স্বামীকে অবহেলা করে বউর জন্য সমাজ সেবায় ব্যস্ত থাকা কি শরীয়ত সম্মত?

Family Life · Hanafi

Question No: 6501
Questioner: tahmid miah
Question Asked: 06 Oct 2026, 09:50 PM
Reviewed & Published: 06 Oct 2026, 10:26 PM
Views: 32
Tokens: 5,946
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আমার বান্ধবি লিখে দেন ,
আমার মা সমাজসেবায় খুব ব্যস্ত। আত্মীয়-স্বজনের বিপদে সবসময় ছুটে যান, কিন্তু নিজের সংসারের প্রতি তেমন খেয়াল রাখেন না, ঘরের কাজ করেন ,শুধু স্বামীর প্রতি গাফেল ,তার অনুমতি ছাড়া চলে যান অন্যের কাজে ,অথচ স্বামীর প্রয়োজনে অবহেলা , অনেক আত্মীয়ও শুধু প্রয়োজনের সময় তাঁকে মনে করে। আমি এসব বললেই মা আমাকে হিংসুক বলেন। আমি কি এভাবে বললে গুনাহগার হব? আমি নাকি উনার আত্মীয় দের আহ্লাদ দেখা পছন্দ করি না ,
অবশ্য আমার খুব খারাপ লাগে , মাঝে মাঝে অনেক রাগ হয় , আত্মীয়রা শুধু তাদের প্রয়োজনে আমাদের খবর করে , আমার এরকম রাগা কি ঠিক ? না গুনাহ হবে ? আর উনার স্বামী উনার অসুখ এর টাকা দিলে উনি উনার আত্মীয় দের দিয়ে দেন তাদের বিপদে , অনেক দরদী ,অথচ আল্লাহর বাকি বিধানে গাফেল ।

Answer

প্রশ্নের উত্তর

বিষয়: মায়ের সমাজসেবা, স্বামীর অবহেলা এবং সন্তানের রাগ সম্পর্কে ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি


ভূমিকা

আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল। এখানে কয়েকটি দিক রয়েছে:

১. মায়ের সমাজসেবা ও আত্মীয়দের প্রতি দায়িত্ব ২. স্বামীর অধিকার ও অনুমতি ছাড়া বাইরে যাওয়া ৩. সন্তানের কর্তব্য ও মায়ের প্রতি আচরণ ৪. রাগ ও অভিযোগের শরীয়তসম্মত সীমা


১. স্ত্রীর উপর স্বামীর অধিকার (হুকুকুল আওলাদ)

আল্লাহ তা'আলা কুরআনে বলেন:

"পুরুষরা নারীদের উপর কর্তৃত্বশীল (তত্ত্বাবধায়ক), কারণ আল্লাহ তাদের এককে অপরের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন..." — (সূরা আন-নিসা: ৩৪)

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

"যদি আমি কাউকে আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে সিজদা করার আদেশ দিতাম, তবে আমি স্ত্রীকে তার স্বামীকে সিজদা করার আদেশ দিতাম।" — (সুনানে তিরমিযী: ১১৫৯, হাসান সহীহ)

আরও ইরশাদ হয়েছে:

"নারীর জন্য তার স্বামীর অধিকার সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ।" — (মুসনাদে আহমাদ)

স্বামীর অনুমতি ছাড়া বাইরে যাওয়া:

হানাফী ফিকহ অনুযায়ী, স্ত্রী স্বামীর অনুমতি ছাড়া ঘর থেকে বাইরে যেতে পারবে না — যদি না তা শরীয়তসম্মত জরুরি প্রয়োজন হয় (যেমন: চিকিৎসা, মাহরাম আত্মীয়ের জানাযা ইত্যাদি)।

আল-হিদায়া ও রাদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ আছে:

"স্ত্রীর জন্য স্বামীর অনুমতি ব্যতীত ঘর থেকে বের হওয়া জায়েয নয়, এমনকি পিতা-মাতার রোগ-শোকের সময়ও — যদি না স্বামী অনুমতি দেয়।" — (রাদ্দুল মুহতার: ৩/৫৯৯, আল-হিদায়া: ২/৩২৮)

তবে পিতা-মাতার সেবা ইসলামে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু স্ত্রীর ক্ষেত্রে স্বামীর অধিকার প্রাধান্য পায় — কারণ রাসূল ﷺ বলেছেন:

"স্ত্রী যদি তার স্বামীর অধিকার আদায় করে, তবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।" — (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)


২. আত্মীয়দের প্রতি দায়িত্ব ও সমাজসেবা

ইসলামে আত্মীয়দের সাথে সদ্ব্যবহার (সিলাতুর রাহিম) অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ। আল্লাহ বলেন:

"আত্মীয়-স্বজনকে তাদের হক আদায় করো..." — (সূরা আর-রূম: ৩৮)

রাসূল ﷺ বলেছেন:

"যে ব্যক্তি আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।" — (সহীহ মুসলিম: ২৫৫৬)

কিন্তু — এই সেবা ও আত্মীয়তার দায়িত্ব স্বামীর অধিকার ও অনুমতির সীমার ভেতরে হতে হবে। স্বামীর অনুমতি ছাড়া বাইরে গিয়ে সেবা করা — যদিও নিয়ত ভালো — তবুও স্বামীর হক নষ্ট করার কারণে তা গুনাহের কারণ হতে পারে।

ফাতাওয়া উসমানী-তে উল্লেখ আছে:

"স্ত্রী যদি স্বামীর অনুমতি ছাড়া আত্মীয়দের সেবায় ব্যস্ত থাকে এবং স্বামীর হক নষ্ট করে, তবে সে গুনাহগার হবে।" — (ফাতাওয়া উসমানী: ২/৩৩২)


৩. সন্তানের কর্তব্য — মায়ের প্রতি আচরণ

আপনার মায়ের প্রতি আপনার সর্বোচ্চ সম্মান ও ভদ্রতা বজায় রাখা ফরজ। আল্লাহ বলেন:

"তোমার রব আদেশ দিয়েছেন যে, তোমরা তিনি ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করবে না এবং পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করবে।" — (সূরা আল-ইসরা: ২৩)

রাসূল ﷺ বলেছেন:

"মায়ের প্রতি সদ্ব্যবহার করো, তারপর মায়ের, তারপর মায়ের, তারপর পিতার।" — (সহীহ বুখারী: ৫৯৭১, সহীহ মুসলিম: ২৫৪৮)

মায়ের সাথে রূঢ় ভাষায় কথা বলা, তাকে "হিংসুক" বলা বা তার সেবাকে খাটো করা — এগুলো ইসলামে নিষিদ্ধ। এমনকি যদি মা ভুল করেন, তবুও সন্তানের কর্তব্য হলো ভদ্রভাবে, সম্মানের সাথে নসীহত করা — কঠোর ভাষায় নয়।

আল্লাহ বলেন:

"তোমরা তাদের (পিতা-মাতার) সাথে 'উফ' শব্দটিও বলো না এবং তাদের ধমক দিও না; বরং তাদের সাথে সম্মানজনক কথা বলো।" — (সূরা আল-ইসরা: ২৩)


৪. আপনার রাগ ও অভিযোগ সম্পর্কে

আপনার রাগ কি ঠিক?

রাগ দুই ধরনের:

১. শরীয়তসম্মত রাগ: যখন কেউ আল্লাহর হুকুম লঙ্ঘন করে — যেমন স্বামীর হক নষ্ট করা, অনুমতি ছাড়া বের হওয়া। এই রাগ নীতিগতভাবে ঠিক, তবে তা মায়ের প্রতি অসম্মান বা কঠোর ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না।

২. নফসানী রাগ: হিংসা, আত্মীয়দের প্রতি ঈর্ষা বা ব্যক্তিগত অসন্তুষ্টি থেকে উৎপন্ন রাগ — এটি গুনাহ।

আপনার করণীয়:

| করণীয় | বর্জনীয় | |--------|---------| | মাকে ভদ্রভাবে বুঝানো | কঠোর ভাষায় বলা | | দুআ করা মায়ের হেদায়েতের জন্য | মাকে "হিংসুক" বলা বা গালি দেওয়া | | পিতার সাথে পরামর্শ করা | আত্মীয়দের নিয়ে মায়ের সাথে ঝগড়া | | ধৈর্য ধারণ করা | রাগের বশে অপমান করা | | মায়ের সেবা করা | মায়ের সেবাকে খাটো করা |


৫. স্বামীর টাকা আত্মীয়দের দেওয়া প্রসঙ্গে

স্বামী যদি নিজের ইচ্ছায় স্ত্রীকে টাকা দেন এবং স্ত্রী তা আত্মীয়দের দান করেন — তবে দান হিসেবে তা জায়েয, যদি না স্বামী তা নিষেধ করেন। কিন্তু যদি স্বামী নির্দিষ্ট প্রয়োজনে (যেমন: নিজের চিকিৎসা) টাকা দেন এবং স্ত্রী তা অন্যত্র দান করেন — তবে তা আমানতের খিয়ানত এবং গুনাহ।

আল্লাহ বলেন:

"নিশ্চয়ই আল্লাহ আমানতদারদেরকে তাদের আমানত আদায় করার আদেশ দেন..." — (সূরা আন-নিসা: ৫৮)


৬. চূড়ান্ত পরামর্শ

১. মায়ের সাথে কখনো কঠোর ভাষায় কথা বলবেন না। বরং ভালোবাসা ও সম্মানের সাথে বুঝান।

২. পিতার সাথে পরামর্শ করুন — তিনি মায়ের স্বামী, তিনিই সবচেয়ে ভালো বুঝতে পারবেন।

৩. মায়ের জন্য দুআ করুন — আল্লাহ তাকে হেদায়েত দিন এবং তাকে স্বামীর হক আদায় করার তাওফিক দিন।

৪. নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করুন — রাসূল ﷺ বলেছেন:

"শক্তিশালী সেই ব্যক্তি নয় যে কুস্তিতে জয়ী হয়; বরং শক্তিশালী সেই ব্যক্তি যে রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে।" — (সহীহ বুখারী: ৬১১৪)

৫. আত্মীয়দের প্রতি হিংসা করবেন না — বরং তাদের সেবা করুন, তবে শরীয়তের সীমার ভেতরে।

৬. মায়ের সেবা করা আপনার জন্য সদকায়ে জারিয়া — মায়ের প্রতি সদ্ব্যবহার করুন, এমনকি যদি তিনি ভুল করেন।


সারসংক্ষেপ

| প্রশ্ন | উত্তর | |--------|-------| | মা স্বামীর অনুমতি ছাড়া বাইরে যান — এটা কি ঠিক? | না, এটি শরীয়তবিরোধী। স্বামীর অনুমতি ছাড়া বের হওয়া জায়েয নয়। | | মা স্বামীর হক নষ্ট করছেন — এটা কি গুনাহ? | হ্যাঁ, গুনাহ। স্বামীর হক আদায় করা স্ত্রীর উপর ফরজ। | | আপনি মাকে "হিংসুক" বললে গুনাহগার হবেন? | হ্যাঁ, যদি কঠোর ভাষায় বলেন। মায়ের সাথে সম্মানজনক কথা বলা ফরজ। | | আপনার রাগ কি ঠিক? | নীতিগত রাগ ঠিক, তবে তা ভদ্রভাবে প্রকাশ করতে হবে। ব্যক্তিগত হিংসা বা অপমান করা যাবে না। | | আপনার করণীয় কী? | ভদ্রভাবে নসীহত, দুআ, পিতার সাথে পরামর্শ, ধৈর্য। |


মূল কথা: আপনার মায়ের সমাজসেবা ও আত্মীয়দের প্রতি দরদ ভালো কাজ, কিন্তু স্বামীর হক নষ্ট করা যাবে না। আপনি ভালোবাসা ও সম্মানের সাথে তাকে বুঝানোর চেষ্টা করুন, কঠোর ভাষায় নয়। আর আপনার রাগ নীতিগত হলে তা ঠিক, কিন্তু মায়ের প্রতি অসম্মান করা কখনোই জায়েয নয়।


والله أعلم بالصواب


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.