সরকারি স্বায়ত্ত্বশাসিত কোম্পানিতে অর্থ সংক্রান্ত পদে চাকরী করার বিধান কি

Business and Job · Hanafi

Question No: 389
Questioner: Sohel Miah
Question Asked: 20 May 2026, 12:55 AM
Reviewed & Published: 20 May 2026, 01:54 AM
Views: 30
Tokens: 5,351
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম মুহতারাম,
সরকারি বিভিন্ন স্বায়ত্ত্বশাসিত কোম্পানি যেমন: পেট্রোবাংলা (তেল, গ্যাস, খনিজ পদার্থ সম্পর্কিত), ডেসকো (বিদ্যুৎ সম্পর্কিত) ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানে অর্থ সংক্রান্ত নিম্নোক্ত পদগুলোতে কাজ করার বিধান কী? যদি ব্যাংকিং এর সুদি লেনদেন তারা করে থাকে তাহলে কি সুদ সম্পর্কিত ঐ হাদিসের অন্তর্ভূক্ত হয়ে যেতে হয় কিনা যে "রাসূল(ﷺ) ‎লা'নত করেছেন সুদখোর, সুদদাতা, সুদের লেখক ও তার সাক্ষীর উপর"। আবার যারা অর্থ সংক্রান্ত পদে নয় যেমন সহকারী পরিচালক রয়েছেন তারাও হয়তো অর্থ-সংস্থান এর ব্যাপারে সুদি লেনদেন করার হুকুম করে থাকতে পারেন প্রতিষ্ঠানের নীতি অনুযায়ী। তাহলে কি এসকল পদে চাকরি করাই নাযায়েজ হবে নাকি কোনো উপায় বা সুরত রয়েছে। আসলে এসব পদে বাস্তবেই কি তা করতে হয় কিনা নিশ্চিত না, যদি কোনো সূত্রে তা নিশ্চিত হওয়া যায় জানাবেন দয়া করে। কারণ ঐসব সেক্টরে না যাওয়া পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে বলতে পারছি না। তাই সেগুলোয় চাকরির চেষ্টা করবো কিনা দ্বিধায় আছি। তবে অর্থ সংশ্লিষ্ট পদে চাকরির কিছু প্রধান কাজ নিম্নে উল্লেখ করা হল যেন হযরতের জন্য সহজ হয়।

১। অর্থ ব্যবস্থাপক: প্রতিষ্ঠানের বাজেট, আয়-ব্যয়, বিল, অডিট ও আর্থিক রিপোর্ট দেখাশোনা করে এবং ফাইন্যান্স বা অর্থ-সংস্থান সংক্রান্ত সিদ্ধান্তে সহায়তা করে ইত্যাদি।

২। হিসাব সহকারী: ভাউচার, বিল, হিসাব এন্ট্রি, লেজার বা খতিয়ানে হিসাব মেইনটেইন করা ও রিপোর্ট তৈরিতে সহায়তা করে এবং আর্থিক নথি সংরক্ষণ করে ইত্যাদি।

৩। ক্যাশিয়ার: দৈনন্দিন নগদ টাকা গ্রহণ-প্রদান, ক্যাশ বুক রাখা ও কোম্পানির সাথে ব্যাংক লেনদেনের হিসাব ঠিক রাখে ইত্যাদি।

Answer

بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيم
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

প্রশ্নটির জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। আপনি সরকারি স্বায়ত্ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠানে (যেমন পেট্রোবাংলা, ডেসকো) অর্থ সংক্রান্ত পদে কাজ করার বৈধতা ও সুদ সম্পর্কিত হাদিসের আলোকে এর প্রভাব জানতে চেয়েছেন। নিচে কুরআন, হাদিস ও হানাফি ফিকহের আলোকে বিস্তারিত উত্তর প্রদান করা হলো।

১. সুদের (রিবা) গুরুত্ব ও নিষেধাজ্ঞা

কুরআন ও হাদিসে সুদকে স্পষ্টভাবে হারাম ঘোষণা করা হয়েছে এবং এর সাথে জড়িত সকল পক্ষকে অভিশপ্ত করা হয়েছে। আল্লাহ বলেন:

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَذَرُوا مَا بَقِيَ مِنَ الرِّبَا إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ
"হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে ভয় কর এবং সুদের যা কিছু বাকি থাকে তা ছেড়ে দাও, যদি তোমরা মুমিন হও।" (সূরা আল-বাকারা ২:২৭৮)

রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন:

لَعَنَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ آكِلَ الرِّبَا وَمُؤْكِلَهُ وَكَاتِبَهُ وَشَاهِدَيْهِ وَقَالَ هُمْ سَوَاءٌ
"রাসূলুল্লাহ (ﷺ) অভিশাপ দিয়েছেন সুদখোরকে, সুদদাতাকে, সুদের লেখককে ও তার দুই সাক্ষীকে। আর তিনি বলেছেন, তারা সকলেই সমান।" (সহিহ মুসলিম, ১৫৯৮)

এই হাদিস সুদ লেনদেনের প্রতিটি স্তরের সাথে জড়িত ব্যক্তিকে অভিশপ্ত বলেছে, যার মধ্যে রয়েছে:

  • সুদখোর (যে সুদ গ্রহণ করে),
  • সুদদাতা (যে সুদ প্রদান করে),
  • লেখক (যে সুদের চুক্তি বা হিসাব লিখে),
  • সাক্ষী (যে সাক্ষ্য দেয়)।

২. প্রশ্নে উল্লেখিত পদের বিধান

(ক) অর্থ ব্যবস্থাপক, হিসাব সহকারী, ক্যাশিয়ার

  • সরাসরি সুদি লেনদেনের সাথে সম্পৃক্ততা: যদি প্রতিষ্ঠানটি ব্যাংকিং সুদি লেনদেন করে (যেমন ঋণ, আমানত, বিনিয়োগ ইত্যাদির মাধ্যমে সুদ গ্রহণ বা প্রদান), তাহলে এই পদে কাজ করা হারাম হবে। কারণ:

    • অর্থ ব্যবস্থাপক প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, যা সুদি লেনদেন অনুমোদন বা পরিচালনার সাথে জড়িত হতে পারে।
    • হিসাব সহকারী সুদের লেনদেনের হিসাব এন্ট্রি, ভাউচার তৈরি, লেজার রক্ষণাবেক্ষণ ইত্যাদি করে, যা হাদিসের বর্ণিত "লেখক" এর অন্তর্ভুক্ত।
    • ক্যাশিয়ার নগদ টাকা গ্রহণ-প্রদান করে, যা সরাসরি সুদি লেনদেনের অংশ হতে পারে (যেমন ব্যাংক লেনদেনে সুদ জড়িত থাকে)।
  • হাদিসের আলোকে বিধান: উপরোক্ত পদের কাজগুলো সুদি লেনদেনের সাথে সরাসরি যুক্ত হলে, তাহলে তারা হাদিসের অভিশপ্ত দলের অন্তর্ভুক্ত হবে এবং এই কাজ হারাম ও গুনাহের কাজ হবে।

(খ) সহকারী পরিচালক (যিনি সরাসরি অর্থ সংক্রান্ত নন)

  • যদি তার কাজে সুদি লেনদেনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ বা বাস্তবায়ন অন্তর্ভুক্ত না থাকে, তাহলে শুধুমাত্র প্রতিষ্ঠানের অন্যান্য বৈধ কাজের জন্য চাকরি করা জায়েজ হতে পারে। তবে শর্ত হলো:
    • তিনি সুদের লেনদেনে অংশগ্রহণ করবেন না
    • প্রতিষ্ঠানের অন্যান্য বিভাগে যদি সুদের সাথে সম্পর্কহীন কাজ থাকে, তাহলে সেটি বৈধ হবে।
    • তবে উল্লেখিত পদগুলোর মতো যদি তার কাজ সুদের সাথে পরোক্ষভাবে জড়িত হয় (যেমন সুদের চুক্তি অনুমোদন), তাহলে সেটিও হারাম

৩. বাস্তব অবস্থা নিশ্চিত না হলে কী করবেন?

  • ইসলামী নীতি: কোনো কাজের হুকুম তার বাস্তব অবস্থার ওপর নির্ভর করে। আপনি যদি নিশ্চিত না হন যে প্রতিষ্ঠানটি আসলে সুদি লেনদেন করে কিনা, তাহলে:
    • নিশ্চিত হওয়া জরুরি: আগে প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম সম্পর্কে গবেষণা করুন। সরকারি স্বায়ত্ত্বশাসিত কোম্পানি যেমন পেট্রোবাংলা বা ডেসকো সাধারণত ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে থাকে, যা সুদভিত্তিক হয়। এছাড়া তাদের নিজস্ব তহবিল বা বিনিয়োগেও সুদ জড়িত থাকতে পারে।
    • তথ্য সংগ্রহ করুন: প্রতিষ্ঠানের আর্থিক প্রতিবেদন, ঋণের তথ্য, পরিচালনা পদ্ধতি ইত্যাদি দেখে নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করুন।
    • সন্দেহ থাকলে: যদি স্পষ্টভাবে জানা না যায় কিন্তু প্রবল সম্ভাবনা থাকে যে তারা সুদি লেনদেন করে, তাহলে এখানে চাকরি করা থেকে বিরত থাকাই উত্তম। কারণ সন্দেহ থেকে বেঁচে থাকা ইসলামের শিক্ষা।

৪. হানাফি ফিকহের আলোকে সমাধান

  • ইবনে আবিদীন (রহ.) তার রদ্দুল মুহতার গ্রন্থে বলেন:

    "সুদের সাথে জড়িত কোনো কাজ করা, যেমন সুদ লেখা, সাক্ষ্য দেওয়া, বা সুদের লেনদেনে সহায়তা করা, তা হারাম।" (রাদ্দ আল-মুহতার, ৫/১৭৫)

  • মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) মা'আরিফুল কুরআন এ সুদের ভয়াবহতা বর্ণনা করে বলেছেন, সুদি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করা জায়েজ নয়, যদি না ব্যক্তি সরাসরি সুদের লেনদেন থেকে দূরে থাকে। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে অর্থ বিভাগের পদগুলো সুদের সাথে জড়িত থাকে।

  • মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) বলেন:

    "যে প্রতিষ্ঠান সুদি লেনদেন করে, সেখানে কোনো পদে চাকরি করা জায়েজ হবে না, যদি সেই পদটি সুদের লেনদেনের সাথে সম্পর্কিত হয়। তবে যদি কোনো পদ সম্পূর্ণ সুদমুক্ত হয় (যেমন নিরাপত্তা প্রহরী, ড্রাইভার), তাহলে সেটি জায়েজ হতে পারে।" (ইসলাম ও সুদ, পৃষ্ঠা ৪৫)

৫. নির্দিষ্ট পদের জন্য পরামর্শ

(১) অর্থ ব্যবস্থাপক:

  • হারাম। কারণ তিনি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী, যা সুদি লেনদেনের অনুমোদনের সাথে জড়িত।

(২) হিসাব সহকারী:

  • হারাম। কারণ তিনি সুদের লেনদেনের হিসাব নথিভুক্ত করেন, যা হাদিসের "লেখক" এর অন্তর্ভুক্ত।

(৩) ক্যাশিয়ার:

  • হারাম। কারণ তিনি সুদি লেনদেনের নগদ টাকা গ্রহণ-প্রদান করেন।

(৪) সহকারী পরিচালক (অর্থ ছাড়া):

  • যদি তার কাজ সুদের সাথে সরাসরি জড়িত না হয়, তাহলে জায়েজ হতে পারে। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই পদেও প্রতিষ্ঠানের নীতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত গ্রহণ বা বাস্তবায়নে সুদের প্রভাব থাকতে পারে।

৬. চাকরি না পাওয়ার আশঙ্কা থাকলে কী করবেন?

যদি এই প্রতিষ্ঠানগুলোতে চাকরি না পেয়ে অন্য কোনো বিকল্প না থাকে, তাহলে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো মনে রাখবেন:

  • আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করুন। তিনি হালাল রিজিকের পথ অবশ্যই খুলে দেবেন। আল্লাহ বলেন:

    وَمَنْ يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَلْ لَهُ مَخْرَجًا وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ
    "যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য নিষ্কৃতির পথ বের করে দেবেন এবং তাকে এমন উৎস থেকে রিজিক দেবেন যা সে কল্পনাও করতে পারে না।" (সূরা আত-তালাক ৬৫:২-৩)

  • হারাম কাজ থেকে বিরত থাকুন। সুদি প্রতিষ্ঠানে অর্থ সংক্রান্ত পদে চাকরি করে সাময়িক লাভের চেয়ে আল্লাহর অসন্তুষ্টি অর্জন করা অনেক বড় ক্ষতি।

৭. উপসংহার

  • প্রশ্নে উল্লেখিত তিনটি পদই (অর্থ ব্যবস্থাপক, হিসাব সহকারী, ক্যাশিয়ার) হারাম, যদি প্রতিষ্ঠানটি সুদি লেনদেন করে। তবে বাস্তব অবস্থা নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করুন।
  • সহকারী পরিচালক পদে শুধুমাত্র সেই শর্তে জায়েজ হতে পারে যদি তার কাজ সুদের সাথে সরাসরি জড়িত না হয়।
  • সর্বোত্তম পন্থা: এসব প্রতিষ্ঠানে চাকরি করার চেষ্টা করা থেকে বিরত থাকুন এবং হালাল উপার্জনের জন্য চেষ্টা চালিয়ে যান।

আল্লাহ আমাদেরকে হালাল রিজিক দান করুন এবং হারাম থেকে দূরে রাখুন। আমিন।

والله أعلم بالصواب
(আল্লাহই সর্বাধিক জ্ঞানী)



This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.