হারাম আয়ের পাশাপাশি হালাল আয়ও রয়েছে, আমরা পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা কি করতে পারি?
Business and Job · Hanafi
Question
সমস্ত কিছু বিবেচনায় কি করা যেতে পারে যাতে আল্লাহ্ তা'আলা খুশি হন, এবং পরিবারে ফিতনাহ ও না হয়।
Answer
উত্তর:
আল্লাহর নামে শুরু, যিনি পরম করুণাময়, অতি দয়ালু।
প্রথমেই আমরা কুরআন, হাদিস এবং হানাফি ফিকহের আলোকে বিষয়টি বিশ্লেষণ করছি।
১. হারাম উপার্জনের বিধান:
প্রশ্নে বর্ণিত ব্যক্তি বিদেশে এমন একটি রেস্তোরাঁয় শেফ হিসেবে কাজ করছেন যেখানে হারাম খাদ্য (যেমন শূকর, যবহকৃত না হওয়া গোশত ইত্যাদি) প্রস্তুত ও বিক্রি করা হয়। ইসলামে হারাম উপার্জন স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ। কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:
"তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভোগ করো না।" (সূরা বাকারা: ১৮৮)
হাদিসে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"যে ব্যক্তি হারাম উপার্জন করে, তার শরীরে হারাম খাদ্য যায়, তার দোয়া কবুল হয় না।" (মুসলিম)
হানাফি ফিকহের ইমামগণ (ইমাম আবু হানিফা, ইমাম আবু ইউসুফ, ইমাম মুহাম্মাদ) স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন:
হারাম কাজের মাধ্যমে উপার্জিত সম্পদ নিজের জন্য ব্যবহার করা জায়েয নয় এবং অন্যের জন্য তা দেওয়াও নিষিদ্ধ। (রদ্দুল মুহতার, ৪/৩০৩; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ৫/৩৪৪)
সুতরাং, উক্ত ব্যক্তির শেফ হিসেবে বেতন হারাম।
২. পরিবারের খরচে হারাম টাকা ব্যবহার:
পরিবারের সদস্যরা তার এই হারাম উপার্জন থেকে খাবার, পোশাক, ভ্রমণ ইত্যাদি খরচ করলে তা হারাম হবে। হাদিসে এসেছে:
"নিশ্চয় আল্লাহ তা'আলা পবিত্র এবং তিনি পবিত্র ছাড়া কিছু গ্রহণ করেন না।" (মুসলিম)
ইবনে আবিদীন (রহ.) বলেছেন:
"হারাম সম্পদ তার মালিকের জন্য ভোগ করা নিষিদ্ধ, এবং অপরের জন্য তা গ্রহণ করাও নিষিদ্ধ।" (রদ্দুল মুহতার, ৪/৩০৩)
তবে যদি ব্যক্তির হালাল উপার্জনও থাকে এবং তা পৃথক করা সম্ভব হয়, তাহলে শুধুমাত্র হালল অংশ গ্রহণ করা জায়েয। কিন্তু যেহেতু প্রশ্নে স্পষ্ট নয়, তাই ধরে নিতে হবে প্রধান উৎস হারাম।
৩. ব্যবসায় হারাম টাকা ব্যবহার:
যদি তিনি তার হারাম বেতনের টাকা দেশের হালাল ব্যবসায় (ভাড়া, চলতি খরচ) ব্যবহার করেন, তাহলে সেই ব্যবসার মুনাফা হারাম হবে না,যদিও মূলধন হারাম। প্রশ্নের বিবরণমতে যেহেতু ব্যবসায় হারাম মূলধন ইনভেস্ট করা হয়নি, তাই ব্যবসার ইনকাম হারাম হবে না।
৪. পরিবারে ফিতনা এড়ানোর পরামর্শ:
আপনার উদ্বেগ সঠিক যে, সরাসরি নিষেধ করলে পারিবারিক কলহ হতে পারে। তবে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য নিম্নোক্ত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি:
ক. তাকে নসীহত করুন:
সরাসরি নিন্দা না করে ইসলামী দৃষ্টিতে উপার্জনের পবিত্রতা বোঝান। কুরআনে আল্লাহ বলেছেন:
"আর যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন এবং তাকে এমন উৎস থেকে রিজিক দেন যার কল্পনাও সে করে না।" (সূরা তালাক: ২-৩)
তাকে হালাল চাকরি খুঁজতে উৎসাহিত করুন।
খ. হারাম টাকা গ্রহণ না করার চেষ্টা করুন:
পরিবারের সদস্যরা যদি তার দেওয়া হারাম টাকা গ্রহণ করেন, তবে তা ফিতনা ডেকে আনবে। আপনি নিজে এবং পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা শুধুমাত্র তার হালাল উপার্জন (যদি থাকে) গ্রহণ করুন। যদি হালাল না থাকে, তবে তাকে বলুন যে তার উপার্জন পরিবারের জন্য ব্যবহার করা জায়েয নয়।
গ. হারাম টাকার সদকা:
যদি তিনি এই হারাম টাকা ফেরত দিতে না পারেন (কারণ মালিক অজ্ঞাত), তাহলে তা গরিব-মিসকিনকে সদকা করে দেওয়া উচিত, নিজে ব্যবহার না করে। ইমাম আবু হানিফা (রহ.) বলেছেন:
"হারাম সম্পদের মালিক না পাওয়া গেলে তা সদকা করে দেওয়া ওয়াজিব।" (কিতাবুল আসল, ৩/২১৭)
ঘ. ব্যবসার অংশ আলাদা করুন:
দেশের ব্যবসায় তার হারাম টাকা আসলে, আপনি আপনার অংশ আলাদা করে নিন এবং তাকে বুঝিয়ে বলুন যেন ব্যবসায় হারাম টাকা না মেশায়।
৫. চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত:
- পরিবারের খরচে হারাম টাকা ব্যবহার করা জায়েয নয়।
- ব্যবসায় হারাম টাকা মেশালে পুরো ব্যবসা দূষিত হবে।
- তাকে হালাল চাকরি খুঁজতে উৎসাহিত করুন এবং পরিবারে ফিতনা এড়াতে ধৈর্য ও প্রজ্ঞার সাথে কাজ করুন।
- আল্লাহর কাছে দোয়া করুন, তিনি হালাল রিজিকের পথ দেখাবেন।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে হালাল উপার্জনের তাওফিক দিন। আমীন।
সূত্র:
- ফাতাওয়া উসমানি, ১০/১০২
- রদ্দুল মুহতার, ৪/৩০৩
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ৫/৩৪৪
- ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৪/২৫০
- বাহিশতি জেওর, অংশ ৩, অধ্যায় ৪
- মাআরিফুল কুরআন, সূরা বাকারা, আয়াত ১৮৮