাপাক হয় না। যেহেতু আপনি নিশ্চিত নন হাতে নাপাক লেগেছিল কি না, সন্দেহের কারণে হাত নাপাক সাব্যস্ত হবে না।
৩. হাতল ও গেট ধরা: যদি আম্মুর হাতে নাপাক লালা লেগে থাকে এবং সেই ভেজা হাত দিয়ে হাতল ও গেট ধরেন, তবে হাতল ও গেটের সেই নির্দিষ্ট স্থান নাপাক হবে। আর যদি হাত পাক থাকে, তাহলে হাতল ও গেট পাক।
সাতবার ধোয়ার বিষয়: শিয়ালের লালা বা নাপাক লেগে থাকলে সাতবার ধোয়া ওয়াজিব নয়। সাতবার ধোয়া ওয়াজিব শুধু কুকুরের মুখ/লালা পাত্রে লাগলে (হাদিস অনুযায়ী)। শিয়ালের লালা বা অন্যান্য নাপাকের ক্ষেত্রে একবার ধোয়েই নাপাকত্ব দূর হয়ে যায়, যদি নাপাকের চিহ্ন (রং/গন্ধ) দূর হয়। (রাদ্দুল মুহতার, ১/৩১৭; ফাতাওয়া উসমানি, ১/২৩০)
সারসংক্ষেপ:
- শিয়ালের লালা নাপাক, কিন্তু সাতবার ধোয়া ওয়াজিব নয়—একবার ধোয়েই পাক হবে।
- মুরগির শিয়ালের মুখ লাগা অংশ ধুয়ে ফেলুন, বাকি মুরগি পাক।
- আম্মুর হাত ও হাতল-গেট: নিশ্চিতভাবে নাপাক লেগেছে বলে জানা না থাকলে সন্দেহের কারণে নাপাক ধরবেন না। সতর্কতামূলকভাবে হাত ও হাতল-গেট একবার ধুয়ে নিলে ভালো।
পরামর্শ: আপনার কম্বলটি যদি সহজে ধোয়া যায়, তবে তিনবার ধুয়ে নিন—এতে সন্দেহ দূর হবে এবং নামাজ-ইবাদতে প্রশান্তি থাকবে। আর বিছানার চাদর নিয়মিত ধুয়ে রাখুন।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে পবিত্রতা ও ইবাদতের সঠিক জ্ঞান দান করুন। আমিন।
রেফারেন্স:
- রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদিন), ১/৩১৭
- ফাতাওয়া উসমানি, ১/২৩০
- ফাতাওয়া আলমগিরি, ১/৪৬
- আল-হিদায়া, ১/৩৫
- সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৭৯
- সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ৭১, ৭৫
- সুনানে তিরমিজি, হাদিস ৯২