কেয়ামতের দিন কি আলেমদের বিচার পর্দার আড়ালে হবে?
Sunnah and Bid'ah · Hanafi
Question
অনেকের মুখে বলতে শুনি কেয়ামতের দিন আল্লাহ তায়ালা আলেমদের বিচার পর্দার আড়ালে করবে এরকম কি কোন কিছু আছে কিনা হাদিস যদি মেহেরবানী করে বলতেন।
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। কেয়ামতের দিন আলেমদের বিচার পর্দার আড়ালে হবে—এই বিষয়টি নিয়ে অনেকের মধ্যে আলোচনা প্রচলিত আছে। ইসলামী উৎসগুলোতে এর সত্যতা যাচাই করা জরুরি।
উত্তর:
কেয়ামতের দিন আলেমদের বিচার পর্দার আড়ালে হবে—এমন কোনো সহিহ (বিশুদ্ধ) হাদিস আমার জানামতে নেই। তবে এর সাথে সম্পর্কিত কিছু গুরুত্বপূর্ণ হাদিস ও আছার (সাহাবী ও তাবেয়ীদের উক্তি) রয়েছে, যা থেকে বিষয়টি বোঝা যায়।
১. সাধারণ মানুষের আগে আলেমদের বিচার:
হাদিসে এসেছে, কেয়ামতের দিন সর্বপ্রথম সেই ব্যক্তির বিচার করা হবে, যে জ্ঞান অর্জন করেছিল এবং অপরকে শিক্ষা দিয়েছিল এবং কুরআন পাঠ করেছিল। তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে, কারণ সে এসব করেছিল মানুষের প্রশংসা লাভের জন্য, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নয়। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৯০৫)
২. পর্দার আড়ালে বিচার সম্পর্কে যা পাওয়া যায়:
কিছু বর্ণনায় এসেছে, কেয়ামতের দিন কিছু মানুষের সাথে আল্লাহ তায়ালা এমনভাবে কথা বলবেন যে, অন্য কেউ তা দেখতে বা শুনতে পাবে না। এটি তাদের জন্য সম্মানের বিষয় হবে। যেমন হাদিসে এসেছে:
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِنَّ اللَّهَ يُدْنِي الْمُؤْمِنَ فَيَضَعُ عَلَيْهِ كَنَفَهُ وَيَسْتُرُهُ فَيَقُولُ أَتَعْرِفُ ذَنْبَ كَذَا أَتَعْرِفُ ذَنْبَ كَذَا فَيَقُولُ نَعَمْ يَا رَبِّ حَتَّى إِذَا قَرَّرَهُ بِذُنُوبِهِ وَرَأَى فِي نَفْسِهِ أَنَّهُ هَلَكَ قَالَ سَتَرْتُهَا عَلَيْكَ فِي الدُّنْيَا وَأَنَا أَغْفِرُهَا لَكَ الْيَوْمَ
"আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: আল্লাহ তায়ালা মুমিন বান্দাকে নিকটে আনবেন, তার উপর তাঁর (আল্লাহর) আবরণ চাপিয়ে দেবেন এবং তাকে (পর্দার আড়ালে) লুকিয়ে রাখবেন। তারপর বলবেন, তুমি কি অমুক গুনাহ চিনতে পারছ? তুমি কি অমুক গুনাহ চিনতে পারছ? সে বলবে, হ্যাঁ, হে আমার রব! অবশেষে যখন সে তার সব গুনাহ স্বীকার করবে এবং মনে করবে সে ধ্বংস হয়ে গেছে, তখন আল্লাহ বলবেন, আমি দুনিয়াতে তোমার উপর তা গোপন রেখেছিলাম এবং আজ তোমাকে তা ক্ষমা করে দিলাম।" (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৪৪১; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৭৬৮)
এই হাদিসটি সাধারণ মুমিনদের সম্পর্কে, বিশেষভাবে আলেমদের সম্পর্কে নয়। তবে আলেমরাও মুমিন, তাই তাদের ক্ষেত্রেও এটি প্রযোজ্য হতে পারে।
৩. আলেমদের সম্পর্কে বিশেষ বর্ণনা:
কিছু বর্ণনায় এসেছে, আলেমদেরকে পর্দার আড়ালে বিচার করা হবে। যেমন একটি বর্ণনায় আছে:
يُحْشَرُ الْعُلَمَاءُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ فَيُقَالُ لَهُمْ ادْخُلُوا الْجَنَّةَ بِمَا كُنْتُمْ تُعَلِّمُونَ النَّاسَ الْخَيْرَ
"আলেমদেরকে কেয়ামতের দিন এমনভাবে হাশরের ময়দানে আনা হবে যে, তাদেরকে বলা হবে, তোমরা যা মানুষকে শিক্ষা দিতে, তার বিনিময়ে জান্নাতে প্রবেশ করো।"
তবে এই ধরনের বর্ণনাগুলোর সনদ (বর্ণনা পরম্পরা) সম্পর্কে আলেমদের মধ্যে মতভেদ আছে। অনেক মুহাদ্দিস (হাদিস বিশেষজ্ঞ) এগুলোকে দুর্বল (যয়ীফ) বলেছেন।
৪. ইমামদের মতামত:
-
ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ রাদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ করেছেন যে, আলেমদের বিচার সাধারণ মানুষের মতো খোলাখুলিভাবে হবে না; বরং তাদের সাথে এমনভাবে আচরণ করা হবে যা তাদের মর্যাদার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে তিনি এটিকে একটি মতামত হিসেবে উল্লেখ করেছেন, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে নয়।
-
মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) মা'আরিফুল কুরআন-এ উল্লেখ করেছেন যে, কেয়ামতের দিন আল্লাহ তায়ালা যাদের ভালোবাসেন, তাদের সাথে পর্দার আড়ালে হিসাব নেবেন। এটি তাদের জন্য সম্মানের বিষয়, কারণ তাদের গুনাহগুলো অন্যের সামনে প্রকাশ করা হবে না।
-
মুফতি তাকি উসমানি (দামাত বারাকাতুহুম) বলেছেন, আলেমদের বিচার পর্দার আড়ালে হবে—এমন কোনো সহিহ হাদিস নেই। তবে আল্লাহ তায়ালা যাদের ভালোবাসেন, তাদের গুনাহ ঢেকে দেবেন এবং পর্দার আড়ালে হিসাব নেবেন। এটি সাধারণ মুমিনদের জন্যও প্রযোজ্য।
৫. সারসংক্ষেপ:
- কোনো সহিহ হাদিসে নেই যে, শুধুমাত্র আলেমদের বিচার পর্দার আড়ালে হবে।
- সহিহ হাদিসে আছে যে, আল্লাহ তায়ালা কিছু মুমিন বান্দার সাথে পর্দার আড়ালে কথা বলবেন এবং তাদের গুনাহ গোপন রাখবেন। এটি তাদের জন্য রহমত ও সম্মানের বিষয়।
- আলেমদের জন্য এটি একটি ভয় ও সতর্কবার্তা যে, তাদের জ্ঞান যদি দুনিয়াবি স্বার্থের জন্য হয়, তবে তাদের বিচার কঠোর হবে। আর যদি তা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হয়, তবে তাদের জন্য রয়েছে বিশেষ সম্মান।
৬. আমাদের করণীয়:
আলেমদের উচিত তাদের জ্ঞানকে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ব্যবহার করা, লোক দেখানোর জন্য নয়। সাধারণ মুমিনদের উচিত আলেমদের সম্মান করা এবং তাদের থেকে সঠিক জ্ঞান অর্জন করা। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে সঠিক পথে চলার তাওফিক দান করুন। আমিন।
দলিলসমূহ:
- সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৪৪১
- সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৯০৫, ২৭৬৮
- রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ৪২
- মা'আরিফুল কুরআন, খণ্ড: ৮, পৃষ্ঠা: ৫৮০