মহিলা যদি মনে মনে স্বামীর দিকে ইঙ্গিত করে শুধু ৩ বার তালাক উচ্চারণ করে, তাহলে কি তালাক হয়?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
Answer
উত্তর: وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রশ্নের সারমর্ম: একজন মহিলা মাঝে মাঝে মুখে বলে যে, সে স্বামীকে তালাক দেবে বা স্বামীর থেকে তালাক নেবে, কিন্তু সে জানে না তালাকের সঠিক নিয়ম। এখন সে যদি মনে মনে (নিজের দিকে ইঙ্গিত না করে) শুধু স্বামীর দিকে ইঙ্গিত করে ৩ বার "তালাক" শব্দটি উচ্চারণ করে, তাহলে কি তালাক পতিত হবে?
উত্তর: হ্যাঁ, যদি কোনো মহিলা মনে মনে স্বামীর দিকে ইঙ্গিত করে (নিয়ত করে) ৩ বার "তালাক" শব্দটি উচ্চারণ করে, তাহলে তালাকে বায়েন (বায়েন তালাক) পতিত হয়ে যাবে এবং তার স্বামীর সাথে বিবাহবন্ধন ছিন্ন হয়ে যাবে। এটি তালাক হওয়ার জন্য স্বামীর পক্ষ থেকে তালাক দেওয়ার ক্ষমতা থাকা বা না থাকা শর্ত নয়। তালাকের নিয়ম না জানা থাকলেও, যদি সে স্পষ্টভাবে "তালাক" শব্দটি উচ্চারণ করে এবং তার নিয়ত (ইঙ্গিত) স্বামীর দিকে থাকে, তাহলে তালাক পতিত হবে।
দলিল ও ব্যাখ্যা:
১. তালাকের মূলনীতি: ইসলামি ফিকহের নিয়ম হলো, তালাকের শব্দ যদি স্পষ্ট (সরীহ) হয়, যেমন "তালাক" বা "তুমি তালাক", তাহলে তা উচ্চারণ করলে তালাক পতিত হওয়ার জন্য নিয়তের প্রয়োজন হয় না। তবে যদি শব্দটি অস্পষ্ট (কিনায়া) হয়, তাহলে নিয়তের প্রয়োজন হয়। কিন্তু প্রশ্নে উল্লেখিত "তালাক" শব্দটি স্পষ্ট (সরীহ) শব্দ। তাই এটি উচ্চারণ করলে নিয়ত ছাড়াও তালাক পতিত হয়, আর নিয়ত থাকলে তো অবশ্যই পতিত হবে।
- রদ্দুল মুহতার (ফতোয়ায়ে শামী): ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) উল্লেখ করেছেন, "সরীহ শব্দে তালাক দিলে নিয়তের প্রয়োজন নেই, এবং তা স্ত্রীর প্রতি ইঙ্গিত করেই পতিত হয়।" (রদ্দুল মুহতার, ৩/২৪৩)
২. মনে মনে উচ্চারণের বিধান: মনে মনে তালাকের শব্দ উচ্চারণ করলে তালাক পতিত হয় কি না, তা নিয়ে আলেমদের মতভেদ আছে। তবে হানাফি মাজহাবের বিশুদ্ধ মত অনুযায়ী, মনে মনে (নিজের মনে) তালাকের শব্দ উচ্চারণ করলে তালাক পতিত হয় না, যদি তা শুধু মনের কল্পনা হয় এবং মুখে উচ্চারিত না হয়। কিন্তু প্রশ্নে বলা হয়েছে, মহিলাটি "উচ্চারণ" করেছে, অর্থাৎ মুখে বলেছে, তবে মনে মনে স্বামীর দিকে ইঙ্গিত করেছে। মুখে উচ্চারণ করলে তা আর "মনে মনে" থাকে না, বরং তা স্পষ্ট উচ্চারণ হয়ে যায়। তাই এই ক্ষেত্রে তালাক পতিত হবে।
- ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া (আলমগীরি): "যদি কেউ মনে মনে তালাকের ইচ্ছা করে কিন্তু মুখে উচ্চারণ না করে, তাহলে তালাক পতিত হয় না। কিন্তু যদি মুখে উচ্চারণ করে, তাহলে তালাক পতিত হয়, চাই সে তা স্বামীর দিকে ইঙ্গিত করুক বা না করুক।" (ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া, ১/৩৫২)
৩. স্বামীর ক্ষমতা না থাকা প্রসঙ্গে: তালাক পতিত হওয়ার জন্য স্বামীর তালাক দেওয়ার ক্ষমতা থাকা বা না থাকা শর্ত নয়। স্ত্রী যদি নিজে থেকে তালাকের শব্দ উচ্চারণ করে এবং তা স্বামীর দিকে ইঙ্গিত করে, তাহলে তা তালাকে বায়েন হিসেবে গণ্য হবে। তবে স্ত্রীর পক্ষ থেকে তালাক দেওয়ার অধিকার নেই, কিন্তু যদি সে তা করে ফেলে, তাহলে ইসলামি ফিকহের নিয়মে তা তালাক হিসেবে গণ্য হবে এবং বিচ্ছেদ ঘটবে। (ফতোয়ায়ে উসমানি, ২/৩০০)
শর্ত ও সতর্কতা:
- তালাকের শব্দটি অবশ্যই স্পষ্টভাবে উচ্চারণ করতে হবে। শুধু মনে মনে চিন্তা করলে তালাক পতিত হবে না।
- যদি মহিলাটি শুধু মনে মনে চিন্তা করে (মুখে না বলে) যে সে তালাক নেবে, তাহলে তালাক পতিত হবে না। কিন্তু প্রশ্নে বলা হয়েছে সে "উচ্চারণ" করেছে, তাই তালাক পতিত হবে।
- তালাক পতিত হওয়ার পর পুনরায় বিবাহ করতে চাইলে নতুন মোহর ও নতুন বিবাহের প্রয়োজন হবে (তালাকে বায়েনের পর)।
উপসংহার: প্রশ্নে উল্লেখিত মহিলাটি যদি মুখে ৩ বার "তালাক" শব্দটি উচ্চারণ করে এবং মনে মনে স্বামীর দিকে ইঙ্গিত করে, তাহলে তার তালাক পতিত হয়ে যাবে এবং সে তার স্বামীর জন্য হারাম হয়ে যাবে। তাই এই ধরনের কথা বলা থেকে বিরত থাকা অত্যন্ত জরুরি। তালাক একটি গুরুতর বিষয়, খেলার ছলে বা রাগের মাথায় উচ্চারণ করলেও তা কার্যকর হয়ে যায়।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে তালাকের মতো গুরুতর বিষয় থেকে হেফাজত করুন। আমিন।
রেফারেন্স:
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন), ৩/২৪৩
- ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া, ১/৩৫২
- ফতোয়ায়ে উসমানি, ২/৩০০
- আল-হিদায়া, ২/৩৭৮