মেয়েরা কি মাহরাম সহ বাহিরে ঘুরতে যেতে পারবে এমন কোন পার্ক বা জায়গা যেখানে ছেলে মেয়ে একসাথে থাকে পরিপূর্ণ পর্দা করে
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
মেয়েরা কি মাহরাম সহ বাহিরে ঘুরতে যেতে পারবে এমন কোন পার্ক বা জায়গা যেখানে ছেলে মেয়ে একসাথে থাকে পরিপূর্ণ পর্দা করে। বা কোন বিয়ের অনুষ্ঠান অথবা ক্লাব যেখানে একই জায়গায় ছেলে মেয়ে থাকে। এমন কোন বিয়ের অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকা কি জায়েজ যেখানে ছেলে মেয়ে একই ফ্লোরে উপস্থিত থাকে ছেলে মেয়ে উভয় এর জন্য কতটুকু জায়েজ এটি?
আর একটি হলো কারো জন্মদিনের অনুষ্ঠানে দাওয়াত পেয়ে উপস্থিত হলে কি গুনা হবে?
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
সংক্ষিপ্ত উত্তর:
মাহরামের সঙ্গে ভ্রমণ বা বাইরে যাওয়া মূলত জায়েজ, তবে শর্ত হলো—পূর্ণ পর্দা, নিরাপত্তা, ফিতনার অনুপস্থিতি এবং এমন পরিবেশ না হওয়া যেখানে পুরুষ-নারীর অবাধ মেলামেশা (ইখতিলাত) হয়। যে পার্ক, রিসোর্ট, ক্লাব, বিয়ের হল বা অনুষ্ঠানে ছেলে-মেয়ে একসঙ্গে খোলামেলা মেশে, সেখানে নারীদের যাওয়া ইসলামে নিষিদ্ধ বা অন্ততপক্ষে মারাত্মক মাকরুহ। আর জন্মদিনের অনুষ্ঠান—বিশেষত যেখানে গান-বাজনা, বেপর্দা, মিশ্রণ থাকে—সেখানে উপস্থিত হওয়া গুনাহের কারণ হবে; দাওয়াত কবুল করা ওয়াজিব নয়, বরং অস্বীকার করাই কর্তব্য।
১. মাহরামসহ বাইরে ঘোরাঘুরি ও পার্ক/বিনোদনস্থল
ক. মূল নীতি
ইসলামে নারীর জন্য ঘরের বাইরে বের হওয়া নিষিদ্ধ নয়; প্রয়োজনে ও শর্ত রক্ষা করে বের হওয়া জায়েজ। কিন্তু বের হওয়ার অনুমতি শর্তসাপেক্ষ। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَقَرْنَ فِي بُيُوتِكُنَّ وَلَا تَبَرَّجْنَ تَبَرُّجَ الْجَاهِلِيَّةِ الْأُولَىٰ
“তোমরা নিজেদের ঘরে অবস্থান করো এবং পূর্বকালীন জাহেলিয়াতের মতো বেপর্দা প্রদর্শন করো না।”
(সূরা আহযাব: ৩৩)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
وَالْمَرْأَةُ عَوْرَةٌ، فَإِذَا خَرَجَتْ اسْتَشْرَفَهَا الشَّيْطَانُ
“নারী হলো সতর্কতার বিষয় (আওরাহ); সে যখন বের হয়, শয়তান তার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে।”
(তিরমিজি: ১১৭৩; মুসনাদে আহমাদ)
অর্থাৎ বের হওয়া নিষিদ্ধ নয়, কিন্তু ফিতনার আশঙ্কা থাকলে বের হওয়া নিষিদ্ধ হয়ে যায়।
খ. মাহরামের শর্ত
রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন:
لَا تُسَافِرِ الْمَرْأَةُ إِلَّا مَعَ ذِي مَحْرَمٍ
“কোনো নারী মাহরাম ছাড়া সফর করবে না।”
(বুখারি: ১৮৬২; মুসলিম: ১৩৩৯)
তবে শহরের ভেতরে স্বল্প দূরত্বে মাহরামসহ যাওয়া এবং পূর্ণ পর্দা রক্ষা করা—এটি ভিন্ন বিষয়। ফুকাহায়ে কেরাম বলেছেন, ফিতনার আশঙ্কা না থাকলে ও পর্দার শর্ত পূর্ণ হলে মাহরামসহ বাইরে যাওয়া জায়েজ। (রাদ্দুল মুহতার: ২/৫২৭; ইমদাদুল ফাতাওয়া: ২/৩৫৬)
গ. যে পার্ক/জায়গায় ছেলে-মেয়ে একসঙ্গে মেশে
আপনি যে ধরনের পার্ক বা জায়গার কথা বলেছেন—যেখানে ছেলে-মেয়ে একসঙ্গে থাকে, অবাধে চলাফেরা করে—সেখানে নারীর যাওয়া ইসলামে জায়েজ নয়। কারণ এটি ইখতিলাত (মিশ্রণ) ও খালওয়া (নির্জনতা) এবং ফিতনার পরিবেশ তৈরি করে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَلَا تَقْرَبُوا الزِّنَىٰ إِنَّهُ كَانَ فَاحِشَةً وَسَاءَ سَبِيلًا
“তোমরা ব্যভিচারের কাছেও যেয়ো না; নিশ্চয়ই তা অশ্লীল কাজ ও মন্দ পথ।”
(সূরা বনী ইসরাইল: ৩২)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
مَا تَرَكْتُ بَعْدِي فِتْنَةً أَضَرَّ عَلَى الرِّجَالِ مِنَ النِّسَاءِ
“আমি আমার পরে পুরুষদের জন্য নারীদের চেয়ে বেশি ক্ষতিকর কোনো ফিতনা রেখে যাইনি।”
(বুখারি: ৫০৯৬; মুসলিম: ২৭৪০)
ইমাম ইবনে আবিদিন রাহিমাহুল্লাহ বলেন, নারীর বাইরে যাওয়া তখনই বৈধ যখন ফিতনা থেকে সম্পূর্ণ নিরাপদ থাকে; অন্যথায় নিষিদ্ধ। (রাদ্দুল মুহতার: ২/৫২৭)
সারকথা: মাহরামসহ বাইরে যাওয়া যাবে, কিন্তু এমন পার্ক/রিসোর্ট/ক্লাবে যাওয়া যাবে না যেখানে পুরুষ-নারীর অবাধ মেলামেশা হয়। পূর্ণ পর্দা করলেও পরিবেশটি ফিতনাময় হলে সেখানে যাওয়া জায়েজ নয়।
২. বিয়ের অনুষ্ঠান ও ক্লাব—যেখানে ছেলে-মেয়ে একই ফ্লোরে
ক. বিয়ের অনুষ্ঠানে শরিয়তের নির্দেশনা
বিয়ে ইসলামে সুন্নত ও ইবাদত। কিন্তু বিয়ের অনুষ্ঠানেও শরিয়তের সীমা মানতে হবে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
أَعْلِنُوا النِّكَاحَ
“বিয়েের ঘোষণা দাও।”
(তিরমিজি: ১০৮৯)
কিন্তু একই সঙ্গে তিনি নিষেধ করেছেন:
كُلُّ لَهْوٍ حَرَامٌ إِلَّا لَهْوَ الرَّجُلِ بِفَرَسِهِ وَقَوْسِهِ
“প্রতিটি অপ্রয়োজনীয় খেলা হারাম, তবে ঘোড়া ও ধনুক নিয়ে খেলা ব্যতীত।”
(তিরমিজি: ১৬৩৭)
খ. মিশ্রণ ও বেপর্দা থাকলে
যে বিয়ের অনুষ্ঠানে ছেলে-মেয়ে একই ফ্লোরে অবাধে মেশে, পর্দা থাকে না, গান-বাজনা ও অশ্লীলতা থাকে—সেখানে নারীর উপস্থিত হওয়া জায়েজ নয়। ইমাম ইবনে আবিদিন রাহিমাহুল্লাহ বলেন, ওলিমার খানায় যদি মুনকার (শরিয়তবিরোধী) কাজ হয়, তবে সেখানে যাওয়া নিষিদ্ধ। (রাদ্দুল মুহতার: ৬/৩৪৭)
আশরাফ আলী থানভী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, যে অনুষ্ঠানে বেপর্দা ও মিশ্রণ থাকে, সেখানে নারী-পুরুষ উভয়ের জন্যই অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ; দাওয়াত কবুল করা ওয়াজিব নয়। (বেহেশতী জেওর, বেপর্দার অংশ; ইমদাদুল ফাতাওয়া: ২/৩৫৬)
গ. ছেলে-মেয়ে উভয়ের জন্য কতটুকু জায়েজ?
- পুরুষের জন্য: দৃষ্টি নিয়ন্ত্রণ করে, মিশ্রণ এড়িয়ে, শুধু বিয়ের আকদ ও শরিয়তসম্মত ওলিমায় অংশ নেওয়া যাবে। কিন্তু বেপর্দা ও মিশ্রণে অংশ নেওয়া হারাম।
- নারীর জন্য: পূর্ণ পর্দা, মাহরামসহ উপস্থিতি, মিশ্রণ এড়ানো—এসব শর্তে শরিয়তসম্মত ওলিমায় অংশ নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু একই ফ্লোরে ছেলে-মেয়ে মেশা, গান-বাজনা, বেপর্দা থাকলে যাওয়া জায়েজ নয়।
সারকথা: বিয়ের অনুষ্ঠান নিজে জায়েজ, কিন্তু যে অনুষ্ঠানে মিশ্রণ ও বেপর্দা আছে—সেখানে যাওয়া জায়েজ নয়; ছেলে-মেয়ে উভয়ের জন্যই।
৩. জন্মদিনের অনুষ্ঠানে দাওয়াত পেয়ে উপস্থিত হওয়া
ক. জন্মদিনের মূল বিধান
জন্মদিন উদযাপন ইসলামে সুস্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ; এটি অমুসলিমদের অনুকরণ ও বিদআত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
مَنْ تَشَبَّهَ بِقَوْمٍ فَهُوَ مِنْهُمْ
“যে ব্যক্তি কোনো সম্প্রদায়ের অনুকরণ করবে, সে তাদের অন্তর্ভুক্ত হবে।”
(আবু দাউদ: ৪০৩১)
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَ الَّذِينَ لَا يَعْلَمُونَ
“অজ্ঞদের প্রবৃত্তির অনুসরণ করো না।”
(সূরা জাসিয়াহ: ১৮)
খ. দাওয়াত কবুল করা
দাওয়াত কবুল করা ওয়াজিব নয়; বরং শরিয়তবিরোধী অনুষ্ঠানে দাওয়াত কবুল করা নিষিদ্ধ। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
مَنْ دُعِيَ إِلَى وَلِيمَةٍ فَلْيُجِبْ
“যাকে ওলিমার দাওয়াত দেওয়া হয়, সে যেন কবুল করে।”
(বুখারি: ৫১৭৩)
তবে এই নির্দেশ শরিয়তসম্মত অনুষ্ঠানের জন্য; হারাম বা বিদআতের অনুষ্ঠানের জন্য নয়। ইমাম ইবনে আবিদিন রাহিমাহুল্লাহ বলেন, যে অনুষ্ঠানে মুনকার কাজ হয়, সেখানে দাওয়াত কবুল করা জায়েজ নয়। (রাদ্দুল মুহতার: ৬/৩৪৭)
গ. গুনাহ হবে কি?
হ্যাঁ, জন্মদিনের অনুষ্ঠানে উপস্থিত হওয়া—বিশেষত যেখানে গান-বাজনা, বেপর্দা, মিশ্রণ, মোমবাতি নেভানো ইত্যাদি থাকে—সেখানে উপস্থিত হওয়া গুনাহের কারণ হবে। মুফতি মুহাম্মদ শফী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, বিদআত ও কুফর-শিরকের অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করা জায়েজ নয়। (মাআরিফুল কুরআন, সূরা জাসিয়াহর তাফসির)
সারকথা: জন্মদিনের অনুষ্ঠান ইসলামে নিষিদ্ধ; দাওয়াত কবুল করা ওয়াজিব নয়; বরং উপস্থিত হলে গুনাহ হবে। তবে যদি কেউ শুধু আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষার জন্য যায় এবং সেখানে কোনো হারাম কাজ না থাকে—তবুও জন্মদিনের অনুষ্ঠান হিসেবে অংশগ্রহণ করা বিদআত ও গুনাহ থেকে মুক্ত নয়।
সারসংক্ষেপ
| বিষয় | বিধান | |---|---| | মাহরামসহ বাইরে যাওয়া | শর্তসাপেক্ষে জায়েজ; ফিতনাময় পরিবেশ হলে নিষিদ্ধ | | মিশ্র পার্ক/ক্লাবে যাওয়া | জায়েজ নয় | | বিয়ের অনুষ্ঠান (মিশ্রণ ও বেপর্দা থাকলে) | জায়েজ নয়; ছেলে-মেয়ে উভয়ের জন্য | | জন্মদিনের অনুষ্ঠান | ইসলামে নিষিদ্ধ; দাওয়াত কবুল করা ওয়াজিব নয়; উপস্থিত হলে গুনাহ |
আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা
- পর্দা: নারীর জন্য পূর্ণ পর্দা (হিজাব ও নিকাব) ফরজ; বাইরে বের হলে মাহরামসহ, নিরাপদ পরিবেশে, ফিতনা থেকে দূরে থাকতে হবে।
- দৃষ্টি নিয়ন্ত্রণ: পুরুষ ও নারী উভয়ের জন্য দৃষ্টি নিয়ন্ত্রণ করা ফরজ। আল্লাহ তাআলা বলেন:
قُل لِّلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ
“মুমিনদের বলো, তারা তাদের দৃষ্টি সংযত করুক।” (সূরা নূর: ৩০) - মিশ্রণ এড়ানো: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
لَا يَخْلُوَنَّ رَجُلٌ بِامْرَأَةٍ إِلَّا مَعَ ذِي مَحْرَمٍ
“কোনো পুরুষ কোনো নারীর সঙ্গে নির্জনে থাকবে না, তবে মাহরাম থাকলে ভিন্ন কথা।” (বুখারি: ১৮৬২) - দাওয়াত: শরিয়তসম্মত অনুষ্ঠানে দাওয়াত কবুল করা সুন্নত; হারাম বা বিদআতের অনুষ্ঠানে দাওয়াত কবুল করা নিষিদ্ধ।
উপসংহার
মাহরামসহ বাইরে যাওয়া মূলত জায়েজ, কিন্তু শর্ত হলো—পূর্ণ পর্দা, নিরাপত্তা, ফিতনার অনুপস্থিতি এবং মিশ্রণমুক্ত পরিবেশ। যে পার্ক, ক্লাব, বিয়ের হল বা অনুষ্ঠানে ছেলে-মেয়ে একসঙ্গে অবাধে মেশে, সেখানে নারীর যাওয়া জায়েজ নয়; ছেলে-মেয়ে উভয়ের জন্যই এটি নিষিদ্ধ। আর জন্মদিনের অনুষ্ঠান ইসলামে নিষিদ্ধ; দাওয়াত কবুল করা ওয়াজিব নয়; বরং উপস্থিত হলে গুনাহ হবে। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে শরিয়তের সীমা রক্ষা করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
আরবি দোয়া
اللَّهُمَّ اهْدِنَا لِأَحْسَنِ الْأَخْلَاقِ وَالْأَعْمَالِ، وَاجْعَلْنَا مِنَ الْمُتَّقِينَ، وَاحْفَظْنَا مِنَ الْفِتَنِ مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَمَا بَطَنَ، بِرَحْمَتِكَ يَا أَرْحَمَ الرَّاحِمِينَ
“হে আল্লাহ! আমাদের সর্বোত্তম চরিত্র ও আমলের পথ দেখান, মুত্তাকীদের অন্তর্ভুক্ত করুন, প্রকাশ্য ও গোপন সব ফিতনা থেকে হেফাজত করুন, আপনার রহমতের واسيلة। আমিন।”
তথ্যসূত্র
- আল-কুরআনুল কারীম: সূরা আহযাব ৩৩, সূরা বনী ইসরাইল ৩২, সূরা নূর ৩০-৩১, সূরা জাসিয়াহ ১৮।
- সহিহ বুখারি: হাদিস ১৮৬২, ৫০৯৬, ৫১৭৩।
- সহিহ মুসলিম: হাদিস ১৩৩৯, ২৭৪০।
- সুনানে তিরমিজি: হাদিস ১০৮৯, ১১৭৩, ১৬৩৭।
- সুনানে আবু দাউদ: হাদিস ৪০৩১।
- ইমাম ইবনে আবিদিন, রাদ্দুল মুহতার: ২/৫২৭, ৬/৩৪৭।
- মুফতি মুহাম্মদ শফী, মাআরিফুল কুরআন: সূরা জাসিয়াহর তাফসির।
- আশরাফ আলী থানভী, বেহেশতী জেওর: বেপর্দার অংশ।
- ইমদাদুল ফাতাওয়া: ২/৩৫৬।
- ফাতাওয়া উসমানি: সংশ্লিষ্ট অধ্যায়।
আল্লাহ ভালো জানেন।