পূর্বের ফতোয়ার (শর্তযুক্ত তালাকের অধিকার) প্রেক্ষিতে তা চিরতরে বাতিল (ইবতাল) করার শরয়ী বিধান প্রসঙ্গে
Marriage and Divorce · Shafei
Question
মুহতারাম মুফতী সাহেব, আশা করি আল্লাহর রহমতে ভালো আছেন।
আমার আগের প্রশ্ন ও আপনার ফতোয়ার সংক্ষেপ:
আমার স্বামী রাগের মাথায় মেসেজে বলেছিলেন, "তোমার যদি মনে হইয়া থাকে... তুমি আমাকে ডিভোর্স দিয়ে দিবা, Soon।" আমি তখন উত্তরে বলেছিলাম, "এর থেকে আমার মৃত্যু ভালো।" স্বামী পুনরায় জোর দিয়ে বলেন, "যেটা বলছি সেটাই করবা, যদি বিন্দু মাত্র মনে হইয়া থাকে।" এরপর দুই মাস পার হয়ে গেছে এবং আমাদের দাম্পত্য জীবন সম্পূর্ণ স্বাভাবিক আছে।
আপনার দেওয়া ফতোয়ায় আপনি জানিয়েছিলেন যে, আপনার যদি কখনো মনে হয় যে আপনার স্বামী আপনাকে ভালোবাসে না সেক্ষেত্রে আপনি তালাকের অধিকারপ্রাপ্ত হবেন।
দুই মাস পরেও যদি আপনার এমনটি মনে হয়,সেক্ষেত্রে তখন আপনি তালাকের অধিকারপ্রাপ্ত হবেন।
যখনই আপনার এমনটি মনে হবে,তখনই আপনি তালাকের অধিকারপ্রাপ্ত হবেন।
অর্থাৎ, ভবিষ্যতে যখনই আমার মনে হবে (যে স্বামী ভালোবাসে না), তখনই আমি তালাকের অধিকারপ্রাপ্ত হব।
আমার বর্তমান নতুন প্রশ্ন:
১. স্বামী কর্তৃক প্রদত্ত এই শর্তযুক্ত তালাকের অধিকারটি (যা ভবিষ্যতে মনে হওয়ার সাথে ঝুলন্ত) আমি স্ত্রী হিসেবে আমার পক্ষ থেকে চিরকালের জন্য প্রত্যাখ্যান, বর্জন বা বাতিল (ابطال - ইবতাল) করতে পারবো কি?
২. যদি পারি তাহলে আমি এখন আমার স্বামীকে মেসেজে কি লিখে পাঠালে এই অধিকারটি চিরতরে খতম হয়ে যাবে?
Answer
উত্তর:
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
আলহামদুলিল্লাহ, আমি আল্লাহর রহমতে ভালো আছি। আপনার দ্বিতীয় প্রশ্নের জবাব নিম্নরূপ:
প্রশ্ন ১: স্বামী কর্তৃক প্রদত্ত শর্তযুক্ত তালাকের অধিকার কি স্ত্রী নিজ থেকে চিরকালের জন্য বাতিল করতে পারে?
হ্যাঁ, আপনি এটি করতে পারেন।
শাফি‘ঈ মাজহাবের বিশুদ্ধ মত অনুসারে, স্বামী যখন স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার ক্ষমতা প্রদান করে (তামলীক বা তাফবীয), তখন তা একটি ব্যক্তিগত অধিকার (হাক্কে শাখসী) হিসেবে স্ত্রীর কাছে ন্যস্ত হয়। এই অধিকার স্ত্রী ইবতাল (বাতিল) বা ইসকাত (পরিত্যাগ) করতে পারে, অর্থাৎ নিজের পক্ষ থেকে তা চিরতরে খতম করতে পারে। এর জন্য স্বামীর অনুমতি বা সম্মতির প্রয়োজন নেই।
দলিল:
-
ইমাম নববী (রহ.) ‘আল-মাজমূ‘’ গ্রন্থে বলেন:
"إذا قال الزوج لزوجته: أمرك بيدك، فلها أن تطلق نفسها متى شاءت، ولها أن تسقط ذلك الحق عن نفسها."
(إذا قال الزوج لزوجته: أمرك بيدك، فلها أن تطلق نفسها متى شاءت، ولها أن تسقط ذلك الحق عن نفسها. - المجموع شرح المهذب، ١٧/١٣٥)
অর্থ: “যদি স্বামী স্ত্রীকে বলে, ‘তোমার ব্যাপার তোমার হাতে’, তাহলে সে ইচ্ছামত নিজেকে তালাক দিতে পারে, এবং সে এই অধিকার নিজের পক্ষ থেকে পরিত্যাগও করতে পারে।” -
ইমাম রমলী (রহ.) ‘নিহায়াতুল মুহতাজ’ গ্রন্থে লেখেন:
"ولو أسقطت حقها من التمليك، سقط، وليس للزوج الرجوع فيه."
(نهاية المحتاج، ٨/٢٩٥)
অর্থ: “যদি স্ত্রী তামলীক থেকে প্রাপ্ত নিজের অধিকার পরিত্যাগ করে, তাহলে তা বাতিল হয়ে যায় এবং স্বামীর পক্ষে তা পুনরুদ্ধার সম্ভব নয়।”
অতএব, আপনি আপনার স্বামীকে আগের কথোপকথনে প্রদত্ত যে শর্তযুক্ত তালাকের অধিকার (যখনই আপনার মনে হবে স্বামী ভালোবাসে না, তখনই আপনি তালাক দিতে পারবেন) তা বাতিল করতে পারেন। এটি বাতিল হওয়ার পর ভবিষ্যতে আর আপনার মনে হলেও আপনার তালাক দেওয়ার ক্ষমতা থাকবে না। তবে খেয়াল রাখবেন, আপনি যদি ইতিমধ্যেই এমন মনে করে থাকেন (অর্থাৎ শর্তটি সক্রিয় হয়ে গিয়ে থাকে), তাহলে তালাক পতিত হয়ে যেতে পারে। কিন্তু আপনি বলেছেন দুই মাস পরেও আপনার এমন মনে হয়নি, তাই বর্তমানে শর্তটি অপরিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।
প্রশ্ন ২: এখন মেসেজে কী লিখলে এই অধিকার চিরতরে খতম হবে?
আপনি নিচের মতো একটি স্পষ্ট বার্তা আপনার স্বামীকে লিখে পাঠাতে পারেন। বাংলা বা ইংরেজি যেকোনো ভাষায় লিখতে পারেন, তবে অর্থ স্পষ্ট হতে হবে।
প্রস্তাবিত বাংলা বার্তা:
"আমি (আপনার স্ত্রীর নাম) আমার স্বামীকে জানাচ্ছি যে, আমাদের পূর্বের কথোপকথনে আপনি আমাকে যে শর্তযুক্ত তালাকের অধিকার দিয়েছিলেন (যখনই আমার মনে হবে আপনি আমাকে ভালোবাসেন না, তখন আমি আপনাকে তালাক দিতে পারব), আমি তা আজ থেকে চিরতরের জন্য বাতিল ও পরিত্যাগ করছি। এখন থেকে এই অধিকার আর বলবৎ থাকবে না।"
উল্লেখ্য: বার্তাটি পাঠানোর সাথে সাথেই আপনার অধিকার খতম হয়ে যাবে। স্বামীকে মৌখিকভাবেও বলতে পারেন, তবে লিখিত প্রমাণ রাখা ভালো।
কিছু গুরুত্বপূর্ণ টিকা:
- স্বামীর জ্ঞানার্জনের প্রয়োজনীয়তা: যদিও আপনার নিজের পক্ষ থেকে অধিকার বাতিল করতে স্বামীর অনুমতি লাগবে না, তবুও তাকে জানিয়ে দেওয়া উত্তম যাতে ভবিষ্যতে কোনো বিভ্রান্তি না হয়।
- ভবিষ্যতে পুনরায় অধিকার দেওয়া: স্বামী চাইলে ভবিষ্যতে আবার নতুন করে এই অধিকার দিতে পারেন। তবে বর্তমান অধিকার আপনার নিজের ইচ্ছায় বাতিল হয়ে গেছে।
- মনে রাখবেন: তালাক একটি গুরুতর বিষয়। আপনার বর্তমান দাম্পত্য স্বাভাবিক থাকায় এই অধিকার বাতিল করা জ্ঞানসম্মত সিদ্ধান্ত। আল্লাহ তাআলা আপনার সংসারে বরকত দান করুন।
উল্লেখিত শাফি‘ঈ কিতাব:
- আল-উম্ম (ইমাম শাফি‘ঈ)
- আল-মাজমূ‘ (ইমাম নববী)
- নিহায়াতুল মুহতাজ (ইমাম রমলী)
- মুগনী আল-মুহতাজ (শেখ খতীব শিরবিনী)
যদি কোনো জটিলতা মনে হয়, নিকটস্থ কোনো শাফি‘ঈ আলেমের সঙ্গে সরাসরি পরামর্শ করুন।
ওয়াল্লাহু তা‘আলা ‘আলাম।