"স্বামীর গোপন পরকীয়া, শারীরিক নির্যাতন ও ভাগ্নিকে মলেস্ট করার পর ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে করণীয় কি হতে পারে?

Family Life · Hanafi

Question No: 7441
Questioner: Jannatun Nur
Question Asked: 27 Oct 2026, 03:51 PM
Reviewed & Published: 27 Oct 2026, 06:52 PM
Views: 36
Tokens: 8,835
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

একটু বিস্তারিত কথা লিখা হবে, দয়া করে মনোযোগ দিয়ে দেখবেন। ২০১৪ সালে ৭মাস সম্পর্কে থাকার পর আমার স্বামী গোপনে আমাকে বিয়ে করে, পরিবারকে না জানিয়ে আমরা আলাদা আলাদা থেকেছি প্রেমিক প্রেমিকার মতো। ২০২১ সালে পারিবারিক ভাবে কাবিন হয় আমাদের। এর মাঝে কয়েকবার আমার স্বামী অন্যান্য মেয়েদের সাথে সম্পর্কে জরিয়েছেন, এগুলো ধরার পরেও আমি আমার বা তার পরিবারকে জানায়নি এবং তার থেকে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছি। ২০২২ সালে একজন ডিভোর্সি ২ বাচ্চার মায়ের সাথে ট্যুরে যাওয়ার পরিকল্পনা এবং এক রাত তার উধাও থাকার বিষয় আমার কাছে ধরা পড়ে, আমি ২ পরিবার কে ডাকি। এরপর আবার সমঝোতার মাধ্যমে সংসার করি। এরপরেও আমার স্বামী পুরোপুরি হেদায়েত হন নাই, ছোটখাট অনেক কিছুই করেছেন। ২০২৬ এর জানুয়ারী তে আমাকে আনুষ্ঠানিক ভাবে শশুর বাড়ি নিয়ে যাওয়ার পর আমি বেবি নিতে চাই এবং মার্চ মাসে কন্সিভ করি। এখন আমার ৩৪ সপ্তাহ চলে, এই দীর্ঘ সময়ে আমার স্বামী একবার আমার সাথে শারীরিক সম্পর্কে যায় তাও আমার ইচ্ছায়। আমি ফেব্রুয়ারিতে প্রভাষক হিসেবে জয়েন করি নেত্রকোনা তে আর আমার স্বামী ঢাকাতেই আছেন, এর আগে আমরা ঢাকাতেই ছিলাম। গত শনিবার আমার বোন, ভাগ্নি(ক্লাস ৯ এ পড়ে), আমার স্বামী নেত্রকোনা বাসায় থাকাকালীন ডাক্তার দেখানোর উদ্দেশ্য আমি আর আমার বোন বের হই আমার স্বামী ঘুমে ছিলেন, ভাগ্নী মাত্র ঘুম থেকে উঠার কারণে তাকে নিয়ে বের হওয়া পসিবল ছিলো না। যখন দেরি হচ্ছিলো আমাদের আমি আমার হাসবেন্ডকে ফোন করে ভাগ্নীকে নিয়ে একটা রেস্টুরেন্টে আসতে বলি লাঞ্চের জন্য, আমরা সেখানে ওয়েট করছিলাম। আমি ফোন দেওয়ার ১ ঘন্টার মধ্যে আমার হাসবেন্ড ভাগ্নিকে মলেস্ট করে ফেলে এবং তার ভুল হয়েছে স্বীকার করে। এক্ষেত্রে আমার কি সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত, আমি ইস্তেখারা করাতে চাচ্ছি। নিজে নিজে ইস্তেখারা করার মানসিক অবস্থা আমার নাই। আমার হাজবেন্ড ভবিষ্যতে ভালো হবে না বলেই আমার ধারণা। এক্ষেত্রে আমি কি এভাবেই তার সংসার করবো নাকি সন্তান জন্মের পর সেপারেট হবো আমি বুঝতেসিনা। আমাকে সাহায্য করবেন।

Answer

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।

প্রিয় বোন, আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল। আপনি যে পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন তা সহজ নয়। আল্লাহ তাআলা আপনার সবর ও ধৈর্যকে কবুল করুন এবং আপনার জন্য সর্বোত্তম ফয়সালা দিন। আমিন।

আপনার প্রশ্নের উত্তর ধাপে ধাপে দিচ্ছি:


১. স্বামীর গোপন বিয়ে ও অন্যান্য মেয়েদের সাথে সম্পর্ক

ইসলামে স্বামীর জন্য একাধিক বিবাহ বৈধ, তবে গোপন রাখা বা পরিবারকে না জানানো ইসলামী আদবের পরিপন্থী। তবে এটি সরাসরি তালাকের কারণ নয়। কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন:

"তোমরা নারীদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা দুই, তিন বা চারজনকে বিবাহ করো।" (সূরা নিসা: ৩)

তবে স্বামীর পরকীয়া বা অবৈধ সম্পর্ক (যিনা) সম্পূর্ণ হারাম। আল্লাহ তাআলা বলেন:

"তোমরা যিনার কাছেও যেয়ো না, নিশ্চয়ই তা অশ্লীল কাজ ও মন্দ পথ।" (সূরা বনী ইসরাইল: ৩২)

শারীরিক নির্যাতন ইসলামে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

"তোমরা নারীদেরকে মারধর করো না।" (সুনানে আবু দাউদ: ২১৪৬)

ইমাম ইবনে আবিদিন রহ. বলেন, স্ত্রীকে অকারণে প্রহার করা হারাম। (রাদ্দুল মুহতার: ৩/৫৬৭)


২. ভাগ্নিকে মলেস্ট করা — এটি একটি গুরুতর অপরাধ

আপনার স্বামী আপনার ভাগ্নিকে (যিনি তার জন্য মাহরাম নন) মলেস্ট করেছেন — এটি ইসলামে গুরুতর হারাম ও ফাহেশা কাজ। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

"তোমাদের কেউ যেন কোনো নারীর সাথে নির্জনে না থাকে, কেননা তাদের তৃতীয়জন হবে শয়তান।" (সুনানে তিরমিজি: ১১৭১)

এটি শুধু চরিত্রগত ব্যর্থতা নয়, বরং এটি একটি আইনগত অপরাধও। বাংলাদেশের আইনে শিশু/কিশোরী নির্যাতন দণ্ডনীয়।


৩. ইস্তেখারা সম্পর্কে

ইস্তেখারা করা সুন্নত। রাসূলুল্লাহ ﷺ সাহাবীদেরকে সব কাজে ইস্তেখারা করতে শিক্ষা দিতেন। (সহিহ বুখারি: ১১৬৬)

আপনি নিজে মানসিকভাবে প্রস্তুত না হলে কোনো বিশ্বস্ত আলেম বা বুযুর্গের মাধ্যমে ইস্তেখারা করাতে পারেন। তবে মনে রাখবেন — ইস্তেখারার ফলাফল স্বপ্নে নাও আসতে পারে; বরং আল্লাহ তাআলা আপনার অন্তরে যে দিকটি সহজ করে দেন বা যে বিষয়ে সন্তুষ্টি দেন, সেটিই ইস্তেখারার ফল।


৪. আপনার করণীয় — ইসলামী দৃষ্টিকোণ

ক) এখনই যা করবেন:

  1. ভাগ্নিকে রক্ষা করুন — তাকে আর কখনো আপনার স্বামীর সাথে একা রাখবেন না। এটি আপনার দ্বীনি ও নৈতিক দায়িত্ব।
  2. পরিবারকে জানান — বিশেষত আপনার ভাগ্নির মা-বাবাকে। এটি গোপন রাখা ভাগ্নির জন্য আরও বিপদের কারণ হতে পারে।
  3. আইনগত পদক্ষেপের কথা ভাবুন — শিশু/কিশোরী নির্যাতনের বিষয়ে বাংলাদেশের আইনে অভিযোগ করা যায়। এটি দ্বীনি দৃষ্টিতেও জালিমের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ।

খ) সংসার চালিয়ে যাওয়া না ভাঙা — ইসলামী দৃষ্টিকোণ:

ইসলামে তালাক শেষ উপায়। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

"আল্লাহর কাছে সবচেয়ে অপছন্দনীয় হালাল জিনিস হলো তালাক।" (সুনানে আবু দাউদ: ২১৭৮)

তবে যদি স্বামী বারবার যিনা/ফাহেশায় লিপ্ত হয়, শারীরিক নির্যাতন করে, এবং শিশু-কিশোরীকে মলেস্ট করে — তাহলে এ সংসার চালিয়ে যাওয়া আপনার দ্বীন, ইজ্জত ও সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে।

ইমাম ইবনে আবিদিন রহ. বলেন, স্বামী যদি স্ত্রীর উপর জুলুম করে এবং তার দ্বীন-ইজ্জত রক্ষা না করে, তাহলে স্ত্রীর জন্য বিচ্ছেদ চাওয়া বৈধ। (রাদ্দুল মুহতার: ৩/৫৬৭)

মুফতি মুহাম্মদ শফী রহ. (মা'আরিফুল কুরআনে) বলেন, স্বামীর চরিত্রহীনতা ও নির্যাতন স্ত্রীর জন্য তালাক চাওয়ার বৈধ কারণ।

গ) সন্তানের বিষয়:

সন্তান জন্মের পর সেপারেট হওয়ার চিন্তা — ইসলামে সন্তানের হক সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তবে সন্তানের সামনে এমন পিতার চরিত্র সন্তানের জন্যও ক্ষতিকর। ইসলামে সন্তানের লালন-পালন (হিদানা) মায়ের হক। (রাদ্দুল মুহতার: ৩/৫৬৬)


৫. ব্যবহারিক পরামর্শ

  1. এখনই কোনো বিশ্বস্ত আলেম/মুফতির সাথে সরাসরি পরামর্শ করুন
  2. ইস্তেখারা করুন।
  3. ভাগ্নির বিষয়ে পরিবারকে জানান — এটি গোপন রাখা যাবে না।
  4. নিরাপত্তা নিশ্চিত করুন — আপনার ও ভাগ্নির শারীরিক নিরাপত্তা প্রথম।
  5. আইনগত পরামর্শ নিন — শিশু নির্যাতনের বিষয়ে।
  6. সিদ্ধান্তে তাড়াহুড়ো করবেন না — তবে নিজের ও সন্তানের নিরাপত্তা বিসর্জন দেবেন না।

সারসংক্ষেপ

আপনার স্বামীর কাজ (ভাগ্নিকে মলেস্ট, বারবার পরকীয়া, শারীরিক নির্যাতন) ইসলামে গুরুতর হারাম ও জুলুম। আপনি যদি ধৈর্য ধরে সংসার চালাতে চান, তবে শর্ত হলো — সে তাওবা করবে, ভাগ্নি ও অন্যান্য নারী থেকে দূরে থাকবে, নির্যাতন বন্ধ করবে। কিন্তু যদি সে না বদলায়, তাহলে আপনার দ্বীন ও ইজ্জত রক্ষার জন্য বিচ্ছেদ ইসলামে বৈধ। তবে সিদ্ধান্তের আগে অবশ্যই একজন মুফতির সাথে সরাসরি পরামর্শ করুন এবং ইস্তেখারা করান।

আল্লাহ তাআলা আপনার জন্য সর্বোত্তম ফয়সালা করুন এবং আপনার সন্তানকে হেফাজত করুন। আমিন।


والله أعلم بالصواب


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.