টুরিস্ট ভিসায় বিদেশ গিয়ে কাজ করলে ইনকাম কি হালাল হবে?
Business and Job · Hanafi
Question
১) শ্রমিক ভিসা বর্তমানে খোলা না থাকায়, কোনো ব্যক্তি যদি প্রচণ্ড অর্থকষ্টের কারণে টুরিস্ট ভিসায় বিদেশে যেতে চান, তাহলে শরিয়তের দৃষ্টিতে তার এভাবে বিদেশ যাওয়া কতটুকু জায়েয? বিদেশ ছাড়া বিকল্প নেই বেশকিছু কারণে এইজন্য ।
২) যদি টুরিস্ট ভিসায় গিয়ে আয় করা জায়েয না হয়, কিন্তু তার আগেই পরিকল্পনা থাকে—বিদেশে পৌঁছানোর পর বৈধ সুযোগ পাওয়া মাত্র শ্রমিক ভিসা/ওয়ার্ক পারমিট করে নেবেন এবং এরপর বৈধভাবে কাজ করবেন, তাহলে এই নিয়তে টুরিস্ট ভিসায় বিদেশ যাওয়া কি জায়েয হবে?
৩) টুরিস্ট ভিসায় গিয়ে কাজটি নিজে হালাল হলেও, যেহেতু ওই ভিসায় কাজ করা আইনত নিষিদ্ধ—সেই কাজের উপার্জন শরিয়তের দৃষ্টিতে হালাল হবে কি না?
৪) ব্যক্তির নিকটাত্মীয় ওই দেশে আছেন এবং তার জন্য হালাল কাজের ব্যবস্থা করে রেখেছেন। দেশে প্রচণ্ড অর্থকষ্ট থাকায় তিনি টুরিস্ট ভিসায় গিয়ে কাজ করতে চান। সেখানে পুলিশি ঝামেলা বা ধরার আশঙ্কাও খুব কম। এ অবস্থায় শুধু অর্থকষ্ট ও হালালভাবে উপার্জনের প্রয়োজনের কারণে টুরিস্ট ভিসায় যাওয়া ও পরবর্তীতে কাজ করা কি শরিয়তসম্মত হবে?
Answer
বিদেশ যাওয়া প্রসঙ্গে — টুরিস্ট ভিসায় ভ্রমণ ও কাজ করার শরিয়তসম্মত বিধান
উত্তর: ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু
আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং বাস্তবসম্মত। বর্তমান সময়ে অনেক মুসলিম ভাই-বোন অর্থকষ্টের কারণে টুরিস্ট ভিসায় বিদেশ যাওয়ার পরিকল্পনা করেন। নিম্নে কুরআন, হাদিস এবং হানাফি ফিকহের আলোকে বিস্তারিত উত্তর প্রদান করা হলো:
১) টুরিস্ট ভিসায় বিদেশ যাওয়ার শরিয়তসম্মত বিধান
টুরিস্ট ভিসা মূলত পর্যটন বা ভ্রমণের উদ্দেশ্যে প্রদান করা হয়। এই ভিসায় কাজ করার অনুমতি থাকে না। শরিয়তের দৃষ্টিতে:
মূল নীতি: কোনো দেশের আইন ভঙ্গ করা জায়েয নয়, যদি না তা শরিয়তের কোনো অপরিহার্য প্রয়োজনে (যারারত) হয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"مَنْ أَطَاعَ الْأَمِيرَ فَقَدْ أَطَاعَنِي، وَمَنْ عَصَى الْأَمِيرَ فَقَدْ عَصَانِي" "যে ব্যক্তি শাসকের আনুগত্য করল, সে আমার আনুগত্য করল; আর যে শাসকের অবাধ্য হলো, সে আমার অবাধ্য হলো।" (সহীহ বুখারী: ৭১৩৭)
তবে, শুধুমাত্র টুরিস্ট ভিসায় বিদেশ যাওয়া (কাজ করার উদ্দেশ্য ছাড়া) যদি বৈধ উদ্দেশ্যে হয়—যেমন আত্মীয়-স্বজন দেখা, ব্যবসায়িক সম্ভাবনা যাচাই, বা পরবর্তীতে বৈধভাবে কাজের ব্যবস্থা করার চেষ্টা—তাহলে তা জায়েয হতে পারে।
হানাফি ফিকহের নীতি: ফতোয়ায়ে শামীতে (রদ্দুল মুহতার) উল্লেখ আছে যে, কোনো মুসলিমের জন্য এমন কাজ করা উচিত নয় যা দেশের আইন ভঙ্গ করে এবং সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। (রদ্দুল মুহতার, ৯:৫৫৬)
২) টুরিস্ট ভিসায় গিয়ে পরে ওয়ার্ক পারমিট করার নিয়তে যাওয়া
যদি কেউ টুরিস্ট ভিসায় যাওয়ার সময় দৃঢ় সংকল্প করে যে, পৌঁছানোর পর বৈধভাবে ওয়ার্ক পারমিট/শ্রমিক ভিসা করে নেবে এবং ততক্ষণ পর্যন্ত কাজ করবে না, তাহলে:
বিশ্লেষণ:
- যদি তার নিয়ত থাকে যে, পৌঁছে প্রথমে বৈধভাবে ভিসা পরিবর্তন করবে এবং তার আগে কোনো কাজ করবে না, তাহলে এই নিয়তে টুরিস্ট ভিসায় যাওয়া জায়েয হওয়ার অবকাশ রয়েছে। কারণ, ভিসা পরিবর্তনের চেষ্টা করা নিজেই একটি বৈধ কাজ।
- তবে, যদি সে জানে যে, ভিসা পরিবর্তন করা সম্ভব হবে না এবং সে অবৈধভাবে কাজ করবে, তাহলে এই নিয়তে যাওয়া যাবে না।
হানাফি ফিকহের নীতি: ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর নীতি হলো, "الْأُمُورُ بِمَقَاصِدِهَا" অর্থাৎ "বিষয়সমূহ তার উদ্দেশ্য অনুযায়ী বিবেচিত হয়।" (সহীহ বুখারী, হাদিস: ১) সুতরাং, যদি উদ্দেশ্য বৈধ হয় এবং অবৈধ কাজের সংকল্প না থাকে, তাহলে তা জায়েয হওয়ার আশা করা যায়।
তবে, গুরুত্বপূর্ণ শর্ত: যদি বাস্তবিকভাবে জানা যায় যে, টুরিস্ট ভিসায় গিয়ে ওয়ার্ক পারমিট করা সম্ভব নয় এবং তাকে অবৈধভাবে কাজ করতে হবে, তাহলে এই নিয়তে যাওয়া যাবে না। কারণ, এটি পরোক্ষভাবে আইন ভঙ্গের সংকল্প।
৩) টুরিস্ট ভিসায় কাজ করে উপার্জন হালাল হবে কি?
মূল নীতি: ইসলামে উপার্জনের হালাল-হারাম নির্ধারিত হয় কাজের প্রকৃতি দ্বারা, তবে আইন ভঙ্গ করে উপার্জন করাও অপরাধ সমতুল্য।
বিশ্লেষণ:
- যদি কাজটি নিজে হালাল হয় (যেমন: দোকানে বিক্রি, অফিসের কাজ ইত্যাদি), কিন্তু ভিসার শর্ত ভঙ্গ করে করা হয়, তাহলে কাজটি নিজে হালাল কিন্তু ভিসার শর্ত ভঙ্গ করা হারাম।
- এই অবস্থায় উপার্জিত অর্থের ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে। তবে হানাফি ফিকহের বিশুদ্ধ মত অনুযায়ী, যদি কাজটি নিজে হালাল হয় এবং কোনো প্রতারণা বা অন্যায়ভাবে কারো হক নষ্ট না হয়, তাহলে উপার্জিত অর্থ হালাল হবে, তবে ভিসার শর্ত ভঙ্গ করার জন্য দায়বদ্ধ থাকবে।
দলিল: ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.) এবং ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর মতে, কোনো কাজ যদি নিজে হালাল হয়, তাহলে আইন ভঙ্গের কারণে সেই কাজের উপার্জন হারাম হয় না; বরং আইন ভঙ্গের জন্য পৃথক গুনাহ হবে। (আল-মাবসুত, ১৪:১২৩)
তবে, সতর্কতা: যদি ভিসার শর্ত ভঙ্গ করে কাজ করা হয় এবং তা দেশের আইনে অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়, তাহলে মুসলিমের উচিত এই ধরনের কাজ থেকে বিরত থাকা। কারণ, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"الْمُسْلِمُ عَلَى شُرُوطِهِمْ" "মুসলিমগণ তাদের শর্তসমূহের উপর প্রতিষ্ঠিত।" (আবু দাউদ: ৩৫৯৪)
৪) নিকটাত্মীয়ের ব্যবস্থা থাকা অবস্থায় টুরিস্ট ভিসায় যাওয়া
আপনার বর্ণনা অনুযায়ী, ব্যক্তির নিকটাত্মীয় ওই দেশে আছেন এবং তার জন্য হালাল কাজের ব্যবস্থা করে রেখেছেন। দেশে প্রচণ্ড অর্থকষ্ট। পুলিশি ঝামেলার আশঙ্কা কম।
বিশ্লেষণ:
- যদি নিকটাত্মীয় ইতিমধ্যে তার জন্য বৈধভাবে কাজের ব্যবস্থা করে রেখেছেন (যেমন: ওয়ার্ক পারমিটের ব্যবস্থা চলছে), তাহলে টুরিস্ট ভিসায় গিয়ে সেই ব্যবস্থা সম্পন্ন করা জায়েয হতে পারে।
- তবে, যদি ব্যবস্থা শুধুমাত্র কথায় আছে কিন্তু বাস্তবে অবৈধভাবে কাজ করতে হবে, তাহলে তা জায়েয নয়।
গুরুত্বপূর্ণ শর্ত: ১. যে কাজটি করা হবে তা নিজে হালাল হতে হবে। ২. যত দ্রুত সম্ভব বৈধভাবে ভিসা/ওয়ার্ক পারমিট করার চেষ্টা করতে হবে। ৩. যদি কোনো কারণে বৈধভাবে কাজ করা সম্ভব না হয়, তাহলে দেশে ফিরে আসতে হবে।
হানাফি ফিকহের নীতি: ফতোয়ায়ে উসমানীতে (মুফতি মুহাম্মদ তাকি উসমানি দামাত বারাকাতুহুম) উল্লেখ আছে যে, অর্থকষ্টের কারণে যদি কেউ বিদেশে যায় এবং সেখানে বৈধভাবে কাজের ব্যবস্থা করার চেষ্টা করে, তাহলে তা জায়েয। কিন্তু যদি অবৈধভাবে কাজ করার সংকল্প থাকে, তাহলে তা জায়েয নয়।
সারসংক্ষেপ ও ফতোয়া
সংক্ষিপ্ত উত্তর:
১) শুধুমাত্র টুরিস্ট ভিসায় বিদেশ যাওয়া (কাজের উদ্দেশ্য ছাড়া) জায়েয, যদি বৈধ উদ্দেশ্যে হয়। কিন্তু টুরিস্ট ভিসায় গিয়ে অবৈধভাবে কাজ করার উদ্দেশ্যে যাওয়া জায়েয হবে না।
২) টুরিস্ট ভিসায় গিয়ে পরে ওয়ার্ক পারমিট করার নিয়তে যাওয়া — যদি দৃঢ় সংকল্প থাকে যে, পৌঁছে প্রথমে বৈধভাবে ভিসা পরিবর্তন করবে এবং ততক্ষণ কাজ করবে না, তাহলে জায়েয হওয়ার অবকাশ রয়েছে। তবে, যদি জানা থাকে যে ভিসা পরিবর্তন সম্ভব নয় এবং অবৈধভাবে কাজ করতে হবে, তাহলে জায়েয হবে না।
৩) টুরিস্ট ভিসায় কাজ করে উপার্জন — কাজটি নিজে হালাল হলে উপার্জন হালাল, তবে ভিসার শর্ত ভঙ্গ করার কারণে দায়বদ্ধ থাকবে। উত্তম হলো বৈধভাবে কাজ করা।
৪) নিকটাত্মীয়ের ব্যবস্থা থাকলে — যদি বৈধভাবে কাজের ব্যবস্থা করা সম্ভব হয় এবং পুলিশি ঝামেলার আশঙ্কা কম থাকে, তাহলে অর্থকষ্টের কারণে টুরিস্ট ভিসায় যাওয়া জায়েয হওয়ার অবকাশ রয়েছে, তবে শর্ত হলো যত দ্রুত সম্ভব বৈধভাবে ভিসা পরিবর্তন করতে হবে।
গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ
১. সবচেয়ে উত্তম পথ: বৈধভাবে শ্রমিক ভিসা বা ওয়ার্ক পারমিট করে বিদেশ যাওয়া। এটি সম্পূর্ণ জায়েয এবং বরকতময়।
২. টুরিস্ট ভিসায় যাওয়ার পূর্বে: অবশ্যই স্থানীয় কোনো আলেম বা মুফতির সাথে পরামর্শ করুন এবং দেশের আইন সম্পর্কে ভালোভাবে জেনে নিন।
৩. দ্বীন ও ইমান রক্ষা: বিদেশে গিয়ে দ্বীনি আমল বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নামাজ, রোজা, হালাল খাবার ইত্যাদির প্রতি যত্নবান থাকুন।
৪. দেশের আইন মেনে চলা: ইসলামে প্রতিশ্রুতি ও শর্ত পূরণ করা অপরিহার্য। টুরিস্ট ভিসার শর্ত ভঙ্গ করা একটি গুনাহের কাজ।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে হালাল রিজিকের তাওফিক দান করুন এবং হারাম থেকে হেফাজত করুন। আমিন।
والله أعلم بالصواب