"স্বামীর গোপন পরকীয়া, শারীরিক নির্যাতন ও ভাগ্নিকে মলেস্ট করার পর ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে করণীয় কি হতে পারে?
Family Life · Hanafi
Question
Answer
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
প্রিয় বোন, আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল। আপনি যে পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন তা সহজ নয়। আল্লাহ তাআলা আপনার সবর ও ধৈর্যকে কবুল করুন এবং আপনার জন্য সর্বোত্তম ফয়সালা দিন। আমিন।
আপনার প্রশ্নের উত্তর ধাপে ধাপে দিচ্ছি:
১. স্বামীর গোপন বিয়ে ও অন্যান্য মেয়েদের সাথে সম্পর্ক
ইসলামে স্বামীর জন্য একাধিক বিবাহ বৈধ, তবে গোপন রাখা বা পরিবারকে না জানানো ইসলামী আদবের পরিপন্থী। তবে এটি সরাসরি তালাকের কারণ নয়। কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন:
"তোমরা নারীদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা দুই, তিন বা চারজনকে বিবাহ করো।" (সূরা নিসা: ৩)
তবে স্বামীর পরকীয়া বা অবৈধ সম্পর্ক (যিনা) সম্পূর্ণ হারাম। আল্লাহ তাআলা বলেন:
"তোমরা যিনার কাছেও যেয়ো না, নিশ্চয়ই তা অশ্লীল কাজ ও মন্দ পথ।" (সূরা বনী ইসরাইল: ৩২)
শারীরিক নির্যাতন ইসলামে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"তোমরা নারীদেরকে মারধর করো না।" (সুনানে আবু দাউদ: ২১৪৬)
ইমাম ইবনে আবিদিন রহ. বলেন, স্ত্রীকে অকারণে প্রহার করা হারাম। (রাদ্দুল মুহতার: ৩/৫৬৭)
২. ভাগ্নিকে মলেস্ট করা — এটি একটি গুরুতর অপরাধ
আপনার স্বামী আপনার ভাগ্নিকে (যিনি তার জন্য মাহরাম নন) মলেস্ট করেছেন — এটি ইসলামে গুরুতর হারাম ও ফাহেশা কাজ। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"তোমাদের কেউ যেন কোনো নারীর সাথে নির্জনে না থাকে, কেননা তাদের তৃতীয়জন হবে শয়তান।" (সুনানে তিরমিজি: ১১৭১)
এটি শুধু চরিত্রগত ব্যর্থতা নয়, বরং এটি একটি আইনগত অপরাধও। বাংলাদেশের আইনে শিশু/কিশোরী নির্যাতন দণ্ডনীয়।
৩. ইস্তেখারা সম্পর্কে
ইস্তেখারা করা সুন্নত। রাসূলুল্লাহ ﷺ সাহাবীদেরকে সব কাজে ইস্তেখারা করতে শিক্ষা দিতেন। (সহিহ বুখারি: ১১৬৬)
আপনি নিজে মানসিকভাবে প্রস্তুত না হলে কোনো বিশ্বস্ত আলেম বা বুযুর্গের মাধ্যমে ইস্তেখারা করাতে পারেন। তবে মনে রাখবেন — ইস্তেখারার ফলাফল স্বপ্নে নাও আসতে পারে; বরং আল্লাহ তাআলা আপনার অন্তরে যে দিকটি সহজ করে দেন বা যে বিষয়ে সন্তুষ্টি দেন, সেটিই ইস্তেখারার ফল।
৪. আপনার করণীয় — ইসলামী দৃষ্টিকোণ
ক) এখনই যা করবেন:
- ভাগ্নিকে রক্ষা করুন — তাকে আর কখনো আপনার স্বামীর সাথে একা রাখবেন না। এটি আপনার দ্বীনি ও নৈতিক দায়িত্ব।
- পরিবারকে জানান — বিশেষত আপনার ভাগ্নির মা-বাবাকে। এটি গোপন রাখা ভাগ্নির জন্য আরও বিপদের কারণ হতে পারে।
- আইনগত পদক্ষেপের কথা ভাবুন — শিশু/কিশোরী নির্যাতনের বিষয়ে বাংলাদেশের আইনে অভিযোগ করা যায়। এটি দ্বীনি দৃষ্টিতেও জালিমের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ।
খ) সংসার চালিয়ে যাওয়া না ভাঙা — ইসলামী দৃষ্টিকোণ:
ইসলামে তালাক শেষ উপায়। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"আল্লাহর কাছে সবচেয়ে অপছন্দনীয় হালাল জিনিস হলো তালাক।" (সুনানে আবু দাউদ: ২১৭৮)
তবে যদি স্বামী বারবার যিনা/ফাহেশায় লিপ্ত হয়, শারীরিক নির্যাতন করে, এবং শিশু-কিশোরীকে মলেস্ট করে — তাহলে এ সংসার চালিয়ে যাওয়া আপনার দ্বীন, ইজ্জত ও সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে।
ইমাম ইবনে আবিদিন রহ. বলেন, স্বামী যদি স্ত্রীর উপর জুলুম করে এবং তার দ্বীন-ইজ্জত রক্ষা না করে, তাহলে স্ত্রীর জন্য বিচ্ছেদ চাওয়া বৈধ। (রাদ্দুল মুহতার: ৩/৫৬৭)
মুফতি মুহাম্মদ শফী রহ. (মা'আরিফুল কুরআনে) বলেন, স্বামীর চরিত্রহীনতা ও নির্যাতন স্ত্রীর জন্য তালাক চাওয়ার বৈধ কারণ।
গ) সন্তানের বিষয়:
সন্তান জন্মের পর সেপারেট হওয়ার চিন্তা — ইসলামে সন্তানের হক সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তবে সন্তানের সামনে এমন পিতার চরিত্র সন্তানের জন্যও ক্ষতিকর। ইসলামে সন্তানের লালন-পালন (হিদানা) মায়ের হক। (রাদ্দুল মুহতার: ৩/৫৬৬)
৫. ব্যবহারিক পরামর্শ
- এখনই কোনো বিশ্বস্ত আলেম/মুফতির সাথে সরাসরি পরামর্শ করুন
- ইস্তেখারা করুন।
- ভাগ্নির বিষয়ে পরিবারকে জানান — এটি গোপন রাখা যাবে না।
- নিরাপত্তা নিশ্চিত করুন — আপনার ও ভাগ্নির শারীরিক নিরাপত্তা প্রথম।
- আইনগত পরামর্শ নিন — শিশু নির্যাতনের বিষয়ে।
- সিদ্ধান্তে তাড়াহুড়ো করবেন না — তবে নিজের ও সন্তানের নিরাপত্তা বিসর্জন দেবেন না।
সারসংক্ষেপ
আপনার স্বামীর কাজ (ভাগ্নিকে মলেস্ট, বারবার পরকীয়া, শারীরিক নির্যাতন) ইসলামে গুরুতর হারাম ও জুলুম। আপনি যদি ধৈর্য ধরে সংসার চালাতে চান, তবে শর্ত হলো — সে তাওবা করবে, ভাগ্নি ও অন্যান্য নারী থেকে দূরে থাকবে, নির্যাতন বন্ধ করবে। কিন্তু যদি সে না বদলায়, তাহলে আপনার দ্বীন ও ইজ্জত রক্ষার জন্য বিচ্ছেদ ইসলামে বৈধ। তবে সিদ্ধান্তের আগে অবশ্যই একজন মুফতির সাথে সরাসরি পরামর্শ করুন এবং ইস্তেখারা করান।
আল্লাহ তাআলা আপনার জন্য সর্বোত্তম ফয়সালা করুন এবং আপনার সন্তানকে হেফাজত করুন। আমিন।
والله أعلم بالصواب