বিয়ের পর স্বামীর শারীরিক সমস্যা ও মানসিক অস্থিরতা—শরিয়তের দিকনির্দেশনা চাই।

Marriage and Divorce · Hanafi

Question No: 3579
Questioner: Koly Akter
Question Asked: 06 Aug 2026, 09:45 PM
Reviewed & Published: 06 Aug 2026, 09:57 PM
Views: 55
Tokens: 9,416
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ।

আমার বয়স ২২ বছর। পারিবারিকভাবে আমার বিয়ে হয়েছে (গ্রামে) প্রায় ২ মাস। আমার স্বামী আমার থেকে প্রায় ১০–১২ বছরের বড়। খুব অল্প সময়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে, ৩ দিন এর মধ্যে, তাঁর মোটামুটি দ্বীনদারিতা দেখে, বেকার জেনেও আমি বিয়েতে রাজি হই।এখন অবধি শশুর বাড়ি যাইনি,উঠিয়ে নেয়ার কথা আরো ৬ মাস বা ১ বছর পর।
তো প্রবলেম হচ্ছে...
বিয়ের প্রথম দিনই জানতে পারি, তাঁর একটি শারীরিক সমস্যা আছে, যার কারণে এখনো আমাদের স্বাভাবিক দাম্পত্য জীবন শুরু হয়নি। বর্তমানে তিনি চিকিৎসা করাচ্ছেন। প্রথমে তিনি বলতেন, তিনি আগে এ সমস্যার কথা জানতেন না এবং কীভাবে হয়েছে তাও জানেন না। পরে আমি বারবার জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, এটি তাঁর নিজের ভুলের কারণে হয়েছে। বিষয়টি বিয়ের আগে আমাদের জানানো হয়নি, আর আমরাও এ বিষয়ে খোঁজ নিইনি—এ জন্য এখন খুব আফসোস হচ্ছে।

এ ছাড়া বয়সের পার্থক্য, তাঁর চলাফেরা ও আচরণ আমার কাছে অনেক পরিণত বা বয়স্ক মানুষের মতো মনে হয়। তিনি খুব কম রসিকতা বা স্নেহপূর্ণ কথা বলেন, কোথাও ঘুরতে যাওয়া বা একসঙ্গে সময় কাটানোর উদ্যোগও তেমন নেন না। ফলে সবকিছু মিলিয়ে তাঁকে স্বামী হিসেবে মন থেকে গ্রহণ করতে পারছি না। তাঁর প্রতি ভালোবাসা, আকর্ষণ, মায়া, সম্মান ও মানসিক প্রশান্তি অনুভব করছি না। স্ত্রী হিসেবে তার জন্য আন্তরিকভাবে দায়িত্ব পালন করতেও কষ্ট হচ্ছে। এমনকি চোখের হেফাজত করতেও কষ্ট হচ্ছে। আমার পরিবারও বিষয়টি জানার পর আমাকে তাঁর সঙ্গে থাকতে নিরুৎসাহিত করছে। আমি তাদের কিছু এখনো বলতে পারছি না।

আমি এই বিষয়গুলো কাউকে খুলে বলতে পারছি না। আমার বাবা-মাও দ্বীনের বিষয়ে আমাকে এ ধরনের সমস্যায় সঠিকভাবে দিকনির্দেশনা দেওয়ার মতো সক্ষম নন। তাই খুব হতাশা ও মানসিক কষ্টের মধ্যে আপনাদের কাছে অনলাইনে পরামর্শ চাইছি, যেন শরিয়তের আলোকে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারি।

আমার প্রশ্ন:১.এমন পরিস্থিতিতে শরিয়তসম্মতভাবে কী সিদ্ধান্ত নেওয়া উত্তম হবে?
2. ইসলামের দৃষ্টিতে এখন আমার করণীয় কী?3.চিকিৎসা চলমান থাকায় কি আরও ধৈর্য্য ধরে অপেক্ষা করা উচিত? আর কি কি দুয়া বা আমল করতে পারি?


জাযাকুমুল্লাহু খইরন।

Answer

বিয়ের পর স্বামীর শারীরিক সমস্যা ও মানসিক অস্থিরতা—শরিয়তের দিকনির্দেশনা

উত্তর:

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

প্রিয় বোন, আপনার সমস্যা ও মানসিক কষ্ট আমরা অনুধাবন করতে পারছি। এটি একটি জটিল পারিবারিক বিষয়। নিচে শরিয়তের আলোকে ধাপে ধাপে দিকনির্দেশনা দেওয়া হলো:

১. শরিয়তসম্মত সিদ্ধান্ত কী হবে?

ক. ধৈর্য ও পরামর্শের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিন:

আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেছেন: ﴿وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ﴾ (সূরা নিসা: ১৯) "তোমরা স্ত্রীদের সাথে সদ্ব্যবহার করো।"

এবং অন্য আয়াতে: ﴿فَإِمْسَاكٌ بِمَعْرُوفٍ أَوْ تَسْرِيحٌ بِإِحْسَانٍ﴾ (সূরা বাকারা: ২২৯) "তখন হয় নিয়ম অনুযায়ী রাখা, নয় উৎকৃষ্ট পন্থায় ছেড়ে দেওয়া।"

খ. শারীরিক সমস্যার ক্ষেত্রে শরিয়তের বিধান:

ইসলামী শরিয়তে বিবাহের মূল উদ্দেশ্যগুলোর মধ্যে দাম্পত্য সম্পর্ক পূর্ণাঙ্গভাবে প্রতিষ্ঠা অন্যতম। যদি স্বামীর এমন শারীরিক সমস্যা থাকে যা দাম্পত্য জীবন সম্পূর্ণরূপে ব্যাহত করে এবং চিকিৎসায়ও নিরাময়ের আশা না থাকে, তাহলে স্ত্রীর জন্য বিবাহ বিচ্ছেদের (খুলা বা ফাসখ) আবেদন করার অধিকার রয়েছে।

ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) বলেন,

"إذا كان الزوج عنينا لا يصل إلى النساء، تخيرت المرأة بين الصبر وبين الفسخ" (রদ্দুল মুহতার, ৩/৫৬৮) "যদি স্বামী 'আনীন' (যৌন অক্ষম) হয়, তাহলে স্ত্রী ধৈর্য ধরা এবং ফাসখ (বিবাহ বিচ্ছেদ) করার মধ্যে যেকোনো একটি বেছে নিতে পারবে।"

তবে এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—তিনি বর্তমানে চিকিৎসা করাচ্ছেন। তাই চিকিৎসা চলমান থাকা অবস্থায় ধৈর্য ধরা এবং ফলাফল দেখার পর সিদ্ধান্ত নেওয়াই উত্তম।

গ. প্রতারণার শিকার হলে:

যদি প্রমাণিত হয় যে, বিয়ের আগে স্বামী বা তার পরিবার ইচ্ছাকৃতভাবে এই শারীরিক সমস্যা গোপন করেছে, তাহলে এটি প্রতারণার শামিল। ইসলামে বিবাহের সময় কোনো ত্রুটি গোপন করা নিষিদ্ধ। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

"من غشنا فليس منا" (সহিহ মুসলিম: ১০১) "যে আমাদেরকে প্রতারণা করে, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।"

তবে এখানে আপনার স্বামী প্রথমে বলেছেন তিনি জানতেন না, পরে বলেছেন নিজের ভুলের কারণে হয়েছে। বিষয়টি স্পষ্ট নয়। তাই তাড়াহুড়া না করে বিষয়টি খতিয়ে দেখা উচিত।

২. ইসলামের দৃষ্টিতে আপনার করণীয় কী?

ক. ধৈর্য ধারণ করা:

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "وَمَنْ يَتَصَبَّرْ يُصَبِّرْهُ اللَّهُ" (সহিহ বুখারী: ১৪৬৯) "যে ধৈর্য ধারণের চেষ্টা করে, আল্লাহ তাকে ধৈর্য দান করেন।"

খ. স্বামীর সাথে খোলামেলা কথা বলা:

আপনার অনুভূতি ও সমস্যার কথা স্বামীকে জানান। সম্ভব হলে কোনো বিজ্ঞ আলেম বা পারিবারিক পরামর্শকের মাধ্যমে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করুন।

গ. পরিবারকে বিষয়টি জানানো:

আপনার পরিবার ইতিমধ্যে জানতে পেরেছে এবং তারা আপনাকে নিরুৎসাহিত করছে। তবে তারা সম্পূর্ণ বিষয়টি জানেন না। তাদের সাথে খোলামেলা আলোচনা করুন এবং শরিয়তের দিকনির্দেশনা অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করুন।

ঘ. তালাক বা খুলার আগে চিকিৎসার ফলাফল দেখুন:

ইসলামে তালাক সবচেয়ে অপছন্দনীয় হালাল কাজ। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "أَبْغَضُ الْحَلَالِ إِلَى اللَّهِ تَعَالَى الطَّلَاقُ" (সুনানে আবু দাউদ: ২১৭৮) "আল্লাহ তাআলার নিকট সর্বাপেক্ষা অপছন্দনীয় হালাল কাজ হলো তালাক।"

তাই চিকিৎসা চলমান থাকা অবস্থায় ধৈর্য ধরা এবং ফলাফল দেখার পর সিদ্ধান্ত নেওয়াই উত্তম।

৩. চিকিৎসা চলমান থাকায় ধৈর্য ধরা ও আমল:

ক. ধৈর্য ধরা উচিত:

হ্যাঁ, যেহেতু আপনার স্বামী চিকিৎসা করাচ্ছেন এবং তিনি সমস্যা সমাধানে আগ্রহী, তাই অন্তত চিকিৎসার ফলাফল না দেখা পর্যন্ত ধৈর্য ধরা উচিত। ইসলাম ধৈর্যের প্রতি উৎসাহিত করেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন:

﴿يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اصْبِرُوا وَصَابِرُوا وَرَابِطُوا﴾ (সূরা আলে ইমরান: ২০০) "হে ঈমানদারগণ! তোমরা ধৈর্য ধারণ করো এবং ধৈর্যে প্রতিযোগিতা করো।"

খ. দুয়া ও আমল:

১. দুয়া: নিয়মিত এই দুয়া পড়ুন: ﴿رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّاتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ وَاجْعَلْنَا لِلْمُتَّقِينَ إِمَامًا﴾ (সূরা ফুরকান: ৭৪) "হে আমাদের রব! আমাদের স্ত্রী ও সন্তানদের মাধ্যমে আমাদের চোখ শীতল করুন এবং আমাদের মুত্তাকীদের ইমাম বানান।"

২. সালাতুল হাজত: প্রয়োজনের সময় ২ রাকাত সালাতুল হাজত পড়ে আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করুন।

৩. ইস্তিগফার: বেশি বেশি ইস্তিগফার (আস্তাগফিরুল্লাহ) পড়ুন।

৪. দরুদ শরীফ: বেশি বেশি দরুদ শরীফ পড়ুন।

৫. তাহাজ্জুদ: রাতের শেষভাগে তাহাজ্জুদ পড়ে আল্লাহর কাছে হেদায়েত প্রার্থনা করুন।

৪. চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের নিয়ম:

১. চিকিৎসার ফলাফল দেখুন: ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা চলতে দিন। যদি চিকিৎসায় সম্পূর্ণ নিরাময় সম্ভব হয়, তাহলে ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করুন।

২. বিজ্ঞ আলেমের পরামর্শ নিন: আপনার এলাকার কোনো বিশ্বস্ত আলেম বা মুফতির কাছে বিষয়টি খুলে বলুন এবং পরামর্শ নিন।

৩. যদি চিকিৎসায় কোনো ফল না আসে: তাহলে আপনি খুলা (স্ত্রীর পক্ষ থেকে বিবাহ বিচ্ছেদ) বা ফাসখের (বিচারকের মাধ্যমে বিবাহ বিচ্ছেদ) আবেদন করতে পারেন।

৪. পারিবারিক সমাধানের চেষ্টা করুন: উভয় পরিবারের প্রবীণদের মাধ্যমে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করুন।

৫. গুরুত্বপূর্ণ নসীহত:

প্রিয় বোন, আপনার অনুভূতি ও কষ্ট আমরা বুঝতে পারছি। তবে মনে রাখবেন—

১. তাড়াহুড়া করবেন না: বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, তাই ধৈর্য ধরে সিদ্ধান্ত নিন।

২. আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন: আল্লাহর উপর পূর্ণ ভরসা রাখুন। তিনি উত্তম ফয়সালা দেবেন।

৩. নামাজ ও দুয়ায় লেগে থাকুন: নামাজ ও দুয়ার মাধ্যমে আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করুন।

৪. গোপনীয়তা রক্ষা করুন: বিষয়টি অন্যদের কাছে না বলাই ভালো, তবে যাদের কাছে বলা জরুরি (যেমন- অভিভাবক, বিজ্ঞ আলেম) তাদেরকে বলা যাবে।

রেফারেন্স:

  • রদ্দুল মুহতার, ৩/৫৬৮
  • সহিহ বুখারী: ১৪৬৯
  • সহিহ মুসলিম: ১০১
  • সুনানে আবু দাউদ: ২১৭৮
  • সূরা নিসা: ১৯
  • সূরা বাকারা: ২২৯
  • সূরা আলে ইমরান: ২০০
  • সূরা ফুরকান: ৭৪

আল্লাহ তাআলা আপনার সমস্যার সমাধান করুন এবং আপনাকে ধৈর্য দান করুন। আমিন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.