তাকবীরে তাশরিক জোরে বলা কি সাহাবায়ে কেরাম রা এর আমল দ্বারা প্রমাণিত?
Sunnah and Bid'ah · Hanafi
Question
এহইয়াউস সুনান বইয়ে দেখলাম, ইমাম আবু হানিফা রহ. ৯ও ১০ জিলহজ্জ জোরে জোরে তাকবির দিতেন ফরজ নামাজের পর তবে অন্যান্য বাকিরা অনুচ্চ আওয়াজে তাকবির দিতেন। কারণ জিকিরের সুন্নাহ হলো অনুচ্চ আওয়াজে জিকির করা।
তাই আমরা যে জোরে জোরে তাকবির দেই এটাকি সুন্নাহ সম্মত সাহাবায়ে কেরাম রা এর আমল দ্বারা প্রমাণিত?
Answer
উত্তর: তাকবীরে তাশরীক জোরে পড়া সুন্নাহ ও সাহাবায়ে কেরামের আমল দ্বারা প্রমাণিত
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহ।
আপনার প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। তাকবীরে তাশরীক (জিলহজ্জের ৯ তারিখ ফজর থেকে ১৩ তারিখ আসর পর্যন্ত ফরজ নামাজের পর তাকবীর বলা) হানাফী মতে পুরুষদের জন্য জোরে পড়া সুন্নাহ বা ওয়াজিব। নিম্নে দলিল ও ব্যাখ্যা পেশ করা হলো।
১. তাকবীরে তাশরীক জোরে পড়ার হাদীস ও সাহাবীদের আমল
রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন:
«زَيِّنُوا أَعْيَادَكُمْ بِالتَّكْبِيرِ»
“তোমাদের ঈদগুলোকে তাকবীর দ্বারা সাজাও।”
(মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা, হাদীস: ৫৮০০; বায়হাকী, শু‘আবুল ঈমান)
হযরত উমর (রা.) মিনায় অবস্থানকালে তাকবীর জোরে দিতেন, আর সাহাবীরাও তাঁর সাথে জোরে তাকবীর বলতেন।
(মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা, হাদীস: ৫৮০৩)
হযরত আলী (রা.) তাকবীরে তাশরীক জোরে পড়তেন।
(ইমাম ত্বহাবী, শারহু মা‘আনিল আসার, ৪/২৭৪)
হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) বলতেন:
«كَانَ النَّاسُ يُكَبِّرُونَ فِي أَيَّامِ التَّشْرِيقِ حَتَّى يَسْمَعَ أَهْلُ الْأَسْوَاقِ»
“লোকেরা তাশরীকের দিনগুলোতে এতো জোরে তাকবীর দিত যে বাজারের লোকেরাও শুনতে পেত।”
(মুস্তাদরাক হাকিম, ১/২৯৯)
২. হানাফী ফিকহের মূল অবস্থান
-
ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর মতে তাকবীরে তাশরীক জোরে পড়া ওয়াজিব।
(বাদায়েউস সানায়ে, ১/৪৫৮-৪৫৯) -
ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মাদ (রহ.)-এর মতে তা সুন্নাতে মুওয়াক্কাদা।
(আল-হিদায়া, ১/৮২; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/১৫০) -
সমস্ত হানাফী কিতাবে লেখা:
«يُسَنُّ رَفْعُ الصَّوْتِ بِالتَّكْبِيرِ فِي أَيَّامِ التَّشْرِيقِ»
“তাশরীকের দিনগুলো তাকবীর জোরে বলা সুন্নাত।”
(রদ্দুল মুহতার, ২/১৭৯; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/১৫০)
৩. ‘ইহইয়াউস সুনান’ গ্রন্থের বক্তব্য
আপনার উল্লেখিত ‘ইহইয়াউস সুনান’-এর বক্তব্যটি সম্ভবত ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর একটি ব্যক্তিগত তরীকা বা কিছু বিশেষ দিনের জন্য নির্দেশ করে।
- অধিকাংশ নির্ভরযোগ্য হানাফী সূত্র মতে, ইমাম আবু হানীফা (রহ.) জিলহজ্জের ৯, ১০, ১১, ১২ ও ১৩ তারিখ—সব দিনই ফরজ নামাজের পর তাকবীর জোরে পড়তেন।
- ইমাম ত্বহাবী (রহ.) তাঁর ‘শারহু মা‘আনিল আসার’ গ্রন্থে ইমাম আবু হানীফা থেকে স্পষ্টভাবে জোরে তাকবীর পড়ার উদ্ধৃতি দিয়েছেন।
(শারহু মা‘আনিল আসার, ৪/২৭৩)
তবে কিছু বর্ণনায় এসেছে যে, ইমাম সাহেব ৯ ও ১০ তারিখে জোরে এবং বাকি দিনগুলোতে নিচু স্বরে পড়তেন। কিন্তু এটি ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর মাযহাবের চূড়ান্ত ফতোয়া নয়; বরং পরবর্তী মুজতাহিদ ইমামগণ (ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মাদ) সাহাবায়ে কেরামের ব্যাপক আমলের ভিত্তিতে জোরে পড়াকেই প্রাধান্য দিয়েছেন এবং হানাফী মাযহাবের মূল অবস্থান এটিই।
৪. সুতরাং বর্তমান প্রচলিত জোরে তাকবীর দেওয়া সুন্নাহ সম্মত
- পুরুষদের জন্য ফরজ নামাজের পর তাকবীর জোরে পড়া সাহাবী ও তাবেঈনদের আমল, যা হাদীস দ্বারা প্রমাণিত।
- মহিলারা নিচু স্বরে পড়বেন।
(বাদায়েউস সানায়ে, ১/৪৫৯)
৫. সংক্ষিপ্ত জবাব
হ্যাঁ, জিলহজ্জের ৯ তারিখ ফজর থেকে ১৩ তারিখ আসর পর্যন্ত প্রত্যেক ফরজ নামাজের পর পুরুষের জন্য জোরে তাকবীর বলা সাহাবায়ে কেরামের আমল দ্বারা প্রমাণিত এবং হানাফী মাযহাবে সুন্নাতে মুওয়াক্কাদা বা ওয়াজিব। আপনি যে তাকবীর জোরে দেন তা সঠিক।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সুন্নাহ অনুযায়ী আমল করার তওফীক দান করুন। (আমীন)
রেফারেন্স সমূহ:
- রদ্দুল মুহতার, ২/১৭৯
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/১৫০
- বাদায়েউস সানায়ে, ১/৪৫৮-৪৫৯
- শারহু মা‘আনিল আসার, ৪/২৭৩-২৭৪
- মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা, হাদীস: ৫৮০০, ৫৮০৩