“বিয়ে করলে তুমি ওটা” এদ্বারা কি তালাক পতিত হবে?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
আমার প্রশ্ন হলো, এই কথার কারণে আমি পরবর্তীতে ওই মেয়েকে বিয়ে করলে বিয়ের পর কোনো তালাক কার্যকর হবে কি? এটি কি শর্তযুক্ত তালাক হিসেবে গণ্য হবে বিয়ের পরে?
২)একবার আমি তাকে বলেছিলাম যে,“বিয়ে হইলে না হয় ওটা (তালাক)।” ওটা বলতে তালাক বুঝিয়েছি। কিন্তু আমি উচ্চারণ করেনি।
প্রশ্ন: “বিয়ে হইলে না হয় ওটা”—এটা বলার কারণে কি বিয়ের পরে কোনো তালাক হবে?
৩) এসব বলার পরে আমি সেই মেয়েকে বিয়ে করেছি। এখন আমার বিবাহিত জীবন কি ঠিক আছে?
৪) এগুলা ছিল আমার হাসবেন্ড এর প্রশ্ন। আমি পুরনো ম্যাসেজ পড়তে যেয়ে এটা পাই। পরে আমিও ম্যাসেংজার এ ম্যাসেজ খুজতে থাকি। যে আমার হাসবেন্ড আমাকে এমন বলেছিল কিনা। আমি এভাবে ম্যাসেজ লিখে সার্চ দেই " বিয়ে হইলে না হয়", তার পর শুধু " ওটা" এসব শব্দ লিখে ম্যাসেজ খুজি। ম্যাসসেঞ্জার। ওয়াটসাপ এ। এভাবে খুজার কারনে কি কোনো সমস্যা হবে?
৫) আমাকে ১৮ নং এ অধিকার দেয়া হয়েছে। এখন আমি " বিয়ে হইলে না হয়", " ওটা", এসব শব্দ দিয়ে ম্যাসেজ খোঁজার সময় যদি মনে মনে কিছু বলে ফেলি, যেহেতু আমাকে অধিকার দেয়া হয়েছে। এখন প্রশ্ম এসব শব্দ দিয়ে খুজার সময় মনে মনে কিছু বললে ফেললে কি আমার এখন বিবাহিত জীবনে কোনো সমস্যা হবে?
৬) আশে পাশে কোনো দারুল ইফতা নাই। বিজ্ঞ মুফতি নাই। আপনাদের উত্তর এর উপর আমল করতে পারবো?
Answer
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।
জবাব
১. বিয়ের আগে “বিয়ে করলে তুমি ওটা” (এখানে ‘ওটা’ বলতে তালাক উদ্দেশ্য) বলা এবং অন্য শব্দ মনে না থাকা বিষয়ে বিধান:
উত্তর: বিয়ের পর এর দ্বারা কোনো তালাক কার্যকর হবে না এবং এটি কোনো শর্তযুক্ত তালাক (তা'লীকুত তালাক) হিসেবেও গণ্য হবে না।
- শরঈ কারণ: শরীয়তে তালাক কার্যকর হওয়ার জন্য মুখে স্পষ্ট 'তালাক' শব্দ অথবা ফিকহে স্বীকৃত সুনির্দিষ্ট কিনায়াহ (অস্পষ্ট কিন্তু প্রচলিত তালাকসূচক) শব্দ উচ্চারণ করা আবশ্যক। কেবল "ওটা" বা কোনো অস্পষ্ট সর্বনাম পদ ব্যবহার করে মনে মনে তালাক উদ্দেশ্য করলেও তা মুখে স্পষ্ট উচ্চারণ না হওয়া পর্যন্ত তালাক হয় না। এছাড়া অন্য কোনো শব্দ বলেছিলেন কিনা তা স্পষ্ট মনে না থাকা একটি "সন্দেহ" (شک), আর ফিকহের প্রতিষ্ঠিত নীতি হলো— "সন্দেহের কারণে সুনিশ্চিত বৈবাহিক সম্পর্ক বিচ্ছেদ হয় না" (اليقين لا يزول بالشك)।
কিতাব ও পৃষ্ঠা নম্বর:
- ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী: ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা: ২০৩–২০৪ (কিতাবুত তালাক, ১ম অনুচ্ছেদ); এবং ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৩৭৪–৩৭৫ (ফাসল ফিল কিনায়াত)।
- ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া: ১২তম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১৭৬ (বাবুল ইয়াকীন ওয়াশ শাক্ক); এবং ১৩তম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৭৬।
- কাওয়াইদুল ফিক্বহ: পৃষ্ঠা: ১২১–১২২ (কায়দা: আল-ইয়াকীনু লা ইযালু বিশ-শাক্ক)।
২. “বিয়ে হইলে না হয় ওটা” বলা প্রসঙ্গে বিধান:
উত্তর: না, এর কারণে বিয়ের পরে কোনো তালাক পতিত হবে না।
- শরঈ কারণ: এখানেও 'তালাক' শব্দ মুখে উচ্চারণ করা হয়নি। কেবল "ওটা" বলে মনে মনে তালাক ভাবলে বা নিয়ত করলে মুখে উচ্চারণ না হওয়া পর্যন্ত তা শরীয়তে তালাক হিসেবে ধর্তব্য হয় না।
কিতাব ও পৃষ্ঠা নম্বর:
- ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী: ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৩৫৪ (কিতাবুত তালাক)।
- আদ্দুররুল মুখতার / ফাতাওয়ায়ে শামী (রদ্দুল মুহতার): ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৪৫৮ (কিতাবুত তালাক, বাবুল কিনায়াত)।
- ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া: ১৩তম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৮৭।
৩. আপনাদের বিবাহিত জীবনের বর্তমান শরঈ অবস্থা:
উত্তর: আপনাদের বিবাহিত জীবন সম্পূর্ণ সহীহ, পবিত্র ও বহাল আছে।
- শরঈ কারণ: যেহেতু বিয়ের পূর্বে স্বামী কর্তৃক বলা ওই অস্পষ্ট কথাগুলোর কারণে কোনো শর্তযুক্ত তালাক (তা'লীক) বা তালাক কার্যকর হয়নি, তাই বিয়ের পর আপনারা শরীয়তসম্মত বৈধ স্বামী-স্ত্রী হিসেবে বসবাস করছেন। আপনাদের বিবাহিত জীবনে কোনো প্রকার ফিকহী ত্রুটি বা সমস্যা নেই।
কিতাব ও পৃষ্ঠা নম্বর:
- ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী: ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা: ২১–২২ (কিতাবুন নিকাহ)।
- দরসুল ফিকহ (১ম খণ্ড): পৃষ্ঠা: ২৬৯–২৭১।
৪. মেসেঞ্জারে বা হোয়াটসঅ্যাপে পুরাতন মেসেজ খোঁজা বা সার্চ করার হুকুম:
উত্তর: মেসেঞ্জারে বা হোয়াটসঅ্যাপে পুরাতন মেসেজ অনুসন্ধান করা বা "বিয়ে হইলে না হয়", "ওটা" লিখে সার্চ করার কারণে দাম্পত্য জীবনে কোনো প্রভাব পড়বে না বা কোনো সমস্যা হবে না।
- শরঈ কারণ: ডিজিটাল অ্যাপে পুরাতন চ্যাট সার্চ করা কেবল তথ্য অনুসন্ধান করা বা পড়া, এটি কোনো তালাক প্রদান বা গ্রহণ করা নয়।
কিতাব ও পৃষ্ঠা নম্বর:
- ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া: ১২তম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১৭৬।
- দরসুল ফিকহ (১ম খণ্ড): পৃষ্ঠা: ২৬৭ (ম্যাসেজ ও লেখার শরঈ বিধান)।
৫. ১৮ নম্বর ধারায় তাফবীযে তালাকের অধিকার থাকা অবস্থায় মেসেজ খোঁজার সময় মনে মনে কিছু বললে বিধান:
উত্তর: মনে মনে কিছু ভাবলে বা বললে আপনাদের বিবাহিত জীবনে বিন্দুমাত্র কোনো সমস্যা হবে না এবং কোনো তালাক হবে না।
- শরঈ কারণ:
- কাবিননামার ১৮ নম্বর ধারায় স্ত্রীকে তালাক গ্রহণের অধিকার (তাফবীযে তালাক) দেওয়া থাকলেও, তা প্রয়োগ করার জন্য স্ত্রীকে সশরীরে সুস্থ মস্তিষ্কে মুখে স্পষ্ট ভাষায় তালাক গ্রহণের সিদ্ধান্ত উচ্চারণ করতে হয়।
- মনে মনে কিছু চিন্তা করা বা ভাবা ফিকহের পরিভাষায় 'হাদীসে নফস' (মনস্তাত্ত্বিক চিন্তা)। হাদীস শরীফে এসেছে— রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "আল্লাহ তাআলা আমার উম্মতের অন্তরের কুচিন্তা বা ভাবনার বিষয় ক্ষমা করেছেন, যতক্ষণ না তা কাজে পরিণত করে বা মুখে উচ্চারণ করে।"
কিতাব ও পৃষ্ঠা নম্বর:
- সহীহ বুখারী: হাদীস নং: ২৫২৮; সহীহ মুসলিম: হাদীস নং: ১২৭।
- ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী: ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৩৮৮ (অধ্যায়: তাফবীযে তালাক)।
- ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া: ১৩তম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১৩৯ (বাবুত তাফবীয)।
- দরসুল ফিকহ (১ম খণ্ড): পৃষ্ঠা: ২৬৯–২৭১ (তাফবীযে তালাক ও কাবিননামা)।
৬. আশেপাশে বিজ্ঞ মুফতী/দারুল ইফতা না থাকায় এই উত্তরের ওপর আমল করার বিধান:
উত্তর: হ্যাঁ, আপনারা নিশ্চিন্তে ও নির্দ্বিধায় এই উত্তরের ওপর আমল করতে পারবেন।
- শরঈ কারণ: ফিকহে হানাফীর প্রামাণ্য কিতাবসমূহের (যেমন ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী, ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া, রদ্দুল মুহতার ইত্যাদি) শরঈ মূলনীতির আলোকে এই ফতোয়া প্রদান করা হয়েছে। যেহেতু আশেপাশে কোনো ফতোয়া বিভাগ বা মুফতী সাহেব নেই, তাই নির্ভরযোগ্য শরঈ সূত্রের ওপর ভিত্তি করে প্রদত্ত এই ফতোয়ার ওপর আমল করা সম্পূর্ণরূপে জায়েয ও সঠিক। আপনাদের মনে কোনো প্রকার শয়তানী ওয়াসওয়াসা (সন্দেহ বা ভয়) রাখার প্রয়োজন নেই।
কিতাব ও পৃষ্ঠা নম্বর:
- ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া: ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ২১৫–২১৬ (অধ্যায়: ইফতা ও তাকলীদ)।
- কাওয়াইদুল ফিক্বহ: পৃষ্ঠা: ১২৮–১২৯।
আল্লাহ ভালো জানেন।