অফিসিয়াল কাজে কোথাও গেলে এবং আত্মীয়র বাসায় রাত্রিযাপন করলে কি হোটেল বিলের ভাউচার দেওয়া যাবে?
Business and Job · Hanafi
Question
আমার কোম্পানির নিয়ম হচ্ছে আমি যদি কোম্পানির প্রয়োজনে পাশের জেলায় রাত কাটাই তাহলে খরচ যাই হোকনা কেন হোটেল খরচ বাবদ প্রায় ১৪০০-১৫০০ টাকা দেয়া হয়। এক্ষেত্রে প্রমাণ স্বরূপ কোম্পানিকে হোটেল বিল এর মেমো বা ভাউচার দেখানো লাগে।
এখন আমাকে কোন মাসে প্রায় ১০ দিন বাইরে থাকা লাগলো তো আমি আমার এক পরিচিত ভাইয়ের বাসায় থাকলাম। টাকাও কম খরচ হলো প্লাস সেফটি। তো এক্ষেত্রে যদিও আমি বাইরে রাত কাটিয়েছি কিন্তু হোটেল এ না থাকার দরুন ঐ বিল থেকে বঞ্চিত হবো।
১.তো আমি যদি বাসা ভাড়া বাবদ ভাইকে কিছু টাকা দিই এবং নিজে মেমো বানিয়ে তা অফিসে জমা দিই তাহলে তা জায়েজ হবে কিনা?
২. বা কোনো হোটেল এর ফাঁকা মেমো নিয়ে তাতে যে কয়টাকা বিল হওয়ার কথা তা নিজেই যদি লিখি তা কি জায়েজ হবে?
৩. এক্ষেত্রে বিলটা পাওয়ার জন্য কি করা যায়? যেহেতু বিল পাওয়ার উপযুক্ত কিন্তু হেটেল এর মেমো নেই?
Answer
উত্তর: ওয়া আলাইকুম আসসালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
আপনার প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে একটি গুরুত্বপূর্ণ ফিকহি নীতি স্পষ্ট করে নেওয়া জরুরি:
ইসলামী শরিয়তে মিথ্যা বলা, প্রতারণা করা, জালিয়াতি করা এবং কোনো কোম্পানির সম্পদ (মাল) অন্যায়ভাবে গ্রহণ করা হারাম। এটি একটি গুরুতর গুনাহ। কোম্পানি আপনাকে যে অর্থ দিচ্ছে, তা একটি নির্দিষ্ট শর্তের ভিত্তিতে দিচ্ছে—সেটি হচ্ছে হোটেলে থাকার বাস্তব বিল বা ভাউচার উপস্থাপন করা। যেহেতু আপনি হোটেলে থাকেননি, তাই সেই অর্থ আপনার জন্য বৈধ নয়।
এখন আপনাদের কোম্পানির নিয়ম যদি হয় যে, হোটেল বিল দেখালেই নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা দেওয়া হবে, তাহলে নিম্নোক্ত পদ্ধতিগুলো জায়েজ হবে কি না, তা বিশ্লেষণ করা যাক:
১. বাসা ভাড়া বাবদ ভাইকে কিছু টাকা দিয়ে নিজে মেমো বানিয়ে জমা দেওয়া:
উত্তর: এটি জায়েজ নয় এবং এটি একটি জালিয়াতি ও প্রতারণা। কারণ:
- আপনি প্রকৃতপক্ষে হোটেলে থাকেননি, অথচ হোটেল বিলের মতো একটি জাল কাগজ তৈরি করছেন।
- কোম্পানির সাথে আপনার চুক্তি বা নীতিমালা অনুযায়ী, আপনি শুধুমাত্র প্রকৃত হোটেল বিলের বিপরীতে সেই অর্থ পাওয়ার অধিকারী।
- আপনি যদি ভাইকে বাসা ভাড়া হিসেবে কিছু টাকা দেন, তবে তা একটি ব্যক্তিগত লেনদেন। সেই লেনদেনের রসিদ কোম্পানিকে হোটেল বিল হিসেবে দেখানো মিথ্যা ও প্রতারণা।
- সুতরাং, এটি সম্পূর্ণরূপে হারাম ও নাজায়েজ। (সূত্র: ফাতাওয়া শামী, ৫/২৬১; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ২/৩১৮; ইমদাদুল ফাতাওয়া, ২/২০৮)
২. কোনো হোটেলের ফাঁকা মেমো নিয়ে নিজে টাকা লিখে জমা দেওয়া:
উত্তর: এটিও জায়েজ নয় এবং এটি মিথ্যা, প্রতারণা ও জালিয়াতি।
- একটি ফাঁকা হোটেল মেমো নেওয়া এবং তাতে নিজের ইচ্ছামতো টাকা লেখা জালিয়াতির শামিল।
- প্রমাণ (ভাউচার) উপস্থাপন না করে কোম্পানির কাছ থেকে অর্থ নেওয়া আপনার জন্য হারাম হবে।
- এটি আপনার আখিরাতের জন্য ক্ষতির কারণ হবে এবং দুনিয়ায়ও এটি একটি বিশ্বাসঘাতকতা। (সূত্র: সহিহ বুখারি, হাদিস নং ২৪৫২; আল-হিদায়া, ৩/২৮৭; ফাতাওয়া উসমানী, ১/৩১১)
৩. বিল পাওয়ার জন্য কী করা যায়? (সঠিক পদ্ধতি)
আপনার জন্য নিম্নোক্ত বৈধ পন্থাগুলো অবলম্বন করা জায়েজ:
ক. কোম্পানির নীতিমালা জানুন: প্রথমে আপনার কোম্পানির নীতিমালা ভালোভাবে দেখুন। যদি নীতিমালায় বলা থাকে "শুধুমাত্র হোটেল বিলের বিপরীতে" অর্থ দেওয়া হবে, তাহলে আপনি হোটেলে না থাকার কারণে আপনি এই সুবিধার জন্য যোগ্য নন। তবে, যদি নীতিমালায় বলা থাকে "বাইরে রাত কাটানোর খরচ বাবদ" বা "ভ্রমণ ভাতা" তখন আপনি ভিন্ন পদ্ধতি অবলম্বন করতে পারেন।
খ. ভাইয়ের বাসায় থাকার সত্যতা জানিয়ে প্রকৃত খরচ চাওয়া (যদি কোম্পানি অনুমতি দেয়): আপনি আপনার কোম্পানির ব্যবস্থাপনার সাথে কথা বলে সত্যি পরিস্থিতি খুলে বলতে পারেন যে, আপনি নিরাপত্তা ও সাশ্রয়ের জন্য পরিচিত ভাইয়ের বাসায় থেকেছেন। বিনিময়ে আপনি ভাইকে কিছু টাকা দিয়েছেন বা কিছু উপহার দিয়েছেন। যদি কোম্পানি এই সত্যতা মেনে নেয় এবং সেই অনুযায়ী আপনাকে কিছু ভাতা দেয় (যেমন প্রকৃত খরচ বাবদ), তাহলে তা জায়েজ হবে। কিন্তু কোম্পানির অনুমতি ছাড়া নিজ থেকে কোনো ভাউচার তৈরি করা জায়েজ হবে না।
গ. প্রকৃত হোটেল ভাউচার ছাড়া অন্যকিছু জমা দেওয়া কোম্পানি মেনে নিলে: যদি কোম্পানি নীতিমালা শিথিল করে এবং বলে যে, "আপনি যদি মার্কেট থেকে খাবার বা অন্য কোনো বৈধ খরচের বিল জমা দেন, তবুও আমরা আপনাকে হোটেল ভাতা দেবো", তাহলে সেটা জায়েজ হবে। কিন্তু কোম্পানিকে না জানিয়ে নিজে থেকে ওইরূপ বিল জমা দেওয়া জায়েজ নয়।
ঘ. আপনার করণীয়: আপনার জন্য সঠিক উপায় হলো:
- কোম্পানির অ্যাকাউন্টস বা প্রশাসনিক বিভাগের নিকট থেকে স্পষ্ট অনুমতি নেওয়া যে, আপনি যদি ঘর ভাড়া বা অন্য বৈধ খরচের বিল দেন, তাহলে তারা হোটেল ভাতা দেবেন কি না।
- যদি সেই অনুমতি না পাওয়া যায়, তাহলে আপনি প্রকৃত খরচ (যেমন: পরিবহন, খাদ্য) ছাড়া বাড়তি অর্থ নিতে পারবেন না।
- আপনি যদি ভাইয়ের বাসায় থেকে থাকেন, তবে আপনি তার কাছ থেকে একটি রশিদ (প্রমাণ-পত্র) নিতে পারেন যে, "আপনাকে তা-এত টাকা দেওয়া হয়েছে"। কিন্তু সেটি কোম্পানিকে হোটেল বিল হিসেবে দেখানো যাবে না, বরং একটি "আবাসন সহায়তা" বা "বাসা ভাড়া" হিসেবে দেখাতে হবে (যদি কোম্পানি তা গ্রহণ করে)।
সংক্ষিপ্ত সিদ্ধান্ত:
- প্রশ্ন ১ ও ২: নিজে জাল মেমো তৈরি করা বা হোটেলের ফাঁকা মেমো পূরণ করা হারাম ও নাজায়েজ। এতে করে আপনি অন্যায়ভাবে কোম্পানির সম্পদ ভক্ষণ করবেন, যা কঠোর গুনাহ।
- প্রশ্ন ৩: আপনি কোম্পানির অনুমতি নিয়ে প্রকৃত খরচ দাবি করতে পারেন, অথবা হোটেলে খরচ না করায় সেই অর্থ থেকে বিরত থাকুন। আপনার জন্য সর্বোত্তম পন্থা হলো সৎ উপায়ে কাজ করা এবং আল্লাহর কাছে বরকত কামনা করা।
আল্লাহ তায়ালা প্রশ্নকারীকে হালাল উপায়ে জীবিকা অর্জনের তাওফিক দান করুন। আমিন।
উল্লেখযোগ্য হানাফি কিতাব:
- ফাতাওয়া শামী (রাদ্দুল মুহতার) ৫/২৬১-২৬২
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া (আলমগীরি) ২/৩১৮
- ইমদাদুল ফাতাওয়া ২/২০৮
- ফাতাওয়া উসমানী ১/৩১১
- বাহিশতি জেওর (আশরাফ আলী থানভী) - হিসাব-নিকাশ সম্পর্কিত অধ্যায়