ইসলামে গর্ভপাতের বিধান কী? দেড় মাসের ভ্রূণ নষ্ট করা যাবে কি?
Halal and Haram · Hanafi
Question
এমতাবস্থায় রিজিকের ভয় ছাড়া দেড় মাসের ভ্রুন নষ্ট করা যাবে কি না
এমতাবস্থায়
Answer
ভ্রূণ নষ্ট করা প্রসঙ্গে
উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته।
প্রশ্নে বর্ণিত অবস্থায় — অর্থাৎ মহিলার শরীর দুর্বল, পূর্বে তিনটি সিজারিয়ান হয়েছে, স্বামী প্রবাসে, সংসারের সব দায়িত্ব একা বহন করতে হয়, পাঁচটি ছোট বাচ্চা — এসব কারণে শুধু কষ্ট বা রিজিকের ভয়ের কারণে দেড় মাসের ভ্রূণ নষ্ট করা শরীয়তসম্মত নয়। এটি গুনাহের কাজ।
তবে যদি বিশ্বস্ত মুসলিম বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এটা স্পষ্টভাবে বলে দেন যে, গর্ভ ধারণ ও প্রসব মহিলার জীবননাশের আশঙ্কা তৈরি করবে (শুধু কষ্ট বা দুর্বলতা নয়, বরং মৃত্যুর প্রবল আশঙ্কা), তাহলে ভিন্ন বিধান হবে — সেক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শে ভ্রূণ নষ্ট করার অনুমতি থাকতে পারে।
বিস্তারিত আলোচনা
১. মূল নীতি: গর্ভপাত মূলত নিষিদ্ধ
ইসলামে সন্তান আল্লাহর পক্ষ থেকে রিজিক ও রহমত। কুরআনে আল্লাহ বলেন:
وَلَا تَقْتُلُوا أَوْلَادَكُمْ خَشْيَةَ إِمْلَاقٍ ۖ نَحْنُ نَرْزُقُهُمْ وَإِيَّاكُمْ "তোমরা দারিদ্র্যের ভয়ে তোমাদের সন্তানদের হত্যা করো না; আমিই তাদের রিজিক দিই এবং তোমাদেরও।" — (সূরা আল-ইসরা: ৩১)
وَلَا تَقْتُلُوا النَّفْسَ الَّتِي حَرَّمَ اللَّهُ إِلَّا بِالْحَقِّ "আল্লাহ যাকে হত্যা করা হারাম করেছেন, অন্যায়ভাবে তাকে হত্যা করো না।" — (সূরা আল-আনআম: ১৫১)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
لَا ضَرَرَ وَلَا ضِرَارَ "নিজের ক্ষতি করো না, অন্যেরও ক্ষতি করো না।" — (সুনানে ইবনে মাজাহ: ২৩৪১; মুসনাদে আহমাদ)
২. হানাফি ফিকহের বিধান — ভ্রূণের পর্যায়ভেদে
হানাফি মাযহাবে গর্ভপাতের বিধান ভ্রূণের বয়স ও অবস্থার উপর নির্ভর করে:
| পর্যায় | সময় | বিধান | |---|---|---| | প্রথম পর্যায় | ৪ মাস (১২০ দিন) পূর্ণ হওয়ার আগে | ভ্রূণে প্রাণ সঞ্চার হয়নি; তবে কোনো শরয়ি ওজর ছাড়া নষ্ট করা মাকরূহ তাহরিমি বা নাজায়েয | | দ্বিতীয় পর্যায় | ৪ মাসের পর | প্রাণ সঞ্চার হয়ে যায়; গর্ভপাত করা হারাম, হত্যার সমান |
আল্লামা ইবনে আবিদিন (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ উল্লেখ করেন:
وَلَوْ أَلْقَتْ عَلَقَةً أَوْ مُضْغَةً لَا يُعْتَبَرُ... إِلَّا بَعْدَ نَفْخِ الرُّوحِ "রক্তপিণ্ড বা মাংসপিণ্ড অবস্থায় নষ্ট হলে হত্যার হুকুম নেই, তবে রূহ ফুঁকে দেওয়ার পর (৪ মাস পর) তা হত্যা হিসেবে গণ্য হবে।" — (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৩, কিতাবুল জিনায়াত)
ফতোয়ায়ে আলমগিরি-তে এসেছে:
إِسْقَاطُ الْحَمْلِ بَعْدَ نَفْخِ الرُّوحِ حَرَامٌ "রূহ ফুঁকে দেওয়ার পর গর্ভপাত করা হারাম।" — (ফতোয়ায়ে আলমগিরি, খণ্ড ৫)
৩. দেড় মাসের ভ্রূণের ক্ষেত্রে
দেড় মাস = প্রায় ৪৫ দিন। এ পর্যায়ে ভ্রূণ আলাকা (রক্তপিণ্ড) বা মুদগা (মাংসপিণ্ড) অবস্থায় থাকে, এখনো রূহ ফুঁকে দেওয়া হয়নি। তাই এটি হত্যার সমান নয় — কিন্তু শরয়ি ওজর ছাড়া নষ্ট করা জায়েয নয়।
মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) «ফতোয়ায়ে উসমানি»-তে বলেন:
"শুধু অর্থনৈতিক সমস্যা, সন্তান লালন-পালনের কষ্ট বা সামাজিক অসুবিধার কারণে গর্ভপাত করা জায়েয নয়। হ্যাঁ, যদি চিকিৎসকের মতে মায়ের জীবন সংকটাপন্ন হয়, তাহলে ভিন্ন কথা।" — (ফতোয়ায়ে উসমানি, খণ্ড ২, কিতাবুল হাযর ওয়াল ইবাহা)
মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) «মাআরিফুল কুরআন»-এ সূরা ইসরার ৩১ নম্বর আয়াতের তাফসিরে বলেন:
"দারিদ্র্যের ভয় করা আল্লাহর উপর ভরসার অভাব। আল্লাহ সন্তানের রিজিকের দায়িত্ব নিয়েছেন।"
৪. প্রশ্নের অবস্থার বিশ্লেষণ
প্রশ্নে যা যা বলা হয়েছে:
- ✅ মহিলা দুর্বল, ৩টি সিজার
- ✅ স্বামী প্রবাসে, একা সংসার সামলান
- ✅ ৫টি ছোট বাচ্চা, কেউ সাহায্যকারী নেই
- ✅ পিরিয়ড বন্ধ ১.৫ মাস
এগুলো কষ্ট ও কঠিনতা বটে, কিন্তু জীবননাশের আশঙ্কা হিসেবে প্রমাণিত নয়। তাই এ অবস্থায় ভ্রূণ নষ্ট করা জায়েয হবে না।
তবে হ্যাঁ — যদি নির্ভরযোগ্য মুসলিম বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক (স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ) স্পষ্টভাবে সতর্ক করেন যে:
- ৩টি সিজারের পর ৪র্থ গর্ভধারণে জরায়ু ফেটে যাওয়ার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে,
- অথবা মহিলার জীবন রক্ষার জন্য গর্ভপাত অপরিহার্য,
তাহলে জীবন রক্ষার প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শে গর্ভপাতের অনুমতি থাকবে। কারণ ইসলামে "দাফউল মাফাসিদ" (ক্ষতি দূর করা) একটি স্বীকৃত নীতি, এবং মায়ের জীবন সন্তানের চেয়ে অগ্রাধিকারযোগ্য।
করণীয় ও পরামর্শ
-
আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন — রিজিকের ভয় পরিত্যাগ করুন। আল্লাহ বলেন: "আমিই রিজিক দিই।"
-
বিশ্বস্ত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন — শুধু কষ্টের কারণে নয়, বরং জীবননাশের আশঙ্কা আছে কি না তা নিশ্চিত করুন।
-
সাহায্যের ব্যবস্থা করুন — স্থানীয় মসজিদ, আত্মীয়, প্রতিবেশী বা ইসলামিক সংগঠনের মাধ্যমে সাহায্য নিন।
-
দোয়া করুন — আল্লাহর কাছে সাহায্য ও সহজতা প্রার্থনা করুন।
-
গর্ভপাতের সিদ্ধান্ত নিলে — অবশ্যই মুফতি/আলেমের সাথে সরাসরি পরামর্শ করে নিন, কারণ এটি গুরুতর মাসআলা।
সারসংক্ষেপ
| প্রশ্ন | উত্তর | |---|---| | শুধু কষ্ট/রিজিকের ভয়ে দেড় মাসের ভ্রূণ নষ্ট করা যাবে? | না, জায়েয নয় | | চিকিৎসক জীবননাশের আশঙ্কা বললে? | জায়েয হতে পারে (চিকিৎসকের পরামর্শে) | | ৪ মাসের পর? | কোনো অবস্থাতেই জায়েয নয় (জীবন রক্ষার প্রয়োজনে ভিন্ন) |
والله أعلم بالصواب