কুরবানি দিবো না ঋণ পরিশোধ করবো?
Sunnah and Bid'ah · Hanafi
Question
আমার বাবা আল্লাহর কাছে চলে গেছেন,২০২২ সালে।সেবার আমরা কোরবান দেয়নি কারণ আমাদের চলার মতই কোনো অর্থ ছিলোনা।
আমার আব্বুর প্রায় ৩০ লক্ষ টাকার লোন ছিলো।আমরা আমাদের ২০ লক্ষ টাকার সঞ্চয়পত্র ভেংগে সেটা পরিশোধ করে দিয়েছি।যা আমাদের জমানো একমাত্র সম্পদ ছিলো।বাকি ১০ লক্ষ টাকা আব্বুর পেনশন থেকে প্রতিমাসে কেটে নেয়। আজ চার বছর ধরে এভাবে চলছে এখন প্রায় ৮ লক্ষ টাকা আছে। এই প্রসেস এই শোধ চলছে।
এখন আব্বুর পেনশন আম্মু পায়।এরপর ভাইয়ের বিয়ে + বাচ্চা হওয়ার সময় প্রায় ১লক্ষ ঋণ হয়েছে।সেগুলাও প্রতিমাসে ধার শোধ করছি অল্প অল্প করে।কেউ তাড়া দেয়না,যাকে যেভাবে যখন পারি শোধ করে দিচ্ছি। ভাইয়ার ইনকাম অল্প,আর বাড়ি ভাড়া থেকে শোধ করছি।
আমাদের মাস শেষে সেভিংস ৫ হাজার করে যেটা একাউন্টে জমাচ্ছে আমার বিয়ের জন্য এখন ৩০হাজার আছে আর স্বর্ণ ৩ ভরি মত আছে।এই হলো বিস্তারিত।
আব্বুর পেনশন এর সাথে কোরবানির জন্যেও টাকা দেয়। পেনশন এর টাকা থেকে লোন শোধ হয়, আর কোরবানির টাকা দিয়ে আম্মু কোরবানি দেয় ২০২৩। আম্মুর পক্ষ থেকে।
এমতাবস্থায় আম্মুর ওপর কি কোরবান ওয়াজিব? নাকি কোরবানির টাকা গুলো দিয়েও ঋণ শোধ করা উচিত? এই যে বিগত ৩ বছর আম্মু একটা ছাগল কোরবানি দিলো এটা কি ভুল হয়েছে?
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রশ্নে বর্ণিত পরিস্থিতি অনুযায়ী আপনার আম্মুর ওপর কুরবানী ওয়াজিব হওয়ার শর্ত পাওয়া যাচ্ছে না। নিম্নে এর বিস্তারিত দলীল-ভিত্তিক উত্তর দেওয়া হলো।
১. কুরবানী ওয়াজিব হওয়ার শর্ত (হানাফি মতে)
হানাফি ফিকহ অনুসারে, কুরবানী ওয়াজিব হওয়ার জন্য নিম্নোক্ত শর্তগুলো থাকা জরুরি:
- মুসলিম হওয়া।
- আকিল (বুদ্ধিসম্পন্ন) ও বালেগ (প্রাপ্তবয়স্ক) হওয়া।
- মুকিম হওয়া (মুসাফির না হওয়া)।
- নেসাবের মালিক হওয়া:
২. কোন সম্পদ কি পরিমাণ জমা থাকলে যাকাত এবং কুরবানী ও সদকায়ে ফিতির ওয়াজিব হবে?
মাল দুই প্রকার যথা, মালে নামী(বাড়ন্ত মাল) এবং মালে গায়রে নামী(অবান্তর মাল)
মালে নামী: যাকাত ফরয হওয়ার জন্য নিসাবের পরিমাণ সম্পদ হলো:
- সোনা: ৮৭.৪৮ গ্রাম (সাড়ে সাত ভরি)
- রূপা: ৬১২.৩৬ গ্রাম (সাড়ে বায়ান্ন ভরি)
- নগদ টাকা বা ব্যবাসায়িক পণ্য: উপরোক্ত দুইয়ের সর্বনিম্নটি তথা রূপার নেসাব সমপরিমাণ বর্তমান বাজারমূল্যের নগদ টাকা বা ব্যবসায়িক পণ্য।
- সম্মিলিত নেসাব যদি কারো কাছে স্বর্ণ এবং রূপা বা নগদ টাকা থাকে, তবে কোনোটিরই নেসাব পরিপূর্ণ না থাকে, তাহলে সবকিছু মিলিত করে রূপার নেসাব পরিমাণ টাকা হয়ে গেলেই যাকাত ফরয হবে। উক্ত সবগুলো সম্পদকে মালে নামী হিসেবে বিবেচনা করা হবে এগুলো কারো কাছে থাকলে যাকাত ফরয হবে। এবং সাথে সাথে কুরবানি ও সদকায়ে ফিতির ও ওয়াজিব হবে।
মালে গায়রে নামী: প্রয়োজন অতিরিক্ত ঘরের আসবাবপত্র, এক বৎসরের খোরাকির অতিরিক্ত জমি, প্রয়োজন অতিরিক্ত গাড়ী, বাড়ী ইত্যাদি, যদি রূপার নেসাব তথা ৫২.৫ ভড়ি রূপার মূল্যর সমপরিমাণ বা অতিরিক্ত হয়, তাহলে কুরবানি এবং সদকায়ে ফিতির ওয়াজিব হবে।
মৌলিক প্রয়োজন বলতে নিজ ও পরিবারের এক বছরের খোরপোশ, বাসস্থান, পোশাক, স্বামী-স্ত্রীর প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র, এবং বিদ্যমান ঋণ বোঝানো হয়।
২. আপনার আম্মুর বর্তমান আর্থিক অবস্থার বিশ্লেষণ
-
ঋণের বোঝা:
- আব্বুর রেখে যাওয়া প্রায় ২৭ লক্ষ টাকা লোন (মোট ৩০ লক্ষের মধ্যে ২০ লক্ষ সঞ্চয়পত্র ভেঙে দেওয়া হয়েছে, বাকি ১০ লক্ষ পেনশন থেকে কাটা হচ্ছে – বর্তমানে প্রায় ৮ লক্ষ বাকি)।
- ভাইয়ের বিয়ে ও সন্তানের খরচের জন্য প্রায় ১ লক্ষ টাকা ঋণ।
মোট ঋণ প্রায় ৯ লক্ষ টাকা (৮+১)।
-
নিজস্ব সম্পদ:
- আম্মুর ব্যক্তিগত কোনো সঞ্চয় নেই। তার প্রাপ্ত পেনশনের পুরো টাকা ঋণ পরিশোধ ও সংসারের মৌলিক চাহিদায় ব্যয় হচ্ছে।
- আপনার বিয়ের জন্য জমানো ৩০ হাজার টাকা ও ৩ ভরি স্বর্ণ আপনার সম্পদ, আম্মুর নয়।
যেহেতু আপনার সম্পদ তাই আপনার উপর কুরবানি ওয়াজিব হবে। আপনার মায়ের উপর কুরবানি ওয়াজিব হবে না।
-
আয়:
- আপনার আব্বুর পেনশন আম্মু পান। এই পেনশন থেকে ঋণ কাটা হয়, বাকি টাকা সংসারের খরচে চলে যায়। পেনশনের পাশাপাশি পৃথকভাবে কুরবানী বাবদ কিছু টাকাও দেওয়া হয়, যা দিয়ে আপনার আম্মু গত তিন বছর যাবৎ কুরবানী দিচ্ছেন।
৩. কুরবানী ওয়াজিব কি না?
আপনার আম্মুর নিকট নেসাব পরিমাণ সম্পদ নেই। কারণ:
- তার সমস্ত আয় ঋণ পরিশোধ ও মৌলিক প্রয়োজনে বিলীন হচ্ছে।
- ব্যাংক বা অন্য কোথাও তার নামে কোনো সঞ্চয় বা নেসাব-পরিমাণ নগদ অর্থ নেই।
- আপনার বিয়ের জমানো টাকা ও স্বর্ণ তার সম্পদ নয়।
তাই তাঁর ওপর কুরবানী ওয়াজিব নয়। হ্যা, আপনার এই সম্পদ যেহেতু ৫২.৫ ভড়ি রূপা সমপরিমাণ হয়ে যায়, তাই আপনার উপর কুরবানি ওয়াজিব। (সূত্র: ফাতাওয়া দারুল উলুম দেওবন্দ, কিতাবুল কুরবানী; ফাতাওয়া উসমানী, ২/৪৪৫)
৪. কুরবানীর টাকা দিয়ে ঋণ শোধ করা উচিত ছিল কি?
আপনাদেরকে কুরবানি দেওয়ার জন্য টাকা দেওয়া হচ্ছে, যা আপনাদের জন্য নফল, কিন্তু ঋণ পরিশোধ আপনাদের জন্য ওয়াজিব। তাই আপনারা ঋণ পরিশোধ করবেন। (সূত্র: ইমদাদুল ফাতাওয়া, ২/২২৫; ফাতাওয়া দারুল উলুম, ৮/৩৭৪)
৬. সারসংক্ষেপ ও নির্দেশনা
| বিষয় | ফয়সালা | |------|--------| | আম্মুর ওপর কুরবানী ওয়াজিব? | না, ওয়াজিব নয়। কারণ নেসাব নেই। | | কুরবানীর টাকা দিয়ে ঋণ শোধ করাই কর্তব্য? | হ্যাঁ, উত্তম হলো আগে ঋণ শোধ করা। তবে নফল কুরবানী করাও জায়েজ। | | গত ৩ বছরের কুরবানী কি ঠিক ছিল? | হ্যাঁ, নফল হিসেবে ঠিক ছিল, কিন্তু ঋণগ্রস্ত অবস্থায় তা উত্তম নয়। তবে গুনাহ হয়নি। |
পরামর্শ:
- আম্মু যেন আগে ঋণ পরিশোধে মনোযোগী হন।
- কুরবানীর বাবদ যে টাকা আসে, তা ঋণ শোধে ব্যবহার করলে বেশি সওয়াব হবে ইনশাআল্লাহ।
- যদি কুরবানী দিতেই ইচ্ছা হয়, তবে ছাগলের চেয়ে কম মূল্যের পশু বা অংশীদারিত্বের মাধ্যমে কুরবানী করতে পারেন (গরু/মহিষে ৭ ভাগের ১ ভাগ) যাতে বেশি খরচ না হয়।
আল্লাহ তাআলা আপনাদের সবাইকে হালাল উপার্জন ও ঋণমুক্ত জীবনের তাওফীক দিন। আমীন।
তথ্যসূত্র:
- রদ্দুল মুহতার (৬/৩২৫)
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া (৫/২৯২)
- ফাতাওয়া উসমানী (২/৪৪০-৪৪৫)
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (২/২২৫)
- বাহিশতি জেওর (কুরবানী অধ্যায়)