সিদ্ধান্তহীনতা
Business and Job · Hanafi
Question
আমি এখন ১টা এনঞ্জিও তে চাকরি করি মাঠ করমী পদে।এটার বেতন ভালো কিন্তু আমি সারাক্ষন মনকস্টে অশান্তি তে ভুগি।সারাক্ষণ রাস্তায় থাকা এত টার্গেট চাপ এত পুরুসের সাথে হেসে কথা বলতে হয় জগ্রা করতে হয় আমার খুব খারাপ লাগে।আমি।৩বার রিজাইন দিয়েছি।কিন্তু।অফিস নিচ্ছেনা।।ওনারা বারবার এইযে চাক্রির বাজার খারাপ,এখন চাকরি ছারলে পাবোনা,,আর আমার সামির ও আরথিক অবস্থা দুরবল জানেন সেগুলা বুজাচ্ছেন।।আমার ১টা ৫বছরের মেয়েও আছে।।তার ভবিষ্যতের জন্য চাক্রিটা দরকার।।কিন্তু আবার।সুদের চাকরি।এর।উপর এত লোকের সাথে কথা বলতে হয় এগুলাও আর নিতে পারছিনা।এভাবে।সারাদিন রাস্তা রাস্তায় ঘুরতে।।আমিযে কি করবো আমার খুব অশান্তি লাগতেছে।।কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারছিনা।।আর কোথাও কোন চাকরি বা ব্যবসার লাইন ও হচ্চেনা।।আমার ও না আর আমার সামিওও ১১বছর ধরে কোনভাবেই উঠে দারাতে পারছেনা
আমাকে ১টু।সঠিক পথের দিশা দিন আর আমার জন্য ১টু।দুয়া করেন আল্লাহ যেন হিদায়াত দেন আর।সঠিক পথের।দিশা দেন আমার।এখন কি করনিয়??বরতমান দেশের অবস্থায় চাক্রিটা করা ঠিক হবে নাকি ছেরে দিলে ভালো হবে
Answer
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
প্রিয় বোন, আপনার অবস্থা ও মানসিক অশান্তি আমি সম্পূর্ণভাবে অনুধাবন করতে পারছি। আপনার প্রশ্নটি মূলত দুটি বিষয়কে কেন্দ্র করে: (১) সুদভিত্তিক (এনজিও) চাকরির বিধান, এবং (২) চাকরিতে থাকা অবস্থায় পুরুষের সাথে কথা বলার মতো পরিবেশের বিধান। আসুন, কুরআন-হাদিস ও হানাফি ফিকহের আলোকে বিষয়গুলো বিশ্লেষণ করি।
১. সুদভিত্তিক (এনজিও) চাকরির বিধান
আপনি যে এনজিওতে কাজ করছেন, সেটি যদি সুদভিত্তিক হয় (যেমন: মাইক্রোক্রেডিট বা সুদে টাকা বিতরণ করা হয়), তাহলে শরিয়তের দৃষ্টিতে সেখানে চাকরি করা সম্পূর্ণ হারাম। কুরআন ও হাদিসে সুদের সাথে জড়িত থাকার ব্যাপারে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা হয়েছে।
- কুরআনের নির্দেশ: আল্লাহ তাআলা বলেন, "হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সুদের যা কিছু বাকি থাকে তা ছেড়ে দাও, যদি তোমরা মুমিন হয়ে থাক।" (সূরা আল-বাকারা: ২৭৮)
- হাদিসের বর্ণনা: হযরত জাবির (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) সুদখোর, সুদদাতা, সুদের লেখক ও তার সাক্ষী—এই চার শ্রেণির লোকের উপর লানত (অভিশাপ) করেছেন। (সহিহ মুসলিম: ১৫৯৮)
হানাফি ফিকহের দৃষ্টিভঙ্গি:
- ফাতাওয়া আলমগীরি ও রদ্দুল মুহতার-এ স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে যে, সুদভিত্তিক প্রতিষ্ঠানে (ব্যাংক বা এনজিও) চাকরি করা, সেখানে হিসাব রাখা, টাকা আদায় করা বা এমনকি দারোয়ানের কাজ করাও জায়েয নেই। কারণ, এতে হারাম কাজে সহযোগিতা করা হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, "তোমরা নেকী ও তাকওয়ার কাজে একে অপরকে সাহায্য করো এবং পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে একে অপরকে সহযোগিতা করো না।" (সূরা আল-মায়িদা: ২)
- ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ রদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ করেছেন যে, সুদভিত্তিক লেনদেনের সাথে জড়িত থাকা কবিরা গুনাহ এবং এর মাধ্যমে উপার্জিত অর্থ বরকতহীন।
আপনার করণীয়: যেহেতু আপনি জানেন যে, এটি সুদের চাকরি, তাই এই চাকরি ছেড়ে দেওয়া আপনার উপর ফরজ (অবশ্য কর্তব্য)। এই চাকরিতে থেকে যাওয়া এবং হারাম উপার্জন দিয়ে পরিবার চালানো আপনার ও আপনার সন্তানের জন্য বরকত বয়ে আনবে না। বরং, হারাম উপার্জনে পরিবারে অভাব-অনটন ও অশান্তি বাড়ে।
২. চাকরির পরিবেশে পুরুষের সাথে কথা বলার বিধান
আপনি উল্লেখ করেছেন যে, কাজের প্রয়োজনে পুরুষদের সাথে হেসে কথা বলতে হয়, যা আপনার খুব খারাপ লাগে। শরিয়তে অপরিচিত (গায়রে মাহরাম) পুরুষের সাথে সাক্ষাৎ, কথা বলা ও দেখা-সাক্ষাতের ব্যাপারে কঠোর বিধান রয়েছে।
- কুরআনের নির্দেশ: আল্লাহ তাআলা বলেন, "আর তোমরা নিজেদেরকে প্রদর্শন করো না, যেমনিভাবে প্রদর্শন করত জাহেলিয়াতের যুগের নারীরা।" (সূরা আল-আহযাব: ৩৩) অন্য আয়াতে বলেন, "মুমিন নারীদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হিফাজত করে।" (সূরা আন-নূর: ৩১)
- হাদিসের বর্ণনা: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "তোমাদের কেউ যেন কোনো পুরুষের সাথে নির্জনে সাক্ষাৎ না করে।" (সহিহ বুখারি: ৫২৩৩)
হানাফি ফিকহের দৃষ্টিভঙ্গি:
- ফাতাওয়া উসমানি ও ইমদাদুল ফাতাওয়া-তে স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে যে, অপরিচিত পুরুষের সাথে কথা বলা, বিশেষ করে হেসে-খেলে বা নরম স্বরে কথা বলা নারীদের জন্য জায়েয নেই। প্রয়োজনে (যেমন: কেনাকাটা বা জরুরি কাজ) সংক্ষিপ্তভাবে, শক্ত ও সোজাসাপ্টা ভাষায় কথা বলা যেতে পারে, তবে তাও পর্দার আড়াল থেকে বা প্রয়োজন অনুযায়ী।
- মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) তাঁর তাফসির মা'আরিফুল কুরআন-এ উল্লেখ করেছেন যে, নারীদের জন্য গায়রে মাহরাম পুরুষের সাথে কথাবার্তায় সতর্কতা অবলম্বন করা ফরজ। যদি কাজের চাপে তা সম্ভব না হয়, তাহলে সেই চাকরি ত্যাগ করা উচিত।
৩. চাকরি ছাড়ার পর আর্থিক সংকট ও সন্তানের ভবিষ্যৎ
আপনি চিন্তিত যে, চাকরি ছাড়লে আর্থিক সংকটে পড়বেন এবং ৫ বছরের মেয়ের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। এ বিষয়ে ইসলামের দিকনির্দেশনা হলো:
- রিজিকের মালিক আল্লাহ: আল্লাহ তাআলা বলেন, "আর যে আল্লাহকে তাকওয়া অবলম্বন করে, আল্লাহ তার জন্য উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন। এবং তাকে এমন জায়গা থেকে রিজিক দেন, যা তার ধারণাও হয় না।" (সূরা আত-তালাক: ২-৩)
- হাদিসের বর্ণনা: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং উত্তম পন্থায় রিজিক তালাশ করো। কারণ, কোনো বান্দা ততক্ষণ পর্যন্ত মরবে না, যতক্ষণ না তার রিজিক পূর্ণ হবে।" (ইবনে মাজাহ: ২১৪৪)
হানাফি ফিকহের দৃষ্টিভঙ্গি:
- ফাতাওয়া উসমানি-তে উল্লেখ আছে যে, হারাম উপার্জন ত্যাগ করা ফরজ। হারাম উপার্জন ত্যাগ করলে আল্লাহ বিকল্প হালাল রিজিকের ব্যবস্থা করেন। তবে, চাকরি ছাড়ার আগে অন্য কোনো হালাল চাকরি বা ব্যবসার সন্ধান করা এবং আল্লাহর উপর ভরসা রাখা উচিত।
- আশরাফ আলী থানভী (রহ.) তাঁর বেহেশতী জেওর-এ বলেছেন, "হারাম উপার্জন ত্যাগ করা ফরজ, যদিও তা কষ্টকর হয়। আল্লাহ তায়ালা তাকওয়ার বিনিময়ে হালাল রিজিক দান করেন।"
৪. আপনার করণীয় সম্পর্কে সিদ্ধান্ত ও দিকনির্দেশনা
আপনার বর্তমান পরিস্থিতিতে আমি নিম্নোক্ত পরামর্শ দিচ্ছি:
১. সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ: যেহেতু আপনি নিশ্চিত যে, এটি সুদভিত্তিক চাকরি, তাই এই চাকরি ছেড়ে দেওয়াই আপনার জন্য ফরজ। সুদের চাকরিতে থেকে যাওয়া আপনার ঈমান ও আখিরাতের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। আল্লাহর উপর ভরসা রেখে চাকরি ছাড়ুন।
২. বিকল্প খোঁজা: চাকরি ছাড়ার আগে বা ছাড়ার পরপরই অন্য কোনো হালাল চাকরি বা ব্যবসার সন্ধান করুন। আপনি মাঠকর্মী হিসেবে কাজ করেছেন, তাই আপনার অভিজ্ঞতা আছে। আপনি কোনো ইসলামিক ব্যাংকের (যা সুদমুক্ত) বা হালাল ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে চাকরির চেষ্টা করতে পারেন। অথবা বাসায় বসে সেলাই, হস্তশিল্প, বা অনলাইনে ছোটখাটো ব্যবসা শুরু করতে পারেন।
৩. স্বামীর সহযোগিতা: আপনার স্বামী ১১ বছর ধরে চেষ্টা করেও উঠে দাঁড়াতে পারছেন না। আপনি উভয়ে মিলে আল্লাহর কাছে বেশি বেশি তাওবা ও ইস্তিগফার করুন। হারাম উপার্জন বন্ধ হলে আল্লাহর রহমতে রিজিকে বরকত আসবে। স্বামীকে উৎসাহিত করুন যেন তিনি কোনো হালাল ব্যবসা বা কাজের সন্ধান করেন।
৪. ধৈর্য ও তাকওয়া: এই কঠিন সময়ে ধৈর্য ধারণ করুন এবং আল্লাহর উপর পূর্ণ ভরসা রাখুন। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "জেনে রেখো, যে বিষয়ে তোমার উপকার হবে না, তা তুমি কখনো পাবে না। আর যে বিপদ তোমাকে স্পর্শ করেছে, তা তোমাকে স্পর্শ করা থেকে কখনো বিচ্যুত ছিল না।" (সহিহ মুসলিম: ২৫৭৭)
৫. দুআ ও উপসংহার
আপনার জন্য আমার আন্তরিক দুআ রইল। আল্লাহ তাআলা আপনাকে সঠিক পথের দিশা দিন, আপনার অন্তরকে প্রশান্তি দান করুন এবং আপনার জন্য উত্তম রিজিকের ব্যবস্থা করুন। আমিন।
মনে রাখবেন: হারাম উপার্জনে যে টাকা আসে, তাতে বরকত থাকে না। বরং, তা পরিবারে অশান্তি, অসুখ-বিসুখ ও মানসিক চাপ বাড়ায়। আপনি যে অশান্তিতে ভুগছেন, এটি সম্ভবত হারাম উপার্জনেরই ফল। তাই, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য এই চাকরি ছেড়ে দিন এবং হালাল রিজিকের সন্ধান করুন। আল্লাহ অবশ্যই পথ দেখাবেন।
উত্তম দুআ:
"رَبِّ إِنِّي لِمَا أَنزَلْتَ إِلَيَّ مِنْ خَيْرٍ فَقِيرٌ" উচ্চারণ: "রাব্বি ইন্নি লিমা আনযালতা ইলাইয়া মিন খাইরিন ফাকির।" অর্থ: "হে আমার রব! তুমি আমার প্রতি যে কল্যাণ নাজিল করবে, আমি তার মুখাপেক্ষী।" (সূরা আল-কাসাস: ২৪)