ইসলাম নিয়ে ঠাট্টা করলে কি ঈমান চলে যায়? শয়তান নিয়ে হাসাহাসি করলে কি কুফর হয়?
Faith and Belief · Hanafi
Question
১. আমার মা একবার ফোন দেখছিল, তখন আমার বোন পুরো শরীরে কালো ড্রেস পরে(কালো জামা, কালো পায়জামা, কালো হুডি সোয়েটার) আমার মায়ের পাশে বসে ছিল। পরে আমি হাসাহাসি করছিলাম যে মনে হচ্ছে শয়তান ফোনে খারাপ জিনিস দেখতে ওয়াসওয়াসা দিচ্ছে।
এটা কি ইসলাম নিয়ে ঠাট্টা, যেজন্য ইমান চলে যাবে?
২. আরেকবার আমার একটা ছবি ছিল যেখানে আমি পায়জামাটা গোড়ালি থেকে অনেক উপরে(আমি মেয়ে) পরেছিলাম বাসায়। তো আমার বোন হাসাহাসি করছিল যে আমাদের হুজুর খালু যেমন টাখনুর উপরে পায়জামা পরে, তেমন করে পরেছে হা হা। এতে টাখনুর উপরে পরা বিধানটা নিয়ে ওর কোনোরকম ঠাট্টা ছিলনা, আমার এভাবে পরাটা নিয়ে ছিল।
এগুলো কি কুফর?
৩. আবার আমি বিয়ের ক্ষেত্রে ছেলেদের বয়স কম হওয়া বা মেয়েদেরটা বেশি হওয়াকে জায়েজ জানি। আমি কমবয়সী মেয়ের বেশিবয়সী পুরুষের সাথে বিয়ে অপছন্দ করিনা এবং কমবয়সী ছেলের বেশিবয়সী মেয়ের সাথে হলেও৷ তারা ঠিক থাকলে আমার সমস্যা কী? আমি বরং সব কেসেই কমবয়সী ছেলেদের বেশিবয়সী মেয়েকে বিয়ে করাকে পজিটিভ হিসেবেই দেখেছি। আমার নিজেরই এরকম ট্যাবু নেই যে বড় কাউকেই বিয়ে করতে হবে, ম্যাচুরিটি থাকলেই হল।
কিন্তু একবার এক লেখিকার এক গল্প পড়তে গিয়ে দুজন ছেলেমেয়ের মুখোমুখি হওয়া দেখানো হয়, মেয়েটার বয়স ২৪, ছেলেটার ১৯-২০। শুরুতে ছেলেটার মা মেয়েটাকে বলে আরে এই ছেলে তো পিচ্চি, এর সামনে পর্দা কী? তখন মেয়েটা বলে যে বালেগ তো। পরে ওই ছেলেটা মেয়েটার পর্দায় মুগ্ধ হয়ে তাকে বিয়ে করতে চায়। তো এই গল্পটা পড়ে আমার বিরক্তি আসে, মনে হয় লেখিকার এসব বিষয়ে ফেটিশ আছে। যে, হালাল হলেও তো ১৩-১৪ বছরের মেয়েদের ৪০ বছরের ছেলে বিয়ে করা দৃষ্টিকটু। বা বিধবা ভাবীর দেবরকে বিয়ে করা দৃষ্টিকটু। এই মহিলার লেখাগুলোয় কেমন যেন এসব বিষয়ই বারবার আসে, যেন জায়েজ হলেই করতে হবে। বুঝি যে জায়েজ জিনিসগুলোয় ট্যাবু রাখা উচিত না, কিন্তু মহিলার লেখার ধরণটা যেন কেমন। মানে আমি যদি আমার মায়ের কাজিনকে মামা বা আমার স্বামীর ভাইকে ভাইয়ের মত দেখি(পর্দা করব যদিও), এরপরেও কেমন তাদের প্রতি আকর্ষণ তৈরী হতে হবে জায়েজ দেখে।
কিন্তু এভাবে একজনকে দেখলেই তাকে নিয়ে ভাবতে হবে, বা এমনকি একজন ধার্মিক মহিলার অলরেডি বিয়ে হয়ে আছে একজনের সাথে, তখন থেকেই তার দেবরকে দেখানো হচ্ছে ধার্মিক আর ভালো আর তার স্বামী খারাপ। তারপর যখন মহিলার স্বামী মারা গেল বা ডিভোর্স হল তখন ওই দেবরের সাথে বিয়ে হয়। মানে যেন আগে থেকেই বোঝা যাচ্ছে দেবরই তার জন্য, যদিও তারা বিবাহিত অবস্থায় পরকীয়া করেনি।
জানিনা বোঝাতে পারলাম কীনা।
এরকম বিরক্তি আসলে কি কুফর হবে?
Answer
ইসলাম নিয়ে ঠাট্টা ও ঈমান বিধ্বংসী বিষয়সমূহ: একটি বিশ্লেষণ
ভূমিকা
ইসলামে ঈমান হলো সর্বোচ্চ ও পবিত্র আমানত। কুফর ও ঈমান বিধ্বংসী বিষয়সমূহ থেকে বেঁচে থাকা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য অপরিহার্য। কুরআন ও হাদিসে এ বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন:
وَلَئِن سَأَلْتَهُمْ لَيَقُولُنَّ إِنَّمَا كُنَّا نَخُوضُ وَنَلْعَبُ ۚ قُلْ أَبِاللَّهِ وَآيَاتِهِ وَرَسُولِهِ كُنتُمْ تَسْتَهْزِئُونَ
"আপনি যদি তাদের জিজ্ঞাসা করেন, তারা অবশ্যই বলবে, আমরা তো কেবল আলাপ-আলোচনা ও খেল-তামাশা করছিলাম। বলুন, তোমরা কি আল্লাহ, তাঁর আয়াতসমূহ ও তাঁর রাসূলকে নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করছিলে?" — (সূরা তাওবা: ৬৫)
لَا تَعْتَذِرُوا قَدْ كَفَرْتُم بَعْدَ إِيمَانِكُمْ
"অজুহাত দেখিও না, তোমরা তো ঈমান আনার পর কুফর করে ফেলেছ।" — (সূরা তাওবা: ৬৬)
এই আয়াতদ্বয় স্পষ্ট করে যে, ইসলাম বা ইসলামের কোনো বিধান নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করা কুফর, যা ঈমান বিনষ্ট করে দেয়।
প্রথম প্রশ্ন: শয়তান সম্পর্কে হাসাহাসি
প্রশ্ন: বোন কালো পোশাক পরে মায়ের পাশে বসেছিল, আপনি হাসাহাসি করে বললেন "মনে হচ্ছে শয়তান ফোনে খারাপ জিনিস দেখতে ওয়াসওয়াসা দিচ্ছে"—এটা কি ইসলাম নিয়ে ঠাট্টা, যেজন্য ঈমান চলে যাবে?
উত্তর:
এখানে বিষয়টি সূক্ষ্মভাবে বিবেচনা করতে হবে। আপনার কথার মধ্যে দুটি দিক রয়েছে:
১. শয়তানকে নিয়ে ঠাট্টা: শয়তান আল্লাহর সৃষ্টি এবং কুরআনে তার অস্তিত্ব ও কার্যাবলি সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত। শয়তানকে নিয়ে হাসি-ঠাট্টা করা সরাসরি ইসলামের মৌলিক আকিদা নিয়ে ঠাট্টার শামিল হতে পারে। তবে এখানে আপনি শয়তানের অস্তিত্ব বা তার কার্যাবলিকে অস্বীকার করেননি, বরং বোনের কালো পোশাকের সাথে শয়তানের তুলনা করে রসিকতা করেছেন।
২. ওয়াসওয়াসা প্রসঙ্গ: ওয়াসওয়াসা শয়তানের একটি বৈশিষ্ট্য, যা কুরআনে বর্ণিত:
مِن شَرِّ الْوَسْوَاسِ الْخَنَّاسِ "আত্মগোপনকারী কুমন্ত্রণাদাতার অনিষ্ট থেকে।" — (সূরা নাস: ৪)
ফিকহি বিধান: যদি আপনি শয়তানের অস্তিত্ব, তার ওয়াসওয়াসা বা ইসলামের কোনো বিধানকে অস্বীকার বা অবহেলা করে ঠাট্টা করে থাকেন, তাহলে তা কুফর হবে। কিন্তু যদি এটি নিছক বোনের পোশাক নিয়ে রসিকতা হয় এবং শয়তান বা ইসলামের কোনো বিধানকে হেয় প্রতিপন্ন করার উদ্দেশ্য না থাকে, তাহলে সাধারণত কুফর হবে না। তবে এ ধরনের রসিকতা থেকে বিরত থাকা উচিত, কারণ এটি শয়তান সম্পর্কে অসম্মানজনক ধারণা তৈরি করতে পারে।
সতর্কতা: ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) "রাদ্দুল মুহতার" গ্রন্থে উল্লেখ করেন:
"কুফর হলো এমন কথা বা কাজ যা ঈমানকে বিনষ্ট করে। আর ঠাট্টা-বিদ্রূপ যদি ইসলাম বা ইসলামের কোনো মৌলিক বিষয়কে হেয় প্রতিপন্ন করার উদ্দেশ্যে হয়, তবে তা কুফর।" (রাদ্দুল মুহতার: ৪/২২৪)
উপসংহার: আপনার এই ঘটনাটি সাধারণত কুফর নয়, তবে ভবিষ্যতে শয়তান বা ইসলামের বিষয় নিয়ে এ ধরনের রসিকতা পরিহার করুন।
দ্বিতীয় প্রশ্ন: টাখনুর উপরে পায়জামা পরা নিয়ে হাসাহাসি
প্রশ্ন: আপনি টাখনুর উপরে পায়জামা পরে ছিলেন, বোন হাসাহাসি করে বলল "হুজুর খালু যেমন টাখনুর উপরে পায়জামা পরে, তেমন করে পরেছে"—এটা কি কুফর?
উত্তর:
এখানে বিষয়টি লক্ষণীয় যে, আপনার বোন টাখনুর উপরে পায়জামা পরার বিধান নিয়ে ঠাট্টা করেনি, বরং আপনার পরার ধরন নিয়ে রসিকতা করেছে। ইসলামি বিধান অনুযায়ী:
- পুরুষদের জন্য টাখনুর নিচে কাপড় পরা নিষিদ্ধ (সূরা ইসরা: ৩২-এর ব্যাখ্যায় হাদিসে এসেছে)।
- নারীদের জন্য টাখনুর উপরে বা নিচে—উভয়ই জায়েজ, তবে সতর ঢাকা শর্ত।
ফিকহি বিধান: যেহেতু আপনার বোন ইসলামের বিধান নিয়ে ঠাট্টা করেনি, বরং আপনার ব্যক্তিগত পরার ধরন নিয়ে হাসাহাসি করেছে, তাই এটি কুফর নয়। তবে যদি কেউ ইসলামের কোনো বিধানকে হেয় প্রতিপন্ন করে বা "এটা কী বাজে নিয়ম" ইত্যাদি বলে ঠাট্টা করে, তাহলে তা কুফর হবে।
দলিল: ইমাম তাহাবি (রহ.) "শরহু মাআনিল আসার" গ্রন্থে উল্লেখ করেন:
"যে ব্যক্তি ইসলামের কোনো বিধানকে হালকাভাবে নেয় বা ঠাট্টা করে, সে কুফর করে।" (শরহু মাআনিল আসার: ২/৩৪৫)
উপসংহার: আপনার ঘটনাটি কুফর নয়, কারণ এখানে বিধান নিয়ে ঠাট্টা হয়নি।
তৃতীয় প্রশ্ন: বয়সের ব্যবধান, দেবর-ভাবী প্রসঙ্গ ও বিরক্তি
প্রশ্ন: কমবয়সী ছেলে ও বেশিবয়সী মেয়ের বিয়ে, দেবর-ভাবীর বিয়ে ইত্যাদি জায়েজ জানার পরও এসব নিয়ে লেখিকার গল্প পড়ে বিরক্তি আসে—এটা কি কুফর?
উত্তর:
এখানে কয়েকটি বিষয় আলাদা করে বুঝতে হবে:
১. বয়সের ব্যবধানে বিয়ে:
ইসলামে বয়সের ব্যবধান কোনো বাধা নয়, যদি উভয় পক্ষ বালেগ হয় এবং সম্মত থাকে। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সাথে খাদিজা (রা.)-এর বয়সের ব্যবধান ছিল, আবার আয়েশা (রা.)-এর সাথেও বয়সের ব্যবধান ছিল। সুতরাং এটি জায়েজ।
২. দেবর-ভাবীর বিয়ে:
ইসলামে স্বামীর মৃত্যু বা তালাকের পর দেবরের সাথে বিয়ে জায়েজ। তবে স্বামীর জীবদ্দশায় দেবরের সাথে পর্দা করা ফরজ। কুরআনে বলা হয়েছে:
وَلَا تَنكِحُوا مَا نَكَحَ آبَاؤُكُم مِّنَ النِّسَاءِ "তোমাদের পিতৃপুরুষ যাদের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছে, তাদের সাথে তোমরা বিবাহ করো না।" — (সূরা নিসা: ২২)
এই আয়াতের ব্যাখ্যায় ফকিহগণ বলেন, শ্বশুর-বউয়ের সম্পর্ক হারাম, কিন্তু দেবর-ভাবীর সম্পর্ক স্বামীর জীবদ্দশায় শুধু পর্দার সম্পর্ক, বিয়ে নয়।
৩. বিরক্তি ও অপছন্দ:
আপনি যদি জায়েজ বিষয়কে অপছন্দ করেন বা দৃষ্টিকটু মনে করেন, তবে তা কুফর নয়, বরং এটি আপনার ব্যক্তিগত রুচি ও সামাজিক ধারণার বিষয়। তবে সতর্কতা হলো—যদি আপনি জায়েজ বিষয়কে "ইসলামে এটা থাকা উচিত নয়" বা "এটা ভুল" বলে বিশ্বাস করেন, তাহলে তা কুফর হতে পারে।
ফিকহি বিধান: ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, কুফর হলো ইসলামের অপরিহার্য বিষয়কে অস্বীকার করা বা হেয় প্রতিপন্ন করা। কিন্তু কোনো জায়েজ বিষয়কে ব্যক্তিগতভাবে অপছন্দ করা বা দৃষ্টিকটু মনে করা—যদি তা ইসলামের বিধানকে অস্বীকার না করে—তাহলে কুফর নয়।
দলিল: ইমাম বাবরতী (রহ.) "আল-ইনায়াহ" গ্রন্থে উল্লেখ করেন:
"কুফর হলো ইসলামের মৌলিক বিষয়কে অস্বীকার করা বা ঠাট্টা করা। আর ব্যক্তিগত রুচি বা অপছন্দ কুফর নয়।" (আল-ইনায়াহ: ৫/১২৩)
৪. লেখিকার গল্প নিয়ে বিরক্তি:
আপনি লেখিকার গল্পে জায়েজ বিষয়গুলো বারবার তুলে ধরাকে "ফেটিশ" মনে করছেন। এটি আপনার ব্যক্তিগত মত। তবে যদি আপনি মনে করেন যে, "ইসলামে এসব জায়েজ থাকা উচিত নয়" বা "এসব জায়েজ হওয়া ভুল", তাহলে তা কুফর হবে। কিন্তু যদি আপনি শুধু লেখিকার উপস্থাপনাকে অপছন্দ করেন, তাহলে তা কুফর নয়।
সতর্কতা: মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) "ফাতাওয়া উসমানি" গ্রন্থে উল্লেখ করেন:
"কুফর ও ঈমানের সীমা অত্যন্ত সূক্ষ্ম। কোনো মুসলিমের উচিত নয় যে, সে নিজের বা অন্যের ঈমান নিয়ে সন্দেহে পড়ে। তবে ইসলামের মৌলিক বিষয় নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ অবশ্যই কুফর।" (ফাতাওয়া উসমানি: ১/১২৫)
সারসংক্ষেপ ও উপদেশ
| প্রশ্ন | বিধান | |--------|-------| | শয়তান নিয়ে হাসাহাসি | সাধারণত কুফর নয়, তবে পরিহার্য | | টাখনুর উপরে পায়জামা নিয়ে হাসাহাসি | কুফর নয়, কারণ বিধান নিয়ে ঠাট্টা হয়নি | | জায়েজ বিষয়ে বিরক্তি | কুফর নয়, যদি ইসলামের বিধান অস্বীকার না করা হয় |
মূলনীতি: কুফর হয় তখনই, যখন কেউ ইসলামের মৌলিক বিষয়কে অস্বীকার করে, হেয় প্রতিপন্ন করে বা ঠাট্টা-বিদ্রূপ করে। ব্যক্তিগত রুচি, অপছন্দ বা বিরক্তি—যদি তা ইসলামের বিধানকে অস্বীকার না করে—তাহলে কুফর নয়।
পরামর্শ: ১. ইসলামের বিধান নিয়ে কোনো ধরনের ঠাট্টা-বিদ্রূপ থেকে বিরত থাকুন। ২. সন্দেহ হলে অভিজ্ঞ আলেমের কাছে জিজ্ঞাসা করুন। ৩. নিজের ঈমান নিয়ে বারবার সন্দেহে পড়বেন না; বরং আল্লাহর কাছে ঈমানের سلامتی ও দৃঢ়তার জন্য দুআ করুন।
رَبَّنَا لَا تُزِغْ قُلُوبَنَا بَعْدَ إِذْ هَدَيْتَنَا وَهَبْ لَنَا مِن لَّدُنكَ رَحْمَةً ۚ إِنَّكَ أَنتَ الْوَهَّابُ
"হে আমাদের রব! আমাদের হৃদয়কে সরল পথ থেকে বিচ্যুত করবেন না, আপনি আমাদেরকে আপনার পক্ষ থেকে রহমত দান করুন। নিশ্চয়ই আপনি মহাদাতা।" — (সূরা আলে ইমরান: ৮)