আমলের আপডেট দেওয়া বিদআত হবে কি না?
Sunnah and Bid'ah · Ahle Hadith / Salafi
Question
জাযাকুমুল্লাহু খইর
Answer
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
প্রশ্নের জন্য জাযাকাল্লাহু খাইর। আপনার রুকইয়াহ ও আমল নিয়মিত করার আগ্রহ দেখে আলহামদুলিল্লাহ। আপনার সমস্যা ও চিন্তাগুলো খুবই স্বাভাবিক। শয়তান মুমিনকে আমল থেকে বিরত রাখতে নানা কৌশল অবলম্বন করে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
الشَّيْطَانُ يَعِدُكُمُ الْفَقْرَ وَيَأْمُرُكُم بِالْفَحْشَاءِ
"শয়তান তোমাদেরকে অভাবের ভয় দেখায় এবং অশ্লীল কাজের আদেশ দেয়।" (সূরা আল-বাকারাহ: ২৬৮)
আমি বিস্তারিত উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করছি, ইনশাআল্লাহ।
১. আমলের জন্য গ্রুপ জয়েন করা বা রিমাইন্ডার নেওয়া কি বিদআত?
বিদআত হলো দ্বীনের মধ্যে নতুন এমন বিষয় প্রবর্তন করা যার মূল ভিত্তি কুরআন-সুন্নাহয় নেই। যেমন—নির্দিষ্ট দিনে নির্দিষ্ট সংখ্যায় জিকিরকে ইবাদত মনে করা, অথবা এমন পদ্ধতি উদ্ভাবন করা যা প্রমাণিত নয়।
কিন্তু আমল নিয়মিত করার জন্য গ্রুপ তৈরি করা, রিমাইন্ডার দেওয়া, বা অগ্রগতি দেখা একটি পার্থিব উপায় (ওয়াসিলা)। ইসলামে উপায় বা পদ্ধতি (ওয়াসিলা) জায়েয, যতক্ষণ তা হারাম না হয় এবং ইবাদতের মূল পদ্ধতিকে বিকৃত না করে।
মূলনীতি: ইবাদতের কী (مَا) এবং যেভাবে (كَيْفَ) করা হবে তা শুধু কুরআন-সুন্নাহ দ্বারা নির্ধারিত; কিন্তু কখন, কতক্ষণ, বা কোন উপায়ে নিজেকে বাধ্য করা সেটা বৈধ, যতক্ষণ শরীয়তের কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই।
- রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সাহাবীদের জন্য নির্দিষ্ট সময়ে জিকিরের মজলিসের আয়োজন করতেন।
- ইবনে উমার (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন: "আমরা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর জীবদ্দশায় তরতাজা খেজুর গাছে জিকির করতাম; যখন আমরা পরিপক্ব খেজুর পেতাম তখন গাছে জিকির করতাম।" (সহীহ বুখারী)
- সাহাবীরা (রা.) কুরআন তিলাওয়াতের জন্য নিয়মিত মজলিস করতেন।
শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহ.) বলেছেন:
"নেক কাজে সাহায্যের জন্য জমায়েত হওয়া এবং একে অপরকে তাড়িত করা মুস্তাহাব। কারণ আল্লাহ তাআলা বলেছেন: 'তোমরা সৎকর্ম ও তাকওয়ায় পরস্পর সহযোগিতা করো।' (সূরা আল-মায়িদাহ: ২)। আর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সাহাবীদেরকে নিয়ে বসতেন এবং তাদের সাথে মাশওয়ারা করতেন।" (মাজমুʿ ফাতাওয়া, ২৮/১৮)
শায়খ ইবনে বায (রহ.) থেকেও অনুরূপ বক্তব্য রয়েছে। তিনি বলেন:
"নেক কাজে সহযোগিতার জন্য মুসলিমদের একত্র হওয়া, উপদেশ দেওয়া, এবং একে অপরকে সৎকাজের তাগিদ দেওয়া বৈধ এবং এতে কোনো দোষ নেই।" (মাজমুʿ ফাতাওয়া ইবনে বায, ২৬/১৪৪)
সুতরাং গ্রুপে জয়েন করা বা রিমাইন্ডার নেওয়া বিদআত নয়; বরং এটি সৎকাজের সহযোগিতা। তবে শর্ত হলো:
- গ্রুপে তৈরি করা জিকির বা আমল যেন মাসনুন (সুন্নাহসম্মত) হয়।
- যেন গ্রুপের লোকদেরকে সংখ্যা বা গুনতে দেখে মনে না হয় যে এটা জরুরি বা ফরজ।
- নিয়মিত না হলে কেউ যেন অন্যদের নিয়ে মন্দ মন্তব্য না করে।
২. রিয়া (প্রদর্শন) হওয়ার আশঙ্কা
রিয়া হলো ইবাদত অন্যকে দেখানোর উদ্দেশ্যে করা। সেটা হারাম ও শিরকের ছোট প্রকার।
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন:
إِنَّ أَخْوَفَ مَا أَخَافُ عَلَيْكُمُ الشِّرْكُ الأَصْغَرُ
"আমি তোমাদের জন্য ছোট শিরকের (রিয়া) সবচেয়ে বেশি আশঙ্কা করছি।" (মুসনাদ আহমাদ, সহীহ)
গ্রুপে আমলের তালিকা বা সংখ্যা প্রকাশ করা যদি রিয়ার উদ্দেশ্যে হয়, তাহলে হারাম। কিন্তু যদি উদ্দেশ্য হয় নিজেকে হিসাব-নিকাশ ও নিয়মিত রাখা, এবং অন্যেরা দেখে উৎসাহ পায়, তাহলে আশা করা যায় এটি রিয়া নয়।
শায়খ ইবনে উসাইমীন (রহ.) বলেন:
"যদি কোনো ব্যক্তি অন্যকে দেখানোর জন্য আমল করে, তাহলে তা রিয়া। কিন্তু যদি আমল করার পর অন্যদেরকে দেখে আনন্দিত হয় (যেমন—লোকেরা তার ইবাদত দেখে উৎসাহিত হয়), এতে দোষ নেই, যতক্ষণ তার মূল উদ্দেশ্য আল্লাহর সন্তুষ্টি।" (শারহু রিয়াদিস সালিহীন)
তবে সতর্কতা হলো: যতটুকু সম্ভব আমল গোপন রাখা উত্তম। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন:
صَلَاةُ الرَّجُلِ فِي التَّطَوُّعِ حَيْثُ لَا يَرَاهُ النَّاسُ تَعْدِلُ صَلَاتَهُ عَلَى أَعْيُنِ النَّاسِ
"যেখানে মানুষ তাকে দেখে না সেখানে নফল সালাত আদায় করা মানুষের সামনে আদায়ের চেয়ে উত্তম।" (সহীহ বুখারী)
কিন্তু আপনি যেহেতু একা একা ঘুমিয়ে পড়েন বা মনোযোগ হারান, তাই গ্রুপের সাহায্য নেওয়া জরুরি হলে সেটা জায়েয। কিন্তু নিজের আমলের সংখ্যা বা "আজকে এতবার পড়েছি" - এ ধরনের ঘোষণা সর্বজনীন করা ঠিক নয়; বরং ব্যক্তিগত রিমাইন্ডার অ্যাপ বা নিজের নোটে লিখে রাখা ভালো। আর যদি গ্রুপে দিতেই হয়, তবে সংখ্যা না জানিয়ে শুধু বলা যেতে পারে: "আলহামদুলিল্লাহ, আজকের আমলটি সম্পন্ন হয়েছে" — ইনশাআল্লাহ এতে রিয়ার আশঙ্কা কম।
৩. সংখ্যা উল্লেখ না করে "সম্পন্ন হয়েছে" বলা কি জায়েয?
জায়েয। তবে শর্ত হলো:
- যেন অন্যেরা মনে না করে যে আপনি তাদের চেয়ে উত্তম।
- যেন তা নিয়ে অহংকার প্রকাশ না পায়।
- সংখ্যা প্রকাশের প্রয়োজন না থাকলে সংখ্যা না বলাই উত্তম।
রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর যুগে সাহাবীরা আমলের কথা বলতেন, কিন্তু সংখ্যা নিয়ে গর্ব করতেন না। আর আপনি যদি সংখ্যা না জানিয়ে শুধু "সম্পন্ন" লিখেন, তাহলে সেটা সৎকাজের ঘোষণা হিসেবে গণ্য হবে, যা ইসলামে নিন্দনীয় নয়। তবে মনে রাখবেন, সৎকাজ গোপন রাখা অধিক নিরাপদ।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
إِن تُبْدُوا الصَّدَقَاتِ فَنِعِمَّا هِيَ ۖ وَإِن تُخْفُوهَا وَتُؤْتُوهَا الْفُقَرَاءَ فَهُوَ خَيْرٌ لَّكُمْ
"তোমরা যদি দান খোলাখুলি করো, তবে তা ভালো; আর যদি গোপনে করো এবং ফকিরদেরকে দাও, তবে তা তোমাদের জন্য আরও উত্তম।" (সূরা আল-বাকারাহ: ২৭১)
৪. একা জিকির করতে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়া বা মনোযোগ হারানো
এটা খুবই স্বাভাবিক। শয়তান মানুষের আমল বরকতহীন করার চেষ্টা করে। তবে কিছু ব্যবহারিক সমাধান আছে:
১. জিকির কমপক্ষে ২-৩ মিনিটের ছোট পরিসরে করুন। যেমন—১০০ বার ইস্তিগফার বা ১০০ বার দরুদ।
২. নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ করুন, যেমন—ফজরের পরে, যোহরের পর, অথবা ইশার পর।
৩. ঘুমানোর আগে জিকির করবেন না, কারণ ঘুম আসবে। বরং না-ঘুমিয়ে এমন সময় বেছে নিন।
৪. জিকিরের সময় মনোযোগের জন্য অর্থ জানা দরকার। যেমন—আল্লাহuমা আগফিরলি অর্থ "হে আল্লাহ, আমাকে ক্ষমা করুন" — এটা ভাবতে ভাবতে বলেন।
৫. কুরআন তিলাওয়াত করুন। যদি জিকিরে মনোযোগ না যায়, তবে কুরআন তিলাওয়াত করুন; এটা সবচেয়ে উত্তম জিকির।
৬. ছোট ছোট আমল দিয়ে শুরু করুন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন:
أَحَبُّ الأَعْمَالِ إِلَى اللهِ أَدْوَمُهَا وَإِنْ قَلَّ
"আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় আমল হলো যা নিয়মিত করা হয়, যদিও তা পরিমাণে কম হয়।" (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)
৫. রুকইয়াহ করার পদ্ধতি ও নিয়মিততা
রুকইয়াহ জায়েয যদি তা কুরআন ও সহীহ হাদীসের দুআ দ্বারা হয়। আপনার সমস্যা শুনে আমার পরামর্শ:
- দিনে ২ বার রুকইয়াহ করুন—সকাল ও সন্ধ্যায় (ফজর ও মাগরিবের পরে)।
- রুকইয়াহর জন্য নির্ধারিত আয়াত—সূরা ফাতিহা, আয়াতুল কুরসি, সূরা ইখলাস, ফালাক, নাস, এবং কিছু সহীহ দুআ।
- হাতে ফুঁ দিয়ে শরীরের উপর হাত বুলানো—এটা সুন্নাহ।
- নিয়মিত না হলে গ্রুপে "সম্পন্ন" জানানো জায়েয—ইনশাআল্লাহ।
৬. আমলের দিকে ঝুঁকবেন কি করে?
১. আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করুন:
رَبَّنَا عَلَيْكَ تَوَكَّلْنَا وَإِلَيْكَ أَنَبْنَا وَإِلَيْكَ الْمَصِيرُ
"হে আমাদের রব, আমরা আপনার উপরই ভরসা করেছি, আপনার দিকেই ফিরেছি এবং আপনার কাছেই ফিরে যাব।" (সূরা আল-মুমতাহিনাহ: ৪)
২. ছোট থেকে শুরু করুন: প্রতিদিন ১০০ বার ইস্তিগফার, ৫০ বার দরুদ।
৩. এক নিয়তে নিজেকে বাধ্য করুন: যেমন—প্রতিদিন সকালে ১০ মিনিট।
৪. ঘুমের আগে বেশি বেশি আউযুবিল্লাহ পড়ুন (সূরা ফালাক ও নাস), যাতে শয়তান আপনার আমলে বাধা না দেয়।
৫. সৎ বন্ধু বাছাই করুন—যারা আপনাকে আমলের কথা মনে করিয়ে দেবে।
৬. মনে রাখুন, আল্লাহ সহজ চান:
يُرِيدُ اللَّهُ بِكُمُ الْيُسْرَ وَلَا يُرِيدُ بِكُمُ الْعُسْرَ
"আল্লাহ তোমাদের জন্য সহজ চান এবং কঠিন চান না।" (সূরা আল-বাকারাহ: ১৮৫)
সংক্ষিপ্ত ফতোয়া প্রসঙ্গে
প্রশ্ন: গ্রুপে জয়েন করা, রিমাইন্ডার দেওয়া, "সম্পন্ন" জানানো কি বিদআত বা রিয়া?
উত্তর:
- গ্রুপে জয়েন করা—বিদআত নয়; জায়েয।
- রিমাইন্ডার নেওয়া—জায়েয।
- নিজের আমলের সংখ্যা না বলে "সম্পন্ন" জানানো—জায়েয, তবে সংখ্যা জানানো ঠিক নয় (রিয়ার আশঙ্কায়)।
- রিয়া সন্দেহ হলে—গোপন রাখাই উত্তম।
- বেশি পরিমাণের চেয়ে নিয়মিত কম আমল করুন, এটাই সুন্নাহর পদ্ধতি।
আল্লাহ আপনার সব সমস্যা দূর করুন, রুকইয়াহ সহজ করুন, এবং আমলে নিয়মিত হওয়ার তাওফিক দিন। আমিন।
وَمَا تَوْفِيقِي إِلَّا بِاللَّهِ ۚ عَلَيْهِ تَوَكَّلْتُ وَإِلَيْهِ أُنِيبُ
"আমার তাওফিক শুধু আল্লাহরই সাহায্যে; আমি তাঁরই উপর ভরসা করি এবং তাঁরই দিকে ফিরি।" (সূরা হুদ: ৮৮)
জাযাকাল্লাহু খাইরান।