বিধবা নারীকে ইদ্দত শেষে বিয়ে করার পর সন্তানদের দায়িত্ব কার?

Family Life · Hanafi

Question No: 6386
Questioner: Al Amin Ahmed Mobin
Question Asked: 04 Oct 2026, 07:18 PM
Reviewed & Published: 04 Oct 2026, 08:10 PM
Views: 44
Tokens: 5,180
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

কেউ একজন বিধবা নারীকে ইদ্দত শেষে শরিয়তসম্মতভাবে বিয়ে করল। সেই নারীর যদি সন্তান থাকে তাদের দায়িত্ব নিয়ে কি করবে? কাউকেই উপযুক্ত পাওয়া না গেলে কি কোন বন্ধ্যা দম্পতির কাছে দত্তক হিসেবে বিনিময় ছাড়া দিতে পারবে? আর যদি সন্তানটি বিয়েটা মানতে না পারায় যে বিধবা নারীকে বিয়ে করল তার প্রাননাশের চেষ্টা করে তবে সন্তানটিকে হত্যা করা জায়েজ হবে? নিজের জীবন রক্ষার্থে?

Answer

বিধবা নারীকে বিয়ে ও সন্তানদের দায়িত্ব: শরয়ি দিকনির্দেশনা

উত্তর: সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তা'আলার জন্য, যিনি সমগ্র জগতের প্রতিপালক। দরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক প্রিয় নবী মুহাম্মাদ (সা.)-এর উপর, তাঁর পরিবার-পরিজন ও সাহাবায়ে কেরামের উপর।

প্রশ্নের সারসংক্ষেপ

প্রশ্নে তিনটি বিষয় উত্থাপিত হয়েছে: ১. ইদ্দত শেষে শরিয়তসম্মতভাবে বিধবাকে বিয়ে করার পর তার সন্তানদের দায়িত্ব কে নেবে? ২. উপযুক্ত কেউ না পাওয়া গেলে বন্ধ্যা দম্পতির কাছে বিনিময় ছাড়া দত্তক দেওয়া যাবে কি? ৩. সন্তান যদি বিয়ে মানতে না পেরে সৎ বাবার প্রাণনাশের চেষ্টা করে, তবে আত্মরক্ষার্থে তাকে হত্যা করা জায়েজ হবে কি?


১. সন্তানদের দায়িত্ব কে নেবে?

শরয়ি মূলনীতি

ইসলামে সন্তানের ভরণ-পোষণ (নাফাকা) ও তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব মূলত সন্তানের পিতার উপর বর্তায়। পিতা মৃত হলে বা অক্ষম হলে দাদা, তারপর নিকটতম পুরুষ আত্মীয়ের উপর। মায়ের উপর সন্তানের নাফাকা ওয়াজিব নয়, তবে মায়ের কাছে সন্তান থাকলে সে লালন-পালন করতে পারে।

আল্লাহ তা'আলা বলেন:

وَعَلَى الْمَوْلُودِ لَهُ رِزْقُهُنَّ وَكِسْوَتُهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ "সন্তানের পিতার দায়িত্ব হলো প্রচলিত নিয়মে তাদের খাদ্য ও বস্ত্রের ব্যবস্থা করা।" — (সূরা আল-বাকারা: ২৩৩)

মায়ের দ্বিতীয় বিয়ের পর সন্তানের অবস্থা

বিধবা নারী দ্বিতীয় বিয়ে করলে সন্তানদের ব্যাপারে কয়েকটি অবস্থা হতে পারে:

ক) সন্তান যদি নাবালেগ হয়:

  • মায়ের হেফাজতের (custody) অধিকার শরিয়তে স্বীকৃত। হানাফি মাযহাব অনুযায়ী, ছেলে সন্তানের হেফাজত ৭ বছর পর্যন্ত এবং মেয়ে সন্তানের হেফাজত বালেগা হওয়া পর্যন্ত মায়ের অধিকারে থাকে।
  • তবে নতুন স্বামী যদি সন্তানদের সাথে সদাচরণ না করে বা ক্ষতির আশঙ্কা থাকে, তাহলে হেফাজত দাদা বা নিকটতম পুরুষ আত্মীয়ের কাছে হস্তান্তর করা যাবে।

খ) সন্তান যদি বালেগ হয়:

  • বালেগ সন্তান নিজেই নিজের দায়িত্ব নেবে। তার সম্মতি ছাড়া তার ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া যাবে না।

গ) নতুন স্বামীর দায়িত্ব:

  • নতুন স্বামী সন্তানদের প্রতি সদাচরণ করবেন, কিন্তু তাদের নাফাকার দায়িত্ব তার উপর বাধ্যতামূলক নয় — এ দায়িত্ব সন্তানের পিতার পরিবার বা নিকটতম আত্মীয়ের উপর।
  • তবে স্বেচ্ছায় সাহায্য করলে তা সদকা ও ইহসানের অন্তর্ভুক্ত।

ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) বলেন:

"সন্তানের নাফাকা পিতার উপর, মায়ের উপর নয়; মায়ের কাছে হেফাজত থাকলেও নাফাকার দায়িত্ব পিতার।" — (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৩, পৃ. ৬১৪)


২. বন্ধ্যা দম্পতির কাছে দত্তক দেওয়া যাবে কি?

ইসলামে দত্তকের বিধান

ইসলামে "দত্তক" (adoption) বলতে পশ্চিমা অর্থে সন্তানের পরিচয় পরিবর্তন করে তাকে নিজের সন্তান হিসেবে দাবি করা জায়েজ নয়। আল্লাহ তা'আলা বলেন:

وَمَا جَعَلَ أَدْعِيَاءَكُمْ أَبْنَاءَكُمْ ۚ ذَٰلِكُمْ قَوْلُكُم بِأَفْوَاهِكُمْ ۖ وَاللَّهُ يَقُولُ الْحَقَّ وَهُوَ يَهْدِي السَّبِيلَ "আল্লাহ তোমাদের পালক-পুত্রদের তোমাদের প্রকৃত সন্তান করেননি; এগুলো তোমাদের মুখের কথা মাত্র। আল্লাহ সত্য বলেন এবং তিনিই সঠিক পথ দেখান।" — (সূরা আল-আহযাব: ৪)

তবে "লালন-পালনের জন্য দেওয়া" (কাফালা) জায়েজ

সন্তানকে কাফালা (তত্ত্বাবধান ও লালন-পালন) হিসেবে কোনো দম্পতির কাছে দেওয়া জায়েজ, শর্ত হলো:

  • সন্তানের প্রকৃত পিতার পরিচয় গোপন করা যাবে না।
  • সন্তানের নাসাব (বংশপরিচয়) পরিবর্তন করা যাবে না।
  • সন্তান বালেগ হলে সে নিজের ইচ্ছায় সিদ্ধান্ত নিতে পারবে।
  • উত্তরাধিকারের বিধান প্রকৃত বংশপরিচয় অনুযায়ীই চলবে।

বিনিময় ছাড়া দেওয়া যাবে কি?

হ্যাঁ, বিনিময় ছাড়া কাফালা হিসেবে দেওয়া যাবে। তবে:

  • এটি বিক্রয় বা বিনিময় নয়, বরং আমানত ও তত্ত্বাবধান।
  • লিখিত চুক্তি করা উত্তম, যাতে ভবিষ্যতে সন্তানের হক নষ্ট না হয়।
  • সন্তানের সম্পত্তি থাকলে তা তার নামেই থাকবে, কাফালাদানকারীর নয়।

মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) বলেন:

"সন্তানকে লালন-পালনের জন্য অন্য কারো কাছে দেওয়া জায়েজ, কিন্তু তাকে নিজের সন্তান হিসেবে দাবি করা বা নাসাব পরিবর্তন করা জায়েজ নয়।" — (ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ২, পৃ. ৩২১)


৩. সন্তান যদি প্রাণনাশের চেষ্টা করে — আত্মরক্ষার্থে হত্যা জায়েজ?

ইসলামে আত্মরক্ষার বিধান

ইসলামে আত্মরক্ষা একটি বৈধ অধিকার। আল্লাহ তা'আলা বলেন:

وَلَا تَقْتُلُوا النَّفْسَ الَّتِي حَرَّمَ اللَّهُ إِلَّا بِالْحَقِّ "আল্লাহ যাকে হত্যা করা হারাম করেছেন, তাকে হক ছাড়া হত্যা করো না।" — (সূরা আল-আনআম: ১৫১)

আরও ইরশাদ হয়েছে:

فَمَنِ اعْتَدَىٰ عَلَيْكُمْ فَاعْتَدُوا عَلَيْهِ بِمِثْلِ مَا اعْتَدَىٰ عَلَيْكُمْ "যে তোমাদের উপর আক্রমণ করে, তোমরা তার উপর আক্রমণ করো ঠিক ততটুকু, যতটুকু সে তোমাদের উপর আক্রমণ করেছে।" — (সূরা আল-বাকারা: ১৯৪)

হানাফি ফিকহের বিধান

দাফে সাইল (আত্মরক্ষা)-এর ক্ষেত্রে হানাফি মাযহাবের মূলনীতি:

১. প্রথমে প্রতিরোধের চেষ্টা করতে হবে — কথা, বোঝানো, পরিবারের মুরুব্বিদের মাধ্যমে সমাধান। ২. প্রয়োজনে প্রশাসন/আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাহায্য নিতে হবে। ৩. যদি আক্রমণ অনিবার্য হয় এবং প্রাণনাশের সরাসরি আশঙ্কা থাকে, তাহলে আত্মরক্ষার্থে আক্রমণকারীকে প্রতিহত করা যাবে — এমনকি হত্যা পর্যন্ত পৌঁছালেও। ৪. তবে সীমা লঙ্ঘন করা যাবে না — আক্রমণ থেমে গেলে বা বিপদ কেটে গেলে আর আঘাত করা যাবে না।

ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) বলেন:

"যদি কেউ প্রাণনাশের উদ্দেশ্যে আক্রমণ করে, তবে আত্মরক্ষার্থে প্রতিরোধ করা ওয়াজিব; আর এতে আক্রমণকারী নিহত হলে আত্মরক্ষাকারীর উপর কোনো গুনাহ নেই।" — (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৬, পৃ. ৩৯৮; কিতাবুল জিহাদ)

ফাতাওয়া আলমগিরিতে এসেছে:

"আত্মরক্ষার্থে আক্রমণকারীকে প্রতিহত করা জায়েজ; যদি আক্রমণকারী নিহত হয়, তবে দিয়াত (রক্তপণ) ওয়াজিব নয়।" — (ফাতাওয়া আলমগিরি, খণ্ড ২, পৃ. ১৯২)

তবে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত

  • সন্তান যদি নাবালেগ হয়, তবে তার আক্রমণকে পূর্ণ দায়িত্বশীল আক্রমণ হিসেবে গণ্য করা যাবে না; বরং তাকে সংশোধনের ব্যবস্থা করতে হবে।
  • সন্তান বালেগ হলেও প্রথমে তাকে বোঝানো, চিকিৎসা করানো, পরিবারের মাধ্যমে সমাধান করা — এগুলো অগ্রাধিকার।
  • সরাসরি প্রাণনাশের আশঙ্কা ছাড়া হত্যা করা যাবে না।
  • রাষ্ট্রীয় আইন মেনে চলা আবশ্যক; নিজে বিচারক হয়ে হত্যা করা ফিতনা সৃষ্টি করে।

উপদেশ

১. ধৈর্য ও হিকমত অবলম্বন করুন। সন্তানের সাথে সদাচরণ করুন, তাকে বোঝানোর চেষ্টা করুন। ২. পরিবারের মুরুব্বি, ইমাম, বা মুফতির পরামর্শ নিন। ৩. প্রয়োজনে আইনি সহায়তা নিন — ইসলাম রাষ্ট্রীয় বিধান মেনে চলার নির্দেশ দেয়। ৪. দুআ করুন — আল্লাহ তা'আলার কাছে হেদায়াত ও নিরাপত্তার প্রার্থনা করুন।

আল্লাহ তা'আলা আমাদের সবাইকে সঠিক বুঝ ও আমল করার তাওফিক দান করুন। আমিন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.