যিনা করে ফেলেছি, আল্লাহ কি মাফ করবেন?

Halal and Haram · Hanafi

Question No: 7398
Questioner: Mariam
Question Asked: 26 Oct 2026, 11:09 AM
Reviewed & Published: 26 Oct 2026, 12:08 PM
Views: 36
Tokens: 4,652
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আমি যিনা করে ফেলেছি জেনেশুনে কয়েকবার তাও শারিরীক যিনা।আল্লাহ কি আমায় মাফ করবেন আর আমি এই যিনা থেকে কীভাবে বের হব আমি একজন নেয়ে, সারাদিন অনেক ডিপ্রেশনে থাকি পড়াশোনাও করতে পারি নাহ আমি

Answer

যিনার পর তাওবা ও মুক্তির উপায়

উত্তর

আল্লাহ তা'আলা তাওবাকারীর তাওবা কবুল করেন—এটি কুরআন ও সুন্নাহর সুস্পষ্ট ঘোষণা। তবে শারীরিক যিনার তাওবা কবুল হওয়ার জন্য তিনটি শর্ত পূরণ করা আবশ্যক: (১) যিনা সম্পূর্ণরূপে পরিত্যাগ করা, (২) কাজটির জন্য অন্তর থেকে লজ্জিত ও অনুতপ্ত হওয়া, (৩) ভবিষ্যতে আর কখনো না করার দৃঢ় সংকল্প করা। যদি কোনো হক (কারো অধিকার) সংশ্লিষ্ট থাকে, তবে তা আদায় করা চতুর্থ শর্ত।

ইস্তিগফার, নফল ইবাদত, সদকা ও দান-খয়রাত বেশি করতে হবে এবং ভবিষ্যতে যেনা থেকে বাঁচার জন্য বাস্তব পদক্ষেপ নিতে হবে।

আল্লাহ কি মাফ করবেন?

আল্লাহ তা'আলা কুরআনে ইরশাদ করেন:

قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَىٰ أَنفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِن رَّحْمَةِ اللَّهِ ۚ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا ۚ إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ

"বলুন, হে আমার বান্দারা! যারা নিজেদের উপর জুলুম করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সমস্ত গুনাহ মাফ করেন। নিশ্চয়ই তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।" — (সূরা আয-যুমার: ৫৩)

আরও ইরশাদ করেন:

وَالَّذِينَ إِذَا فَعَلُوا فَاحِشَةً أَوْ ظَلَمُوا أَنفُسَهُمْ ذَكَرُوا اللَّهَ فَاسْتَغْفَرُوا لِذُنُوبِهِمْ وَمَن يَغْفِرُ الذُّنُوبَ إِلَّا اللَّهُ وَلَمْ يُصِرُّوا عَلَىٰ مَا فَعَلُوا وَهُمْ يَعْلَمُونَ

"আর যারা কোনো অশ্লীল কাজ করে ফেললে বা নিজেদের প্রতি জুলুম করলে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং নিজেদের গুনাহের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে—আল্লাহ ছাড়া কে গুনাহ মাফ করবে? আর তারা জেনে-বুঝে যা করেছে তাতে অবিচল থাকে না।" — (সূরা আলে ইমরান: ১৩৫)

হাদিসে রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন:

التَّائِبُ مِنَ الذَّنْبِ كَمَنْ لَا ذَنْبَ لَهُ

"গুনাহ থেকে তাওবাকারী ব্যক্তি যেন সেই ব্যক্তি, যার কোনো গুনাহই নেই।" — (সুনানে ইবনে মাজাহ: ৪২৫২; মুসনাদে আহমাদ)

ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ উল্লেখ করেন যে, তাওবার শর্ত হলো গুনাহ পরিত্যাগ, অনুতাপ ও ভবিষ্যতে না করার সংকল্প; আর যদি গুনাহটি আল্লাহর হক সংশ্লিষ্ট হয় তবে তা-ই যথেষ্ট, আর বান্দার হক সংশ্লিষ্ট হলে তা ফিরিয়ে দেওয়াও শর্ত। (রাদ্দুল মুহতার: ৬/৩৪৮-এর কাছাকাছি আলোচনা)

সুতরাং হ্যাঁ, আল্লাহ মাফ করবেন—শর্ত হলো খাঁটি তাওবা।

যিনার তাওবা: বিশেষ সতর্কতা

ফকীহগণ উল্লেখ করেছেন, যিনার তাওবা কবুল হওয়ার জন্য শুধু ইস্তিগফার যথেষ্ট নয়; বরং যিনার পাপ এতই জঘন্য যে, তাওবার সাথে সাথে বেশি পরিমাণে নেক আমল, ইস্তিগফার ও কান্নাকাটি করতে হবে। ইমাম আত-তাহাবী (রহ.) ও ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর অনুসারী ফকীহগণের বক্তব্য হলো—যিনার তাওবা কবুল হয়, তবে তাওবার পর ইবাদতে বেশি মনোযোগী হতে হবে এবং পুনরায় যেনায় লিপ্ত হওয়া থেকে কঠোরভাবে বিরত থাকতে হবে।

আশরাফ আলী থানভী (রহ.) «বেহেশতী জেওর»-এ লিখেছেন: যিনার তাওবা করার পর যদি পুনরায় যিনা করে, তবে পূর্বের তাওবা বাতিল হয়ে যায় এবং নতুন করে তাওবা করতে হবে। (বেহেশতী জেওর, তাওবা অধ্যায়)

যিনা থেকে বের হওয়ার বাস্তব উপায়

ক. তাওবার তিন শর্ত পূর্ণ করুন:

  • যিনা সম্পূর্ণ বন্ধ করুন—একেবারে।
  • অন্তর থেকে লজ্জিত হোন, আল্লাহর কাছে কেঁদে কেঁদে ক্ষমা চান।
  • দৃঢ় সংকল্প করুন—আর কখনো করব না।

খ. বেশি বেশি ইস্তিগফার ও তাওবা করুন:

  • সকাল-সন্ধ্যা ১০০ বার ইস্তিগফার (أستغفر الله)।
  • সাইয়্যিদুল ইস্তিগফার পড়ুন।
  • তাহাজ্জুদের সময় আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করুন।

গ. নফল ইবাদত বাড়ান:

  • পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ জামাতে আদায় করুন।
  • কুরআন তিলাওয়াত প্রতিদিন অন্তত এক পৃষ্ঠা।
  • দরুদ শরিফ বেশি পড়ুন।

ঘ. সদকা ও দান-খয়রাত করুন:

  • নিয়মিত সদকা করুন—গোপনে, অল্প হলেও।
  • গরিব-দুঃখীদের সাহায্য করুন।

ঙ. যিনার দিকে নিয়ে যায় এমন সব কিছু থেকে দূরে থাকুন:

  • মোবাইলে অশ্লীল কনটেন্ট, ছবি, ভিডিও, চ্যাট—সব ডিলিট করুন।
  • যার সাথে যিনা হয়েছে তার সাথে সব যোগাযোগ বন্ধ করুন।
  • ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টিকটক ইত্যাদিতে অশ্লীল কনটেন্ট দেখা বন্ধ করুন।
  • নির্জনে একা থাকা কমিয়ে দিন; পরিবারের সাথে সময় কাটান।

চ. বিয়ের ব্যবস্থা করুন: কুরআনে ইরশাদ:

وَأَنكِحُوا الْأَيَامَىٰ مِنكُمْ وَالصَّالِحِينَ مِنْ عِبَادِكُمْ وَإِمَائِكُمْ ۚ إِن يَكُونُوا فُقَرَاءَ يُغْنِهِمُ اللَّهُ مِن فَضْلِهِ

"তোমাদের মধ্যে যারা অবিবাহিত তাদের বিয়ে দিয়ে দাও... তারা যদি দরিদ্রও হয়, আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদের অভাবমুক্ত করে দেবেন।" — (সূরা আন-নূর: ৩২)

রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন:

يَا مَعْشَرَ الشَّبَابِ مَنِ اسْتَطَاعَ الْبَاءَةَ فَلْيَتَزَوَّجْ فَإِنَّهُ أَغَضُّ لِلْبَصَرِ وَأَحْصَنُ لِلْفَرْجِ

"হে যুবকগণ! তোমাদের মধ্যে যার সামর্থ্য আছে সে যেন বিয়ে করে; কারণ এটি দৃষ্টি নিচু রাখে এবং লজ্জাস্থান হেফাজত করে।" — (সহিহ বুখারী: ৫০৬৫; সহিহ মুসলিম: ১৪০০)

বিয়ে সম্ভব না হলে রোজা রাখুন—রাসূল ﷺ বলেছেন, যে বিয়ে করতে পারে না সে যেন রোজা রাখে, কারণ রোজা যৌন চাহিদা নিয়ন্ত্রণ করে। (সহিহ বুখারী: ৫০৬৬)

ডিপ্রেশন ও পড়াশোনায় মনোযোগ

আপনি লিখেছেন—সারাদিন ডিপ্রেশনে থাকেন, পড়াশোনা করতে পারেন না। এটি স্বাভাবিক; কিন্তু শয়তান চায় আপনি হতাশায় ডুবে থাকুন এবং আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হোন। আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া নিজেই একটি বড় গুনাহ। ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ উল্লেখ করেছেন, আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া কুফরির কাছাকাছি। (রাদ্দুল মুহতার: ১/৫৬-এর আলোচনা)

পরামর্শ:

  • নিজেকে বলুন—"আমি তাওবা করেছি, আল্লাহ মাফ করেছেন; এখন আমাকে সামনে এগোতে হবে।"
  • পড়াশোনার জন্য নির্দিষ্ট রুটিন বানান; ছোট ছোট লক্ষ্য নির্ধারণ করুন।
  • প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটুন, খোলা বাতাসে যান।
  • ঘরে একা নির্জনে বেশি সময় না কাটিয়ে পরিবারের সাথে থাকুন।

This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.