স্বপ্নে সাপ দেখা ও বাচ্চার অসুস্থ হওয়া নিয়ে প্রশ্ন।

Miscellaneous Fiqh · Hanafi

Question No: 5381
Questioner: Sobnom Mostary Linda
Question Asked: 13 Sep 2026, 05:12 AM
Reviewed & Published: 13 Sep 2026, 05:48 AM
Views: 33
Tokens: 11,033
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম, হুজুর।
আমি আমি হেলথ প্রফেশনসের ১ম বর্ষের ছাত্রী। আজ ভোর ০৪:৪২ এর দিকে একটা ভয়ংকর স্বপ্ন ঘুম ভাঙার পর অনেক চিন্তায় আছি। যদি স্বপ্নের ব্যাখাটা আমাকে জানাতেন তাহলে অনেক উপকৃত হতাম।

শায়েখ, আমি স্বপ্নে দেখেছি, আমি, আম্মু, আমার বোন, আর বোনের ছোট্ট মেয়েটা.. আমরা একটা গ্রামের দিকে ২-১ দিনের জন্য থাকতে গিয়েছি। সেখানে আবার আমাদের এক আত্মীয় না আম্মুর পরিচিত একজন মহিলা এসেছে আমাদের বাসায়। তো উনি আসার পর বিকালের দিকে আমাদেরই আরেকটা পরিত্যাক্ত বাড়িতে সাথে করে ঘুরতে গেছেন গ্রাম ঘুরে দেখার কথা বলে। তো ঐখানে গিয়ে কী কারণে যেন উনি অনেক খানি গভীর (ছোট একটা পুকুরের থেকেও গভীর) গর্ত করে ফেলেছেন এক কোপে। তারপর তার এই কান্ড দেখে আমরা সবাই অবাক... একটু ভয় ভয়ও পাচ্ছিলাম কারণ এটা পরিত্যক্ত বাড়ি, সাপ থাকতে পারে। তো উনি বলে আরেহ্ না, কিছু হবে না। গিয়েই দেখো। তো ঐ গর্তের সামনে গিয়ে দেখে এমন কোনো সাইজের সাপ সেখানে বাকি নাই যে ঐখানে নাই। বড়, ছোট, মাঝারি...অনেক প্রজাতির অনেক সাপ! কিন্তু ওরা সবাই আমাকে বা আমাদেরকে দেখে মাটির আরে গভীরে চলে যাচ্ছে। একটা সাপও উপরের দিকে আসলো না। 'শ য়ে 'শ য়ে সাপ...সবগুলো যেন আমাদের দেখে ভয় পেয়ে মাটির ভেতরে ঢোকার প্রতিযোগিতা শুরু করেছে এমন। তো এসব দেখার পর, আমাদের সেই পরিত্যাক্ত বাড়ি থেকে আমাদের কাজে লাগতে পারে এমন কয়েকটা ঝুড়ি বা প্রয়োজনীয় জিনিস নিয়ে আমরা বাসায় চলে আসি। বাসায় আসার একটু পরেই, আমার বড় বোনের মেয়েটা নতুন এই বাসার মধ্যেই খেলাধুলা করতে করতে কখন যে বাথরুমে চলে গেছে আমরা কেউই খেয়াল করিনি। অনেকক্ষণ ওকে দেখতে না পেয়ে আমি একটু ওকে খুজতে গিয়ে দেখি মেয়ে আমার একা একাই বাথরুমের মধ্যে গিয়ে ওর বাথরুমের পটের উপর বসেই নিস্তেজ হয়ে গেছে। এটা দেখে আমি তাড়াহুড়ো করে ওকে রুমে নিয়ে আসি। এরপর হসপিটালে নিয়ে যাওয়া হয়, কোনোভাবেই তার হার্টবিট ফিরে আসে না। ডক্টর বলে ও এখনো মারা যায়নি কিন্তু একবারের জন্য হয়তো একটু সেন্স আসতে পারে, সেন্স আসার পর আর ১ ঘণ্টার মতো সময় থাকবে ওর হাতে। দুঃখিত আমরা ওকে বাঁচাতে পারবো না এটা বলার পর ওকে যে সাদা কাপড়ে মোড়ানো ছিলো সেখানে ২ টা ক্রস দাগ দিয়ে দিলো। এটা বলার পর অনেক কান্নাকাটি করে আমি আয়াতুল কুরসি, তিন কুল আরো কী কী যেন পড়ার পর দেখি মেয়ের হৃদস্পন্দন ফিরে আসলো, আস্তে ধীরে মেয়ে উঠে বসলো। তারপর একদম স্বাভাবিক বাচ্চার মতো কথা বলা, খেলাধুলা শুরু করেছে। এমন সময় আমার ঘুম ভেঙে গেছে। ঘুম ভাঙার পরও এমন মনে হচ্ছিল যেন সেটা বাস্তবেই ঘটেছে। একটু পর আমার মনে হলো যে না, আমি স্বপ্ন দেখেছি।

শায়েখ, আমাকে যদি একটু এই স্বপ্নের ব্যাখ্যাটা দিয়ে সাহায্য করতেন তাহলে অনেক উপকৃত হতাম। আর আমাদের মেয়েটার কী কোনো সমস্যা হবে না তো? যদি একটু বলতেন তাহলে অনেক ভালো হতো। জাজাকাল্লাহ খইর।

Answer

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

প্রিয় বোন, আপনার স্বপ্নের ঘটনা বিস্তারিত পড়লাম। প্রথমেই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট করে নেওয়া দরকার:

স্বপ্নের ব্যাখ্যা (তাবির) কোনো নিশ্চিত ইলম নয়। শরীয়তে স্বপ্নের ব্যাখ্যা কেবল সম্ভাবনা (য推测/অনুমান) হিসেবে বিবেচিত হয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

«الرُّؤْيَا الصَّالِحَةُ مِنَ اللهِ، وَالرُّؤْيَا السَّوْءُ مِنَ الشَّيْطَانِ» — সহীহ বুখারী, হাদীস ৬৯৮৪; সহীহ মুসলিম, হাদীস ২২৬৩

অর্থাৎ ভালো স্বপ্ন আল্লাহর পক্ষ থেকে, আর খারাপ/ভয়ংকর স্বপ্ন শয়তানের পক্ষ থেকে। তাই ভয় পাওয়ার কিছু নেই, বরং শয়তানের অনিষ্ট থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাওয়া উচিত।


১. স্বপ্নের ব্যাখ্যা সম্পর্কে ইসলামের মূলনীতি

ইবন সীরীন রহ. ও অন্যান্য মুহাক্কিকীন বলেন, স্বপ্নের ব্যাখ্যা নির্ভর করে স্বপ্নদ্রষ্টার অবস্থা, সময়, পরিবেশ ও প্রতীকের উপর। একই স্বপ্ন একজনের জন্য সুসংবাদ, আরেকজনের জন্য সতর্কবার্তা হতে পারে। তাই কোনো আলেমই নিশ্চিতভাবে বলতে পারেন না যে "এমনই হবে"। এটা কেবল ইজতেহাদী অনুমান।

ইমাম ইবন আবিদীন শামী রহ. «রাদ্দুল মুহতার»-এ উল্লেখ করেন যে, স্বপ্নের ব্যাখ্যা একটি ফর'ঈ ইলম, যা কুরআন-হাদীসের মূল আকীদার অংশ নয়। (রাদ্দুল মুহতার, ১/৪৮-এর আলোচনা দ্রষ্টব্য)


২. আপনার স্বপ্নের প্রতীকী বিশ্লেষণ (ইবন সীরীন ও মুফাসসিরীনের আলোকে)

| প্রতীক | সম্ভাব্য ইশারা | |---|---| | গ্রামে সফর | জীবনের পরিবর্তন, নতুন পরিবেশ বা অবস্থার দিকে অগ্রসর হওয়া | | পরিত্যক্ত বাড়ি | অতীতের কোনো অবহেলিত বিষয়, অথবা এমন কিছু যা থেকে সতর্ক থাকা দরকার | | গভীর গর্ত/কূপ | গোপন বিষয়, লুকানো বিপদ বা চিন্তার গভীরতা | | অসংখ্য সাপ | শত্রু, হিংসুক, ষড়যন্ত্রকারী, অথবা অভ্যন্তরীণ ভয়-দ্বিধা | | সাপের পালিয়ে যাওয়া/মাটির নিচে ঢুকে যাওয়া | বিপদের দূর হয়ে যাওয়া, শত্রুর পরাজয়, আল্লাহর হেফাজত — এটি ইতিবাচক ইশারা | | ঝুড়ি/প্রয়োজনীয় জিনিস নিয়ে আসা | অভিজ্ঞতা থেকে উপকৃত হওয়া, ক্ষতির মধ্য থেকেও লাভ | | শিশুর অসুস্থতা/নিস্তেজ হওয়া | পরিবারের কোনো সদস্যের প্রতি দুশ্চিন্তা, অথবা দুর্বলতার সময় | | আয়াতুল কুরসি ও তিন কুল পড়ে সুস্থ হয়ে যাওয়া | কুরআনের শিফা, আল্লাহর রহমত ও হেফাজতের সুস্পষ্ট ইশারা — এটি অত্যন্ত শুভ লক্ষণ | | সাদা কাপড়ে ক্রস দাগ | অশুভ প্রতীক, তবে আপনার দুআ ও কুরআন তিলাওয়াতে তা রদ হয়ে গেছে |

সারসংক্ষেপ: স্বপ্নের শেষাংশ অত্যন্ত ইতিবাচক। সাপগুলো আপনার সামনে থেকে পালিয়ে গেছে — এটি ইঙ্গিত করে যে আল্লাহ তা'আলা আপনাদেরকে বিপদ, হিংসা ও শত্রু থেকে হেফাজত করবেন। আর কুরআন তিলাওয়াতের পর শিশুর সুস্থ হয়ে ওঠা — এটি আল্লাহর কুদরত ও শিফার সুস্পষ্ট নিদর্শন।


৩. মেয়েটার বিষয়ে দুশ্চিন্তা

না, ইনশাআল্লাহ মেয়েটার কোনো ক্ষতি হবে না। স্বপ্নে দেখা কোনো ঘটনা বাস্তবে ঘটবে — এটি কোনো শরীয়তসম্মত বিশ্বাস নয়। স্বপ্ন কেবল ইশারা, ভাগ্য নির্ধারণকারী নয়। ভাগ্য আল্লাহর হাতে।

আল্লাহ তা'আলা বলেন:

«وَعِندَهُ مَفَاتِحُ الْغَيْبِ لَا يَعْلَمُهَا إِلَّا هُوَ» — সূরা আন'আম, আয়াত ৫৯

অর্থাৎ গায়েবের চাবি কেবল আল্লাহর কাছেই।


৪. করণীয় (আমলী নির্দেশনা)

রাসূলুল্লাহ ﷺ খারাপ স্বপ্ন দেখলে যা করতে বলেছেন:

  1. বাম দিকে তিনবার থুথু ফেলা (হালকা, শুকনো)
  2. শয়তান থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাওয়া: «أَعُوذُ بِاللهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ»
  3. ডান কাত হয়ে শোয়া (যদি শুয়ে থাকে)
  4. কারও কাছে খারাপ স্বপ্নের কথা না বলা
  5. সালাত আদায় করা

(সহীহ মুসলিম, হাদীস ২২৬২; সহীহ বুখারী, হাদীস ৬৯৮৬)

আপনার জন্য বিশেষ আমল:

  • আয়াতুল কুরসি প্রতিদিন রাতে ঘুমানোর আগে পড়া
  • সূরা ফালাক, সূরা নাস, সূরা ইখলাস তিনবার পড়ে হাতে ফুঁ দিয়ে সারা শরীরে মাসেহ করা
  • সূরা বাকারার শেষ দুই আয়াত রাতে পড়া
  • সকাল-সন্ধ্যা তিনবার: «بِسْمِ اللهِ الَّذِي لَا يَضُرُّ مَعَ اسْمِهِ شَيْءٌ فِي الْأَرْضِ وَلَا فِي السَّمَاءِ وَهُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ»
  • সদকা করা — বিশেষ করে মেয়েটার পক্ষ থেকে
  • মেয়েটার জন্য দুআ: «اللَّهُمَّ احْفَظْهَا مِنْ كُلِّ سُوءٍ»

৫. একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা

স্বপ্নের ব্যাখ্যা নিয়ে অতিরিক্ত ব্যস্ত হওয়া বা ভয় পাওয়া শয়তানের কুমন্ত্রণা। আপনার পড়াশোনা (হেলথ প্রফেশনস ১ম বর্ষ) গুরুত্বপূর্ণ — মনোযোগ সেদিকে রাখুন। স্বপ্নকে ভাগ্যের ফয়সালা মনে করবেন না।

ইমাম ইবন সীরীন রহ. বলেন, স্বপ্নের ব্যাখ্যা কেবল তখনই গুরুত্বপূর্ণ যখন তা আমলে উদ্বুদ্ধ করে বা সতর্ক করে — ভয় সৃষ্টি করে না।


দুআ

اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ خَيْرَ هَذِهِ الرُّؤْيَا وَخَيْرَ مَا فِيهَا، وَأَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّهَا وَشَرِّ مَا فِيهَا

"হে আল্লাহ, আমি এই স্বপ্নের কল্যাণ ও তার ভেতরের কল্যাণ কামনা করছি, আর তার অনিষ্ট ও ভেতরের অনিষ্ট থেকে আপনার আশ্রয় চাইছি।"

আল্লাহ তা'আলা আপনাকে, আপনার পরিবারকে এবং মেয়েটাকে সব ধরনের অনিষ্ট থেকে হেফাজত করুন। আমীন।

والله أعلم بالصواب


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.