হোটেলে স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে সই করলে কি বিবাহ হয়?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
২. উক্ত ঘটনার পর যদি ছেলে ও মেয়ের মধ্যে সহবাস সংঘটিত হয়, তাহলে সেই সহবাসের কারণে কি তাদের মধ্যে বিবাহ বৈধ বলে গণ্য হবে?
৩. যদি উল্লিখিত ঘটনার কয়েক দিন পর ছেলে মেয়েটিকে অনেকবার তালাক বিষয়ক কথা বলে, তাহলে সেই কথাগুলো কি শরিয়তের দৃষ্টিতে তালাক বা বিচ্ছেদ হিসেবে গণ্য হবে?
৪.সেই মেয়েকে আনুষ্ঠানিক ভাবে কি বিবাহ করার ক্ষেত্রে শরিয়তে কোন বাধা আছে?
আমার আশে পাশে কোন নির্ভরযোগ্য দারুল ইফতা বা পরিচিত কোন আলেম নেই।আপনাদের প্রদত্ত ফতওয়া অনুযায়ী আমল করতে হবে।
উপরোক্ত বিষয়গুলোর কুরআন-সুন্নাহ ও নির্ভরযোগ্য ফিকহি দলিলের আলোকে বিস্তারিত শরয়ি সমাধান জানালে উপকৃত হব।
Answer
ফতোয়া: হোটেলে স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে সই ও বিবাহের বিধান
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম আলহামদুলিল্লাহি রাব্বিল আলামিন, ওয়াস-সালাতু ওয়াস-সালামু আলা রাসূলিহিল কারিম, আম্মা বাদ:
ভূমিকা
প্রশ্নে উল্লিখিত বিষয়গুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর। ইসলামে বিবাহ একটি ইবাদত ও চুক্তি (আকদ), যা নির্দিষ্ট শর্ত ও রুকন ছাড়া সংঘটিত হয় না। নিচে প্রতিটি প্রশ্নের ধারাবাহিক উত্তর দেওয়া হলো।
১ম প্রশ্ন: শুধু কাগজে স্বামী-স্ত্রী পরিচয় লিখে ও সই করে ইজাব-কবুল ছাড়া কি বিবাহ সংঘটিত হয়েছে?
উত্তর: না, শরিয়তের দৃষ্টিতে তাদের মধ্যে বিবাহ সংঘটিত হয়নি।
দলিল ও ব্যাখ্যা:
ক) কুরআন: আল্লাহ তাআলা বলেন:
«وَأَخَذْنَ مِنكُم مِّيثَاقًا غَلِيظًا» "এবং তারা তোমাদের থেকে দৃঢ় অঙ্গীকার নিয়েছে।" (সূরা নিসা: ২১)
এবং ইজাব-কবুলের নির্দেশ:
«فَانكِحُوهُنَّ بِإِذْنِ أَهْلِهِنَّ» "তোমরা তাদেরকে তাদের অভিভাবকের অনুমতিক্রমে বিবাহ করো।" (সূরা নিসা: ২৫)
খ) হাদীস: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
«لَا نِكَاحَ إِلَّا بِوَلِيٍّ وَشَاهِدَيْ عَدْلٍ» "অভিভাবক ও দুইজন ন্যায়পরায়ণ সাক্ষী ছাড়া কোনো বিবাহ নেই।" (তিরমিজি: ১১০২, আবু দাউদ: ২০৮৫)
অন্য হাদীসে:
«إِنَّمَا النِّكَاحُ بِالْكَلَامِ» "নিশ্চয়ই বিবাহ হলো কথার (ইজাব-কবুলের) মাধ্যমে।" (মুসান্নাফ ইবনে আবি শাইবা)
গ) হানাফি ফিকহের মূলনীতি:
ইমাম আবু হানিফা, ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর সর্বসম্মত মত হলো—বিবাহের আকদ (চুক্তি) সংঘটিত হওয়ার জন্য ইজাব ও কবুল (প্রস্তাব ও গ্রহণ) শব্দে বা লিখিতভাবে স্পষ্টভাবে প্রকাশ করা আবশ্যক। শুধু কাগজে "স্বামী-স্ত্রী" লিখে দেওয়া বা সই করা ইজাব-কবুল হিসেবে গণ্য হবে না, কারণ:
- ইজাব-কবুল হলো আকদের রুকন (মূল স্তম্ভ)। এটি ছাড়া আকদ হয় না।
- কাগজে পরিচয় লিপিবদ্ধ করা কেবল তথ্য প্রদান বা ভুল বিবরণ, বিবাহের প্রস্তাব-গ্রহণ নয়।
- সাক্ষীদের উপস্থিতি সাক্ষ্য (শাহাদাত) হিসেবে গণ্য হতে পারে, কিন্তু ইজাব-কবুল ছাড়া সাক্ষ্য একা বিবাহ সংঘটিত করতে পারে না।
ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ বলেন:
"النكاح ينعقد بالإيجاب والقبول، ولا ينعقد بمجرد الكتابة أو الإشارة من غير لفظ يدل على الرضا" "বিবাহ ইজাব ও কবুল দ্বারা সংঘটিত হয়; কেবল লেখা বা ইশারা দ্বারা—যা সম্মতি প্রকাশ করে না—বিবাহ হয় না।" (রাদ্দুল মুহতার: ৩/৯)
ইমাম আল-হাসকাফি «আদ-দুররুল মুখতার»-এ বলেন:
"ينعقد النكاح بالإيجاب والقبول بلفظ الماضي أو الأمر" "বিবাহ ইজাব ও কবুল দ্বারা সংঘটিত হয়—অতীতকালীন বা আদেশসূচক শব্দে।"
মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) «ফাতাওয়া উসমানি»-তে বলেন:
"নিকাহর আকদ ছাড়া শুধু কাগজে স্বামী-স্ত্রী লেখা বা সই করা নিকাহ হিসেবে গণ্য হবে না।" (ফাতাওয়া উসমানি: ২/২৯৮)
সিদ্ধান্ত: যেহেতু প্রশ্নে স্পষ্ট বলা হয়েছে—মুখে কোনো ইজাব-কবুল করেনি (এটা নিশ্চিত), তাই শরিয়তের দৃষ্টিতে তাদের মধ্যে বিবাহ সংঘটিত হয়নি। তারা এখনও পরস্পর গায়রে মাহরাম (অবিবাহিত) হিসেবে গণ্য।
সতর্কতা: হোটেলে মিথ্যা পরিচয়ে স্বামী-স্ত্রী লেখা ও সই করা—এটি মিথ্যা, প্রতারণা ও গুনাহের কাজ। এটি শরিয়তসম্মত নয় এবং তাওবা করা আবশ্যক।
২য় প্রশ্ন: সহবাসের কারণে কি বিবাহ বৈধ বলে গণ্য হবে?
উত্তর: না, সহবাসের কারণে বিবাহ বৈধ হবে না। বরং এটি যিনা (ব্যভিচার) হিসেবে গণ্য হবে।
দলিল ও ব্যাখ্যা:
ক) কুরআন:
«وَلَا تَقْرَبُوا الزِّنَىٰ إِنَّهُ كَانَ فَاحِشَةً وَسَاءَ سَبِيلًا» "তোমরা যিনার নিকটবর্তী হয়ো না; নিশ্চয়ই তা অশ্লীল কাজ ও মন্দ পথ।" (সূরা ইসরা: ৩২)
খ) হাদীস: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
«الْوَلَدُ لِلْفِرَاشِ وَلِلْعَاهِرِ الْحَجَرُ» "সন্তান বিছানার (বিবাহের) অধিকারী, আর ব্যভিচারীর জন্য পাথর (বঞ্চনা)।" (বুখারি: ৬৭৪৯)
গ) হানাফি ফিকহের মূলনীতি:
ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ বলেন:
"الوطء لا يصير نكاحًا، بل هو زنا إذا لم يكن هناك عقد شرعي" "সহবাস বিবাহে পরিণত হয় না; বরং শরয়ি আকদ ছাড়া তা যিনা।" (রাদ্দুল মুহতার: ৩/২২)
ইমাম আল-মারগিনানি «আল-হিদায়া»-তে বলেন:
"النكاح لا يثبت بالوطء، بل الوطء في غير النكاح زنا" "সহবাস দ্বারা বিবাহ প্রমাণিত হয় না; বরং বিবাহ ছাড়া সহবাস যিনা।"
মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) «মাআরিফুল কুরআন»-এ বলেন:
"বিবাহ ছাড়া সহবাস কখনোই বিবাহের বৈধতা সৃষ্টি করে না; বরং তা কবিরা গুনাহ।"
সিদ্ধান্ত: সহবাসের কারণে বিবাহ বৈধ হবে না। এটি যিনা হিসেবে গণ্য হবে—যা কবিরা গুনাহ। উভয়কে তাওবা করতে হবে এবং ভবিষ্যতে শরয়ি পদ্ধতিতে বিবাহ করতে হবে।
গুরুত্বপূর্ণ: যদি এই সহবাস থেকে সন্তান জন্মগ্রহণ করে, তবে হানাফি মতে সন্তান মায়ের সাথে সম্পর্কিত হবে, কিন্তু পিতার সাথে নসব (বংশ) প্রমাণিত হবে না—যতক্ষণ না শরয়ি বিবাহ হয়।
৩য় প্রশ্ন: তালাক বিষয়ক কথাগুলো কি তালাক হিসেবে গণ্য হবে?
উত্তর: যেহেতু বিবাহই সংঘটিত হয়নি, তাই তালাকের কোনো অস্তিত্ব নেই। ঐ কথাগুলো তালাক হিসেবে গণ্য হবে না।
দলিল ও ব্যাখ্যা:
ক) হানাফি ফিকহের মূলনীতি:
ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ বলেন:
"الطلاق لا يقع إلا على نكاح صحيح أو فاسد" "তালাক কেবল সহিহ বা ফাসিদ বিবাহের উপর পতিত হয়।" (রাদ্দুল মুহতার: ৩/২৩২)
ইমাম আল-হাসকাফি «আদ-দুররুল মুখতার»-এ বলেন:
"الطلاق لا يقع إلا على منكوحة" "তালাক কেবল বিবাহিতা নারীর উপর পতিত হয়।"
খ) হাদীস: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
«لَا طَلَاقَ لِمَنْ لَا يَمْلِكُ» "যে মালিক নয়, তার তালাক নেই।" (তিরমিজি: ১১৮১)
গ) যেহেতু বিবাহই হয়নি:
- ছেলে মেয়েটির স্বামী নয়।
- মেয়েটি ছেলের স্ত্রী নয়।
- তাই তালাকের কথাগুলো আল-হাজল (ঠাট্টা) বা লাগো (অপ্রযোজ্য) হিসেবে গণ্য হবে।
- এতে কোনো তালাক বা বিচ্ছেদ সংঘটিত হবে না।
সিদ্ধান্ত: ঐ কথাগুলো শরিয়তের দৃষ্টিতে তালাক বা বিচ্ছেদ হিসেবে গণ্য হবে না। কারণ তালাকের পূর্বশর্ত হলো সহিহ বিবাহ—যা এখানে নেই।
৪র্থ প্রশ্ন: সেই মেয়েকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিবাহ করার ক্ষেত্রে শরিয়তে কোনো বাধা আছে কি?
উত্তর: শরিয়তে কোনো বাধা নেই, তবে কিছু শর্ত ও সতর্কতা রয়েছে।
শর্তসমূহ:
১. শরয়ি পদ্ধতিতে বিবাহ সম্পন্ন করতে হবে:
- ইজাব-কবুল স্পষ্টভাবে মুখে বা লিখিতভাবে (যেখানে উভয় পক্ষের সম্মতি প্রকাশ পায়)।
- দুইজন ন্যায়পরায়ণ মুসলিম সাক্ষী (পুরুষ হলে উত্তম; নারী হলে দুই পুরুষ বা এক পুরুষ ও দুই নারী)।
- মেয়ের অভিভাবক (ওয়ালি)-এর অনুমতি বা উপস্থিতি (হানাফি মতে প্রাপ্তবয়স্কা মেয়ে নিজে সম্মতি দিলেও ওয়ালির অনুমতি উত্তম ও প্রয়োজনীয়)।
২. তাওবা ও ইস্তেগফার:
- উভয়কে যিনার গুনাহ থেকে খাঁটি তাওবা করতে হবে।
- ভবিষ্যতে এমন কাজ থেকে বিরত থাকতে হবে।
৩. মিথ্যা ও প্রতারণা থেকে বিরত থাকা:
- হোটেলে মিথ্যা পরিচয় দেওয়া, কাগজে ভুল তথ্য লেখা—এসব থেকে তাওবা করতে হবে।
৪. ইদ্দতের বিধান: ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ বলেন:
"إذا وطئت المرأة بشبهة أو زنا، يجب عليها العدة" "যদি নারীকে শুভেচ্ছা বা যিনার মাধ্যমে সহবাস করা হয়, তবে তার উপর ইদ্দত ওয়াজিব।" (রাদ্দুল মুহতার: ৩/৫০৬)
সিদ্ধান্ত: শরিয়তে বাধা নেই, তবে ইদ্দত শেষ হওয়ার পর শরয়ি পদ্ধতিতে (ইজাব-কবুল, সাক্ষী, ওয়ালি, মোহর) বিবাহ করতে হবে। তাওবা করলে আল্লাহ ক্ষমাশীল।