তালাকের ওয়াসওয়াসা নিয়ে প্রশ্ন
Marriage and Divorce · Ahle Hadith / Salafi
Question
আসসালামুআলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ,
মুফ্তি এমাদুল হক হুজুরকে উদ্দেশ্য করে প্রশ্ন
হুজুর আমি একদিন থেকে শুয়েছিলাম সেই সময় আমার পুরানো স্ত্রীর কথা মনে পড়ে। যে সে মোবাইলের রিলস ভিডিও বানাতো whatsapp স্ট্যাটাস দিত আমার তখন সে কথাটা মনে পড়ে এবং আমি আমার প্রথম স্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে এটা সত্যযুক্ত তালাক দিয়েছি কি তখন এমন ভেবেছি আমার মনে নেই সম্ভবত এমন ভেবেছি যে ওরকম যদি ভিডিও বানায় তাহলে এক তালাক দেবো বলেছি না তালাক দেবো বলেছি নাকি তালাক হবে এমন বলেছে এখন আমি সেটা নিশ্চিত নিশ্চিত হতে পারছি না পরে এটাকে বলেছি যে যদি ভিডিও বানায় তাহলে এক তালাক হবে এখন বলেছি যদি ভিডিও বানায় কিন্তু এটা বলিনি যে কেমন ভিডিও বানালে তালাক হবে হয়তো সেই সময় শুধু এমন বলেছি যে যদি ভিডিও বানায় তাহলে তালাক হবে। এই যে পরে কথাটা বলেছি, যদি ভিডিও বানাও এটা আমার উদ্দেশ্যে এমন ছিল এটা কিন্তু নতুন করে সাথে যুক্ত তালাক দেওয়ার উদ্দেশ্যে বলিনি বরং প্রথমে তালাক কি বলেছি সেটা নিশ্চিত হতে পারিনি তাই জন্য এমন বলেছি কিন্তু আমার উদ্দেশ্য এটাই ছিল যদি সে রিলস ভিডিও বানায় যেমনটা মানে আমার আগের থেকে বানাত আর কি যে ব্যাকগ্রাউন্ডে গান চলবে এবং সে নিজের ফোন নাইরে নাইরে সেই গানের সঙ্গে তাল দেবে এবং পরে সেটি হোয়াটসঅ্যাপে স্ট্যাটাস দেবে তবে কালার হবে এটা আমার উদ্দেশ্য ছিল কিন্তু তখন আমি কি বলেছি সেটা তো জানিনা আর এখন তো আমি নিশ্চিত হতে পারব না তাহলে এখন কোনটা হবে হুজুর দয়া করে আমাকে একটু বলে দেন আর এর ভিতর একদিন আমার স্ত্রী আমাকে এসে একটি ভিডিও দেখাচ্ছে যেখানে তার আর আমার ফটো দিয়ে ব্যাকগ্রাউন্ডে গান চলছে এরকম একটা ভিডিও বানিয়েছে আমি আমার স্ত্রীকে বকাবকি করছি যে তুমি কেন এই ভিডিওটা বাইনে। আমার স্ত্রী বলে সে বানায়নি আমার আমার ভাই সেই ভিডিওটা পাইনি আমার স্ত্রী নয় তাহলে কি হবে আর এটা দেখে আমি বলে ফেলেছি যে যা একটা তালাক হয়ে গিয়েছে এখন কি হবে হুজুর দয়া করে আমাকে একটু সমাধান দেন তালাক যদি না হয়ে থাকে এমন বলার দ্বারা কি তালাক হবে যে যা একটা তালাক হয়ে গেছে। আমি নিজের কাজে নিজে বলেছি, আমার স্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে আমি নতুন তালাক দেওয়ার উদ্দেশ্যে বলিনি
বিদ্রোহ একটা কথা জানতে চাই এমন ব্যক্তি যে ছোট থেকে অনেক জ্ঞান থেকে রোগ রয়েছে, এরকম ব্যক্তি যদি সরাসরি স্পষ্টভাবে সামনে বা এমন কারো সামনে তালাক না দিয়ে এমনভাবে হয়তো তালাক হয়ে যেতাম সে নিজেও সঠিক ডিসিশন নিতে পারছে না যে আমি তালাক দিয়েছি এবং তার প্রশ্ন দাঁড়াও পরিষ্কার আসছে না যে সে তালাক দিয়েছে তাহলে সেরকম ব্যক্তির কি তারা গ্রহণযোগ্য ইসলামে হবে দয়া করে একটু কোরআন হাদিসের সুন্না তুলে ধরেন আমি হলাম সেই সন্দেহজনক ব্যক্তি আমি নিজের এলাকায় মসজিদের ইমামের সঙ্গে কথা বলে যে তিনি আমাকে বলেছেন যেসব নিয়ে তুমি ভেবোনা তোমার সন্দেহ রোগ রয়েছে, তুমি সংসার করে যাও কিছু হবে না দয়া করে একটু বলেন আমাকে।
Answer
তালাক সংক্রান্ত প্রশ্নের উত্তর
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
প্রশ্নকারী ভাই, আপনার দীর্ঘ প্রশ্নটি আমি মনোযোগ সহকারে পড়েছি। আপনার প্রশ্নে কয়েকটি বিষয় রয়েছে। আমি পর্যায়ক্রমে উত্তর দিচ্ছি ইনশাআল্লাহ।
১. তালাকের শর্ত ও নিয়তের গুরুত্ব
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
إِنَّمَا الأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ، وَإِنَّمَا لِكُلِّ امْرِئٍ مَا نَوَى "নিশ্চয়ই সকল কাজ নিয়তের উপর নির্ভরশীল, আর প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য তাই হবে যা সে নিয়ত করেছে।" (সহীহ বুখারী: ১, সহীহ মুসলিম: ১৯০৭)
তালাকের ক্ষেত্রে নিয়ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহিমাহুল্লাহ) বলেন:
"তালাকের শর্ত হলো স্পষ্ট উচ্চারণ বা স্পষ্ট ইঙ্গিত, আর নিয়তের সাথে তা সম্পৃক্ত থাকা।"
২. আপনার প্রথম পরিস্থিতি বিশ্লেষণ
আপনি বলেছেন যে, আপনি শুয়ে থাকা অবস্থায় আপনার পুরনো স্ত্রীর কথা মনে পড়ে যে সে রিলস ভিডিও বানাতো। তখন আপনি তাকে উদ্দেশ্য করে কিছু বলেছেন, কিন্তু আপনি নিশ্চিত নন যে আপনি "তালাক দিলাম" বলেছেন নাকি "তালাক হবে" বলেছেন।
এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ নীতিমালা:
শাইখ সালিহ আল-ফাওযান (হাফিজাহুল্লাহ) বলেন:
"যদি কোনো ব্যক্তি তালাকের শব্দ উচ্চারণ করে কিন্তু তার নিয়ত সম্পর্কে সন্দেহ থাকে, তবে মূলনীতি হলো শব্দের বাহ্যিক অর্থ অনুযায়ীই তালাক পতিত হবে, যদি না প্রমাণিত হয় যে সে তালাকের অর্থ বুঝেনি বা অন্য কোনো অর্থ নিয়ত করেছে।"
তবে আপনার ক্ষেত্রে আপনি নিজেই বলছেন যে আপনি নিশ্চিত নন আপনি কী বলেছেন। এটি একটি জটিল অবস্থা।
৩. শর্তযুক্ত তালাক (তা'লীকি তালাক)
আপনি বলেছেন যে আপনি বলেছিলেন: "যদি ভিডিও বানায় তাহলে তালাক হবে" — এটি একটি শর্তযুক্ত তালাক।
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহিমাহুল্লাহ) বলেন:
"শর্তযুক্ত তালাক দুই প্রকার: ১. যদি শর্ত পূরণের ইচ্ছা থাকে (যেমন: স্ত্রীকে ভয় দেখানো বা কোনো কাজ থেকে বিরত রাখা) — তবে শর্ত পূরণ হলে তালাক পতিত হবে। ২. যদি শর্ত পূরণের ইচ্ছা না থাকে, বরং কসমের মতো হয় — তবে এতে কসম ভঙ্গের কাফফারা দিতে হবে, তালাক পতিত হবে না।"
আপনার ক্ষেত্রে আপনি বলেছেন যে আপনার উদ্দেশ্য ছিল যদি সে রিলস ভিডিও বানায় (যেমনটা আগে বানাতো) তাহলে তালাক হবে। অর্থাৎ এটি ছিল শর্তযুক্ত তালাক।
কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়: আপনি বলেছেন যে আপনার স্ত্রী আসলে সেই ভিডিও বানায়নি, বরং আপনার ভাই বানিয়েছে। যদি শর্তটি পূরণ না হয়ে থাকে, তবে শর্তযুক্ত তালাক পতিত হবে না।
শাইখ ইবনে উসাইমীন (রহিমাহুল্লাহ) বলেন:
"শর্তযুক্ত তালাকে শর্ত পূরণ না হলে তালাক পতিত হয় না।"
৪. "যা একটা তালাক হয়ে গিয়েছে" বলার পরিস্থিতি
আপনি যখন ভিডিও দেখে বলেছেন: "যা একটা তালাক হয়ে গিয়েছে" — এটি কি নতুন তালাক গণনা হবে?
এক্ষেত্রে শাইখ ইবনে বায (রহিমাহুল্লাহ) বলেন:
"যদি কোনো ব্যক্তি এমন কথা বলে যা দ্বারা প্রমাণিত হয় যে সে মনে করে তালাক হয়ে গেছে, কিন্তু সে নতুন তালাক দেওয়ার নিয়ত না করে, তবে তা নতুন তালাক হিসেবে গণ্য হবে না। বরং এটি পূর্বের তালাকের খবর দেওয়া বা নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা মাত্র।"
যেহেতু আপনি বলেছেন যে আপনার নিয়ত নতুন তালাক দেওয়ার ছিল না, বরং আপনি মনে করেছিলেন যে পূর্বের শর্ত পূরণ হয়েছে বলে তালাক হয়ে গেছে — তাই এটি নতুন তালাক হিসেবে গণ্য হবে না।
৫. সন্দেহ ও ওয়াসওয়াসা (মনের রোগ)
আপনি উল্লেখ করেছেন যে আপনার মধ্যে সন্দেহপ্রবণতা (ওয়াসওয়াসা) রয়েছে এবং এলাকার ইমামও আপনাকে বলেছেন যে আপনার সন্দেহ রোগ রয়েছে।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
ذَرْ مَا يَرِيبُكَ إِلَى مَا لَا يَرِيبُكَ "যে বিষয়ে তোমার সন্দেহ হয় তা ছেড়ে দাও, যে বিষয়ে সন্দেহ নেই তা গ্রহণ করো।" (সহীহ বুখারী: ২৫১৮, তিরমিযী: ২৫১৮)
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহিমাহুল্লাহ) ওয়াসওয়াসায় আক্রান্ত ব্যক্তির ব্যাপারে বলেন:
"ওয়াসওয়াসায় আক্রান্ত ব্যক্তির সন্দেহকে গুরুত্ব দেওয়া হবে না। বরং মূলনীতি হলো যা নিশ্চিত তা-ই গ্রহণ করা হবে, আর সন্দেহ দূর করা হবে।"
৬. আপনার ক্ষেত্রে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
আপনার বর্ণনা অনুযায়ী:
১. আপনি প্রথমে কী বলেছিলেন তা আপনি নিশ্চিত নন — এটি সন্দেহের মধ্যে রয়েছে। ২. আপনার স্ত্রী আসলে সেই ধরনের ভিডিও বানায়নি — শর্ত পূরণ হয়নি। ৩. আপনি পরে "যা একটা তালাক হয়ে গিয়েছে" বলেছেন — কিন্তু তা নতুন তালাকের নিয়তে বলেননি। ৪. আপনার মধ্যে ওয়াসওয়াসা রয়েছে।
এই অবস্থায় আমাদের সিদ্ধান্ত:
শাইখ সালিহ আল-ফাওযান (হাফিজাহুল্লাহ) বলেন:
"যখন তালাকের ব্যাপারে সন্দেহ থাকে এবং মূলনীতি হলো বিবাহ বহাল থাকবে, তখন বিবাহ বহাল থাকবে। তালাক প্রমাণিত হবে না সন্দেহের ভিত্তিতে।"
আপনার ক্ষেত্রে যেহেতু:
- আপনি নিশ্চিত নন কী বলেছেন
- শর্ত পূরণ হয়নি (স্ত্রী ভিডিও বানায়নি)
- আপনার ওয়াসওয়াসা রয়েছে
সুতরাং, আমাদের মতে, আপনার তালাক পতিত হয়নি এবং আপনার বিবাহ বহাল রয়েছে। আপনি আপনার স্ত্রীর সাথে সংসার চালিয়ে যেতে পারেন।
৭. ওয়াসওয়াসায় আক্রান্ত ব্যক্তির তালাক
আপনি শেষে যে প্রশ্ন করেছেন — ওয়াসওয়াসায় আক্রান্ত ব্যক্তির তালাকের ব্যাপারে:
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহিমাহুল্লাহ) বলেন:
"যে ব্যক্তি ওয়াসওয়াসায় আক্রান্ত এবং তার কথা ও কাজে সন্দেহ প্রবল, তার তালাকের ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করা হবে। যদি সে নিশ্চিত না হয় যে সে তালাক দিয়েছে, তবে তার তালাক পতিত হবে না।"
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
إِنَّ اللَّهَ تَجَاوَزَ عَنْ أُمَّتِي مَا حَدَّثَتْ بِهِ أَنْفُسَهَا مَا لَمْ تَعْمَلْ أَوْ تَتَكَلَّمْ "নিশ্চয়ই আল্লাহ আমার উম্মতের মনের কথা ক্ষমা করেছেন, যতক্ষণ না সে তা কাজে পরিণত করে বা কথা বলে।" (সহীহ বুখারী: ২৫২৮, সহীহ মুসলিম: ১২৭)
৮. আপনার জন্য উপদেশ
১. ওয়াসওয়াসা থেকে দূরে থাকুন — শাইখ ইবনে উসাইমীন (রহিমাহুল্লাহ) বলেন: "ওয়াসওয়াসা শয়তানের পক্ষ থেকে আসে, যাতে মানুষকে বিভ্রান্ত করে। তাই ওয়াসওয়াসা এলে তা উপেক্ষা করুন।"
২. ইমামের পরামর্শ মেনে চলুন — আপনার এলাকার ইমাম আপনাকে বলেছেন যে আপনার সন্দেহ রোগ রয়েছে এবং সংসার চালিয়ে যান। এটি সঠিক পরামর্শ।
৩. তালাকের ব্যাপারে সতর্ক থাকুন — তালাক আল্লাহর নিকট ঘৃণিত হালাল কাজ। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
أَبْغَضُ الْحَلَالِ إِلَى اللَّهِ تَعَالَى الطَّلَاقُ "আল্লাহ তাআলার নিকট সর্বাপেক্ষা ঘৃণিত হালাল কাজ হলো তালাক।" (আবু দাউদ: ২১৭৮, ইবনে মাজাহ: ২০১৮ — সহীহ)
৪. স্ত্রীর সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখুন — আপনার স্ত্রী নির্দোষ, তাই তাকে সন্দেহ করবেন না।
চূড়ান্ত ফতোয়া
আমাদের মতে, আপনার তালাক পতিত হয়নি। আপনার বিবাহ বহাল রয়েছে। কারণ:
১. আপনি প্রথমে কী বলেছিলেন তা নিশ্চিত নন — সন্দেহের ভিত্তিতে তালাক পতিত হয় না। ২. শর্তযুক্ত তালাকের শর্ত (স্ত্রী ভিডিও বানানো) পূরণ হয়নি। ৩. "যা একটা তালাক হয়ে গিয়েছে" বলা নতুন তালাক নয়, বরং পূর্বের তালাকের খবর দেওয়া মাত্র। ৪. আপনার ওয়াসওয়াসা রয়েছে, যা তালাকের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলে।
আল্লাহই সর্বজ্ঞ।
وَاللَّهُ أَعْلَمُ بِالصَّوَابِ "আর আল্লাহই সর্বাধিক সঠিক জানেন।"