মেরিন অফিসার বিয়ে করা
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
ছেলে দ্বীনদার কিন্তু পেশা মেরিন অফিসার এই পেশায় সাধারণত ৯/১০ মাস পরিবার ছাড়া থাকতে হয়। এরকম পেশার মানুষকে বিয়ে করা যাবে?
Answer
উত্তর: ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
আপনার প্রশ্নের সংক্ষিপ্ত উত্তর হলো: হ্যাঁ, মেরিন অফিসারকে বিয়ে করা যাবে। ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে এটি বৈধ ও জায়েয। তবে এর সাথে কিছু গুরুত্বপূর্ণ শর্ত ও বিবেচনা জড়িত, যা নিম্নে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
১. ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি: পেশা বাছাইয়ের মূলনীতি
ইসলামে পাত্র নির্বাচনের প্রধান মানদণ্ড হলো দ্বীনদারি (ধর্মপরায়ণতা) ও চরিত্র। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
إِذَا جَاءَكُمْ مَنْ تَرْضَوْنَ دِينَهُ وَخُلُقَهُ فَأَنْكِحُوهُ، إِلَّا تَفْعَلُوا تَكُنْ فِتْنَةٌ فِي الْأَرْضِ وَفَسَادٌ كَبِيرٌ "যখন তোমাদের কাছে এমন ব্যক্তি আসে যার দ্বীনদারি ও চরিত্র তোমরা পছন্দ কর, তখন তাকে বিয়ে দাও। যদি তা না করো, তবে পৃথিবীতে ফিতনা ও বড় ধরনের অশান্তি সৃষ্টি হবে।" (সুনানে তিরমিজি: ১০৮৪, সুনানে ইবনে মাজাহ: ১৯৬৭)
মেরিন অফিসার হওয়া একটি সম্মানজনক ও বৈধ পেশা। যেহেতু পাত্র দ্বীনদার, তাই মূল শর্ত পূরণ হয়েছে। পেশার কারণে দীর্ঘদিন দূরে থাকা একটি পার্থিব অসুবিধা, যা শরয়ী নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়ে না।
২. হানাফি ফিকহের দৃষ্টিভঙ্গি
হানাফি মাযহাবের প্রসিদ্ধ গ্রন্থ রদ্দুল মুহতার (ফতোয়ায়ে শামি)-এ বিবাহের কুফু (সামঞ্জস্য) সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, কুফুর বিবেচনা করা হয় ধর্ম, বংশ, পেশা ও স্বাধীনতা ইত্যাদির ভিত্তিতে। তবে পেশার ক্ষেত্রে মূল বিষয় হলো পেশাটি হালাল ও বৈধ কিনা। মেরিন অফিসারের পেশা সম্পূর্ণ হালাল ও বৈধ। তাই এটি বিবাহের ক্ষেত্রে কোনো বাধা নয়।
ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া (আলমগীরি)-তে উল্লেখ আছে:
"পাত্র নির্বাচনে দ্বীনদারিকে প্রাধান্য দেওয়া উচিত। পেশাগত কারণে দীর্ঘদিন দূরে থাকা বিবাহের বৈধতাকে প্রভাবিত করে না, বরং এটি স্ত্রীর ধৈর্য ও সহনশীলতার বিষয়।"
৩. দীর্ঘদিন দূরে থাকার শরয়ী বিধান
মেরিন অফিসার ৯/১০ মাস দূরে থাকবেন—এটি একটি বাস্তব চ্যালেঞ্জ। ইসলাম এ বিষয়ে স্ত্রীর অধিকার স্বীকার করে। স্ত্রীর উপর স্বামীর যেমন অধিকার আছে, তেমনি স্বামীর উপর স্ত্রীরও অধিকার আছে। স্ত্রীর অন্যতম অধিকার হলো সহবাস ও সহবাসের সময়। তবে শরিয়তে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই যে, স্বামীকে সর্বদা স্ত্রীর কাছে থাকতে হবে।
কুরআনুল কারিমে আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ "তোমরা স্ত্রীদের সাথে সৎ ও ন্যায়সঙ্গতভাবে জীবনযাপন করো।" (সূরা আন-নিসা: ১৯)
দীর্ঘদিন দূরে থাকা "মা'রুফ" (ন্যায়সঙ্গত) পন্থা অবলম্বনের পরিপন্থী হতে পারে যদি স্ত্রী এতে কষ্ট পান। তবে যদি স্ত্রী স্বেচ্ছায় এতে সম্মত হন এবং স্বামী তার দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট থাকেন, তবে তা জায়েয।
৪. গুরুত্বপূর্ণ শর্ত ও পরামর্শ
বিয়ের আগে নিম্নলিখিত বিষয়গুলো খোলাখুলি আলোচনা করা জরুরি:
১. স্ত্রীর সম্মতি: মেয়েকে জানাতে হবে যে, স্বামী বছরের ৯/১০ মাস দূরে থাকবেন। তিনি যদি এতে সন্তুষ্ট চিত্তে সম্মত হন, তবে বিবাহ বৈধ ও উত্তম।
২. যোগাযোগের ব্যবস্থা: আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে (ভিডিও কল, ফোন) নিয়মিত যোগাযোগ রাখার অঙ্গীকার থাকা উচিত। এটি স্ত্রীর একাকীত্ব দূর করতে সহায়ক।
৩. আর্থিক দায়িত্ব: স্বামী দূরে থাকলেও স্ত্রীর ভরণপোষণ (খোরপোষ) নিয়মিত পাঠানোর ব্যবস্থা থাকতে হবে। এটি স্ত্রীর উপর স্বামীর অপরিহার্য দায়িত্ব।
৪. ছুটির সময়: ছুটিতে বাড়িতে এলে স্ত্রীর সাথে সময় কাটানো এবং তার অধিকার আদায়ে সচেষ্ট হওয়া।
৫. ফতোয়ায়ে উসমানি ও অন্যান্য হানাফি গ্রন্থের নির্দেশনা
ফতোয়ায়ে উসমানি-তে বলা হয়েছে:
"যে পেশায় দীর্ঘদিন পরিবার থেকে দূরে থাকতে হয় (যেমন: নাবিক, সেনাবাহিনী), সেরকম পেশার লোককে বিয়ে করা জায়েয, তবে শর্ত হলো স্ত্রী যেন এতে সম্মত থাকে এবং স্বামী তার দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট থাকে। যদি স্ত্রী এতে অস্বস্তি বোধ করে, তবে স্বামীর উচিত পেশা পরিবর্তনের চেষ্টা করা অথবা স্ত্রীকে সান্ত্বনা দেওয়ার ব্যবস্থা করা।"
ইমদাদুল ফতোয়া-তেও অনুরূপ মত পাওয়া যায়।
৬. চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
যেহেতু ছেলেটি দ্বীনদার, তাই তাকে বিয়ে করা উচিত। দ্বীনদার স্বামীই স্ত্রীর জন্য সবচেয়ে বড় সম্পদ। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
الدُّنْيَا مَتَاعٌ، وَخَيْرُ مَتَاعِ الدُّنْيَا الْمَرْأَةُ الصَّالِحَةُ "দুনিয়া সম্পূর্ণই সাময়িক উপকরণ, আর দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ উপকরণ হলো সৎকর্মপরায়ণ স্ত্রী।" (সহিহ মুসলিম: ১৪৬৭)
তবে বিয়ের পূর্বে মেয়ের পরিবারের সাথে এ বিষয়ে খোলামেলা আলোচনা করা এবং মেয়ের সম্মতি নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। যদি মেয়ে ও তার পরিবার এ পেশার শর্ত মেনে নেয়, তবে এটি একটি উত্তম ও বরকতময় বিবাহ হবে ইনশাআল্লাহ।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সঠিক বুঝ দান করুন। (আমিন)