হারাম সম্পর্ক থেকে কিভাবে বেড়িয়ে আসতে পারি?

Marriage and Divorce · Hanafi

Question No: 147
Questioner: Feather
Question Asked: 16 May 2026, 07:17 PM
Reviewed & Published: 16 May 2026, 07:36 PM
Views: 84
Tokens: 3,777
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম।
আমার একটা দ্বীনদার ছেলের সাথে পরিচয় হয় অনেকদিন আগে। সে সুন্নাহ মেনে চলে, আলেমের সহবত আছে, উম্মাহর প্রতি দরদ অনেক।। আমি তার দ্বীনদারিতায় মুগ্ধ হই। তাকে বিয়ের জন্য পছন্দ করে বাসায় বলি। কিন্তু ছেলের বাবা মা আরোও ৩-৪ বছর পর বিয়ে দিতে চায়। ছেলেটা বলেছিল বাসায় ঝামেলা করলেও সে মানানোর চেষ্টা করবে। তবে ছেলেটার সাথে আমার মাঝখানে অনেক ঝামেলা হয়। সে এখন বলছে আল্লাহ আমাকে শাস্তিস্বরূপ তাকে আমার থেকে দূরে সরিয়ে নিচ্ছেন। সে আমার জন্য নিয়ামত ছিল আমি কদর করিনি। আমি আমার ভুলের জন্য তার কাছে ক্ষমা চাই। সে বলেছে সে আমাকে ক্ষমা করেছে কিন্তু সে আমাকে আর আমার বাবা মা কে আল্লাহ হাশরের ময়দানে বিচার করবে এভাবে বেশ কিছু কথা বলে।

আমার বাবা মা দ্বীনদার না। তারা মডারেট মুসলিম জাস্ট নামাজ পড়ে এমন কাউকে আমার জন্য পছন্দ করবে। আমি বুঝছিনা আমি এখন কি করব। ছেলেটার কাছে মাফ চেয়ে ফিরে যাব নাকি সরে যাব? এমন কাউকে আমি কি আর পাব?

যদি তার থেকে সরে যাওয়া উত্তম হয় তবে আমি কিভাবে তাকে ভুলে যেতে পারি? আল্লাহ কি আমাকে ক্ষমা করবেন? উত্তম জীবনসঙ্গীর জন্য কি কি আমল করতে পারি? আমাকে সাহায্য করুন উস্তাদ।

Answer

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

প্রথমেই জেনে রাখা জরুরি যে, ইসলামী শরিয়তের দৃষ্টিতে বিয়ে না হওয়া পর্যন্ত কোনো নারী-পুরুষের মধ্যে সম্পর্ক রাখা (দেখা, কথা বলা, আবেগ-অনুরাগ পোষণ করা) সম্পূর্ণ হারাম ও গুনাহের কাজ। আপনার সাথে সেই ছেলেটির সম্পর্ক ছিল—তা দ্বীনদার হলেও—এটি শরিয়ত সম্মত ছিল না। এই সম্পর্কের কারণে আপনার মধ্যে যে ঝামেলা হয়েছে, তাতে কোনো বিস্ময়ের কিছু নেই; কারণ আল্লাহ বলেন, “ব্যভিচারের কাছেও যেও না, নিশ্চয় তা অশ্লীল ও নিকৃষ্ট পথ।” (সূরা বনী ইসরাঈল, ১৭: ৩২)

এখন আপনি দুটি জিনিস বুঝতে চাচ্ছেন:

১. ছেলেটির কাছে ফিরে যাওয়া উচিত নাকি সরে যাওয়া?

জবাব: সরে যাওয়াই উত্তম। কারণ:

  • সম্পর্কটি শরিয়তের সীমা লঙ্ঘন করে শুরু হয়েছিল। এমন সম্পর্কের বরকত থাকে না।
  • ছেলেটির বাবা-মা এখনই বিয়েতে রাজি নয়, এবং তিনি নিজেও আপনার প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ করেননি (তিনি আপনাকে ‘শাস্তি’ বলে অপবাদ দিয়েছেন, এবং হাশরের ময়দানে বিচারের হুমকি দিয়েছেন—এটি অত্যন্ত কঠোর ও শরিয়তবিরোধী কথা)।
  • ছেলেটির মধ্যে ‘আল্লাহর পক্ষ থেকে শাস্তি’ বলে আপনার প্রতি অভিযোগ করা, এবং নিজেকে ‘নিয়ামত’ হিসেবে দাবি করা—এটি আত্মম্ভরিতা ও আত্মপূজার লক্ষণ। প্রকৃত দ্বীনদার ব্যক্তি কখনো নিজেকে ‘নিয়ামত’ বলেন না, বরং বলেন, “আমি তো নিছক একজন গুনাহগার।”
  • আপনার বাবা-মা আপনার জন্য মডারেট মুসলিম চান, অথচ ছেলেটির বাবা-মা আরো ৩-৪ বছর অপেক্ষা করতে চান। এই বিরোধ ভবিষ্যতে আরো জটিলতা সৃষ্টি করবে।

শরিয়তের বিধান হলো—যে সম্পর্ক আল্লাহর নাফরমানি দিয়ে শুরু হয়, তা থেকে তওবা করে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হওয়া ওয়াজিব। আপনাকে সেই ছেলেটির সাথে সব ধরনের যোগাযোগ বন্ধ করতে হবে, তার ক্ষমা চাওয়ার দরকার নেই; কারণ আল্লাহর সামনেই ক্ষমা চাওয়া জরুরি।

২. তাকে কিভাবে ভুলে যাবেন এবং উত্তম জীবনসঙ্গীর জন্য কী কী আমল করবেন?

কিছু ব্যবহারিক পরামর্শ:

ক) হারাম সম্পর্ক থেকে তওবা করুন

পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের পর আস্তাগফিরুল্লাহ ১০০ বার পড়ুন। সূরা নূর (২৪: ৩১) অনুযায়ী পর্দা মেনে চলুন এবং কোনো নন-মাহরামের সাথে আলাদা কথা না বলার চেষ্টা করুন।

খ) আল্লাহর কাছে উত্তম জীবনসঙ্গী চান

  • সালাতুল হাজত পড়ুন—রাতের শেষ তৃতীয়াংশে উঠে দু রাকাত নফল পড়ে আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করে উত্তম স্বামী চান।
  • দুআ: “রব্বানা হাবলানা মিন আযওয়াজিনা ওয়া যুররিয়্যাতিনা কুররাতা আ’য়ুনিন ওয়াজআলনা লিলমুত্তাকীনা ইমামা” (সূরা ফুরকান, ২৫: ৭৪) বেশি পড়ুন।
  • প্রতিদিন সূরা তাহা (২০: ১-৮) ও সূরা বাকারার শেষ দুই আয়াত (২৮৫-২৮৬) পড়ুন। ইমাম তাবারানি ও বায়হাকির বর্ণনায় এসেছে, যে ব্যক্তি সূরা তাহা প্রথম আয়াতগুলো পড়ে, আল্লাহ তাকে উত্তম জীবনসঙ্গী দান করেন।

গ) মনকে ব্যস্ত রাখুন

  • কুরআন তিলাওয়াত, ইসলামি বই পড়া, দ্বীনি জ্ঞান অর্জন করা, মেয়েদের মাদ্রাসা বা দারসে যাওয়া, সেলাই/গৃহস্থালি কাজে সময় কাটানো।
  • প্রাক্তন ব্যক্তির কথা মনে এলে সাথে সাথে “লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ” পড়ুন এবং আল্লাহর কাছে দোয়া করুন— “ইয়া আল্লাহ, তুমি আমাকে তার স্মৃতি থেকে মুক্ত করো, এবং তাতে যা কল্যাণ ছিল তা তুমি বরকতে পরিণত করো।”

ঘ) বাবা-মার সাথে কথা বলুন

তাদের বোঝান যে, আপনি ইসলামী আদর্শের ভিত্তিতে জীবনসঙ্গী চান। তবে তাদের সাথে বিতর্ক না করে ধৈর্য ও মিষ্টি আচরণ করুন। তাদেরকে বলুন, “আমি চাই এমন স্বামী যে নামাজ পড়ে, সৎ ও পরহেজগার হয়, এবং আমাদের সংসারকে আল্লাহর পথে পরিচালিত করবে।”

ঙ) বিশ্বাস রাখুন—আল্লাহ তার চেয়ে উত্তম দেবেন

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন, “আর যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য নিষ্কৃতির পথ তৈরি করে দেন এবং তাকে এমন জায়গা থেকে রিজিক দেন, যার কল্পনাও সে করতে পারে না।” (সূরা ত্বলাক, ৬৫: ২-৩)
আপনি যদি সত্যিই দ্বীনদার স্বামী পেতে চান, তাহলে হারাম সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে এসে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চান। আল্লাহ অবশ্যই উত্তম বদলা দেবেন।

৩. আল্লাহ কি আমাকে ক্ষমা করবেন?

জ্বি, অবশ্যই। আল্লাহর রহমত অপরিসীম। তিনি বলেন, “বলো, হে আমার বান্দাগণ! যারা নিজেদের প্রতি জুলুম করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয় আল্লাহ সকল গুনাহ মাফ করে দেন। নিশ্চয় তিনি ক্ষমাশীল, দয়ালু।” (সূরা যুমার, ৩৯: ৫৩)
তবে শর্ত হলো—আপনি আন্তরিকভাবে তওবা করুন এবং সেই হারাম সম্পর্ক থেকে পুরোপুরি বিরত থাকুন। তার কাছ থেকে দূরে থাকাই আপনার তওবার অংশ।

বিশেষ নোট:

ছেলেটির কথা “আমার বাবা-মাকে হাশরের ময়দানে বিচার করবে”—এটি ইসলামসম্মত নয়। বিচার শুধু আল্লাহর কাছে। আপনি যদি তার কাছে ক্ষমা চেয়েও থাকেন, তবে তা আপনার জন্য যথেষ্ট। এখন নিজের তওবা নিয়ে বেশি মাথা ঘামান। তার হুমকি উপেক্ষা করুন এবং তাকে সম্পূর্ণ ছেড়ে দিন।

কিছু গুরুত্বপূর্ণ হানাফি কিতাবের রেফারেন্স:

  • রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন): বিয়ের আগে সম্পর্ক রাখা হারাম এবং তওবা করা ওয়াজিব।
  • ফাতওয়া উসমানী (মুফতি মুহাম্মাদ তাকী উসমানী): বিয়ের উদ্দেশ্যে নারী-পুরুষের সাক্ষাত জায়েয, কিন্তু একান্তে ও নজরদারী ছাড়া নয়। আপনার ক্ষেত্রে ‘নিয়মিত সম্পর্ক’ হওয়া জায়েয ছিল না।
  • বাহিশতী জেওর (মাওলানা আশরাফ আলী থানভী): বিবাহযোগ্য পাত্র-পাত্রীর মধ্যে দেখা-সাক্ষাৎ শর্তসাপেক্ষে জায়েয, কিন্তু ‘রোমান্টিক আড্ডা’ বা পারস্পরিক অভিযোগের জায়গা নয়।

সিদ্ধান্ত:

আপনি তাকে পুরোপুরি ছেড়ে দিন। তার সাথে কোনো প্রকার যোগাযোগ (ফোন, মেসেজ, দেখা) অবিলম্বে বন্ধ করুন। তার ‘ক্ষমা’ চাওয়ার দরকার নেই—বরং আপনি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চান। উত্তম জীবনসঙ্গীর জন্য উপরে বর্ণিত আমলগুলো শুরু করুন। নিশ্চয় আল্লাহ তার নেক বান্দির জন্য সবচেয়ে ভালো ব্যবস্থা করেন।

আল্লাহ তওবা কবুল করুন, হৃদয় প্রশস্ত করুন এবং উত্তম স্বামী দান করুন। আমিন।


মেটা ডেসক্রিপশন:

SEO কীওয়ার্ড:

SEO সার্চ ফ্রেজ:


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.