বাসায় স্ত্রী ও বোনদের নিয়ে জামাতে ফরজ নামাজ আদায় করা যাবে কি? ত্রুটিপূর্ণ আকীদার ইমামের পিছনে জুমুআ জায়েজ কি? কুরআন ছুঁয়ে কসম করে বিয়ের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করলে করণীয় কী?

Family Life · Hanafi

Question No: 7321
Questioner: Al Amin Ahmed Mobin
Question Asked: 23 Oct 2026, 08:24 PM
Reviewed & Published: 23 Oct 2026, 08:42 PM
Views: 41
Tokens: 6,220
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

বাসায় স্ত্রী বোনদের নিয়ে জামায়াতে ফরজ সালাত আদায় করা যাবে কি? নিজে ইমাম হয়ে? আর কোনো মসজিদের ইমামের আকীদা যদি ত্রুটি থাকে (টাকার বিনিময়ে মুনাফিকদের জানাজা পড়া, দরবারী আলেম হলে) তার পিছনে জুমুআ আদায় করা কি জায়েজ হবে?
যদি কোনো লোক আল্লাহর নামে কসম করে নারীটিকে অবশ্যই বিয়ে করব বিনিময়ে দানও করব বলে চুক্তিবদ্ধ হয় পবিত্র কুরআন ছুয়ে।পাশাপাশি এটাও বলে এভাবে যদি প্রতিজ্ঞা না রাখি মুনাফিকদের সাথে আমাকে রাখিয়েন কিন্তু নারীটির অন্যত্র বিয়ে হয়ে যায় করা সম্ভব হয় না। এখন লোকটি কি করবে? ওয়াদা ভঙ করে কাফফারা দিয়ে আরেক নারীকে বিয়ে করবে না আল্লাহর সাথে করা চুক্তি করা দান আদায় করে মেয়েটার জন্য অপেক্ষা করবে ডিভোর্সী/বিধবা কখন হবে সে পর্যন্ত?

Answer

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।

জবাব

প্রশ্নটি তিনটি অংশে বিভক্ত। প্রতিটি অংশের বিস্তারিত ফিকহি উত্তর নিচে দেওয়া হলো।


১. বাসায় স্ত্রী ও বোনদের নিয়ে নিজে ইমাম হয়ে ফরয সালাত আদায় করার হুকুম:

উত্তর:

  • সালাতের স্থিতি: পুরুষদের জন্য পাঁচ ওয়াক্ত সালাত মসজিদে গিয়ে জামা'আতের সাথে আদায় করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও মাসনূন আমল। তবে কোনো বিশেষ ওজর, অসুস্থতা বা দূর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতিতে বাসায় নিজের স্ত্রী, বোন বা অন্য মাহরাম মহিলাদের নিয়ে পুরুষ নিজে ইমাম হয়ে জামা'আত করলে জামা'আতের সালাত আদায় হয়ে যাবে এবং তা সম্পূর্ণ সহীহ হবে।
  • কাতারের তারতীব (দাঁড়ানোর নিয়ম):
    1. ইমাম (পুরুষ) সামনে এককভাবে দাঁড়াবেন।
    2. স্ত্রী ও বোনদেরকে ইমামের সোজা পেছনে আলাদা কাতারে দাঁড়াতে হবে।
    3. মহিলারা যদি পুরুষ ইমামের সোজা পাশে বা একই কাতারে এসে দাঁড়ায়, তবে হানাফী ফিকহ অনুযায়ী পুরুষদের সালাত ফাসিদ (নষ্ট) হওয়ার শর'ঈ আশঙ্কা থাকে (মুহাযাতুন নিসা)। তাই মহিলারা অবশ্যই পেছনে আলাদা কাতারে দাঁড়াবে।

কিতাব ও পৃষ্ঠা নম্বর:

  • ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী: ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ২২৬–২২৭ (অধ্যায়: সালাত, ৫ম অনুচ্ছেদ: 'ইমাম ও মুক্তাদীর বিবরণ')।
  • ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া: ২২তম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৮৬–৮৮ (অধ্যায়: জামা'আত, 'মহিলাদের জামা'আতে অংশগ্রহণ' অনুচ্ছেদ)।
  • দরসুল ফিকহ (১ম খণ্ড): পৃষ্ঠা: ৪৮–৫২ ও পৃষ্ঠা: ১৪৩–১৪৪।

২. আকীদাগত ত্রুটি বা ফাসেক/বিদআতী ইমামের পেছনে জুমুআ আদায়ের হুকুম:

উত্তর:

  • সাধারণ ফাসেক/বিদআতী ইমামের হুকুম: কোনো ইমামের আকীদা বা আমলে যদি ফিসক, বিদআত বা দুনিয়াবী স্বার্থসিদ্ধি (যেমন টাকার বিনিময়ে লোকদেখানো জানাযা পড়া বা অসৎ উদ্দেশ্যে তোষামোদী করা) থাকে, তবে তাকে স্থায়ী ইমাম বানানো বা তার পেছনে সালাত পড়া মাকরূহে তাহরীমী।
  • জুমুআর সালাতের ক্ষেত্রে বিধান:
    1. যদি ওই এলাকায় বা কাছে অন্য কোনো সহীহ আকীদা ও সুন্নাত অনুসারী ইমামের জামে মসজিদ থাকে, তবে ফাসেক/বিদআতী ইমামকে এড়িয়ে অন্য মসজিদে গিয়ে জুমুআ আদায় করা উত্তম ও আবশ্যক।
    2. তবে যদি আশেপাশে আর কোনো জামে মসজিদ না থাকে এবং অন্য কোথাও জুমুআ পড়ার উপায় না থাকে, তবে জুমুআ বর্জন করা বা ঘরে যোহর পড়া জায়েয হবে না; বরং উক্ত ইমামের পেছনেই জুমুআর সালাত আদায় করে নিতে হবে। কারণ জামা'আত ও জুমুআ বর্জন করার গুনাহ আরও মারাত্মক।
  • আকীদা কুফরির পর্যায়ে পৌঁছালে: যদি কোনো ইমামের আকীদা স্পষ্ট কুফর বা শিরকের পর্যায়ে পৌঁছে যায় (যেমন আল্লাহর কোনো অপরিহার্য সিফাত বা দ্বীনের মৌলিক বিষয় অস্বীকার করা), তবে তার পেছনে কোনো নামায বা জুমুআ সহীহ হবে না।

কিতাব ও পৃষ্ঠা নম্বর:

  • ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া: ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৯৫–৯৯ (অধ্যায়: ইমামতি, 'ফাসেক ও বিদআতী ইমামের অনুচ্ছেদ'); এবং ৮ম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১৯৫–১৯৬ (অধ্যায়: সালাতুল জুমুআ)।
  • ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী: ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৮৪–৮৬ (অধ্যায়: সালাত, 'ইমামতির বিবরণ')।

৩. কসম ও মান্নতের পর মেয়েটির অন্যত্র বিয়ে হয়ে গেলে পুরুষের করণীয়:

উত্তর:

  1. কসম ভঙ্গ ও কাফফারা ওয়াজিব: কোনো লোক যদি কুরআন মজিদ ছুঁয়ে আল্লাহর নামে কসম করে বলে যে সে কোনো নির্দিষ্ট মেয়েকে বিয়ে করবে, কিন্তু পরবর্তীতে মেয়েটির অন্যত্র বিয়ে হয়ে যায়—তবে এখন সেই কসম পূরণ করা অসম্ভব এবং শরীয়তসম্মত নয় (কারণ অন্য অন্যের বিবাহিতা স্ত্রীকে বিয়ে করা হারাম)। শরীয়তের বিধান হলো, যখন কৃত কসম পূরণ করা অসম্ভব বা অবৈধ হয়ে দাঁড়ায়, তখন সেই কসম ভেঙে ফেলা ওয়াজিব এবং কসমের কাফফারা দেওয়া আবশ্যক।
  2. মেয়েটির জন্য অপেক্ষা করা যাবে না: মেয়েটি অন্য কারো বৈবাহিক বন্ধনে আবদ্ধ। সে কখন ডিভোর্সী বা বিধবা হবে সে পর্যন্ত তার জন্য অপেক্ষা করা শরীয়তে সম্পূর্ণ অযৌক্তিক ও অনর্থক। লোকটির উচিত অবিলম্বে কসমের কাফফারা আদায় করে অন্য কোনো দ্বীনদার নারীকে বিয়ে করে নেওয়া।
  3. কসমের কাফফারা আদায়ের পদ্ধতি:
    • ১০ জন মিসকীনকে দুই বেলা পেট পুরে মধ্যম মানের খাবার খাওয়ানো, অথবা
    • ১০ জন মিসকীনকে পূর্ণ পোশাক (সতর ঢাকার মতো) প্রদান করা।
    • যদি খাদ্য বা পোশাক দেওয়ার আর্থিক সামর্থ্য না থাকে, তবে ধারাবাহিক ৩ দিন রোযা রাখা।
  4. দান করার ওয়াদা/মান্নতের হুকুম: সে যে অর্থ দান করার ওয়াদা বা মান্নত করেছিল, সামর্থ্য অনুযায়ী কোনো গরীব-মিসকীন বা দ্বীনী খাতে তা দান করে দেওয়া উত্তম।
  5. অশুভ উক্তি থেকে তাওবা: "কসম না রাখলে মুনাফিকদের সাথে হাশর নিয়েন"—এ রূপ কথা বলা অত্যন্ত মারাত্মক ও গুনাহের কাজ। এর জন্য আল্লাহর দরবারে লজ্জিত হয়ে খাঁটি মনে তাওবা ও ইস্তিগফার (ক্ষমা প্রার্থনা) করতে হবে।

কিতাব ও পৃষ্ঠা নম্বর:

  • ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী: ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১৬৮–১৬৯ (অধ্যায়: কসম, ১ম ও ২য় অনুচ্ছেদ এবং 'কাফফারার বিবরণ')।
  • ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া: ১৩তম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৫২, ৯৪ এবং ১৪তম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৪১, ৫০,(অধ্যায়: আইমান ও কাফফারা)।
  • নূরুল ঈযাহ: বাংলা সংস্করণ, পৃষ্ঠা: ১২৮, ১৭৯ (অধ্যায়: কসম ও কাফফারা)।

আল্লাহ ভালো জানেন।

আল্লাহ তাআলা সবাইকে সহিহ বুঝ দান করুন এবং আমল করার তাওফিক দিন। আমিন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.