হানাফি মাযহাব অনুযায়ী ইজাব-কবুল ছাড়া নিকাহ হয় কি না?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
হুজুর,
একজন প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম ছেলে ও মেয়ে কয়েক বছর প্রেমের সম্পর্কে ছিল। তারা দুইজনের অধিক প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম ব্যক্তির সামনে, একই মজলিসে, পরস্পরকে স্বামী-স্ত্রী হিসেবে পরিচয় দিত এবং একে অপরকে স্বামী-স্ত্রী বলে সম্বোধন করত। উপস্থিত ব্যক্তিরা জানত যে তারা তখন প্রকৃতপক্ষে অবিবাহিত এবং ভবিষ্যতে তাদের বিয়ে হবে।
তারা নিজেদের মধ্যে স্বামী-স্ত্রীর মতো আচরণ করত এবং কয়েকবার সহবাসও করেছে। পরবর্তীতে তাদের মধ্যে বিচ্ছেদমূলক কথাবার্তাও হয়েছে।
তবে নিশ্চিতভাবে জানা আছে যে, তাদের মধ্যে কখনো কোনো সময় মৌখিকভাবে বিয়ের প্রস্তাব ও গ্রহণ করা হয়নি। অর্থাৎ, ‘আমি তোমাকে বিয়ে করলাম’, ‘তুমি আমার স্ত্রী হলে’—এ ধরনের কোনো বিয়ের প্রস্তাব এবং অপর পক্ষের পক্ষ থেকে ‘আমি কবুল করলাম’—এ ধরনের কোনো গ্রহণোক্তি কখনো হয়নি; সাক্ষীদের সামনেও কোনো ইজাব-কবুল হয়নি।
বর্তমানে পূর্বের এসব ঘটনা নিয়ে তাদের মনে গুরুতর সংশয় সৃষ্টি হয়েছে—তখনকার স্বামী-স্ত্রী পরিচয় ও সহবাসের কারণে কোনোভাবে নিকাহ সংঘটিত হয়েছিল কি না এবং পরবর্তীতে ছেলের বলা বিচ্ছেদমূলক কথার কারণে তালাক কার্যকর হয়েছিল কি না। অনেক চেষ্টা করেও এই সংশয় দূর করতে পারছে না। তারা একে অপরকে ছাড়া থাকতেও পারছে না এবং বর্তমানে হারাম সম্পর্ক থেকে বের হয়ে পরিবারকে জানিয়ে শরিয়তসম্মতভাবে বিবাহ করতে চায়।
প্রশ্ন:
১. কোনো ইজাব-কবুল ছাড়াই, দুইজনের অধিক প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম ব্যক্তির সামনে একই মজলিসে পরস্পরকে স্বামী-স্ত্রী হিসেবে পরিচয় দেওয়া এবং পরবর্তীতে স্বামী-স্ত্রীর মতো আচরণ ও সহবাস করার মাধ্যমে হানাফি শরিয়ত অনুযায়ী তাদের পূর্বে নিকাহ সংঘটিত হয়েছিল কি?
২. যদি এভাবে পূর্বে নিকাহ সংঘটিত হয়েছে কিনা সেটা কোন ভাবেই নিশ্চিত না হয়ে থাকে, তাহলে পরবর্তীতে ছেলের বলা বিচ্ছেদমূলক কথাগুলো তালাক হিসেবে কার্যকর হয়েছে কি?
৩. পূর্বের নিকাহ ও পরবর্তী তালাক—উভয় বিষয়েই যদি নিশ্চিত প্রমাণ না থাকে এবং তাদের মধ্যে শুধু সংশয় থেকে যায়, তাহলে তারা কি সেই সংশয় থাকা অবস্থায় বর্তমানে পরিবারের উপস্থিতিতে নতুন করে শরিয়তসম্মতভাবে একে অপরকে বিবাহ করতে পারবে?
৪. অর্থাৎ, পূর্বে নিকাহ হয়েছিল কি না এবং পরবর্তীতে তালাক হয়েছিল কি না—এ দুটির কোনোটিই নিশ্চিতভাবে জানা না গেলে, শুধু সন্দেহ ও সংশয় থাকা অবস্থায় নতুন করে নিকাহ করা কি শরিয়তসম্মত হবে?
হানাফি মাযহাব অনুযায়ী জানাবেন।
Answer
বিবাহ সম্পর্কিত ফতোয়া
بسم الله الرحمن الرحيم الحمد لله رب العالمين، والصلاة والسلام على أشرف الأنبياء والمرسلين، أما بعد:
ভূমিকা
প্রশ্নে উল্লিখিত বিষয়গুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানে দুটি মূল বিষয় পর্যালোচনা করতে হবে: (১) ইজাব-কবুল ছাড়া শুধু স্বামী-স্ত্রী হিসেবে পরিচয় দেওয়া ও সম্বোধন করার দ্বারা নিকাহ সংঘটিত হয় কি না? (২) সন্দেহের অবস্থায় নতুন করে নিকাহ করার হুকুম কী?
প্রশ্ন ১: ইজাব-কবুল ছাড়া শুধু স্বামী-স্ত্রী হিসেবে পরিচয় দেওয়া ও সহবাসের দ্বারা নিকাহ সংঘটিত হয়েছিল কি?
উত্তর: না, হানাফি মাযহাব অনুযায়ী এভাবে নিকাহ সংঘটিত হয়নি।
দলিল:
নিকাহ সংঘটিত হওয়ার জন্য ইজাব (প্রস্তাব) ও কবুল (গ্রহণ) অপরিহার্য। এটি ছাড়া নিকাহ শুদ্ধ হয় না। আল্লাহ তাআলা বলেন:
﴿وَأَحَلَّ لَكُم مَّا وَرَاءَ ذَٰلِكُمْ﴾ "এবং এদের ছাড়া অন্য নারীদেরকে তোমাদের জন্য হালাল করা হয়েছে।" (সূরা নিসা: ২৪)
হানাফি ফিকহের মূলনীতি:
ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ও তাঁর সাথীদের মতে, নিকাহর জন্য ইজাব ও কবুল শর্ত। শুধু পরিচয় দেওয়া, সম্বোধন করা বা সহবাস করা নিকাহর জন্য যথেষ্ট নয়।
রেফারেন্স:
১. আল-হিদায়া (মারগিনানী, খণ্ড ১, কিতাবুন নিকাহ):
"النكاح ينعقد بالإيجاب والقبول، ولا ينعقد بمجرد التراضي بغير لفظ"
২. রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন শামী, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ৮):
"لا بد في النكاح من الإيجاب والقبول؛ لأنه عقد معاوضة، فلا ينعقد بمجرد الرضا"
৩. ফাতাওয়া আলমগিরি (খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ২৬৮):
"النكاح لا ينعقد إلا بالإيجاب والقبول"
৪. বাদায়েউস সানায়ে (কাসানী, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ২২৯):
"الإيجاب والقبول شرطان في انعقاد النكاح"
সারসংক্ষেপ: শুধু "আমি তোমাকে স্বামী/স্ত্রী হিসেবে মানি" বলা বা "তুমি আমার স্ত্রী/স্বামী" বলা—এগুলো নিকাহর ইজাব-কবুল হিসেবে গণ্য হবে না, যদি না তা নিকাহর নিয়তে স্পষ্ট শব্দে বলা হয় এবং সাক্ষীদের সামনে হয়। এখানে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, কখনো ইজাব-কবুল হয়নি। তাই নিকাহ সংঘটিত হয়নি।
তবে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা: যেহেতু তারা সহবাস করেছে, তাই এটি যিনা হিসেবে গণ্য হবে (যদি নিকাহ না হয়ে থাকে)। তাদের উচিত তাওবা করা এবং ভবিষ্যতে হারাম সম্পর্ক থেকে বেঁচে থাকা।
প্রশ্ন ২: যদি নিকাহ সংঘটিত হয়ে থাকে (সন্দেহের ভিত্তিতে), তাহলে ছেলের বিচ্ছেদমূলক কথাগুলো তালাক হিসেবে কার্যকর হবে কি?
উত্তর:
যেহেতু আমরা প্রশ্ন ১-এ সিদ্ধান্তে পৌঁছেছি যে নিকাহ সংঘটিত হয়নি, তাই তালাকের প্রশ্নই আসে না। তালাক কার্যকর হওয়ার জন্য প্রথমে সহীহ নিকাহ থাকা শর্ত।
দলিল:
﴿يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ إِذَا طَلَّقْتُمُ النِّسَاءَ فَطَلِّقُوهُنَّ لِعِدَّتِهِنَّ﴾ "হে নবী! যখন তোমরা নারীদেরকে তালাক দেবে, তখন তাদের ইদ্দতের সময় তালাক দেবে।" (সূরা তালাক: ১)
হানাফি ফিকহ:
তালাকের শর্ত হলো সহীহ নিকাহ। নিকাহ না থাকলে তালাক হয় না।
রেফারেন্স:
১. রাদ্দুল মুহতার (খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ২৩০):
"الطلاق لا يقع إلا في نكاح صحيح"
২. আল-হিদায়া (খণ্ড ১, কিতাবুত তালাক):
"الطلاق لا يقع إلا بعد النكاح"
সারসংক্ষেপ: যদি নিকাহই না হয়ে থাকে, তাহলে তালাক কার্যকর হবে না। তবে যদি কোনোভাবে নিকাহ হয়ে থাকে (যা এখানে নিশ্চিত নয়), তাহলে বিচ্ছেদমূলক কথাগুলো তালাক হিসেবে গণ্য হতে পারে—কিন্তু সেটাও নিশ্চিত নয়।
প্রশ্ন ৩ ও ৪: সন্দেহের অবস্থায় নতুন করে নিকাহ করা কি শরিয়তসম্মত হবে?
উত্তর: হ্যাঁ, সন্দেহের অবস্থায় নতুন করে নিকাহ করা শরিয়তসম্মত এবং এটাই সর্বোত্তম পন্থা।
কারণ:
১. সন্দেহ দূর করার জন্য নতুন নিকাহ: যেহেতু পূর্বের নিকাহ সংঘটিত হওয়া নিশ্চিত নয়, তাই নতুন করে নিকাহ করলে সব সন্দেহ দূর হয়ে যাবে।
২. ইসলামি মূলনীতি:
﴿فَاسْأَلُوا أَهْلَ الذِّكْرِ إِن كُنتُمْ لَا تَعْلَمُونَ﴾ "তোমরা যদি না জানো, তবে জ্ঞানীদের কাছে জিজ্ঞাসা করো।" (সূরা নাহল: ৪৩)
৩. সতর্কতামূলক পদক্ষেপ: নতুন নিকাহ করলে যদি পূর্বে নিকাহ হয়ে থাকে, তাহলে নতুন নিকাহটি পূর্বের নিকাহর উপর ভিত্তি করে হবে না—বরং এটি একটি নতুন স্বাধীন নিকাহ হবে। আর যদি পূর্বে নিকাহ না হয়ে থাকে, তাহলে এটি প্রথম নিকাহ হবে।
হানাফি ফিকহের রেফারেন্স:
১. রাদ্দুল মুহতার (খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ১০):
"إذا شك في وقوع النكاح، فالأحوط تجديد النكاح"
২. ফাতাওয়া উসমানি (মুফতি তাকি উসমানি, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ২৮৯):
"نكاح کے وقوع میں شک ہو تو احتیاطاً نیا نکاح کر لینا چاہیے"
৩. ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানভী, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ১৭২):
"نکاح کے بارے میں شک ہو تو تجدید نکاح کرنا افضل ہے"
গুরুত্বপূর্ণ শর্ত:
নতুন নিকাহ করতে হবে শরিয়তসম্মতভাবে:
- ইজাব ও কবুল স্পষ্ট শব্দে
- দুইজন প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম সাক্ষীর সামনে
- পরিবারের উপস্থিতিতে
- মোহর নির্ধারণ করে
- কোনো হারাম সম্পর্ক না রেখে
তালাকের সন্দেহ: যদি পূর্বে তালাক হয়ে থাকে (যা নিশ্চিত নয়), তাহলে নতুন নিকাহর পর ছেলেটি যদি মেয়েটিকে পুনরায় বিয়ে করতে চায়, তাহলে হালালা (অন্য পুরুষের সাথে বিয়ে ও সহবাসের পর তালাক) ছাড়া বিয়ে করা যাবে না—যদি তিন তালাক হয়ে থাকে। কিন্তু যেহেতু তালাক নিশ্চিত নয়, তাই সাধারণত নতুন নিকাহই যথেষ্ট।
তবে সতর্কতা: যদি ছেলেটি তিন তালাক দিয়ে থাকে (যদি নিকাহ হয়ে থাকে), তাহলে হালালা ছাড়া পুনর্বিবাহ জায়েয হবে না। তাই একজন বিশ্বস্ত মুফতির কাছে সরাসরি গিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা উচিত।
চূড়ান্ত ফতোয়া
| প্রশ্ন | উত্তর | |--------|--------| | ১. ইজাব-কবুল ছাড়া নিকাহ হয়েছিল কি? | না, হানাফি মাযহাব অনুযায়ী নিকাহ সংঘটিত হয়নি। | | ২. তালাক কার্যকর হয়েছিল কি? | না, কারণ নিকাহই হয়নি। | | ৩. সন্দেহের অবস্থায় নতুন নিকাহ করা যাবে কি? | হ্যাঁ, শরিয়তসম্মতভাবে নতুন নিকাহ করা যাবে এবং এটাই সর্বোত্তম। | | ৪. শুধু সন্দেহ থাকলে নতুন নিকাহ কি জায়েয? | হ্যাঁ, জায়েয। বরং সন্দেহ দূর করার জন্য নতুন নিকাহ করা উচিত। |
করণীয়
১. তাওবা করুন: পূর্বের হারাম সম্পর্ক ও সহবাসের জন্য আন্তরিক তাওবা করুন। ২. নতুন নিকাহ করুন: পরিবারের উপস্থিতিতে, দুইজন সাক্ষীর সামনে, স্পষ্ট ইজাব-কবুলের মাধ্যমে নতুন নিকাহ করুন। ৩. মোহর নির্ধারণ করুন: শরিয়তসম্মত মোহর নির্ধারণ করুন। ৪. মুফতির পরামর্শ নিন: যদি তালাকের সন্দেহ থাকে, তবে একজন বিশ্বস্ত মুফতির কাছে সরাসরি গিয়ে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করুন। ৫. ভবিষ্যতে সতর্ক থাকুন: নিকাহর বৈধতা নিয়ে সন্দেহ সৃষ্টি হয় এমন কোনো কাজ করবেন না।
দুআ
اللَّهُمَّ أَعِنَّا عَلَى ذِكْرِكَ وَشُكْرِكَ وَحُسْنِ عِبَادَتِكَ
আল্লাহ তাআলা তাদের উভয়কে হালাল পন্থায় একত্রিত করুন এবং হারাম থেকে হেফাজত করুন। আমিন।
والله أعلم بالصواب