কর কমিশনারের কার্যালয়ে চাকরি করা জায়েয হবে কি না ?

Business and Job · Hanafi

Question No: 7373
Questioner: Sohel Miah
Question Asked: 25 Oct 2026, 12:07 PM
Reviewed & Published: 25 Oct 2026, 06:35 PM
Views: 19
Tokens: 5,299
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

বর্তমানে কর কমিশনারের কার্যালয়ে বিভিন্ন পদে নিয়োগ হচ্ছে। 'প্রধান সহকারী' পদে কাজ করা কি বৈধ হবে কিনা? বাংলাদেশে কর আদায়ের ব্যবস্থা ইসলামিক বিধানের সাথে সাংঘর্ষিকতা বিবেচনায় নিয়ে কর সেক্টরটা কি জুলুম করছে কিনা এবং সেক্ষেত্রে প্রধান সহকারী এর পদে চাকরি করলে কি কি ঝুঁকি থাকতে পারে বিস্তারিত জানতে চাচ্ছি।

Answer

কর কমিশনারের কার্যালয়ে চাকরি: ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে বিস্তারিত বিশ্লেষণ

প্রশ্নের সারসংক্ষেপ: বাংলাদেশে কর কমিশনারের কার্যালয়ে 'প্রধান সহকারী' পদে চাকরি করা বৈধ হবে কি? কর আদায় ব্যবস্থা ইসলামি বিধানের সাথে সাংঘর্ষিক হলে তা জুলুম হিসেবে গণ্য হবে কি? এবং এ পদে চাকরি করলে কী কী ঝুঁকি থাকতে পারে?


১. মূল নীতি: হারাম কাজে সহযোগিতা নিষিদ্ধ

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:

"তোমরা নেক কাজ ও তাকওয়ায় পরস্পরকে সহযোগিতা করো, আর পাপ ও সীমালঙ্ঘনে সহযোগিতা করো না।" — (সূরা আল-মায়িদা: ২)

"তোমরা জুলুম করো না এবং জুলুমের শিকারও হয়ো না।" — (সূরা আল-বাকারা: ২৭৯)

ইমাম আলাউদ্দিন কাসানি (রহ.) বাদায়েউস সানায়ে-তে এবং ইবন আবিদিন (রহ.) রাদ্দুল মুহতার-এ (খণ্ড ৬, কিতাবুল হাযর ওয়াল ইবাহা) উল্লেখ করেন—কোনো কাজ স্বয়ং হারাম না হলেও যদি তা সরাসরি হারাম বা জুলুমের সহায়ক হয়, তবে তা নাজায়েজ। এটি ফিকহের সুপ্রতিষ্ঠিত কায়েদা: "হারামের দিকে নিয়ে যাওয়া الوسيلة-ও (মাধ্যম) হারাম।"


২. বাংলাদেশে কর ব্যবস্থা: ইসলামি দৃষ্টিকোণ

(ক) কর আরোপের অধিকার কার?

ইসলামি অর্থনীতিতে রাষ্ট্র কর্তৃক কর আরোপের বৈধতা নির্ভর করে কয়েকটি শর্তের উপর:

  1. প্রকৃত প্রয়োজন (হাজতে আসলিয়া): রাষ্ট্রের বৈধ ব্যয় নির্বাহের জন্য বায়তুল মালে ঘাটতি থাকলে ইসলামি ফিকহে 'যরিবা' (কর) আরোপের অনুমতি রয়েছে। ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.) কিতাবুল খারাজ-এ এবং ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর বর্ণনায় এ নীতি পাওয়া যায়।
  2. ন্যায়বিচার ও ভারসাম্য: ধনীদের উপর আনুপাতিক হারে, দরিদ্রদের উপর বোঝা না ফেলে।
  3. যাকাতের সাথে দ্বৈততা পরিহার: যাকাতের খাত ছাড়া অন্য খাতে ব্যয় হলে কর বৈধ; কিন্তু যাকাতের বাধ্যবাধকতার উপর অতিরিক্ত কর হলে তা সীমালঙ্ঘনের কাছাকাছি।

মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) তাঁর "ইসলাম আওর জাদিদ মাঈশত ও তিজারত" এবং ফাতাওয়া উসমানি (খণ্ড ২)-তে স্পষ্ট করেছেন—আধুনিক রাষ্ট্রে কর সম্পূর্ণ হারাম নয়; বরং রাষ্ট্রের বৈধ প্রয়োজনে ন্যায়সংগত কর ইসলামি দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য। তবে করের পদ্ধতি ও ব্যয়ের খাত যদি সুদ, ঘুষ, অপ্রয়োজনীয় বিলাস বা জুলুমে নিহিত হয়, তবে সেই অংশের দায় সংশ্লিষ্টদের উপর বর্তায়।

(খ) বাংলাদেশের কর ব্যবস্থায় সাংঘর্ষিক দিক

বাস্তবতায় কিছু বিষয় ইসলামি বিধানের সাথে সাংঘর্ষিক হতে পারে:

  • সুদভিত্তিক অর্থনীতির সাথে সম্পৃক্ততা: কর রাজস্ব ব্যাংকিং খাতে সুদ-নির্ভর প্রতিষ্ঠানের উপরও আরোপিত হয় এবং রাষ্ট্রীয় বাজেটে সুদ পরিশোধের বড় অংশ থাকে। এতে পরোক্ষ সহযোগিতার আশঙ্কা থাকে।
  • অন্যায় কর আরোপ: কখনো কখনো অপ্রয়োজনীয় বা অতিরিক্ত কর আরোপিত হয়, যা ফিকহে 'মাকস' (অন্যায় কর) হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "যে ব্যক্তি অন্যায় কর আদায়ে সহায়তা করে, সে জাহান্নামের আগুনে নিক্ষিপ্ত হবে" — (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং ২২৩৪৫; তবে হাদিসটি দুর্বল সনদে বর্ণিত, তবে অর্থটি সহিহ হাদিস দ্বারা সমর্থিত)।
  • ঘুষ ও দুর্নীতি: কর আদায়ের প্রক্রিয়ায় ঘুষ, চাপ, হয়রানি—এসব জুলুম। ইমাম তহাবি (রহ.) শরহে মাআনিল আসার-এ এবং ইমাম সারাখসি (রহ.) আল-মাবসুত-এ ঘুষ গ্রহণকে সুস্পষ্ট হারাম বলেছেন।

তবে সব কর-ই জুলুম নয়। রাষ্ট্রের বৈধ প্রশাসনিক ব্যয়, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রতিরক্ষা ইত্যাদির জন্য ন্যায়সংগত কর ইসলামি শাসনব্যবস্থাতেও ছিল (খারাজ, জিজিয়া, উশর)। তাই সামগ্রিকভাবে "কর সেক্টর = জুলুম" বলা অযৌক্তিক; বরং নির্দিষ্ট অন্যায় পদ্ধতি জুলুম।


৩. 'প্রধান সহকারী' পদে চাকরির হুকুম

(ক) পদটির প্রকৃতি

'প্রধান সহকারী' (Principal Assistant) মূলত একটি প্রশাসনিক/সহায়ক পদ—ফাইল প্রস্তুত, রেকর্ড সংরক্ষণ, চিঠিপত্র প্রেরণ, হিসাব সংরক্ষণ ইত্যাদি। সরাসরি কর নির্ধারণ বা আদায়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণের দায়িত্ব সাধারণত এই পদের উপর থাকে না; তবে কাজের ধরন অফিসভেদে ভিন্ন হতে পারে।

(খ) ফিকহি বিশ্লেষণ

ইবন আবিদিন (রহ.) রাদ্দুল মুহতার-এ (খণ্ড ৬, পৃ. ৩৯২) এবং ইমাম কাসানি বাদায়েউস সানায়ে-তে উল্লেখ করেন—যে কাজের মূল উদ্দেশ্য নিজেই হারাম নয়, বরং তা হারামের সাথে মিশ্রিত, সেখানে নিয়ত ও কাজের প্রকৃতি নির্ধারক।

মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) ইমদাদুল ফাতাওয়া-তে এবং মুফতি আশরাফ আলী থানবি (রহ.) বেহেশতি জেওর-এ (কিতাবুল হালাল ওয়াল হারাম অধ্যায়) স্পষ্ট করেছেন:

"যে চাকরির কাজ সরাসরি হারাম কাজ সম্পাদন বা তাতে সহায়তা করা নয়, বরং তা একটি বৈধ প্রশাসনিক সেবা—সে চাকরি নাজায়েজ নয়; তবে হারাম কাজে সহায়তা হলে তা নাজায়েজ।"

সুতরাং 'প্রধান সহকারী' পদে চাকরি মৌলিকভাবে নাজায়েজ নয়, যদি:

  1. কাজটি কেবল প্রশাসনিক/রেকর্ড সংরক্ষণ/সাধারণ সহায়তা হয়;
  2. সরাসরি অন্যায় কর আরোপ, ঘুষ আদায়, মিথ্যা রিপোর্ট তৈরি বা জুলুমে সহায়তা করতে না হয়;
  3. হারাম কাজে বাধ্য করা হলে অস্বীকার করার সুযোগ থাকে।

(গ) তবে সতর্কতার বিষয়

ফাতাওয়া আলমগিরি (খণ্ড ৩, কিতাবুল কারাহিয়াত)-এ উল্লেখ আছে—যুলুমের সরঞ্জাম বা দলিল প্রস্তুতকারীও যালিমের সহযোগী হিসেবে গুনাহগার হয়। তাই যদি পদটির দায়িত্বে থাকে:

  • মিথ্যা কর নির্ধারণের দলিল তৈরি করা,
  • ঘুষ বা অবৈধ আদায়ের রেকর্ড সংরক্ষণ,
  • হয়রানিমূলক নোটিশ প্রস্তুত করা,

তাহলে সেই নির্দিষ্ট কাজে সহযোগিতা নাজায়েজ হবে; যদিও পদটি সামগ্রিকভাবে নাজায়েজ নয়।


৪. সম্ভাব্য ঝুঁকিসমূহ

| ঝুঁকি | বিবরণ | ফিকহি ভিত্তি | |---|---|---| | হারামে সহযোগিতা | ঘুষ, মিথ্যা রিপোর্ট, অন্যায় কর আরোপে সহায়তা | সূরা মায়িদা: ২; রাদ্দুল মুহতার ৬/৩৯২ | | জুলুমে অংশগ্রহণ | করদাতার উপর অন্যায় চাপ সৃষ্টিতে সহায়তা | সূরা বাকারা: ২৭৯; ফাতাওয়া আলমগিরি ৩/৩২১ | | সুদি ব্যবস্থার পরোক্ষ সমর্থন | সুদভিত্তিক বাজেট প্রণয়নে সহায়তা | ফাতাওয়া উসমানি ২/৪৫০ | | ঘুষ গ্রহণ/প্রদান | অফিসে ঘুষের সংস্কৃতিতে জড়িয়ে পড়া | মুসনাদে আহমাদ; আল-মাবসুত | | মিথ্যা সাক্ষ্য/দলিল | ভুল তথ্য দিয়ে কর ফাঁকি বা চাপ | সূরা হুজুরাত: ৬; শরহে মাআনিল আসার | | নিয়তের ফাসাদ | বৈধ কাজও হারাম নিয়তে হারাম হয়ে যায় | বেহেশতি জেওর, হালাল-হারাম অধ্যায় |


৫. ব্যবহারিক পরামর্শ

  1. কাজের বিবরণ যাচাই করুন: চাকরির চুক্তিপত্র ও দায়িত্বের তালিকা দেখে নিশ্চিত হোন—সরাসরি কর নির্ধারণ/আদায়/ঘুষ সংশ্লিষ্ট কাজ আছে কি না।
  2. নিয়ত পরিশুদ্ধ রাখুন: বৈধ প্রশাসনিক সেবা হিসেবে কাজ করুন; অন্যায় কাজে বাধ্য করা হলে অস্বীকার করুন।
  3. সন্দেহ হলে পরিহার: যদি কাজের প্রকৃতি স্পষ্টভাবে হারামে সহায়ক হয়, তবে "সন্দেহজনক বিষয় থেকে দূরে থাকো" (তিরমিজি: ১২০৫) হাদিসের আলোকে অন্য চাকরি খোঁজা উত্তম।
  4. স্থানীয় মুফতির সাথে পরামর্শ: নির্দিষ্ট অফিস ও পদের প্রকৃতি জানিয়ে স্থানীয় নির্ভরযোগ্য মুফতির কাছে সরাসরি ফতোয়া নিন।

উপসংহার

'প্রধান সহকারী' পদে চাকরি মৌলিকভাবে নাজায়েজ নয়, যদি কাজটি কেবল বৈধ প্রশাসনিক সহায়তায় সীমাবদ্ধ থাকে এবং সরাসরি জুলুম, ঘুষ বা মিথ্যা দলিল প্রস্তুতিতে সহায়তা না করে। বাংলাদেশের কর ব্যবস্থা সম্পূর্ণ জুলুম নয়; বরং নির্দিষ্ট অন্যায় পদ্ধতি জুলুম। তবে কর সেক্টরে ঘুষ, হয়রানি ও সুদি বাজেটের সম্পৃক্ততার কারণে সতর্কতা অপরিহার্য। হারাম কাজে সহায়তা প্রমাণিত হলে সেই নির্দিষ্ট কাজ পরিহার করা ফরজ।


তথ্যসূত্র:

  • সূরা আল-মায়িদা: ২; সূরা আল-বাকারা: ২৭৯; সূরা হুজুরাত: ৬
  • ইবন আবিদিন, রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৬, কিতাবুল হাযর ওয়াল ইবাহা
  • ইমাম কাসানি, বাদায়েউস সানায়ে, কিতাবুল কারাহিয়াত
  • ফাতাওয়া আলমগিরি, খণ্ড ৩, কিতাবুল কারাহিয়াত
  • ইমাম সারাখসি, আল-মাবসুত
  • ইমাম তহাবি, শরহে মাআনিল আসার
  • ইমাম আবু ইউসুফ, কিতাবুল খারাজ
  • মুফতি মুহাম্মদ শফি, ইমদাদুল ফাতাওয়া
  • মুফতি তাকি উসমানি, ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ২
  • মুফতি আশরাফ আলী থানবি, বেহেশতি জেওর, হালাল-হারাম অধ্যায়
  • মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং ২২৩৪৫; তিরমিজি, হাদিস নং ১২০৫

আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে হালাল উপার্জন ও হারাম থেকে বেঁচে থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.