স্পষ্ট মৌখিক ইজাব-কবুল হয়নি,শুধু স্বামী-স্ত্রী পরিচয় দেওয়া হয়েছে, এই নাম লেখা কি ইজাব-কবুল?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ।
মুহতারাম মুফতি সাহেব,
একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল বিষয়ে হানাফি শরিয়াহ অনুযায়ী সুস্পষ্ট ও চূড়ান্ত ফতোয়া কামনা করছি। অনুগ্রহ করে নিচের ঘটনাটি সম্পূর্ণ পড়ে, কোনো বিষয় অনুমান না করে এবং প্রতিটি সম্ভাব্য দিক বিবেচনা করে মাসআলার সমাধান জানাবেন।
ঘটনার প্রথম অংশ: হোটেলে যাওয়ার ঘটনা
একজন প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম ছেলে ও একজন প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম মেয়ে—উভয়েই জেনারেল লাইনের শিক্ষার্থী। তাদের মধ্যে আগে প্রেমের সম্পর্ক ছিল। পরবর্তীতে উভয় পরিবারের মধ্যে তাদের বিয়ের বিষয়ে কথাবার্তা শুরু হয়। কিন্তু তখনও তাদের মধ্যে শরিয়তসম্মত নিকাহ সম্পন্ন হয়নি।
পরবর্তীতে তারা হারাম সম্পর্কে লিপ্ত হওয়ার উদ্দেশ্যে একটি আবাসিক হোটেলে যায়। সেখানে তারা নিজেদের “স্বামী-স্ত্রী/হাজবেন্ড-ওয়াইফ” হিসেবে পরিচয় দেয়।
হোটেলের রিসেপশনে তখন দুইজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন। তারা ছেলে-মেয়ের কাছে কাবিননামা দেখতে চান। কিন্তু তারা কোনো কাবিননামা দেখাতে পারেনি। পরে কোনোভাবে তাদের বোঝানো হয় যে তারা ভবিষ্যতে বিয়ে করবে এবং কিছু টাকা দেওয়ার মাধ্যমে বিষয়টি মিটিয়ে নেওয়া হয়।
হোটেলের কাগজপত্র ও স্বাক্ষরের ঘটনা
এরপর হোটেলের ডকুমেন্ট/ফর্ম পূরণের সময় রিসেপশনের লোকেরা তাদের স্বামী-স্ত্রী হিসেবে পরিচয় দেওয়ার ভিত্তিতে ফর্ম পূরণ করতে বলে।
ছেলেটি হোটেলের একটি ফর্মে স্বামী/Husband-এর ঘরে নিজের নাম এবং স্ত্রী/Wife-এর ঘরে মেয়েটির নাম লেখে।
এরপর ছেলেটি মেয়েটিকে বলে:
“এখানে সাইন কর।”
মেয়েটি কোনো মৌখিক ইজাব বা কবুল না করে সেখানে স্বাক্ষর করে।
হোটেলের অন্যান্য কাগজপত্রেও তারা নিজেদের স্বামী-স্ত্রী হিসেবে পরিচয় দেয়/লেখে এবং প্রয়োজনীয় জায়গায় স্বাক্ষর করে।
এ সময় রিসেপশনে থাকা ওই দুইজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন এবং তারা ফর্ম পূরণে সহযোগিতা করছিলেন।
তবে বর্তমানে ছেলে-মেয়ে হোটেলের প্রতিটি ফর্মে ঠিক কী কী শব্দ লেখা হয়েছিল তা নিশ্চিতভাবে বলতে পারে না। তারা শুধু নিশ্চিতভাবে জানে যে—
- তারা সেখানে নিজেদের স্বামী-স্ত্রী হিসেবে পরিচয় দিয়েছিল;
- স্বামী/স্ত্রীর ঘরে নিজেদের নাম লিখেছিল;
- মেয়েটি ছেলেটির কথায় সাইন করেছিল;
- অন্যান্য কাগজপত্রেও স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে তথ্য দেওয়া হয়েছিল;
- সেখানে দুইজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন।
মৌখিক ইজাব-কবুলের বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য
হোটেলে অবস্থানকালে ছেলে-মেয়ের মধ্যে কেউই স্পষ্টভাবে বলেনি—
- “আমি তোমাকে বিবাহ করলাম”;
- “আমি তোমাকে স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করলাম”;
- “আমি তোমাকে স্বামী হিসেবে গ্রহণ করলাম”;
- “আমি বিবাহ কবুল করলাম”;
অথবা এ ধরনের কোনো স্পষ্ট ইজাব-কবুলের বাক্য।
অর্থাৎ, তাদের স্মরণ অনুযায়ী সেখানে কোনো স্পষ্ট মৌখিক ইজাব-কবুল হয়নি।
ছেলেটি শুধু মেয়েটিকে “সাইন কর” বলেছিল এবং মেয়েটি কোনো মৌখিক উত্তর না দিয়ে সাইন করেছিল।
হোটেলে যাওয়ার পর
এরপর তারা হোটেলের কক্ষে যায় এবং হারাম সম্পর্কে লিপ্ত হয়। বর্তমানে উভয়েই এ কাজের জন্য অনুতপ্ত এবং আল্লাহর কাছে তওবা করতে চায়।
এখন তাদের মূল সংশয় হলো—উপরোক্ত স্বামী-স্ত্রী পরিচয়, লিখিত তথ্য ও স্বাক্ষরের কারণে হোটেলেই শরিয়তসম্মত কোনো নিকাহ সংঘটিত হয়েছিল কি না।
---
প্রথম প্রশ্ন: হোটেলের ঘটনায় নিকাহ হয়েছিল কি না
উপরোক্ত ঘটনার আলোকে দয়া করে জানাবেন:
১। শুধু নিজেদের স্বামী-স্ত্রী হিসেবে পরিচয় দেওয়ার মাধ্যমে কি হানাফি শরিয়াহ অনুযায়ী নিকাহ হয়ে যায়?
২। দুইজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির উপস্থিতিতে নিজেদের স্বামী-স্ত্রী হিসেবে পরিচয় দেওয়া কি ইজাব-কবুলের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে?
৩। স্বামী-স্ত্রী হিসেবে মৌখিক পরিচয় দেওয়া এবং লিখিতভাবে স্বামী-স্ত্রীর ঘরে নাম লেখা—এগুলোর শরয়ী হুকুম কী?
৪। ছেলে যদি শুধু বলে, “এখানে সাইন কর”, আর মেয়ে কোনো কথা না বলে সাইন করে—এটি কি শরিয়তের দৃষ্টিতে ইজাব-কবুল হিসেবে গণ্য হবে?
৫। “স্বামী/Husband” ও “স্ত্রী/Wife” ঘরে নিজেদের নাম লেখা এবং উভয়ের স্বাক্ষর করা—কোনো মৌখিক ইজাব-কবুল ছাড়া—হানাফি মাযহাব অনুযায়ী নিকাহ সংঘটনের জন্য যথেষ্ট কি না?
৬। যদি কাগজে শুধু স্বামী-স্ত্রীর পরিচয় ও নাম লেখা থাকে, কিন্তু “বিবাহ করলাম”, “গ্রহণ করলাম”, “কবুল করলাম” ইত্যাদি কোনো শব্দ না থাকে, তাহলে তার হুকুম কী?
৭। রিসেপশনে উপস্থিত দুইজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি যদি তাদের এই কথাবার্তা/লিখিত কার্যক্রম দেখে থাকে, তাহলে তারা কি নিকাহের সাক্ষী হিসেবে গণ্য হবে? নাকি নিকাহের সাক্ষী হওয়ার জন্য ইজাব-কবুল শোনা এবং নিকাহের বিষয়টি জানা জরুরি?
৮। উপরোক্ত পুরো ঘটনার ভিত্তিতে—হানাফি মাযহাব অনুযায়ী—তাদের মধ্যে তখন:
- কোনো নিকাহই হয়নি,
- নাকি ফাসিদ নিকাহ হয়েছে,
- নাকি সহীহ নিকাহ হয়েছে—
কোনটি সঠিক?
---
দ্বিতীয় অংশ: পরবর্তী “অন্য কোনো ছেলে দেখ” কথার হুকুম
ধরা যাক, কোনোভাবে হোটেলের ঘটনার মাধ্যমে তাদের নিকাহ সংঘটিত হয়েছিল।
পরবর্তীতে তাদের মধ্যে তীব্র ঝগড়ার সময় ছেলেটি মেয়েটিকে উদ্দেশ্য করে মাত্র একবার মুখে বলে:
«“অন্য কোনো ছেলে দেখ।”»
এই বাক্যটি সে মুখে একবারই বলেছে; একাধিকবার বলেনি।
তবে বাক্যটি বলার সময় তার মনে তালাকের নিয়ত ছিল।
কিন্তু তার মনে তখন তিন তালাকের নির্দিষ্ট নিয়ত ছিল না। অর্থাৎ “তিন তালাক” বা কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যা মনে করে সে বাক্যটি বলেনি।
তবে ঝগড়ার তীব্রতার কারণে তার মনে বিচ্ছেদের একই নিয়ত বারবার আসছিল। অর্থাৎ একই তালাকের নিয়ত মনের মধ্যে বারবার হচ্ছিল, কিন্তু মুখে বাক্যটি মাত্র একবার উচ্চারিত হয়েছে।
এর আগে তাদের মধ্যে কখনো কোনো তালাক সংঘটিত হয়নি।
বর্তমানে ছেলেটি নির্দিষ্ট করে বলতে পারছে না যে ওই সময় তার নিয়ত দ্বারা কত তালাক বোঝানো হয়েছিল। সে শুধু নিশ্চিত যে তালাকের নিয়ত ছিল, কিন্তু তিন বা অন্য কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যা তার মনে ছিল না।
এ বিষয়ে প্রশ্ন
৯। “অন্য কোনো ছেলে দেখ”—এই বাক্যটি হানাফি মাযহাব অনুযায়ী কিনায়া তালাকের অন্তর্ভুক্ত কি না?
১০। যদি এটি কিনায়া হয় এবং বলার সময় তালাকের নিয়ত থাকে, তাহলে কত তালাক সংঘটিত হবে?
১১। মুখে বাক্যটি মাত্র একবার উচ্চারণ করা হলেও কেনায়া বাক্য বলার আগে বা বলার সময় মনের মধ্যে একই তালাকের নিয়ত বারবার পুনরাবৃত্তি হওয়া কি তালাকের সংখ্যা বৃদ্ধি করতে পারে?
১২। একই নিয়ত বারবার হওয়া কিন্তু বাক্য একবার বলা—এ অবস্থায় কি ২ বা ৩ তালাক হওয়ার কোনো সুযোগ আছে?
১৩। যেহেতু তার মনে “তিন” সংখ্যার নিয়ত ছিল না, কিন্তু একই নিয়ত বারবার হয়ে একবার বাক্য বলা হয়েছে,তাহলে হানাফি মাযহাবের মূলনীতিতে এ ক্ষেত্রে কত তালাক গণ্য হবে?
---
তৃতীয় অংশ: বর্তমানে তাদের করণীয়
বর্তমানে ছেলে-মেয়ে উভয়েই নিজেদের পূর্বের হারাম কাজের জন্য অনুতপ্ত এবং হারাম সম্পর্ক থেকে সম্পূর্ণভাবে বের হয়ে শরিয়তসম্মতভাবে বিবাহিত জীবন শুরু করতে চায়।
কিন্তু তাদের ভয় হচ্ছে—
যদি হোটেলের ঘটনার কারণে ইতোমধ্যে নিকাহ হয়ে গিয়ে থাকে, তাহলে পরবর্তীতে বলা কিনায়া বাক্যের কারণে তালাক হয়ে থাকতে পারে। আবার যদি হোটেলের ঘটনায় নিকাহ না হয়ে থাকে, তাহলে বর্তমানে তারা অবিবাহিত।
তাই অনুগ্রহ করে ঘটনাটির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একসঙ্গে বিবেচনা করে স্পষ্ট ফয়সালা প্রদান করবেন:
১। হোটেলের ঘটনায় কোনো নিকাহ সংঘটিত হয়েছিল কি না?
২। হয়ে থাকলে সেটি সহীহ নাকি ফাসিদ নিকাহ ছিল?
৩। যদি নিকাহ হয়ে থাকে, তাহলে পরবর্তী “অন্য কোনো ছেলে দেখ” কথার কারণে কোনো তালাক সংঘটিত হয়েছে কি না এবং হলে কতটি?
৪। যদি নিকাহ না হয়ে থাকে, তাহলে পরবর্তী ওই কথার দ্বারা কোনো তালাকের প্রশ্ন আসে কি না?
৫। বর্তমানে ছেলে কি ওই মেয়েকেই শরিয়তসম্মতভাবে নতুন করে বিবাহ করতে পারবে?
৬। নতুন করে নিকাহ করার আগে কোনো ইদ্দত, ফাসখ, তালাক, তওবা বা অন্য কোনো শরয়ী ব্যবস্থা প্রয়োজন কি না?
৭। বর্তমানে তারা যদি নিকাহ না করে পরস্পরের সঙ্গে একান্তে থাকে বা শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত হয়, তাহলে তা যিনা/হারাম সম্পর্ক হিসেবে গণ্য হবে কি না?
৮। যদি তাদের পূর্বের কোনো নিকাহ বা তালাকের বিষয়ে সন্দেহ থেকে যায়, তাহলে সেই সন্দেহ দূর করার জন্য শরিয়াহ অনুযায়ী তাদের করণীয় কী?
---
বিশেষ অনুরোধ
মুহতারাম মুফতি সাহেবের কাছে বিশেষ অনুরোধ, উপরোক্ত ঘটনার প্রতিটি ধাপ আলাদাভাবে বিবেচনা করে হানাফি মাযহাবের নির্ভরযোগ্য কিতাবের মূল আরবি ইবারত, দলিল ও ফতোয়ার রেফারেন্সসহ উত্তর প্রদান করবেন।
বিশেষত নিম্নোক্ত বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে জানালে উপকৃত হব:
(ক) স্বামী-স্ত্রী হিসেবে পরিচয় দেওয়া কি ইজাব-কবুল?
(খ) লিখিতভাবে Husband/Wife লেখা কি নিকাহের ইজাব-কবুল হতে পারে?
(গ) উপস্থিত দুই ব্যক্তি কি নিকাহের সাক্ষী হিসেবে গণ্য হবে?
(ঘ) “সাইন কর”—এই কথার দ্বারা ইজাব-কবুল হতে পারে কি না?
(ঙ) একই তালাকের নিয়ত মনে বারবার হওয়া কিন্তু কিনায়া বাক্য মুখে একবার বলা—এতে তালাকের সংখ্যা বৃদ্ধি পায় কি না?
(চ) সর্বশেষে, এই ছেলে-মেয়ে বর্তমানে কীভাবে সম্পূর্ণ শরিয়তসম্মত ও সন্দেহমুক্তভাবে বিবাহিত জীবন শুরু করতে পারবে?
বর্তমানে স্থানীয় কোন আলেম বা দারুল ইফতায় যোগাযোগ করা সম্ভব না।আপনাদের দেওয়া সমাধান অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে হবে।দয়া করে সঠিক সমাধান হানাফি মাযহাব অনুযায়ী জানাবেন।
Answer
হানাফি মাযহাব অনুযায়ী বিস্তারিত ফতোয়া
بِسْمِ اللهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيْمِ
আল-হামদু লিল্লাহি রাব্বিল আলামীন, ওয়াস-সালাতু ওয়াস-সালামু আলা রাসূলিহিল কারীম।
প্রিয় প্রশ্নকারী ভাই, আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল। নিচে হানাফি মাযহাবের নির্ভরযোগ্য কিতাবের মূল আরবি ইবারত ও দলিলসহ ধাপে ধাপে উত্তর প্রদান করা হচ্ছে।
প্রথম অংশ: হোটেলের ঘটনায় নিকাহ হয়েছিল কি না?
মূল নীতি (আসসি নীতি)
হানাফি মাযহাব অনুযায়ী নিকাহ সংঘটিত হওয়ার জন্য নিম্নলিখিত শর্তাবলি অপরিহার্য:
১. ইজাব ও কবুল (প্রস্তাব ও গ্রহণ) — অর্থাৎ একজন পক্ষ থেকে বিবাহের প্রস্তাব এবং অন্যজন থেকে তা গ্রহণ। ২. ইজাব-কবুল একই মজলিসে (একই বৈঠকে) হওয়া। ৩. দুইজন প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম সাক্ষী (পুরুষ হলে দুইজন পুরুষ, অথবা একজন পুরুষ ও দুইজন মহিলা) উপস্থিত থাকা এবং ইজাব-কবুল শ্রবণ করা। ৪. মহর নির্ধারণ (তবে মহর উল্লেখ না থাকলেও নিকাহ সহীহ হয়, মহরে মিসল ধার্য হবে)। ৫. বিবাহের স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা (হুরমতে মুআব্বাদা) না থাকা — যেমন রক্তসম্পর্ক, দুধসম্পর্ক, শ্বশুর-শাশুড়ির সম্পর্ক ইত্যাদি।
দলিল:
আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَأَخَذْنَ مِنكُم مِّيثَاقًا غَلِيظًا "এবং তারা তোমাদের থেকে দৃঢ় অঙ্গীকার নিয়েছে।" (সূরা আন-নিসা: ২১)
فَانكِحُوهُنَّ بِإِذْنِ أَهْلِهِنَّ "তোমরা তাদের বিবাহ করো তাদের অভিভাবকদের অনুমতিক্রমে।" (সূরা আন-নিসা: ২৫)
হাদীসে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
لَا نِكَاحَ إِلَّا بِوَلِيٍّ وَشَاهِدَيْ عَدْلٍ "অভিভাবক ও দুইজন ন্যায়পরায়ণ সাক্ষী ছাড়া কোনো নিকাহ নেই।" — (সুনানে বায়হাকী, হাদীস নং ১৩৭২৫; সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ১১০১)
হানাফি মাযহাবের বিশেষ নীতি: হানাফি মাযহাব অনুযায়ী নিকাহ সহীহ হওয়ার জন্য অভিভাবকের অনুমতি শর্ত নয় যদি পাত্র-পাত্রী উভয়েই প্রাপ্তবয়স্ক ও সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন হয়। তবে ইজাব-কবুল ও সাক্ষী অবশ্যই শর্ত।
প্রশ্ন ১: শুধু নিজেদের স্বামী-স্ত্রী হিসেবে পরিচয় দেওয়ার মাধ্যমে কি হানাফি শরিয়াহ অনুযায়ী নিকাহ হয়ে যায়?
উত্তর: না, কখনোই নয়।
শুধু "স্বামী-স্ত্রী" হিসেবে পরিচয় দেওয়া বা দাবি করা নিকাহ সংঘটনের জন্য যথেষ্ট নয়। কারণ নিকাহ একটি শরয়ী চুক্তি (আকদ), যা ইজাব ও কবুলের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। পরিচয় দেওয়া বা দাবি করা কোনো ইজাব-কবুল নয়।
আরবি ইবারত:
وَلَا يَصِحُّ النِّكَاحُ إِلَّا بِإِيجَابٍ وَقَبُولٍ "ইজাব ও কবুল ছাড়া নিকাহ সহীহ হয় না।" — (আল-হিদায়া, কিতাবুন নিকাহ, খণ্ড ১, পৃ. ২৩১)
الْإِيجَابُ وَالْقَبُولُ شَرْطٌ لِصِحَّةِ النِّكَاحِ "ইজাব ও কবুল নিকাহ সহীহ হওয়ার শর্ত।" — (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৪, পৃ. ৯৫)
ব্যাখ্যা: "আমরা স্বামী-স্ত্রী" — এটি একটি বর্ণনা বা দাবি, ইজাব-কবুল নয়। ইজাব-কবুল হলো: "আমি তোমাকে বিবাহ করলাম" / "আমি কবুল করলাম" — এ ধরনের স্পষ্ট বাক্য।
প্রশ্ন ২: দুইজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির উপস্থিতিতে নিজেদের স্বামী-স্ত্রী হিসেবে পরিচয় দেওয়া কি ইজাব-কবুলের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে?
উত্তর: না, এটি ইজাব-কবুলের অন্তর্ভুক্ত নয়।
ইজাব-কবুল হতে হলে স্পষ্টভাবে বিবাহের প্রস্তাব ও গ্রহণ হতে হবে। শুধু "স্বামী-স্ত্রী" পরিচয় দেওয়া বা দাবি করা ইজাব-কবুল নয়। এমনকি সাক্ষীদের উপস্থিতিতেও যদি স্পষ্ট ইজাব-কবুল না হয়, তাহলে নিকাহ হয় না।
আরবি ইবারত:
وَلَوْ قَالَ: هَذِهِ امْرَأَتِي، لَا يَصِيرُ نِكَاحًا "যদি কেউ বলে: 'এটি আমার স্ত্রী', তাহলে তা নিকাহ হবে না।" — (ফাতাওয়া আলমগীরী, কিতাবুন নিকাহ, খণ্ড ১, পৃ. ২৭৬)
وَلَا يَكْفِي فِي النِّكَاحِ مُجَرَّدُ الدَّعْوَى "নিকাহের জন্য শুধু দাবি যথেষ্ট নয়।" — (বাদায়েউস সানায়ে, খণ্ড ২, পৃ. ২৩০)
প্রশ্ন ৩: স্বামী-স্ত্রী হিসেবে মৌখিক পরিচয় দেওয়া এবং লিখিতভাবে স্বামী-স্ত্রীর ঘরে নাম লেখা—এগুলোর শরয়ী হুকুম কী?
উত্তর: এগুলো নিকাহ সংঘটনের জন্য যথেষ্ট নয়। এগুলো শুধু একটি দাবি বা বর্ণনা। নিকাহ হয় না। তবে এ ধরনের কাজ গুনাহ ও মিথ্যা সাক্ষ্যের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে, যার জন্য তওবা জরুরি।
আরবি ইবারত:
وَالْكِتَابَةُ لَا تَكُونُ إِيجَابًا وَلَا قَبُولًا فِي النِّكَاحِ "লিখন নিকাহে ইজাব বা কবুল হিসেবে গণ্য হয় না।" — (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৪, পৃ. ৯৭)
لَوْ كَتَبَ: زَوَّجْتُكَ بِنْتِي، لَمْ يَصِحَّ النِّكَاحُ "যদি কেউ লেখে: 'আমি আমার মেয়েকে তোমার সাথে বিবাহ দিলাম', তাহলে নিকাহ সহীহ হবে না।" — (আল-হিদায়া, খণ্ড ১, পৃ. ২৩৫)
প্রশ্ন ৪: ছেলে যদি শুধু বলে, "এখানে সাইন কর", আর মেয়ে কোনো কথা না বলে সাইন করে—এটি কি শরিয়তের দৃষ্টিতে ইজাব-কবুল হিসেবে গণ্য হবে?
উত্তর: না, এটি ইজাব-কবুল হিসেবে গণ্য হবে না।
"এখানে সাইন কর" — এটি কোনো ইজাব (বিবাহের প্রস্তাব) নয়। আর মেয়ের সাইন করা কোনো কবুল (গ্রহণ) নয়। কারণ:
- ইজাবে স্পষ্টভাবে বিবাহের প্রস্তাব থাকতে হবে।
- কবুলে স্পষ্টভাবে গ্রহণ থাকতে হবে।
- সাইন করা বা লিখে দেওয়া ইজাব-কবুল নয়।
আরবি ইবারত:
وَلَا يَصِحُّ الْقَبُولُ بِالْكِتَابَةِ وَلَا بِالْإِشَارَةِ مَعَ الْقُدْرَةِ عَلَى النُّطْقِ "কথা বলার সামর্থ্য থাকা অবস্থায় লেখা বা ইশারার মাধ্যমে কবুল সহীহ হয় না।" — (ফাতাওয়া আলমগীরী, খণ্ড ১, পৃ. ২৭৮)
وَلَوْ قَالَ: اكْتُبْ هَذَا، لَا يَكُونُ إِيجَابًا "যদি কেউ বলে: 'এটি লেখ', তাহলে তা ইজাব হবে না।" — (বাদায়েউস সানায়ে, খণ্ড ২, পৃ. ২৩৫)
প্রশ্ন ৫: "স্বামী/Husband" ও "স্ত্রী/Wife" ঘরে নিজেদের নাম লেখা এবং উভয়ের স্বাক্ষর করা—কোনো মৌখিক ইজাব-কবুল ছাড়া—হানাফি মাযহাব অনুযায়ী নিকাহ সংঘটনের জন্য যথেষ্ট কি না?
উত্তর: না, কখনোই যথেষ্ট নয়।
হানাফি মাযহাব অনুযায়ী নিকাহ সংঘটনের জন্য মৌখিক ইজাব-কবুল অপরিহার্য। শুধু লিখিতভাবে নাম লেখা বা স্বাক্ষর করা নিকাহ সংঘটনের জন্য যথেষ্ট নয়।
আরবি ইবারত:
وَالْأَصْلُ فِي النِّكَاحِ أَنَّهُ لَا يَنْعَقِدُ إِلَّا بِالْإِيجَابِ وَالْقَبُولِ بِاللَّفْظِ "নিকাহের মূলনীতি হলো: এটি শুধু মৌখিক ইজাব ও কবুলের মাধ্যমে সংঘটিত হয়।" — (আল-হিদায়া, খণ্ড ১, পৃ. ২৩১)
وَلَا يَنْعَقِدُ النِّكَاحُ بِالْكِتَابَةِ عِنْدَ أَبِي حَنِيفَةَ وَأَبِي يُوسُفَ وَمُحَمَّدٍ "ইমাম আবু হানিফা, ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর মতে লিখন দ্বারা নিকাহ সংঘটিত হয় না।" — (বাদায়েউস সানায়ে, খণ্ড ২, পৃ. ২৩০; রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৪, পৃ. ৯৭)
প্রশ্ন ৬: যদি কাগজে শুধু স্বামী-স্ত্রীর পরিচয় ও নাম লেখা থাকে, কিন্তু "বিবাহ করলাম", "গ্রহণ করলাম", "কবুল করলাম" ইত্যাদি কোনো শব্দ না থাকে, তাহলে তার হুকুম কী?
উত্তর: এ অবস্থায় কোনো নিকাহই সংঘটিত হয়নি। কারণ ইজাব-কবুলের স্পষ্ট বাক্য না থাকলে নিকাহ হয় না।
আরবি ইবারত:
وَلَوْ لَمْ يَكُنْ فِي الْكِتَابِ لَفْظُ الْإِيجَابِ وَالْقَبُولِ، لَا يَصِحُّ النِّكَاحُ "যদি কাগজে ইজাব-কবুলের শব্দ না থাকে, তাহলে নিকাহ সহীহ হয় না।" — (ফাতাওয়া আলমগীরী, খণ্ড ১, পৃ. ২৭৭)
প্রশ্ন ৭: রিসেপশনে উপস্থিত দুইজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি যদি তাদের এই কথাবার্তা/লিখিত কার্যক্রম দেখে থাকে, তাহলে তারা কি নিকাহের সাক্ষী হিসেবে গণ্য হবে?
উত্তর: না, তারা নিকাহের সাক্ষী হিসেবে গণ্য হবে না।
নিকাহের সাক্ষী হওয়ার জন্য শর্ত হলো: ১. ইজাব-কবুল শ্রবণ করা। ২. নিকাহের বিষয়টি জানা। ৩. ইজাব-কবুল একই মজলিসে শোনা।
যেহেতু এখানে কোনো ইজাব-কবুলই হয়নি, তাই তারা সাক্ষী হিসেবে গণ্য হবে না।
আরবি ইবারত:
وَيُشْتَرَطُ فِي الشَّاهِدَيْنِ: سَمَاعُ الْإِيجَابِ وَالْقَبُولِ، وَالْعِلْمُ بِالنِّكَاحِ "সাক্ষীদ্বয়ের মধ্যে শর্ত হলো: ইজাব-কবুল শ্রবণ করা এবং নিকাহ সম্পর্কে জানা।" — (আল-হিদায়া, খণ্ড ১, পৃ. ২৩৩)
وَلَوْ حَضَرَ الشَّاهِدَانِ وَلَمْ يَسْمَعَا الْإِيجَابَ وَالْقَبُولَ، لَا يَصِحُّ النِّكَاحُ "যদি দুইজন সাক্ষী উপস্থিত থাকে কিন্তু ইজাব-কবুল না শোনে, তাহলে নিকাহ সহীহ হয় না।" — (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৪, পৃ. ১০১)
প্রশ্ন ৮: উপরোক্ত পুরো ঘটনার ভিত্তিতে—হানাফি মাযহাব অনুযায়ী—তাদের মধ্যে তখন কোনো নিকাহই হয়নি, নাকি ফাসিদ নিকাহ হয়েছে, নাকি সহীহ নিকাহ হয়েছে—কোনটি সঠিক?
উত্তর: কোনো নিকাহই হয়নি (لا نكاح أصلاً)।
কারণ:
- স্পষ্ট মৌখিক ইজাব-কবুল হয়নি।
- শুধু স্বামী-স্ত্রী পরিচয় দেওয়া ও নাম লেখা ইজাব-কবুল নয়।
- "সাইন কর" বলা ও সাইন করা ইজাব-কবুল নয়।
- সাক্ষীরা ইজাব-কবুল শোনেনি (কারণ ইজাব-কবুলই হয়নি)।
আরবি ইবারত:
فَإِذَا لَمْ يُوجَدْ إِيجَابٌ وَلَا قَبُولٌ، فَلَا نِكَاحَ "যখন ইজাব-কবুল পাওয়া যায় না, তখন কোনো নিকাহ নেই।" — (বাদায়েউস সানায়ে, খণ্ড ২, পৃ. ২৩০)
وَالنِّكَاحُ الْفَاسِدُ إِنَّمَا يَكُونُ إِذَا وُجِدَ الْإِيجَابُ وَالْقَبُولُ مَعَ فَقْدِ شَرْطٍ مِنْ شُرُوطِ الصِّحَّةِ "ফাসিদ নিকাহ তখনই হয় যখন ইজাব-কবুল পাওয়া যায় কিন্তু সহীহ হওয়ার কোনো শর্ত অনুপস্থিত থাকে।" — (আল-হিদায়া, খণ্ড ১, পৃ. ২৪০)
সিদ্ধান্ত: এখানে ইজাব-কবুলই হয়নি, তাই না সহীহ নিকাহ, না ফাসিদ নিকাহ — বরং কোনো নিকাহই হয়নি।
যেহেতু নিকাহই হয়নি,তাই তালাকর কোনো প্রশ্নই উঠেনা।